16 Jun

কুঁটিকাটা

লিখেছেন:সৌগত সুন্দর


বিবর্ণ ঘষা কাঁচের দেওয়াল পেরিয়ে যে’টুকু চোখে এসে পড়ে, সে’টুকুই দেখেন। জলের পর্দা চুঁইয়ে যে’টুকু কানের পর্দায় ধাক্কা দেয়, সে’টুকুই শোনেন। গন্ধগুলো ইদানীং যদিও কেমন বাউন্ডুলে, তবু মাংস রান্না হ’লে ঠিক বুঝতে পারেন। মাংসের স্বাদ আর আগের মত না থাকলেও পোস্ত ছড়ানো পুনকোশাক ভাজা, তারপর  আলু-বড়ির পোস্ত, আর  তারপর পাতে একটু মাংস পড়লে চোখ চকচক ক’রে ওঠে এখনও। আর ভালো লাগে যখন টুপুর এসে গা ঘেঁষে চুপটি ক’রে ব’সে থাকে, আর তার বর অরণ্য সমস্ত শীতের আগল ঠেলে যখন চেপে জড়িয়ে ধরে বুকে, তার স্পর্শ। ভারি সুপুরুষ, সুন্দর বর হয়েছে টুপুরের।

অরণ্যকে দেখলেই নিখিলের কথা মনে পড়ে শচীনবাবুর। সেই চওড়া বুক, চওড়া কাঁধ, শক্ত চোয়াল, উজ্জ্বল চোখ। সেই প্রাণখোলা হাসি। উদ্দাম হুল্লোড়। কলেজের বন্ধু থেকে কত সহজেই আপন হয়ে গিয়েছিলো নিখিল। তার বেপরোয়া আবেগের স্রোতে সাধারণ সামাজিকতার দেয়াল ভেঙে শচীনের চোখের সামনে তুলে ধরেছিলো এক অনাবিল আনন্দজগতের সম্ভাবনা। কিন্তু সে জগৎকে বিশ্বাস করতে পারেনি শচীন। তাল রাখতে পারেনি নিখিলের নির্ভীক আপোষহীন চিন্তাভাবনার সঙ্গে। নিখিল তাই নিখোঁজ হয়ে গেলো, হারিয়ে গেলো তার জীবন থেকে।

টুপুর সাত মাসের পোয়াতি। আজকাল বাড়ি-শ্বশুরবাড়ির পাট চুকে গেছে প্রায় সমস্ত কর্পোরেটগ্রস্ত মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের। টুপুরও মাদ্রাজে থাকে অরণ্যর সঙ্গে। পেট হওয়ার পর থেকেই ঘর আসবো আসবো করছে, কিন্তু আসতে পারেনি। আসলে আসেনি। কারণ এমন মোটেও নয় যে টুপুর চলে এলে অরণ্যর খুব সমস্যা হয়ে যেতো। অরণ্য এক্কেবারে নিখিলের মত। ঘর  ঝাঁটা দেওয়া, মোছা, জামাকাপড় কাচা, রান্নাবান্না – সব বিষয়ে এক্সপার্ট। টুপুর হঠাৎই  আজ নাকি বাড়ি আসছে। একা একা। এই ভরা বর্ষায়। তাও মাত্র দিন পনেরোর জন্য। অরণ্য নাকি এখন  ছুটি পায়নি, সে হয়তো আসবে পুজোর সময়। টুপুরও তখন আবার আসবে, থেকে যাবে বিয়োনো পর্যন্ত।  টুপুর তো তখনই একেবারে এলে পারতো! হঠাৎ এই অসময়ে একা একা আসার দরকারটাই বা কী সাত মাসের পেট নিয়ে? আবছা ক্যালেন্ডারের চপল তারিখ গুলো দেখে দেখে পুজো আর কত দেরি, বোঝার চেষ্টা করেন শচীনবাবু. আর বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অরণ্য চাইলে কি দু’টো দিন ছুটি পেতে পারতো না? বোকরা থেকে জোগ্রামটুকুই যা ঝামেলা! তারপর দূর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ে ধ’রে এয়ারপোর্ট আর কতটকু রাস্তা?

টুপুরের দিদা মায়াবালা আগে থেকেই একটা খেজুরগুড়ের পাটালি বাঁচিয়ে রেখেছেন টুপুরের জন্য। শচীনবাবুর মত টুপুরেরও বড় প্রিয় খেজুরগুড় দিয়ে খাসচালের পায়েস। নুনপায়েসও বড় ভালোবাসে সে। শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মাখা কচুসেদ্ধ আর খাসচালের নুন পায়েস যা জমে না বর্ষায়! আহা! শুকনো লঙ্কা খাওয়াটা অবশ্য তাঁর বারন হয়ে গেছে অনেকদিন। সহ্য হয় না। পেট ছেড়ে দেয়। পেটটা বড়ই লজ্জার ব্যাপার হয়ে উঠেছে ইদানীং। আজকাল কখন যে পায়খানা-পেচ্ছাপ হয়ে যায়, বুঝতেই পারেন না। মায়াবালাকে মাঝেমাঝেই সময়ে-অসময়ে বিছানার চাদর বদলাতে হয়, ঘর মুছতে হয়, রোয়াক পরিষ্কার করতে হয়! কী করবেন?  রাবার ক্লথে শুয়ে যে বেশি শীত লাগে! সারাদিন বিছানায় প’ড়ে থাকতেও ভালো লাগে না তাঁর। মায়াবালা মুখে কিছু বলেন না, বিরক্তও হন না হয়তো, কিন্তু তাঁরও তো বয়স হয়েছে! একা একা আর কত করবেন?  টুপুরের মা মালতীর আবার পায়খানা-বমিতে বড় ঘেন্না। সে মাঝেমাঝে এদিক-ওদিক থেকে উঁকি দিয়ে দেখে যায়, কিন্তু এখন আর কাছ ঘেঁষে না। আগে কত সেবা করতো, কত গল্প করতো! এমনিতে ভারী গোছানো-বাগানো আর শক্ত মনের মেয়ে মালতী। সলিলের মত আলাভোলা ধরনের নয় একটুও। কিন্তু যেই না একটু দুর্গন্ধ গেছে নাকে বা পায়খানা-বমি পড়েছে চোখে, অমনি ওয়াক তুলে ছুটবে বাথরুমের দিকে।

বাইরে বোধ হয় বৃষ্টি নামলো ঝেঁপে। শচীনবাবু উঠে বসেন বিছানায়। বৃষ্টি হ’লে শচীনবাবু ঠান্ডায় কষ্ট পান ঠিকই, কিন্তু গাছপালাগুলো একটু আরাম পায়! অথচ এবারে এদিকে তেমন বৃষ্টি নেই। যত বৃষ্টি কলকাতায়! আরে কলকাতায় কি আর চাষবাস হবে? বীজবোনা হয়ে গেছে, এখন বোয়ার সময়ে বৃষ্টি না হ’লে হয়? যাক! আজ বোধ হয় তাহলে নামলো!

জানলা বন্ধ, অতএব চোখ বুজে বোঝার চেষ্টা করেন শব্দটা বৃষ্টির, নাকি গরম তেলে আনাজ ছাড়ার চিড়বিড়ানি। নাঃ! বোঝা যাচ্ছে না। বাতাসে কি একটু সর্ষেতেলের গন্ধ? আরে আরে এ তো শাকভাজার গন্ধ! মনটা আনন্দে ভ’রে ওঠে শচীনবাবুর। তাহলে কি আলু-বড়ি পোস্তও হবে? আর মাংস? মনটা একটু বিষণ্ণ হয়ে ওঠে তৎক্ষণাৎ। মাংস হ’লেই বা কী? তাঁকে তো আর দেবে না! ক’দিন ধরেই পেটে একটা ব্যথা শুরু হয়েছে। প্রথম প্রথম অল্প ব্যথা হ’ত। ডাক্তার বললো, পেটে ঘা হয়েছে। শুরু হ’ল এবেলা-ওবেলা ওষুধ চার্জ। তারপর শুরু হ’ল প্রচন্ড ব্যথা আর কালো পাতলা পায়খানা। পায়খানা হয়ে গেলে অবশ্য ব্যথা বেশ খানিকটা কমে যাচ্ছিলো। কিন্তু ডাক্তার বললো, ঘা থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অতএব ওষুধের অত্যাচার বাড়লো। কিন্তু তাতে কাজের কাজ হ’ল এ’টুকুই যে কাল সকাল থেকে পায়খানা-পেচ্ছাপ – সব বন্ধ, আর সন্ধেবেলা থেকে কালো বমি। আর মাঝেমাঝেই ভয়ংকর অসহ্য যন্ত্রণা পেটে। শরীর কেঁপে কুঁকড়ে উঠছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। মনে হচ্ছে, ম’রে গেলেই শান্তি। মুক্তি। বয়সও হয়েছে তাঁর ঠিকই, কিন্তু মরার তো কোন বয়স নেই! টুপুরের বিয়োতে আর ক’টা দিনই তো মাত্র বাকি! তার থেকেও বড় কথা নিখিলের সঙ্গে একবার অন্তত দেখা হতেই হবে। নিখিলকে সব কথা ব’লে যেতে না পারলে মরেও যে তিনি শান্তি পাবেন না! টুপুর নির্ঘাৎ খুঁজে বের করবে নিখিলকে। অন্তত শেষ একবারের মত দেখা তাদের হবেই হবে।

মায়া!

মায়াবালার পরিবর্তে আসে প্রতাপ। প্রতাপের মা কাজ করতো এই বাড়িতে। প্রতাপ যখন পেটে, প্রতাপের বাবা পালিয়ে গেল সর্দারপাড়ার জুজে বাগদির মেয়েকে নিয়ে। প্রতাপের মাও পালালো একদিন তার সয়লার বর কাত্তিক দুলের সঙ্গে। প্রতাপের তখন কতই বা বয়স? দশ-বারোর বেশি নয়। অনাথ প্রতাপকে ঘরে এনে তুলেছিলেন শচীনবাবু লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবেন ব’লে। লেখাপড়া বিশেষ হয়নি ঠিকই, কিন্তু মানুষ বোধ হয় হয়েছে। এ’বাড়িতেই থাকে সে। সলিল চাকরিসূত্রে সোম থেকে শুক্র বাঁকুড়ায় থাকে ব’লে বাড়ির সব কাজকর্ম্ম, চাষবাসের দেখাশোনা প্রতাপকেই করতে হয়। দলুইদীঘির কাছে প্রতাপকে একটা নার্সারি ক’রে দিয়েছেন শচীনবাবু। সেটার কাজও করে খুব মন দিয়ে। গাছপালার বড্ড নেশা ছেলেটার।

দিদিমা বেগনি ভাজছে।

চোখ চকচক ক’রে ওঠে শচীনবাবুর। তারপরেই দীর্ঘশ্বাস। তাঁকে তো আর দেবে না!

আমি ভাবনু শাগ হচ্ছে।

শাগ তো দুকুরবেলায় হবে! এখন কী? আজ যা ভালো পুনকো পেয়চি না, খেয়ে দেখো!

আজ তাহলে বুধবার। বুধ আর শনি হ’ল হাটবার। এখন যদিও আনাজপাতি গাঁয়েই হারুর দোকানে পাওয়া যায়, প্রতাপ তবুও সক্কাল সক্কাল সাইকেল চালিয়ে রায়নার হাটে যায় প্রতি বুধবার। শনিবারের হাটটা করে সলিল নিজে। শচীনবাবুও খুব আনন্দ পেতেন সক্কাল সক্কাল রায়নার হাটে গিয়ে তরতাজা তরিতরকারি, মাছ কিনতে। কিনতেন যত না, তার থেকে বেশি দেখতেন প্রাণ ভ’রে। খুব ভালো লাগতো তাঁর। সলিল-প্রতাপ সেই ধারাটাই বজায় রেখেছে।

তুই মাঠ যাইনিস?

গেয়নু। খেপিপিসি ফোন করেছিলো, ডাক্তারদাদুকে বদ্ধমান নিয়ে যেতে হবে।

ডাক্তারটা বোধায় আর বাঁচবে না!

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন শচীনবাবু। ডাক্তার শুধু তাঁর বন্ধুই না, এতদিনের বাঁধাধরা গৃহচিকিৎসকও। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় বড়ই বিপদে পড়েছেন শচীনবাবু। কোত্থেকে এক ছোকরা ডাক্তারকে ধ’রে এনেছে সলিল। শুধু বড়বড় ডিগ্রি, নাড়িই ধরতে শেখেনি এখনো! ডাক্তার হাতুড়ে হ’লে কী হবে, আগেকার দিনের কোবরেজদের মত নাড়িধরায় ধন্বন্তরি। নাড়ি ধরেই ব’লে দেবে শরীরের কোথায় কোন ব্যামো বাসা বেধেছে। ডাক্তার ম’রে গেলে খেপিটার যে কী হবে ভাবতে ভাবতে একটু উদাস হয়ে পড়েন শচীনবাবু।

ডাকছিলে ক্যানে?

ক্যানে ডাকনু বল দিকি?

আমি কী ক’রে জানবো?

বসার ঘর থেকে মায়াবালার ডাক আসে, “পোতে, মুড়ি খেসে!”

হ্যাঁ রে, আমাকে একটা বেগনি দেবে না?

দেবে।

সত্যি দেবে ত?

হ্যাঁ গো! মাইমা তোমার জন্যে মুড়ি ভিজতে দিচ্ছিলো, মামা বললে একটা বেগনিও দিতে।

শচীনবাবুর মনটা আনন্দে ভ’রে ওঠে। শুধু রঙে নয়, স্বাদেও বেগুন বেশ একটা রাজকীয় ব্যাপার। শীতে পেঁয়াজকুচো-ধনেপাতা-বড়িভাজা দিয়ে বেগুনপোড়া আর বর্ষায় মুড়ির সঙ্গে গরম গরম বেগুনি না খেলে বেঁচে থাকার স্বাদ আর কিসে?

সলিল কখন এলে রে?

সকালের ট্টেনে এয়ছে গো!

আমাকে জানায়নে ত?

জানায় নে কী গো? তোমাকে পোনাম ক’রে গেল যে!

অ! … আজকে কিসের ছুটি?

হোই দ্যাখো! বুনি আসছে, মামা ছুটি নেবে না?

ঠিকই তো! টুপুর আসছে আজ কতদিন পর! আগেকার দিনে যে যেখানেই থাকুক, অরবে-পরবে ল্যান্ডাগ্যান্ডা নিয়ে সবাই ঘরে ফিরতো। হইচই ক’রে মেতে থাকতো কয়েকটা দিন। এখন পালা-পার্বণ মানে শুধু ড্ডিজে ড্ডিজে ড্ডিজে। আনন্দময় সমবেত উচ্ছ্বলতার শূন্যতাকে অর্থহীন শব্দমত্ত উন্মাদনা দিয়ে পূরণ করার চিন্তাহীন চেষ্টা। আধুনিকতার মোহ কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই, কিন্তু প্রিয়জনের বাড়ি ফেরার আনন্দ কেড়ে নিতে পারেনি এখনও। সে আনন্দই আজ পরবের মত। সত্যিই তো! টুপুর আসছে এতদিন পর, টুপুরের বাবার আজ বাইরে থাকলে চলে?

বাইরে মেঘ করেছে না রোদ রয়েছে রে?

রোদ রয়ে তো ছে, কিন্তুন তেজ ন্যাই ত্যামন। আজকালের মধ্যে মনে হচ্ছে নামবে!

আমাকে একটু রোয়াকে নিয়ে চ দিকিন, রোদ পোয়াতে পোয়াতে খাবো।

বননু যে রোদের তেজ ন্যাই?

যে’টুকু পাওয়া যায়! রোদ না হ’লে চলে?

এটা তোমার বাতিক।

বুড়ো হ’লে বুঝবি! বুড়ো বয়সে রোদই হল আসল ওশুদ, রোদই হ’ল আসল পথ্য।

কথা না বাড়িয়ে শচীনবাবুকে অনায়াসে পাঁজাকোলা ক’রে তুলে নেয় প্রতাপ। এ’রকম অনায়াসে নিখিলও তাকে কোলে তুলে নিত। একটুও ভয় করতো না শচীনের। কী জোর ছিলো নিখিলের গায়ে! প্রতাপ লম্বা-চওড়া না হ’লে কী হবে, তার গাঁট্টাগোট্টা শরীরেও খুব জোর। বাগান কোপানোর সময় প্রতাপের চকচকে কালো গায়ের রঙ আর টানটান পেশিগুলো যখন সূর্যের আলোয় ঝলসে ঝলসে উঠতো, শচীনবাবু মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। এখন চোখের জ্যোতি কমে গেছে, প্রতাপে নিখিলে গুলিয়ে যায় মাঝেমধ্যে।

রোয়াক বলতে সে আর আগের মত নেই। আগে ছিলো খোলা খামার। খামারের দক্ষিণে রাস্তার ধারে বাঁজা খেজুর গাছের তলায় কয়েকটা ছোটছোট মাটির ঘোড়া আর নয়া পয়সা নিয়ে পীরের থান। তার পাশে থাকতো পালুই আর কুঁটির গাদা। পুবে করুলির পাড় ঘেঁষে সার দিয়ে তিনটে হিমসাগরের, একটা কালোজাম আর দু’টো নারকোল গাছ।  একটু ভেতর দিকে ধানসেদ্ধর দু’টো উনুন। করুলি থেকে জল নিয়েই সেদ্ধ করা হ’ত ধান। উত্তরে নায়েকদের গোয়ালের গা বরাবর ছিলো আস্তাকুঁড়, গোবরগাদা আর একটা বড় নিমগাছ। বাকি জায়গায় হ’ত ধান ঝাড়া, সেদ্ধ ধান শুকোনো আর আলেকালে কারো দরকার পড়লে বিয়ে-ভুজনোর প্যান্ডেল। খামার পেরিয়ে মাটির দেয়াল দিয়ে ঘেরা দখিনদুয়ারী মাটির বাড়ি। সদর দরজার বাঁ পাশে গোয়ালঘরের বাইরের দিকে ঘুঁটের দেয়াল আর অন্যদিকের দেয়ালের গায়ে, সদর দরজা আর খড়কাটার ছিটেবেড়ার ঘরের মাঝে, একটা আড়ে-বহরে চওড়া মাটির রোয়াক। মাথাটা দেয়ালের চালা অবধি খড় দিয়ে ছাওয়া। এই রোয়াকে একবার অবসরমত ব’সে পড়লেই হ’ল, গাঁয়ের লোক আসতে-যেতে দেখা ক’রে যাবে, খোঁজ-খবর দিয়ে যাবে, কখনো তাস, কখনো চা-চ্যানাচুর সহযোগে নিস্তরঙ্গ আড্ডা। এখন খামারে উঠোনে একাকার। মাটির বাড়ি পাকা হয়েছে আর গোটা জায়গাটা ঘিরে দেওয়া হয়েছে ইঁটের উঁচু পাঁচিল দিয়ে। গোয়াল চলে গেছে রাস্তার ধারে। সেটাও পাকা। পালুই, মরাই – সব আছে, কিন্তু গাছগুলো ছাড়া বাকি সবকিছুর জায়গা ওলটপালট হয়ে গেছে। বাগানটা অবশ্য এখন অনেক বড় হয়েছে, আর সুন্দরও হয়েছে প্রতাপের হাতে প’ড়ে। এই বাগানের মাঝেই খড়ের চালের ছিটেবেড়ার ঘরটা একমাত্র একইরকম আছে আগের মত। তার পাশে মাটির রোয়াকটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছে সলিল। তিন ধার উঁচু ক’রে বাঁধানো। এখন আর বৃষ্টির ছাঁট লেগে মাটি স্যাঁৎস্যাঁৎ করেনা, ধারী ভাঙেনা, ঝড়ে চালা ওড়েনা। সেদিক থেকে দেখলে সুবিধে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একে কি রোয়াক বলে? পেছনে দেয়াল নেই, সামনে লোহার গেট! দুদ্দুর! নামেই রোয়াক, আসলে এ শুধু বসার জায়গা। কড়ানাড়াবিহীন মেলামেশার জায়গা নয়।

রোয়াকের ওপর মোটা ক’রে শতরঞ্চি বিছিয়ে ব’সে রয়েছে সলিল আর অপদার্থ অর্বাচীন ডাক্তারটা। পাশে খালি চায়ের কাপ। প্রতাপ শচীনবাবুকে নিয়ে সেখানে পৌঁছোতেই ডাক্তার উঠে একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে মেন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু ক’রে দিলো কোন কথা না বলেই। বলবেটাই বা কী? কিছু বলার মুখ আছে? সামান্য একটা পেটের ব্যাথা সারাতে পারেনা, খালি পয়সা লোটার ধান্দা! সলিলটাও হয়েছে তেমন, চললো ডাক্তারের পিছুপিছু। এই বুদ্ধি নিয়ে ও কলেজে কী ক’রে পড়ায় ভগবানই জানেন!

প্রতাপ খুব সাবধানে শচীনবাবুকে বসিয়ে দেয় রোয়াকের ওপর। একটু ভিতর দিক ক’রে বসায় যাতে প’ড়ে না যান।

মনে পড়েছে। আমাকে ওশুদগুলো এনে দে!

ওশুদ দ্যায়নে?

ব্যথা কমানোরটা খালি দিলো, বাকিগুলো দ্যায়নে বোধায়।

তুমি যে কাল বললে এই ডাক্তারের ওশুদ তুমি খাবে না?

ঠিকই। কাল রাতে কোনরকমে একটু ভাত খাবার পর অনেক কষ্টে ওষুধগুলো গিলেছিলেন শচীনবাবু, কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরেই আবার শুরু হ’ল পেটে ভয়ংকর যন্ত্রণা আর একটু পরেই কালো বমি। তারপর খানিকটা সুস্থ হলেন ঠিকই, কিন্তু মাঝরাতে আবার যেই কে সেই। তখনই বমির ফাঁকে ফাঁকে তিনি ঘোষণা ক’রেছিলেন যে এই ডাক্তারের ওষুধ তিনি আর খাবেন না।

যন্তন্নাটা যখন উটছে, কী যে কষ্ট, তোকে বোঝাতে পারবো না।

আমাকে বোঝাতেও হবে না, তুমি বরং ভগমানকে ডাকো! বলো এই ব্যালা ভালোয় ভালোয় তুলে নিতে!

তুই বরঞ্চ ভাব ক’রে একটা বিয়ে ক’রে ফ্যাল দিকিন, আমার মরার কথা তোকে ভাবতে হবে না! জোয়ান ছেলে কোথায় একটা সোন্দর মেয়েকে নিয়ে ঘর-সংসার করবে, তা না সারাদিন লোকের উব্‌গার ক’রে বেড়াচ্চে!… মনেমনে কাউকে পসন্তো হয়ে থাকলে আমাকে বল!

লজ্জা পেয়ে প্রতাপ চলে যায় ঘরের ভিতরে। বিয়ের কথা ব’লে প্রতাপকে মাঝেমধ্যে বিব্রত করতে বেশ মজা পান বৃদ্ধ শচীনবাবু, কিন্তু এখন মজাটা তেমন জমলো না। কারণ মাথায় তাঁর একটা চিন্তা চিড়িক দিয়েছে। ওষুধে আর কাজ হচ্ছে না ব’লেই কি ওষুধ বন্ধ ক’রে দেওয়া হ’ল? তাহলে কি মৃত্যু আসন্ন তাঁর? কিন্তু তাঁর নিজের তো সে’রকম কিছু মনে হচ্ছে না! প্রতাপ তাহলে অমন কথা কেন বললো? ভেবেচিন্তে বললো, নাকি এমনিই মুখ ফসকে ব’লে ফেলেছে?

প্রতাপ ফিরে আসে কয়েকটা বালিশ নিয়ে। তার পিছন পিছন আসে মালতী। হাতে থালা। তাতে খানিকটা চটকানো ভেজা মুড়ি আর একটা কড়া ক’রে ভাজা বেগুনি। নোলায় জল চ’লে আসে শচীনবাবুর। প্রতাপ বালিশগুলো রোয়াকের তিনপাশে লাগিয়ে দিয়ে যায়, যাতে নড়তেচড়তে শচীনবাবু ব্যথা না পান কিংবা দরকারে ঠেস দিয়ে বসতে পারেন। মালতী ততক্ষণে বেগুনি দিয়ে মুড়ি মাখতে শুরু করেছে। অবাক হন শচীনবাবু। মালতী শুধু কাছ ঘেঁষেছে ব’লেই নয়, খাওয়ানোরও সাহস করছে ব’লে। যদি তাঁর বমি পেয়ে যায়? “হে ভগমান, এখন যেন বমি না পায়! মালতী কতদিন পরে একটু কাছে এসেছে।“ মনে মনে বলেন শচীনবাবু।

তুই মুড়ি নিয়ে এলি?

মায়ের হাত জোড়া। আপনার খেতে দেরি হয়ে যাবে, তাই…

তুই রেখে যা, আমি খেয়ে নোবো।

আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন, বাবা?

না রে, মা! ভয় হচ্ছে যদি…

কিচ্ছু হবে না, আপনি খান! একদম পালো ক’রে মেখে দিয়েছি।

মালতী বেগুনিমাখা মুড়ির ছোট্ট একেকটা মণ্ড তুলে দেয় মুখে, শচীনবাবু সেগুলো আস্তেআস্তে জিভে জড়িয়ে নিয়ে স্বাদ উপভোগ করতে থাকেন ধীরেসুস্থে।

টুপুর পমছাবে কখন?

দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।

মুড়ি খাইয়ে আঁচলে মুখ মুছিয়ে চলে যায় মালতী। এখন আর মুখ ধোয়ার বালাই নেই শচীনবাবুর। ধুলেও হয়, না ধুলেও হয়। পড়ার মত দাঁত আর পাঁচ-ছটাই বাকি। ওগুলো থাকলেই বা কী, না থাকলেই বা কী! বেগুনির স্বাদ আর গন্ধ মুখে মেখে বালিশে একটু এলান দিয়ে বসেন শচীনবাবু। দূরের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাবার হাতে লাগানো গাছগুলো। বাবা খুব ভালো গাছ বাইতে পারতেন। আম-জাম তো ছোট কথা, নারকোল গাছেও উঠে যেতেন তরতর ক’রে! শচীন একেবারেই গাছে চাপতে পারতো না। নিখিল পারতো। বাবার মত। লুঙিটাকে আধখানা তুলে নিয়ে কোমরে গিঁট বেঁধে তড়াক তড়াক ক’রে উঠে যেতো আমগাছে বা জামগাছে। গাছের ডালে ব’সে ব’সে নিজে খেতো আর কিছুকিছ ফেলে দিতো নীচে, শচীনের আঁজলা তাক ক’রে। শচীন সে’গুলোই খেতো। আরো বেশ খানিকটা সে লুঙির কোঁচড়ে ভ’রে নিয়ে নামতো বাড়ির অন্যদের জন্য। এ’বাড়ির একজনের মতই হয়ে গিয়েছিলো নিখিল। কিন্তু সে সুসময় টিকলো না বেশিদিন, নিখিল পর হয়ে স’রে গেলো দূরে। কতদূর কে জানে! টুপুর নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে তাকে।

বাবার ইচ্ছে ছিলো কৃষিবিদ্যা নিয়ে প’ড়ে ছেলে গাঁয়ে ফিরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করবে, অন্যদেরও শেখাবে। কৃষিবিদ্যা হয়নি, তবে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে রাজ কলেজে স্নাতক শেষ করে শচীন। স্নাতকোত্তরও করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু মা চলে গেলেন এই সময়। বৃদ্ধ বাবা একা হয়ে গেলেন বাড়িতে। শচীনকে ভালোভাবে মানুষ করবেন ব’লে তাঁর বাবা-মা আর কোন সন্তান নেন নি, যা তখনকার দিনে গাঁয়েগঞ্জে এক বিরল সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই, কিন্তু যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত কি? কারণ  মায়ের মৃত্যুর পর বাবা হয়ে পড়লেন অসহায়। বুড়িয়ে গেলেন আরো। বাবাকে খুব ভালোবাসতো শচীন। তাই বছর কয়েক আগেই অগত্যা ফিরতে হ’ল তাকে। গাঁয়ে। ঘরে। চাষবাসে। স্নাতকোত্তর পড়া হ’ল না। অবশ্য সে নিয়ে কোন দুঃখ ছিলো না শচীনের। শহরের থেকে গ্রামই তার বেশি ভালো লাগতো। গ্রাম্য জীবন, আচার-বিচার আর সব থেকে প্রিয় এখানকার ভাষা। এখানকার কথা বলায় এমন এক সুর, যেন পাখির ডাকে মত। নিখিল বলতো, “কেউ ঝগড়া করলেও মনে হবে প্রেম করছে।“ নিখিল কলকাতার ছেলে, বর্দ্ধমানের এ’দিকের কথাবলার এই সুর তাকে মুগ্ধ করতো। এই সুরে কথা বলার চেষ্টাও করতো সে, কিন্তু পারেনি কখনো।

পেটের ব্যথাটা বাড়ছে। উঠে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করেন শচীনবাবু, কিন্তু পারেন না। শরীর কাঁপতে শুরু করেছে যন্ত্রণায়। কী যন্ত্রণা ও মা! সলিল ছুটে এসে ধরে শচীনবাবুকে। মায়াবালা ছুটে আসেন একটা এনামেলের জামবাটি হাতে। যন্ত্রণাটা বাড়তে বাড়তে ভয়ংকর। শরীর কাঁপছে থরথর ক’রে। বমি শুরু হ’ল। শুকনো রক্তের মত রঙের বমি। মায়াবালা সেই বমি ধরার চেষ্টা করছেন জামবাটিটায়। এই বমি কি বিষাক্ত? মাটিতে পড়লে বিষিয়ে যাবে মাটি? আর কিছু ভাবতে পারেন না শচীনবাবু। অসহ্য যন্ত্রণায় জ্ঞান হারিয়ে যায় তাঁর। অনেক্ষণ পর হুঁশ ফিরলে বুঝতে পারেন যে তিনি শুয়ে আছেন, সলিল পায়ের কাছে ব’সে উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে আছে তাঁর মুখের দিকে। সলিল খুব ভালোবাসে তাঁকে, তিনি জানেন। অনেক কষ্টে ডান হাতটা দিয়ে সলিলকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু খুব ক্লান্ত লাগছে তাঁর। ঘুমে জড়িয়ে যায় চোখ।

কে যেন তাঁর পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকান শচীনবাবু। চোখটা প্রথমে ধাঁধিয়ে যায় আলোয়। তেজ বেড়েছে রোদের। চোখ সয়ে গেলে বুঝতে পারেন টুপুর ব’সে তাঁর কোলের কাছটিতে। পেট তার ডাগর হয়েছে বেশ। ভারী ভরভরন্ত সুন্দর দেখতে লাগছে টুপুরকে। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শচীনবাবুর অন্তর। টুপুরের মুখে উদ্বিগ্নতা বদলে ততক্ষণে স্মিত হাসি। শচীনবাবুও হাসেন একমুখ, কিন্তু তার সামান্যই ফুটে ওঠে মুখে। টুপুরের সাহায্যে উঠে বসেন শচীনবাবু। টুপুরের আশেপাশে, এদিক ওদিক দ্যাখেন। ঘরের দিকে তাকান। টুপুর বুঝতে পারে কী খুঁজছেন তিনি।

অরণ্য সত্যি ক’রেই আসতে পারেনি গো! ওর কম্পানিতে খুব ছাঁটাই চলছে তো, তাই…

পুজোর সময় কিন্তু বেহোজোর আসতে বলবি!

টুপুরের চোখ চিকচিক ক’রে ওঠে অবরুদ্ধ কান্নায় । শচীনবাবু খেয়াল করেন সেটা।

এই দ্যাখ, পাগলি, কানছিস ক্যানে বলদিকি? আমি দিন দু’য়েকেই ঠিক সেরে যাব। তোর বাপকে বল একটা ঠিকঠাক ডাক্তার খুঁজে আনতে!

বলবো।… তোমাকে তেল মাখিয়ে দি?

টুপুরের হাতে সর্ষেতেলের শিশি। গেঞ্জিটা খুলে, লুঙিটা একটু গুটিয়ে পা ঝুলিয়ে বসেন শচীনবাবু। টুপুর তাঁকে তেল মাখিয়ে দেবে- সে যে কী আরাম! আলতো হাতে শচীনবাবুর হাতে, বুকে-পিঠে, পায়ে তেল মাখিয়ে দেয় টুপুর। আহ! আরামে জুড়িয়ে যায় শরীর। মন।

ঘুম পেলে শুয়ে প’ড়ো! একটু পরে চান করিয়ে দোবো!

টুপুর চলে যায়। সর্ষেতেলের ঝাঁজের চাদর আর রোদের আদর মেখে ব’সে থাকতে থাকতে শচীনবাবুর পৃথিবীটাকে হঠাৎ নতুন ক’রে ভালো লাগতে শুরু করে। এই পৃথিবীরই কোন একটা প্রান্তে রয়েছে নিখিল, সেও ছুঁয়ে রয়েছে এই মাটি। পায়ের তলার মাটিকে পায়ের আঙুল বুলিয়ে আলতো আদর করেন শচীনবাবু। হঠাৎই সবকিছু খুব ভালো লাগছে তাঁর। এই রকমই ভালোলাগা তাঁর মনে লেগে থাকতো দিনরাত তাঁর বাঁশের কেল্লায়।

হঠাৎই বিয়ে ঠিক করলেন বাবা। শাঁকটে স্কুলের গরীব মাস্টারের শান্ত-সুশীলা মেয়ে মায়াবালার সঙ্গে। প্রথমে আপত্তি করে শচীন, কিন্তু তা ধোপে টেকে না। বাবা স্থির ক’রে ফেলেছেন, গরীব মাস্টারের লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটাকে উদ্ধার করতেই হবে। বয়েস হয়ে যাচ্ছে মেয়েটার। শচীনের মত ভালো পাত্রই বা তারা পাবে কোথায়? বাড়িতেও তো মহিলা চাই একজন! মায়াবালার এ’বাড়িতে বৌ হ’য়ে আসা অতএব স্থির হয়ে গেলো। শচীন ছুটলো বর্দ্ধমান। নিখিলের কাছে। খবর শুনে রাগে পাগল হয়ে উঠলো নিখিল। আপত্তি-টাপত্তি নয়, তার যুক্তি হ’ল, সব খুলে বলা দরকার বাবাকে। না মানলে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু তখনকার দিনে গ্রামীণ সমাজে এ’রকম প্রতিবাদ এক্কেবারেই সম্ভব ছিলো না। শচীনের মনের জোরও ছিলো না অত। নিখিল বললো, “দরকার নেই বাবার সম্পত্তির, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আয়!” বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা কি শুধুই সম্পত্তির? বাবাকে যে খুব ভালোবাসে সে! তাঁকে একা ফেলে রেখে কোথাও যেতে পারবে না শচীন। কিছু একটা ক’রে বিয়েটাকে সে আটকাবে- এই ব’লে নিখিলকে আশ্বস্ত ক’রে গ্রামে ফিরে আসে শচীন। কিন্তু কিছুই করতে পারেনি সে। কিছুই বলতে পারেনি বাবাকে। আটকাতে পারেনি বিয়ে। শচীনের মনে আশা ছিলো সব চুকেবুকে গেলে নিখিলকে ঠাণ্ডা মাথায় সব বুঝিয়ে শান্ত করতে পারবে। কিন্তু নিখিলের সঙ্গে আর দেখা হয়নি তার। নিখিল ততদিনে উবে গেছে হঠাৎ। কর্পূরের মত।

সংসারে মন শচীনের কোনকালেই ছিলো না। তার ওপর জেঁকে বসলো এক অবিচ্ছিন্ন উদাসীন মনখারাপ। মনখারাপ কাটাতে চাষবাসে বেশি ক’রে মন দিলো শচীন। তার সঙ্গে খুঁজতে শুরু ক’রে দিলো ‘বোকরা’ ধানের বীজ। বাবা কোত্থেকে জেনেছেন যে তাদের গ্রামের নাম বোকরা হয়েছে কোন এক বুনো ধান ‘বোকরা’ নাম থেকে। সেই ধানের বীজ খুঁজে বের করতে হবে। চাষবাসের পাষাপাশি ভারতের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতে শুরু ক’রে দিলো শচীন বোকরার বীজের খোঁজে। খুঁজেছে খুব, কিন্তু পায়নি। মনের মধ্যে এই আশাও ছিলো যে হঠাৎ হয়তো অপ্রত্যাশিতভাবে খুঁজে পেয়ে যাবে নিখিলকে। খুঁজেছে খুব, কিন্তু পায়নি।

সলিল হ’ল। সলিল একটু বড় হবার পর শচীন চাষের মাঠে শ্যালোর গর্তটাকে বড় ক’রে ডোবার মত বানিয়ে তাতে মাছ চাষ শুরু করলো, আর তার পাশে বানিয়ে নিলো নিজের জন্য বাঁশের একটা ঘর। বাঁশের চ্যালা আর চাঁচল দিয়ে তৈরি। খড়ের চাল। তক্তাও বাঁশের। তার ওপরে খড়। তার ওপরে চট। তার ওপরে কম্বল। শীতকালে একটা লেপ। ব্যস! ফাঁকা মাঠের মাঝখানের এই ঘরটিকেই গাঁয়ের লোকেরা ঠাট্টা ক’রে নাম দিয়েছিলো বাঁশেরকেল্লা। সারাদিন, সারারাত এখানেই কাটাতো সে। দিনে তিনবার শুধু বাড়ি যেতো খেতে। কথা বলতে শুধু দিনে তিনবার “এনু” আর তিনবার “গেনু”। আর কোন কথা নেই। বাড়িতে থাকতে ভালো লাগতো না তার। ভালো লাগতো না কারো মুখোমুখি হতে। ভালো লাগতো শুধু বাঁশের কেল্লায় ব’সে আদিগন্ত ক্ষেত, আবছা গ্রামের নীলচে গাছগাছালি দেখতে আর ভাবতে যে দিগন্তর পর দিগন্ত পেরিয়ে পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে ব’সে নিখিলও হয়তো তার কথা ভাবছে। বাঁশেরকেল্লা ছেড়ে বাড়িতে ফিরতে হ’ল শচীনকে বাবা মারা যাবার পর। বাবা ঠিক মারা যাননি, শচীন একরকম মরতে বাধ্য করেছিলো তাঁকে।

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা এমনিতেই বুড়িয়ে গিয়েছিলেন, তার ওপর শচীনের মনের কষ্টটাও ছুঁয়ে ফেলেছিলো তাঁকে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কোথাও গোলমাল হয়েছে কিছু একটা। বারবার তিনি জিজ্ঞেস করতেন শচীনকে। কিন্তু শচীন কখনো কিছু খুলে বলতে পারেনি বাবাকে। বরং সে সংসার থেকে দূরে স’রে গেলো। এই শুন্যতাটাই বোধ হয় বাবাকে কুরেকুরে খেয়ে শেষ ক’রে দিয়েছিলো। আস্তে আস্তে শয্যাশায়ী হলেন তিনি। আর উঠলেন না। শরীরের সব শক্তি শেষ। সারাদিন দাওয়ায় শুয়ে ফ্যালফ্যাল ক’রে তাকিয়ে থাকতেন খড়ের চালের দিকে। হয়তো নিজের মৃত্যু কামনা করতেন সারাক্ষণ। কিন্তু মরতে পারছিলেন না কিছুতেই এই আশায় যে ছেলেকে শেষ পর্যন্ত সুখী দেখে যেতে পারবেন। মনের জোরে টিকে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু কষ্ট পাচ্ছিলেন খুব। তাই একদিন তাঁকে দাওয়া থেকে নামানো হ’ল ছাঁচতলায়। চালা থেকে একটা কুঁটি টেনে নিয়ে শচীন দাঁড়ালো বাবার কাছে। হাত কাঁপছে তার। কাঁপা হাতেই কুঁটিটা ছিঁড়ে ফেলে দিলো সে বাবার বুকের ওপর। বুক ফাটছে তার। গলা কাঁপছে। তবু এই অপ্রিয় অসত্যটা তাকে বলতেই হবে।

তোমার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করনু, বাবা!

ঘটি থেকে বাবাকে একটু জল খাইয়ে দূরে স’রে দাঁড়ায় শচীন। মৃত্যু যন্ত্রণায় শেষবারের মত কেঁপে ওঠে বাবার শরীর। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব শেষ।

খাওয়া শেষ ক’রে আবার রোয়াকে এসে বসেছেন শচীনবাবু। দুপুরের খাওয়াটা জম্পেশ হয়েছে আজ। টুপুর এসেছে, তাই এলাহি ব্যাপার। তাঁকেও দেওয়া হয়েছে সবকিছু একটু একটু ক’রে। কচুসেদ্ধ দিয়ে নুন পায়েস, ভাত, পোস্ত ছড়ানো পুনকোশাক ভাজা, তারপর আলু-বড়ির পোস্ত, আর তারপর পাতে পড়লো একটু মাংস। আহা! শেষপাতে নলেন গুড় দিয়ে খাস চালের পায়েসও খেলেন একটু। মায়াবালা খুব যত্ন ক’রে খাইয়ে দিয়েছেন একটা একটা ক’রে। খুব তরিবৎ ক’রে খেয়েওছেন শচীনবাবু। ফাঁসির আসামীর মত। হঠাৎ সন্দেহটা চিড়িক দিয়ে ওঠে শচীনবাবুর মনে। এইসব খাওয়া-দাওয়ার তোড়জোড় টুপুরের জন্য হয়েছে নাকি তাঁরই জন্য? এরা কি ভাবছে তাঁর মৃত্যুকাল উপস্থিত? সত্যিই ভাবছে এ’কথা? টুপুর তো জানে, মায়াবালা তো বোঝে যে নিখিলের সঙ্গে দেখা না ক’রে তাঁর পক্ষে মরা সম্ভব নয়!

রোদের আমেজে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন শচীনবাবু। ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো পেটের যন্ত্রণায়। যন্ত্রণাটা বাড়তে লাগলো হুহু ক’রে। বাড়তে বাড়তে অসহ্য, আর পারছেন না শচীনবাবু। সত্যিই পারছেন না। এর থেকে মৃত্যু ভালো। কিন্তু নিখিলের সঙ্গে দেখা না ক’রে তিনি মরবেন না। কিচ্ছুতেই না। ঈশ্বর তাঁকে একটা সুযোগ নিশ্চয়ই দেবেন নিখিলের কাছে ক্ষমা চাইবার!

এই তো শুরু হ’ল কালো রক্তবমি! বমিটা হয়ে গেলেই কমে যাবে যন্ত্রণা। কিন্তু বমি হয়ে যাচ্ছে তো হয়েই যাচ্ছে। নাক দিয়েও বেরিয়ে আসছে কালো রক্ত। বেশ খানিকটা বমি হয়ে থামলো কিছুক্ষণের জন্য, তারপর আবার শুরু হ’ল। যন্ত্রণাটা কমছে না একটুও। ও মা গো, পেটে হাত বুলিয়ে পেটটাকে ঠাণ্ডা ক’রে দাও মা!

বমি থেমে আসে। যন্ত্রণাও কমে আস্তে আস্তে, তবে একেবারে কমে না। নিস্তেজ হয়ে শচীনবাবু শুয়ে পড়েন রোয়াকের ওপর। মায়াবালা, সলিল, মালতী, প্রতাপ, টুপুর – সবাই এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর কাছে। টুপুরের হাতে বমি ধরার জামবাটিটা। মায়াবালার হাতে জলের একটা ঘটি। শচীনবাবু বুঝতে পারেন, এবার কুঁটিকাটা হবে। কিন্তু কুঁটি ওরা পাবে কোথায়? এখন তো তাঁদের পাকা বাড়ি, সিমেন্টের ঢালাই ছাদ! খড়ের চালা কোথা থেকে পাবে?

ছিটেবেড়ার ঘরের চাল থেকে একটা কুঁটি টেনে নেয় সলিল। দুদ্দুর! কুঁটি কাটতে গেলে বসত-ঘরের চালের কুঁটি লাগে। সলিলটার জ্ঞানগম্যি আর হ’ল না। ওর অবশ্য এতটা জানার কথাও নয়। এ’সব আগেকার দিনের সংস্কার, বিশ্বাস। বিশ্বাস ছাড়া আর কী? বিশ্বাসই যখন, তখন বসত-ঘরের চালের কুঁটিই কেন লাগবে? যে’কোন কুঁটিতেই তো কাজ হ’তে পারে! ছিটেবেড়ার ঘরটাও তো এই বাড়িরই একটা অঙ্গ!

সলিল এসে দাঁড়ায় শচীনবাবুর পাশে। বুক ফাটছে। হাত কাঁপছে। চোখ ফেটে কান্না বেরোতে চাইছে। সলিলের মধ্যে সাতাশ বছর আগেকার নিজেকে দেখতে পান শচীনবাবু। কাঁপাহাতে কুঁটিটা ছিঁড়ে শচীনবাবুর বুকের ওপর ফেলে দেয় সলিল।

আমরা তোমার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ করলাম, বাবা!

ঘটি থেকে থেকে একটু জল খাইয়ে একটু দূরে স’রে দাঁড়ায় সলিল। সাতাশ বছর আগেকার ঘটনার পুনরাবৃত্তি এখানেই শেষ হয়। মৃত্যু যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠেন না শচীনবাবু। সলিলের কাটা কুঁটিতে তাঁর মৃত্যু কেন হবে? সলিল তো তাঁর জৈবিক সন্তান নয়! কার সন্তান, কখনো জানতেও চাননি মায়াবালার কাছে। সলিলরা না জানুক, মায়াবালা তো সব জানেন! এবার তো সবাই জেনে যাবে সব কথা, তারপর সম্পর্কগুলো যে আলগা হ’য়ে যাবে! সব জেনেশুনেও মায়াবালা কেন ঘটতে দিলেন এই দুর্ঘটনা? প্রশ্নভরা চোখে শচীনবাবু তাকান মায়াবালার চোখের দিকে। মায়াবালা চোখ নামিয়ে নেন।

রক্তের সম্পর্কই সব? ভালোবাসার বন্ধন কি কিছুই নয়?

মায়াবালার কথায় চমকে ওঠে না কেউ। তার মানে সবাই সব কিছু আগে থেকেই জানতো! তাহলে মায়াবালাকে এ’প্রশ্নের উত্তর দিতে কোন বাধা নেই শচীনবাবুর।

তোমাদের সবাইকে… ভালো… খুব ভালো…

কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে শচীনবাবুর, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর আজ তাঁকে দিতেই হবে সবার সামনে। আর কিছু লুকোনোর নেই তাঁর।

সবাইকে খুব ভালোবাসি… কিন্তু… ভালোবাসার বন্ধন তো… নিখিল… নিখিল ছাড়া আমার আর তো কিছু ন্যাই!

সবাই চুপ। টুপুর গিয়ে বসে শচীনবাবুর কোলের কাছে। তাঁর হাত দু’টো নেয় মুঠোর ভিতর।

তুমি কষ্ট পাবে ব’লে বলিনি, নিখিল দাদু দু’বছর আগে মারা গেছে স্টুটগার্টে।

একটা বুক খালি করা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শচীনবাবুর অন্তর থেকে। নিখিল তাহলে স্টুটগার্ট পৌঁছোতে পেরেছিলো? নিখিলের স্বপ্ন ছিলো শচীনকে নিয়ে সে ঘর বাঁধবে স্টুটগার্টে। কাকে নিয়ে তবে ঘর বেঁধেছিলো সে?

যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন শচীনবাবু। কুঁটি কেটে গেলো নিমেষেই।

বিবাহিত জীবনে মায়াবালাকে কাঁদতে হয়নি কখনো। সেই ফুলশয্যার রাতে কেঁদেছিলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, আর আজ কেঁদে উঠলেন হাউ হাউ ক’রে।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ