16 Jun

খেলা হবে

লিখেছেন:দেবাশিস মজুমদার


লেখাটা পড়েছেন? বেরিয়ে গেছে লেখাটা কিন্তু।খুব নরম গলায়  কানের কাছে মুখ নিয়ে কথাটা  বললেন  গল্পের আড্ডা অনলাইন পত্রিকার ছটফটে  সম্পাদক তোর্সা দত্ত।

না গো । আমি ওইসব মোবাইল ব্যাবহার জানি না গো- এই পঁচাশি বছর বয়সে ওসব আর শিখতেও চাই না। তুমি বললে এইটাই জানা হলো। তুমি বরং একটা কাগজে তোমাদের নম্বর , আর অন্যান্য তথ্য লিখে দাও।আমার নাতনিরা ওই সব দেখে। ওদের দিয়ে দেবো ওরাই দেখবে। আর আমাকে দেখাবে। কিছুটা হতাশ ভাবে ক্লান্ত  শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে বললেন লেখক যুগান্তর সান্যাল । দীর্ঘদিন পর অনেক কষ্টে গাড়ি ভাড়া করে আজ শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসেছেন তার প্রকাশক আদিত্য প্রকাশনীর দপ্তরে। রয়্যালটির টাকার  চেকটাও নেবেন আর দীর্ঘদিনের সান্ধ্য আড্ডার মৌতাতে মাতবেন এরকমই ইচ্ছা আসলে। এই প্রকাশনী সংস্থার সঙ্গে তার নয় নয় করেও দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের যোগাযোগ। তার লেখক হিসাবে খ্যাতি  আর বড় বড় সব পুরস্কারের খ্যাতির সাথেই  জড়িয়ে আছে আদিত্য প্রকাশন। ফলে তার একসময়ের বাড়ি ঘর  হয়ে উঠেছিল এই প্রকাশন দপ্তর । মালিক দীপ্তেনবাবু  ছিলেন  প্রায় সমবয়সী। গত হয়েছেন বছর দুয়েক। ওঁনার ছেলে অরুনাংশু পূত্রবৎ। একসময় নিজের কন্যা তিস্তার সাথে  বিবাহের কথা উঠেছিল কিন্তু বাড়ির অনেকের আপত্তিতে সে কথা আর পাকা হয়নি। আজও  অরুনাংশু পিতৃতুল্য সম্মানই দেয় । লেখালেখি যথেষ্ট কমিয়ে দিয়েছেন যুগান্তর বাবু। তবু কয়েকটি দৈনিকের অনুরোধে মাঝে মাঝে কলম ধরতে হয় তাকে, না হলে বাকি সময় পুরনো লেখার স্মৃতিচারণ করে আর স্ত্রীর সাথে বসে গান বাজনা করেই সময় কেটে যায়। এভাবেই  চলছিল। মাঝে ঢুকে পড়ল গল্পের আড্ডা ডটকম পত্রিকার তোর্সা  দত্ত। ছটফট মেয়েটার সাথে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল অরুনাংশু। মেয়ে আবদার ধরল-  আপনার একটা ইন্টারভিউ নেব। বেশ। তাই হল। সেটা নাকি বেরিয়েও গেছে। কিন্তু যুগান্তর বাবু যে প্রযুক্তির যুগান্তরে পিছিয়ে গেছেন অনেকটাই, ফলে তার যুগান্তকারী সাক্ষাৎকার প্রকাশ আর চাক্ষুষ করতে না পেরে  জানিয়েছিলেন অরুনাংশুকে । অরুণাংশুর অনুরোধেই তোর্সা  দেখা করে খবর নিতে চলে এসেছে আদিত্য প্রকাশনীর অফিসে। যুগান্তর বাবুর অক্ষমতার কথা  জানতে পেরে তোর্সা বলল- আঙ্কেল, একটা কথা বলব একটা স্মার্ট ফোন কিনে দু-তিনদিন নাড়াচাড়া করলেই শিখে যাবেন। ভেরি ইজি। আর  আজকালকার ফোনগুলো খুব   ইউজার ফ্রেন্ডলি,  ইটস নট এ প্রবলেম অ্যাট্ অল্।

অসহায় যুগান্তর বাবুর প্রশ্ন- চলে যাওয়ার বয়সেও শিখতে হবে? বল কি গো?

ছটফটে তোর্সার  উত্তর — ওকে,  আপনি একটা ফোন কিনে আমাকে একটা কল করবেন, বাকিটা তোর্সা উইল ডু। আফটার অল, ইউ আর মাই মোস্ট ফেভারিট রাইটার। আপনার “নরওয়ের নরদানব” বইটা এখনও মাঝে মাঝে পড়ি, ভীষণ অন্য রকম ।

–   সবই তো বুঝলাম রে । আসলে কি জানিস এখনও কাগজের পাতায় নিজের লেখাকে যতটা জীবন্ত  দেখি স্ক্রিনে দেখলেও কেন জানি মন ভরে না রে। কি যেন একটা নেই নেই মনে হয়- এ স্বাদ তোরা বুঝবি নারে সুমনা – মেয়ে- বললেন লেখক

কোন কথায় থামতে জানেনা তোর্সা- এই দেখো আঙ্কেল তোমার লেখায় লাইক পড়েছে থ্রি পয়েন্ট ফাইভ কে। ইটস অসাম আঙ্কেল , উই কান্ট ইমাজিন ।

– লাইক মানে তো বোতামে চাপ। বোতাম ধরে চাপ  দিয়েছে সবাই ? পড়ে  কি? পড়ে কি সবাই ?এত দ্রুত অত বড় লেখাটা পড়ে কি করে? বুঝিনা,  সব কেমন গুলিয়ে যায় । ফোনে পড়াটাও তো খুব কষ্টকর । ওই যে কম্পিউটার স্ক্রিনে ঐরকম আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে ও বেশ কষ্ট হয় । আমরা একটা লেখাকে শুয়ে-বসে গড়িয়ে, দাঁড়িয়ে কত রকম কায়দায় পড়েছি । জানি না বাবা- আমরাই বোকা ছিলাম না তোমরা বোকা বাক্সে পুরে আমাদের  সবাইকে বোকা বানালে বুঝিনা বাবা।

কাউন্টার করলো তোর্সা-  এটাই চলছে আঙ্কেল ইউ কান্ট চেঞ্জ দা সিস্টেম। লাইক শেয়ার ভিউয়ার সাবস্ক্রাইবার এগুলোই অনলাইন ওয়ার্ল্ডের স্ট্যাটাস সিম্বল। যেমন তোমাদের সময় ছিল রাইটার্স মিট। জাস্ট লাইক দ্যাট। হ্যাঁ জাস্ট ইউ হ্যাভ  টু চেঞ্জ ইওর আইডিয়াস এন্ড সরি টু সে- আদারওয়াইজ ইউ কান্ট একাসটাম্ড।

– বুঝলাম রে মেয়ে , আসলে কি জানি- আমরা বুড়ো হয়েছি শরীরে ভাবনায় কি বুড়ো হয়েছি? জানি লেখক এর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাবনার দর্শন ঠিক কিনা! তাই প্রশ্ন জাগে এই এত লেখকের এত লেখা বই সব কি ঐ অনলাইনে ঢুকে যাবে কাগজ ছাপা বই এগুলি সব মিউজিয়াম পিস হবে?

ঘাড় বাঁকিয়ে দুলে উঠল অষ্টাদশী-  প্রবাবলি । অ্যানিওয়ে , ওকে ! আপনার ইন্টারভিউটা কিন্তু ক্লিক করেছে কমেন্ট বক্স তাই ইন্ডিকেট করছে… সদ্য টোয়েন্টি ফোর আওয়ার্স হল আপলোডিং হয়েছে তাতেই এই রিয়াকশন। লেটস সি।

– যারা এসব হইচই করছে তারা আমার লেখা পড়ে বলে তোর মনে হয়?

– অবভিসয়ালি না হলে ধরে নিতে হবে  ইউ আর স্টিল নাউ  সো মাচ পপুলার- এখনি আপনার জনপ্রিয়তা কমছে ভাবছেন কেন ? অরুণাংশু কে- জিজ্ঞেস করে নিন দিনে কটা বই কাটে। যে কোন একটা কারণ তো হতেই হবে? না?

কি হতে হবে রে মেয়ে, বাবা তোকে কতদিন পর দেখলাম রে মেয়ে- আজকাল তো আমাদের খবর করিসই না – বলতে বলতে ঢুকলেন সদ্য আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক গিরিধারী গুছাইত। খুব করিৎকর্মা মানুষ। গুছিয়ে  বসবার আগেই পকেট থেকে দুটো লম্বা ফোন  পাশের টেবিলে রাখলেন তারপর চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে বললেন – কি খবর বলুন যুগান্তর দা।  হঠাৎ এদিকে, কি মনে করে?

– বিস্মিত হতবাক যুগান্তর তাকিয়ে আছেন তার মোবাইল গুলোর দিকে- বাবা একটাতে হয়না দুটো মোবাইল – একটা  ফোনেই তো আমরা কাজ সারতাম গো।

– এসব ব্যাকডেটেড কনসেপ্ট দাদা,। এখন দুটো চারটে রাখতে হচ্ছে বিভিন্ন ফোনে বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট- কোনটাতে ফ্যান ফলোয়ার। কোনটাতে বাড়ির ফ্যামিলি,  কোনটাতে রাইটার্স গ্রুপ, ওসব বুঝবে না তোমরা।

– ঠিক , বললেন অসহায় যুগান্তর বাবু, – আচ্ছা এই যে এত গ্রুপে থাকো তাহলে লেখার সময়,  ভাবার সময় পাও?  এইসব  গ্রুপের মেসেজ দেখতে দেখতে ক্লান্ত লাগেনা?   ভাবনায় প্রভাব ফেলে না ?

এটাই স্টাইল দাদা , শুধু  বিদেশে কেন আমাদের এখানেও অনেক রাইটার তো জুনিয়ার অ্যাপয়েন্ট করেছে  । আই মিন কর্পোরেট অ্যাসোসিয়েট ফার্মের  মতন রাইটার্স  ফার্ম  করছে ।

– এবার কথার মধ্যে  ঢুকে পড়ল তোর্সা – এক্সাক্টলি , আপনিও একটা করতে পারেন গিরিধারী আঙ্কেল ;একচুয়ালি, আমরা বেশ কিছু ফ্রেন্ড এইরকম একটা কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করতে চাইছি- আই মিন , দে উইল সেল দা আইডিয়া টু  দ্য রাইটার্স  হুু ওয়ান্টস টু পারচেস।

যুগান্তর বাবু  এবার ওঠার জন্য জুতোটা পায়ে গলালেন—— কিন্তু আমি যা বুঝি তাতে লেখা,  ভাবনা আর তার প্রকাশ এগুলো তো একদম নিজস্ব কনসেপ্ট, নিজের সৃষ্টিশীলতা, নিজের দর্শন।

ইয়েস , সেই জন্যই তো বলছি,  আপনি শুধু কনসেপ্ট আর আইডিয়াটা কাউকে বিক্রি করলেন ফ্রম ইউর ফার্ম পারচেসাররা সেটাকে রিবিল্ড  করল , এভরি সেক্টরে এই কনসেপ্ট-  সেলসম্যান, মিডলম্যান,পারচেসার আছে। আপনি ল ফার্ম গুলো দেখুন।  বিজনেস ফার্মগুলো দেখুন। দেন হোয়াই নট ইন ক্রিয়েটিভ সেক্টর—  এক নিশ্বাসএ কথা  গুল  বলে থাামলো তোর্সা । তারপর যোগ করলো  – আজকের এই সোশ্যল মিডিয়া র যুগে একদম নিজের বলে কিছুই নেই , সবই আছে বাতাসে ।

ইয়েস। লাফিয়ে উঠলেন গিরিধারি- তোরাই পারবি হল ধরতে মা কর তোরা। আর কে কি করবে জানি না তোদের থেকে আইডিয়া কিনবো আমি। আসলে এখন বুড়ো হচ্ছি  গল্পের প্লট ভাবতে সময় লাগে এত ভাবলে শরীরে ও কষ্ট হয় চাপ পড়ে ।বুঝিস তো, তিনটে প্রেসারের ঔষধ বুঝিস তো আর আমরা কেউ জটায়ু নই যে ঘুরে ঘুরে গল্প পাবো আর আগে যখন এইসব অনলাইন যুগ আসেনি তখন তো কাগজের পাঠানো অমনোনীত গল্পের হারিয়ে যাওয়া প্লটটি নতুন রূপে ফিরিয়ে দিতাম নতুন রেসিপির ভাঁজে। ইনফ্যাক্ট অনিলদা,  মানে অনিল  গাঙ্গুলী তো আমাদের বলেই দিয়েছিলেন রেগুলার লেখক হতে গেলে রেগুলার গল্প বাছাইয়ের কাজ নিয়ে   অন্যের গল্প খুঁটিয়ে মন দিয়ে পড়তে হবে। নিজের মনে মনে কখন গল্প জমে যাবে ভাবতেই পারবেন না- কিভাবে কি হল! সেসব যুগ এখনতো আর নেই।

একটু থেমে গুছাইত বললেন- এখন  নতুন অনলাইন কনসেপ্টএর যুগ –  রাইটার্স  ফার্ম – বিউটিফুল। ভাবো তো সারা পৃথিবীর নানা দেশের তরুণ প্রজন্ম আইডিয়া জোগাবে- আর আমরা সেগুলো কিনব বা ওদের দিয়ে লিখিয়ে এডিট করে নেব । ব্যাস- কেল্লাফতে। এবং এবং আমি নিশ্চিত বড় বড় কর্পোরেটও এই বিজনেসে আসবে।

–  আর তোমার একদম একদম নিজের ভাবনাটা, তোমার নিজের দৃষ্টিকোণটার  কি হবে-  যুগান্তর বাবু উঠতে উঠতে বললেন- কেন সবের পাতে নিজের হাতে সার্ভিস যে দেবো সেটাই তো এনাফ আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার নামের গুড উইল সেটাও তো সেলেবেল , না? তারও তো মূল্য আছে। কস্টিং করো। এটা বিক্রির যুগ দাদা। কোনটা কিভাবে বিক্রয় যোগ্য করছো সেটাই বড় ব্যাপার । বুঝলে যুগান্তর দা – এটাই যুগান্তরের ঘূর্ণিপাক।  চলে আসো চলে আসো আমাদের সাথে-  এই বাচ্চা ছেলে মেয়ে গুলোর সাথে – এটাই অনলাইনে অফলাইন দস্তুর।

–  দোকানের বাইরে পা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে অরুনাংশুর দিকে তাকিয়ে বললেন যুগান্তর- রক্ষে কর রঘুবীর,

ছেড়ে  যেন যেতে পারি- এই ভিড়।

– কোথায় যাবেন ? আঙ্কেল? – নাছোড় তোর্সার প্রশ্ন।

চৌকাঠের ওপার থেকে উত্তর এলো – কেন ? সাইড লাইনে!

অবুঝ তোর্সা তখনও প্রশ্ন করছে  – কেন জেঠু ?  কি হবে তাতে?

যুগান্তকারী উত্তর এলো যুগান্তর বাবুর কাছ থেকে- তবেই তো – খেলা হবে।

নদীর গতিতে  তোর্সার প্রশ্ন তখনও ছুটছে কাদের সাথে কাদের,  জেঠু?

রাস্তায় পা ফেলে উত্তর করলেন লেখক-  অনলাইনের আর অফলাইনের।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ