25 Jan

ছায়া দীর্ঘতর

লিখেছেন:রামকিশোর ভট্টাচার্য


শ্রীরামপুরে গঙ্গার ধারে মদের কারখানা । তবে সে এখন অতীত। অতি বৃদ্ধ সে । মুখ বন্ধ বসে আছে । নেশা তার দিকে আর কাউকেই টেনে আনে না । বোতলের টুংটাং পিয়ানো বাজেনা আর , কাউকে কিছু পিয়ানোর দায়ও নেই তার এখন। তার সামনেই সিমেন্ট বাঁধানো গোল বেঞ্চিটা এখন খুব জীর্ণ। জঞ্জালময়।   কত আগাছা ভিড় করে আছে তাকে ঘিরে। ওখানেই সবাই জঞ্জাল ফেলে। একদল স্বর্গরথ তার পাশে দাঁড়িয়ে ঝিমোয়। দু’এক টুকরো বসার জায়গা যে নেই তা নয়, কিন্তু কেউ এসে বসেনা। ঝিমঝিম যন্ত্রণা আর কষ্ট নিয়ে বেচারা চুপ করে ভাবে সেই অতীত দিনের কথা ।  তাকিয়ে থাকে ডিস্টিলারির দিকে চালসে পড়া চোখে।

সামনে দিকে গড়িয়ে যাওয়া রাস্তাটা তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসে। সেই কবে থেকে গড়িয়ে যায় আবার ফিরে আসে। তারও শরীরটা ভালো নয়। আরে বাবা তারও তো বয়েস হয়েছে। গোল বেঞ্চির চেয়ে বয়সে অনেক বড় সে। ডেনমার্কের রাজা এ শহরে আসার অনেক আগে থেকেই সে চলছে।  যদিও একসময় মাটির রাস্তা ছিল কিন্তু এখন তার ত্বক অনেক মোটা হয়েছে । কিন্তু সমস্ত শরীরে কত ক্ষত দাগ এসব দেখে গোল বেঞ্চির ভিতরে ভিতরে নিরাকার ঢেউ ওঠে। মনে পড়ে যায় সেই কবেকার হারানো দিনের কথা।

একটা সময় ছিল এখানেই জমে উঠত কত আড্ডা । শীত আসলে পাশ ফিরে শোয়া সন্ধ্যাবেলাতেও কত না জমজমাটি আসর বসতো। জলের আঁধারে ছোট ছোট ঢেউএর গায়ে বেজে উঠতো কবিতার অক্ষর কত। এখন মাঝে মাঝে উচ্ছেদের শব্দ বাজে।  অস্তিত্বের সংকট পাশে বসে।  তবু স্মৃতিচারণের নেশা যেন পেয়ে বসে তাকে ।

হঠাৎ ডিস্টিলারীর ঝিমিয়ে থাকা চোখ দুটো একটু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গোল বেঞ্চি সে দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে–  কি গো হঠাৎ চনমনে হয়ে  উঠলে যে!  কিছু দেখলে নাকি ?

সে বলে –  আরে শিবনাথ মুখার্জি আসছে গো ।কতদিন পর । সঙ্গে পল্লবও আছে !

দুজনে এসে বসে গোলবেঞ্চিতে। শিবনাথ পল্লবের চেয়ে কিছুটা বড়। এখন ওই আটাত্তর  ঊনআশি  বয়েস হবে।  যদিও মনে মনে বাইশেই  দাঁড়িয়ে আছে। কবিতা লিখত।  এই শহরের কলমেরা তাকে নিয়ে গর্ব করে।  এই বয়সেও প্রেমে ওস্তাদ।  দৈনিক ফ্রেন্ডলিস্টে মহিলার সংখ্যা নিয়ে অনেক বিতর্কের প্রপাগান্ডা থাকলেও তার কোনো হেলদোল ছিলনা। অনায়াসে বৌদি কি রান্না হচ্ছে বলে ঢুকে যেতে পারতো রান্নাঘরে। তারপর সেই রান্না বস্তুটি খেয়ে  তবে নিশ্চিন্ত। সে মনে করত ছেলেদের একটু চরিত্রদোষ আর পানদোষ না থাকলে ভবিষ্যৎ স্মৃতি থেকে ডিলিট করে দেবে। তার কাব্য ভালোবাসে এমন কোনো সুন্দরী ললনার কাছে নিজের ছেলেকে দাদার ছেলে বলে চালিয়ে দিতেও তার কোনো দ্বিধা ছিল না ।সরকারি অফিসে চাকরী করলেও চেয়ার তাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি অবসর পর্যন্ত। আর পল্লব সামান্য লেখালেখি করলেও ওই নিয়ে তেমন কোনও উৎসাহ ছিল না। নেহাৎ ভালোমানুষি আড্ডা দেবার জন্যই এসেছে।

গড়িয়ে যাওয়ার রাস্তাটা তাদের দেখে একটু ফিকফিক করে হাসলো । আজ গোল বেঞ্চির খুব আনন্দ হচ্ছে । সমস্ত অরগ্যানে যেন রিদিম বাজছে।  এখন একটু বিদেশি শব্দ ভাবতে ইচ্ছে করছে তার।

পল্লব বলে – শিবনাথদা তোমায় অত ক্লান্ত লাগছে কেন!

শিবনাথ একটা দীর্ঘ হাই তোলে।

তারপর বলে –  পল্লব ইদানিং হাওয়া এসে ভেঙে দিচ্ছে যখন তখন । এ যেন খেলার নিয়ম রে ।শরীরের ভিতরে কত যে গোপন লেখা এখন দেখতে পাই । যেন সব প্রেম প্রেম লুকোচুরি খেলা ।

কিন্তু ভুলগুলো শুধরে নিতে পারিনা এখন ।ছায়াগুলো দীর্ঘতর হয় ।

– ঠিক বলেছো।  ভুলগুলো যদি  শুধরে নেওয়া যেত তবে হয়তো ইতিহাস টা একটু অন্য রকম হয়ে যেত।  এখন বড্ড আক্ষেপ  হয়  জানো।

হঠাৎ ঝিপঝিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। দুজনে দৌড়ে ডিস্টিলারির সামনে এসে দাঁড়ায়। শিবনাথ তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে,  বৃষ্টির অক্ষর লেখা হচ্ছে তার গায়ে । গোল বেঞ্চির  আজ উল্লাস হচ্ছে ভিতরে ভিতরে।  তার গায়ের জঙ্গলগুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।  ঝমঝম বৃষ্টি নামলে দুজনেই বৃষ্টির হাত ধরে এগিয়ে চলল ইতিহাসের দিকে। স্বর্গরথগুলো একটু হাসলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে ।

আজ সকাল থেকেই হুঁকোর মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছিল। কাল সারারাত বৃষ্টির পর ওই মেঘলা আকাশটাকে একটু টোকা মেরে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব।  কোথাও যেন একটা গোপন রহস্য খেলা করছে মনে হচ্ছে। হুঁকো বাঁড়ুজ্জে।  একটা ভালো নাম আছে। তবে আশেপাশে সবাই হুঁকোদা বলেই ডাকে।  পাড়ার বাড়ি ঘর চায়ের দোকান এমনকি এই শহরের সব পানশালা তাকে ওই নামেই চেনে।  আর গঙ্গার ধারে ডিস্টিলারী তাকে দেখলেই মাথা নামিয়ে বাও করে। কিন্তু গোলবেঞ্চির বড্ড মায়া হয় হুঁকোর  জন্য।  কত গভীর পড়াশোনা তার । এখানে এসে যখন বসে তখন বন্ধুদের সঙ্গে তার কথা শুনেই শুনেই বুঝতে পারে সে হুকোর কত ফান্ডা আছে।

এখন একটু বিকেল হতেই হুঁকো একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে । ভিতর থেকে বৌ  বলে ওঠে–  ফেরার সময় দয়াকরে ছাতাটা নিয়েই ফিরো।  হুঁকোদের  প্রবীণ বাড়ির ধুলোমাখা দরজাটা একটু ক্যাঁচ করে হুঁকোর বউয়ের কথার সমর্থন করে আবার ফিরে যায় নিজের জায়গায়।  শুধু নিরুপায় ছাতাটা মনে মনে ভাবে আজ তার স্থানান্তরে যাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। হুঁকো এগিয়ে যায় সামনের দিকে যেদিকে এক সময় তার প্রেমিকার বাড়ি ছিল।  যে বাড়ি হুঁকোকে ওকে দেখলেই বলে – জোছনা রোপনের সব গোপন রহস্য লিখে রাখো পৃথিবীর বুকের ভিতরে।  তাতেও হয়তো কিছু রক্তের দাগ দেখা যাবে ।

এখানে এসে দাঁড়িয়ে যায় হুঁকো।  এমন আবগারি বিকেলে  এখানে দাঁড়ালে তার মনে – হয় কিছু নেই – নেই , মানাতে পারি না এই অসমান বেঁচে থাকা , শুধু চোখ মেলে রাখা …

ভাবতে ভাবতেই হুঁকো দেখে তার জীবনের সমস্ত দাবী আর প্রেম ভাবনাগুলো তুলোর বীজ হয়ে উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায়।  এসময তার খুব মরে যেতে ইচ্ছে হয় । আহা সে মৃত্যু এক পেগ হুস্কির ভিতরে যদি হয় । ওপাশের গোলকধাম হুঁকোর ভুল ইচ্ছেগুলো নিয়ে চোখরাঙায় । প্যান্টের পকেট থেকে একটা নিব বের করে গোলকধামের  দিকে এগিয়ে দেয় সে।

এসময় গোলকধামের মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়।  নেশা ধরে । পুরনো খোলস বদলে তার খুব বর্তমান হতে ইচ্ছে করে।  মনে মনে জড়ো করে ফেলে আসা যা কিছু স্মৃতি সম্বল । আসলে গোলকধামের একটা জমিদারি মন আছে। আর আছে কিছু গভীর বিষাদ ।হুঁকো  তার সামনে এলেই সেই সব বিষাদ এলোমেলো ছবি হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।  একেই কি বলে মধ্যবিত্ত বিভ্রান্তি ?  হাওয়ায় নামতা পড়া শুরু হয় -মনেক্ষে মন…   মন দুগুনে …

এবার হুঁকোর খুব ইচ্ছে। হয় গঙ্গারধারে গোলবঞ্চির দিকে যেতে । একবার  ডিস্টিলারির সামনে গিয়ে তার বুকের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে সেখানে কোনো শিশুর মতো হাসি রাখা আছে কিনা । কিংবা তার নিজের যৌবনের পাগল দিনগুলোর ছবি ।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ হুঁকো  দেখে তার সামনে মিলন দাঁড়িয়ে । এসময়ের হুঁকোর মনে হয় আহা শিবনাথ যদি থাকতো । উন্মাদিনীর বাতায়ন দিয়ে কেউ হাত নেড়ে বলতো এসো ছায়ার সঙ্গে খেলা করা যাক । কিংবা ক্ষুধার্ত জল আর শান্ত অগ্নি নিয়ে ছবি আঁকতো কেউ ।

মিলনের কলম এখন এত জনপ্রিয় কত লোক মিলনের ভক্ত হয়ে গেছে। শিবনাথের আবিষ্কার মিলন। সেই  কিশোরবেলায় এক হাফপ্যান্ট আর হাফ শার্টকে আবিষ্কার করে ছিল । তারপর যে কত জল গড়িয়ে গেছে এই ফ্রেডরিকনগরের গঙ্গা দিয়ে । এই তো সেদিন গঙ্গার ধারে এস.ডি.ও বাঙলোর সামনে পাঁইট খেয়ে এসে বসেছিল হুঁকো। ফুরফুরে হাওয়ারা খুব দুষ্টুমি করছিল তার সঙ্গে । আলোর গায়ে তখন ছায়ার ছবি।  বেশ লাগছিল।  সামনেই একটা হাতের বিরাট ট্যাটু আঁকা ছেলে আর একটা মেয়ে অল্প আলোয় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছিল । হঠাৎ ছেলেটা বলে উঠলো , এই নদীর কিনারে তোকে আলতো ডাকবো – বউ কই , রাজী?

তারপরই কয়েক টুকরো হাসি পাখি হয়ে উড়ে গেল হুঁকোর পাশ দিয়ে।

আরেএএ  এ তো মিলনের কবিতার লাইন। হুঁকোর বাংলা খাওয়া মনটা  ভাল হয়ে গেল যে পকেটে  যেটুকু রেখেছিল রাতে খাবে বলে সেটুকুও মেরে দিয়ে তরলমগ্ন হয়ে কান পেতে শুনছিল আর কিছু বলে কিনা । নদীর জল থেকে তখন কত্ত নিরাকার আকার হয়ে উড়ে আসছিল তার দিকে । এ দুনিয়া আনন্দময় হয়ে উঠছিল তার কাছে।  আনন্দ পেলে হুঁকো হরিণ হয়ে যায় । মনে হয় দিকবিদিক ভুলে ছুটে যায় কোন এক গল্পের দিকে । যে গল্পে কাটা ফলের গায়ে আঙ্গুলের রক্তদাগ রয়ে গেছে।

সেদিন থেকে মিলন হুঁকোর কাছে তারকা ।শিবনাথ অনেক বড় কবি ছিল । কিন্তু যা সব কাণ্ড করেছে । ভাবতে ভাবতেই ফুসফুসের ভিতর থেকে সে সব ঘটনার ছবিগুলো বুদবুদের মত বাইরে এসে হাওয়ায় উড়তে থাকে।

হুঁকোও কবিতা লেখে । যদিও ফেসবুকে পোস্টায় না । পত্রিকাতেও তেমন ভাবে মুখ দেখায় না তারা । তবু কিছুতো ছাপা হয়েছে।  নয় নয় করে দুটো বইও আছে।  না হয় তাতে কেউ লাইক মারার সুযোগ পায়নি ,  তবে পোস্টালে কি লাইক করতো না কেউ । কমেন্ট ছড়াতো না ? ওই তো অর্ণব ওদের বন্ধু কিইই বা লেখে ,  শিবনাথ তো ওকে মাথা তুলতেই দেয়নি । পাত্তাই দিত না । এতদিন বই টই কিছুই ছিলনা।  যাস্ট ফেসবুকে কবিতা পোস্টিয়ে এখন কবি  হয়ে গেল ।  কয়েকটা বইও হয়ে গেল তার । আর হুঁকো ! কষ্টের ঢোক গেলে ।

মনে কষ্টের ছবিগুলো হাত পা নাড়ে  সামনে। সে ভাবে আহা তার কবিতার কথা এভাবে কেউ বলছে বলে শোনেনি কোনো দিন । হয়তো বলবেও না ।

আবার মিলনকে বলে চ’  ঘুরে আসি আবগারিতলা থেকে । আহা শিবনাথটা যদি থাকতো তাহলে খুব ভালো হতো । ওই গোল বেঞ্চে বসলেই আমার শিবনাথের কথা মনে হয়। শালার আবার পুনর্জন্ম হবেই দেখিস।  একটা প্রজাপতি হয়ে জন্মাবে।

হুঁকোর কথাগুলো  কেমন যেন পুরনো দেওয়াল থেকে ঝরে পড়ার মতো মনে হচ্ছে মিলনের। আর লুপ্ত হতে থাকা ছবিগুলো সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে তার।

মিলন কিছু বলতেই পারে না। এগিয়ে যাই হুঁকোর সঙ্গে ।

মিলন ভাবে এই শহরের রাস্তাগুলো কত কথা জানে। কত্ত  খোলস বদলের  খবরাখবর ব্লু টুথের হাত ধরে কত নস্টালজিয়া পৌঁছে গেল পারফর্মিং আর্টের দিকে। তার কিছু কিছু ধরে রেখেছে তার কলম। যে কলম তাকে দিয়ে মধ্যবয়সে এসে সূর্যাস্তে নির্মিত গৃহ আঁকিয়েছে।

এখন আর বৃষ্টি নেই । হুঁকোর কাছে ছাতাটা এখন অতিরিক্ত মনে হচ্ছে। ছাতাটার আজ মনটা খারাপ লাগছে খুব । বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে । যে ভাবেই হোক হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা যে ছাতার মনেও বাজে সেটা কে আর মনে ভাবে।  আশ্রয় শব্দটার সঙ্গে ছাতার খুব দোস্তি আছে।  আর থাকবে নাই বা কেন সেই জন্ম থেকেই তো দুজনের পরম আত্মীয়তা। নইবা হল সে ছাতার সহোদর।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ হুঁকোর হাত ফসকে পড়ে গেল সে । মিলন তাকে তুলে নেয় ।এবার তার মনে একটা নিশ্চিন্ত ভাব । একটু সান্তনা তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সেও একটু মুচকি হাসে ।

ওরা এখন নিশান ঘাটের পাশ দিয়েই হাঁটছে।  ডেনমার্ক প্রথম পায়ের ছাপ চিকচিক করে ওঠে। কেরি সাহেবের সেই প্রবীণ জাহাজের ছবিটা টলমল করছে গঙ্গার ধারে । রায়ঘাটের পাশ দিয়ে রাস্তাটাও চলেছে ওদের সঙ্গেই ।

এই পথ ধরেই শিবনাথ , মুকুল , পল্লবরাযও হেঁটে যেত । ওই তো তাদেরও পায়ে চিহ্ন আল্পনার মতো আঁকা হয়েছে ধুলোদের গায়ে। যেন কত এপিটাফের ভাস্কর্য হাসছে শিশুর মতই। একটুও ভনিতা চিহ্ন নেই । হুঁকোর পা টলছে।   সেনট ওলফ গীর্জার ঘণ্টা বাজছে রাজকীয় শব্দে । ঢং ঢং । আর সেই ঢং  শুনে হান্না হাউসের মুখে কি হাসি । দেখে হুঁকোর অকৃত্তিম এই টলমলে পায়ের ছাপও ভাস্কর্য হয়ে যাচ্ছে ভিজে রাস্তার গায়ে । আসলে স্টাডি করলে দেখা যাবে হুঁকোর ভিতরে  ঘুমিয়ে আছে বহুদিনের একটা জলজ্যান্ত মিউট্যান্ট ইংরেজ মন।  এক বাঙালির ভিতরে এ ভাবেই কৌশলে বেঁচে আছে সে । পানীয় যাকে মনে মনে দেখা বানাতে সাহায্য করে । সাহায্য করে সামান্য জড়িয়ে স্বপ্ন আঁকার।  সে স্বপ্নে ফাঁকে ফাঁকে তীব্র ঝাঁঝ থাকে ।

আর ওই বানানো পথ ধরেই সে দেখতে পায় অলৌকিক বারাঙ্গনার আশনাই সন্ধান পায়মহাসতীর কুঞ্জবনে পরমার্থের । নিঃশ্বাস ও নীরবতা পাশাপাশি চলে ।

ওরা পৌঁছে যায় গোল বেঞ্চির কাছে। একদল নস্টালজিয়ার সঙ্গে  ডিস্টিলারির ভিতর থেকে উড়ে আসছে কবেকার হুইস্কির গন্ধ। প্রাচীন হুইস্কি যার কোন দৈর্ঘ্য নেই,  কোনো প্রস্থ নেই। শুধু বেঁচে থাকা আছে । আকাশের একটা দিক ঘন মেঘের চাদরে ঢাকা আর এক দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে গোধূলির রঙ। একটু উদ্বেগ যেন ভাসছে হাওয়ায় । মিলন চুপ করে দেখছিল । কবেকার ডিস্টিলারি দাঁড়িয়ে আছে যেন সিদ্ধপুরুষ । গোলবেঞ্চির দিকে তাকিয়ে নিজের লেখা দুটো লাইন তার সামনে ভেসে  আসছে,   সে বিড়বিড় করে – আড়ালে অনেককাল একা একা পড়ে ছিল/ ধুলোয় কাদায়/ এমন হয়েছে হাল / থেমে গেছে এ সকাল/ সমবেত ঝুলকালি ধোঁয়ার বাধায়… বৃষ্টি যেনো পিছন ছাড়ছে না , আবার এলো ঝিমঝিম করে। খানিক্ষণ বসেই উঠে পড়ে তারা। অতীতের ধুলোগুলি নিয়ে এবার রাস্তা চলে গল্পপথ ধরে।

সে পথ কিছুটা এগিয়েই এসে থামে বাসন্তী কেবিনের সামনে। মাছের চপ এর গন্ধ উড়ে আসছে । ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে বসন্ত জাগ্রত গান গেয়ে ইউটিউবের মনে ।

টেবিলগুলো হাত নেড়ে ডাকে ওদের । মিলনের মনে পড়ে যায় এভাবেই জীবনের সকালবেলায় শিবনাথ ডেকেছিল তাকে । এখানেই।  শীর্ষবিন্দু থেকে জোছনা নেমে ভাসিয়ে দিয়ে ছিল তাকে ।

–  আরে আয় আয় মিলন বোস। হুঁকো  কতদিন পর দেখলাম তোকে । ওরে আর দু’প্লেট মাছের চপ দিস । শিবনাথের ডাকে কেউ সাড়া দিল না তো !  শুধু একটা চায়ের কাপ নিজেকে প্লেটের উপরে ব্যালেন্স করে নিল ।

মিলন তাকিয়ে আছে শিবনাথের দিকে । অবাক হয়ে ।

–  ধুররর  …  কি দেখছিস ভয় নেই অর্ডার দিয়ে তোদের খেতে বলে-আজ আর কেটে পড়বো না। সে ঘটনা আর রিপিট হবে না । সিস্টেম বদলে ফেলেছি রে । মিলন তোর শেষ বইটা পড়লাম ।হুঁকো এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল । হঠাৎ বলে ওঠে – মিলন আমার ছাতাটা ।

শিবনাথ হেসে ওঠে –  ওই ছাতার সঙ্গে আমার আঁতাতটা এখন ভালোই রে । তুই যেখানে  রেখেছিলি তাতে ওটা অন্য প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যেত । ওই দ্যাখ মিলন ঠিক জায়গায় ওকে প্লেস  করে দিয়েছে ।

হুঁকো মিলনকে বলে –  জানিস তো আমি চা খাই না । আমায় বরং টাকাটা দে আমি এক্ষুনি আসছি । টাকা নেওয়ার অপেক্ষা না করেই উঠে বেরিয়ে যায় সে । একটু অবাক হয় মিলন ।

তাকিয়ে থাকে শিবনাথের দিকে।  একটা সিগারেট আপন মনে জ্বলে যাচ্ছে তার পাশে ।

শিবনাথ বলে  –  অবাক হয়ে তাকিয়ে আছিস কেন রে ! কি ভাবছিস ! আসলে পুরনো লিপির পাশে জমে ওঠা সব অপমান নিয়ে প্রতিকূল সব হাওয়া কেটে দু হাত ঝাপটে উড়ে গেছি আমি ।

মনে রাখিস তার একটা আরকাইভ্যাল মুল্য আছে । এ শহরে আমি আছি আগের মতই।  হিসেব রেখেছি ঠিক । আয় আজ দুজনে একটা সেলফি তুলি । নাম দিস –  না ফুরানো রূপকথা ।

বাইরে বৃষ্টি টা খুব জোরে নেমেছে।  এই সময় মিলনের খুব ইচ্ছে করে একটু ম্যাক ডোয়েল বা হোয়াইট রমের সঙ্গে পাশাপাশি বসে এই শিবনাথকে একবার নতুন করে মেপে নিতে ।

[বানানবিধি/মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ