27 Jun

বৈকালী

লিখেছেন:অনিমেষ বন্দ্যোপাধ্যায়


প্রতি বছর নভেম্বর মাসে পেনশনভোগীদের একটা অসম্মানজনক প্রথার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়  

ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে বেঁচে থাকার প্রমাণ দিতে হয়  

বয়স্ক পেনশনাররা, কেউ কেউ রীতিমত বৃদ্ধ, অসুস্থ বা অথর্ব, ব্যাংকে এসে লাইন দিয়ে ডেস্ক ক্লার্ককে মুখ দেখিয়ে যান  

ব্যাপারটা সকলেরই খারাপ লাগে, কিন্তু সকলেই বোঝে, এটা একটা আনএ্যাভয়েডেবল ন্যুইসেন্স  

আজকাল অবশ্য অনলাইনেও করা যায়, কিন্তু শান্তনু নিজে যাওয়াই বেশি পছন্দ করেন  

কারণ, প্রথমত, ব্যাংকটা বাড়ির খুব কাছে  

দ্বিতীয়ত, অনেক পুরনো পরিচিতের সঙ্গে দেখা হয়  

আবার প্রতি বছর অনেকে যেমননেইহয়ে যান, তেমনি অনেক নতুন পেনশনারদের সঙ্গেও আলাপ হয়  

তৃতীয়ত, তাঁর ব্যাংকের পরিষেবা অত্যন্ত ভাল  

বয়স্ক মানুষগুলো যাতে যতটা সম্ভব সহজে এবং সম্মানের সঙ্গে কাজটা সারতে পারেন সেইজন্যে ব্যাংক বিল্ডিঙের বাইরে টেবিল পেতে কাজটা 

করে ।  

পেনশনারদের জন্যে প্রশস্ত লনে শামিয়ানা টাঙিয়ে অনেকগুলো ফাইবারের চেয়ার, কয়েকটা টেবিল, কিছু হুইল চেয়ার, রেখে দেয়  

কাউকে সিঁড়ি ভাঙতে হয় না, লাইনে দাঁড়াতে হয় না  

বয়স্ক মানুষগুলো বসে গল্পগুজব করেন, আর যার নাম ডাকা হয় তিনি এগিয়ে যান

 

শান্তনু ফর্মটা জমা দিয়ে একটা চেয়ারে বসে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে চেনা মুখ খুঁজছিলেন  

কানও সজাগ, কোন চেনা নাম শোনার আশায়

মাইক্রোফোনে একটা ডাক শুনে কৌতুহলী হয়ে উঠলেন

শ্রীমতী এণাক্ষী কর, শ্রীমতী এণাক্ষী কর 

একজন কাঁচাপাকা চুলের ঈষৎ পৃথুলা ফর্সা মহিলা উঠে গেলেন  

শান্তনুর মাথার মধ্যে ক্রিং করে যেন একটা ঘন্টি বাজল  

তিনি এগিয়ে মহিলার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন  

টেবিলের কাজটা মিনিট দুয়েকেই হয়ে গেল  

মহিলা যখন চলে যাবার জন্যে পেছু ফিরলেন, শান্তনু দুহাত জোড় করে বললেন,

 ‘এণাক্ষী কর, বর্ধমান ইউনিভার্সিটি, ইংলিশ, নিবেদিতা হস্টেল’ ? 

মহিলা একটু হকচকিয়ে গেলেন  

প্রতিনমস্কার করে বললেন,

হ্যাঁ, কিন্তু আপনাকে তো ঠিক …’ 

শান্তনুর ঠোঁটে এক টুকরো সূক্ষ্ম হাসি  

আচ্ছা, আর একটু ধরিয়ে দিই আপনাদের চার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর গ্রুপটাকে এক দুই তিন চার বা বারোশো চৌঁতিরিশ বলা হত 

মহিলা এবার হেসে ফেললেন  

হ্যাঁ, এণাক্ষী কর এক, দুর্গা ইশোর দুই, তিলোত্তমা নন্দী তিন, আর চারুশীলা রক্ষিত চার কিন্তু সে তো প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার কথা আপনি সেসব কথা…’ 

শান্তনুও হাসলেন  

বলছি আমি শান্তনু লাহিড়ি ইকনমিক্স বিবেকানন্দ হোস্টেল বন্ধুরা আমাকেও নামের আদ্যক্ষর দিয়েই ডাকত আপনি যদি একটু বসেন তবে আমি এবছরও যে বেঁচে আছি সেটা ওই টেবিলের সামনে শ্বাস নিয়ে প্রমাণ করে আসি

 

 

শান্তনু এগিয়ে গেলে এণাক্ষী একটা চেয়ার টেনে বসলেন  

এই ভদ্রলোক এক ঝটকায় তাঁকে ইউনিভার্সিটির ছাত্রজীবনে নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন সেই এক দুই তিন চার দুর্গা ছিল ম্যাথসের কলেজে পড়াত, প্রায় দশবছর হলো হার্ট এ্যাটাকে চলে গেছে ওর মেয়ে এখন মুম্বাইতে এণামাসির সঙ্গে এখনো যোগাযোগ রেখেছে ইকনমিক্সের তিলু এখন ছেলের কাছে বস্টনে চারু ভূগোলের ছাত্রী ছিল পি এইচ ডি করেছিল কোনও এক বিদেশি ইউনিভার্সিটিতে চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিল, বিয়েও করেছিল বিদেশিকে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ নেই

শান্তনু ফিরলেন

একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন,

তাহলে ম্যাডাম, প্লেস করতে পারলেন ‘?

এণাক্ষী বেশ গলা ছেড়ে হাসলেন

পারলাম আর এটাও মনে পড়ল যে ওই এক দুই তিন চার নামটা আপনারই দেওয়া শুধু তাই নয়, আপনার নিজের নামটাও আপনি নিজেই শর্ট করেছিলেন পুরো ক্যাম্পাস আপনাকে ওই শর্ট নামে চিনত

শান্তনু হো হো করে হেসে উঠলেন  

যখন বুঝতেই পারছেন, আমি আপনার এককালের সহপাঠি, যদিও বিষয় আলাদা, তখন ওই রেস্তোঁরাটায় আমার সঙ্গে বসে এক কাপ কফি খাবেন? এখনো বারোটা বাজেনি অবশ্য আপনার যদি অন্য কোন কাজ না থাকে, আর আপনি একাই ব্যাংকে এসে থাকেন

বেশ তো, চলুন আমারও কৌতুহল হচ্ছে

 

 

কফি নিয়ে কথাবার্তা চলল কিছুক্ষণ  

এণাক্ষী কাছেই একটা গ্রামের স্কুলে হেডমিসট্রেস ছিলেন  

রিটায়ার করার আগে এখানেই পারবীরহাটায় একটা বাড়ি করেছেন বাঁকুড়ার গ্রামের বাড়ির সঙ্গে আর বিশেষ যোগাযোগ নেই অবিবাহিত একজন সর্বক্ষণের কাজের মহিলা আছে, তাছাড়া দূর সম্পর্কের এক বোনপো তাঁর কাছে থেকে কলেজে পড়ে যখন চলে যাবে, একদিন তো যাবেই, তখন আবার দেখতে হবে কাউকে এনে রাখা যায় কিনা

শান্তনু এম করার পর কাস্টমসে যোগ দেন ষোলর মার্চে রিটায়ার করেছেন চিত্তরঞ্জনে রেল কোয়ার্টার্সে বড় হয়েছেন বাবা রিটায়ার করার পর ভাড়াবাড়ি তারপর চাকরিজীবনে সারা ভারত ঘুরে বেড়ানো রিটায়ারমেন্টের আগে এক সমবয়সী কলীগের উৎসাহে এখানে একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে উদ্যোগ নেবার কেউ ছিলনা, ফলে বিয়ে করা আর হয়ে ওঠেনি একাই থাকেন, প্রাক্তন সহকর্মীর পরিবার হোম ডেলিভারির ভরসায়

কফি শেষ করে ওঠার সময় শান্তনু বললেন,

আমি তো আপনাকে নাম শুনেই চিনতে পেরেছিলাম তারপর দেখে নিঃসন্দেহ হলাম এতক্ষণে আপনারও নিশ্চয়ই বিশ্বাস হয়েছে, আমি আপনার এককালের সহপাঠি এবং ভদ্রলোক আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে মাঝে মাঝে কি দেখা হতে পারে ‘?

এণাক্ষী হাসলেন,

 ‘তা পারে তবে কোথায় ‘?

আমার তো না আছে পরিবারের দায়িত্ব, না আছে কোন সাংসারিক কাজ আপনার বোধহয় তা নয় আপনার বাড়ির কাছাকাছি একটা পার্ক আছে, বয়স্ক মানুষদের সকাল সন্ধ্যে হাঁটার জন্যে বলেন তো বিকেলের দিকে ওখানে দেখা হতে পারে

ওখানে আমি তো প্রায় রোজই যাই পাশের মন্দিরটায় আরতি দেখে ফিরি তাহলে তো ওখানেই দেখা হতে পারে

শান্তনু হো হো করে হেসে উঠলেন এণাক্ষী একটু অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

হাসির কি হলো ‘? 

একটা পুরনো গান মনে পড়ে গেল, ম্যায় তুঝসে মিলনে আয়ী মন্দির জানে কে বহানে এই পঁয়ষট্টি ছেষট্টি বছর বয়সেও তাহলে বাহানা লাগে ‘!

এণাক্ষী দৃ্শ্যতই লজ্জা পেলেন  

যাঃ আপনি ভীষণ ইয়ে…’

 

এরপর মাঝে মাঝেই পার্কে দেখা হতে থাকল  

এণাক্ষী যখন মন্দিরে আরতি দেখেন, শান্তনু পার্কে কয়েক চক্কর হেঁটে নেন তারপর এণাক্ষী এলে দুজনে একটা বেঞ্চে বসে গল্প করেন  

হকারদের ডেকে চা কফি খান তারপর আটটা সওয়া আটটা বাজলে উঠে পড়েন এণাক্ষীকে টোটোয় তুলে দিয়ে শান্তনুও বাড়ির পথ ধরেন  

ইতিমধ্যে দুজনে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছেন, কারণ  ‘সহপাঠিকে আপনি আজ্ঞে করতে পারব না আর সহপাঠিও আপনি বললে সাড়া দেবনা।’ 

পয়লা জানুয়ারি শান্তনু এণাক্ষীকে একটা সোনার লকেট উপহার দিল এণাক্ষী শান্তনুকে দিল একটা রিস্ট ওয়াচ  

এণাক্ষী এখন অপেক্ষায় থাকে, কবে দেখা হবে, তবে সেটা যেন নিজের কাছেই স্বীকার করতে লজ্জা  

শান্তনুর কিন্তু কোনরকম সঙ্কোচের বালাই নেই

ওঃ, এত দেরি করে করে দেখা হয় যে সময় আর কাটতে চায় না

কেন, এই তো পরশু দেখা হল

পরশুটা এই তো হল? পুরো আটচল্লিশ ঘন্টা ‘! 

করুণ মুখে বলে শান্তনু এণাক্ষী হেসে গড়িয়ে পড়ে

তারপর একদিন শান্তনু খুব সিরিয়াস মুখে জামার হাতা গোটাতে গোটাতে বলল

অনেক হয়েছে বসন্ত এসে গেছে নাউ অর নেভার আজ হয় এসপার নয় ওসপার

কিসের এসপার ওসপার ‘? 

শুনলেই বুঝবে যা যা জিজ্ঞেস করব, ঠিক ঠিক জবাব দেবে এ্যাভয়েড করা চলবে না বিয়ে করনি কেন ‘?

এণাক্ষী হাসল

 ‘এই কথা ! আসলে ঘটনাচক্রে হয়ে ওঠেনি মা আমার পাস করার আগেই মারা গিয়েছিলেন চাকরিতে ঢোকার পর বাবা কয়েকজন টিচার মিলে স্কুলের পাশেই একটা বাড়িতে থাকতাম বিয়ের যোগাযোগ করার মত বাড়িতে কেউ ছিলনা আর বিয়ে করতে চেয়ে কেউ এগিয়েও আসেনি ওইভাবেই একদিন বুড়িয়ে গেলাম এ্যাজ সি্ম্পল এ্যাজ দ্যাট এবার বল, তুমি বিয়ে করনি কেন? ভাল চাকরি করতে স্মার্ট কত জায়গায় ঘুরেছ, কত জনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে না হয় বাড়িতে উদ্যোগ নেওয়ার কেউ ছিল না, কিন্তু তুমি নিজে চাইলে বিয়ে করতে পারতে না? নাকি, ব্যর্থ প্রেম ‘?

শান্তনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল

প্রেম তো বটেই, এবং সে এসেছিলো যুবক বয়সেই তবে সার্থক বা ব্যর্থ কোনটাই না কারণ তাকে প্রেমের কথা বলতেই পারিনি বন্ধুরা উৎসাহ দিত, যা না শালা, গিয়ে বল হাসিনা মান জায়েগী কিন্তু তাল ঠুকেই দিন গেল, বলা আর হল না

সেকি, কেন ? ভয়ে না সঙ্কোচে ? সেই হাসিনা কি রাগী ছিল ? নাকি উন্নাসিক ?

কোনটাই না সুযোগের অভাবে অথচ, রোজই দেখা হত

তাহলে বলতে পারলে না কেন ? কে ছিল সে ‘?

সে ছিল এক জন কিন্তু সেই এককে কখনো একা পেলাম না সবসময় জোড় বেঁধে, নানা রকম কম্বিনেশনে বারো, তেরো, একশ তেইশ বা বারোশো চৌতিরিশ এই এতদিনে তাকে একা পেলাম এণা, আমাকে বিয়ে করবে ‘?

এণা অবাক চোখে তাকিয়ে শান্তনুর কথা শুনছিল  

তার প্রস্তাবের আকস্মিকতায় একদম চমকে উঠল ।

তারপর অন্যমনস্ক গলায় বলল

এইটুকু বলতে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলে ‘? 

তারপর সোজা শান্তনুর চোখের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে বলল

হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ

 

রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বেরিয়ে দুজনের মোট দশ বারোজন বন্ধু হৈ হৈ করে শান্তনুর ফ্ল্যাটে জমা হল  

শান্তনুর বন্ধুপত্নী একটা সিঁদুরকৌটো তার হাতে দিয়ে বললেন,

এই যে মশাই । এবার সিঁদুরটা পরিয়ে দিন

সবাই চলে যাবার পর আয়নায় নিজের সিঁদুর রাঙা সিঁথি দেখতে দেখতে এণা বলল

জানো, আমার ঠাকুমা আমাকে আশি্র্বাদ করতেন, পাকা চুলে সিঁদুর পর এই ছেষট্টি বছর বয়সে সেই আশির্বাদ ফলল

শান্তনু আয়নাতেই এণাকে দেখছিল

হ্যাঁ, এবারটায়  দেরি করে ফেললাম প্রেমের কোটা পুরো হবে না ফলে পরের জন্মে ডেফিসিট মেক আপ করতে হবে তখন আর ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত অপেক্ষা করব না ক্লাস ইলেভেনেই প্রেমে পড়ব পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে সাইকেল চালিয়ে কোচিং ক্লাসে যাব সরস্বতী পুজোয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেবো।একটা আইসক্রিম দুজনে ভাগ করে খাব আর…আর…আইসক্রীম ভেজা ঠোঁটে চুমু খাব মনে থাকবে তো ‘?

এণা এক মুহূর্ত শান্তনুর চোখের দিকে নির্নিমেষ তাকাল

তারপর দুহাতে শান্তনুর গলা জড়িয়ে ধরে গাঢ় গলায় বলল,

থাকবে

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • Tridibesh Bandyopadhyay on July 2, 2022

    লেখক আমার দাদা। নিবাস বর্ধমান। লেখে কম। পড়ে অনেক। সমঝদার পাঠক, সমালোচক। প্রবন্ধ, স্যাটায়ার লিখতে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু লিখতে চায় না, বলে কী হবে? বিশেষ কিছু জানার প্রয়োজন হলে, সাহিত্য বিষয়ে কোনও কনফিউশান হলে আমি সোজা ফোন করি। বেশির ভাগ সময়েই উত্তর পেয়ে যাই। অনেকটা সিধু জ্যাঠার মতো। গল্পের সময়ে দাদার লেখা পড়ে ভাল লাগলো। চমৎকার সরস গল্প।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ