25 Sep

নেগেটিভ

লিখেছেন:পূষন


নীহার ভৌমিকের বয়স প্রায় পঞ্চাশ, ডিভোর্সী। নীহারবাবুর চোখে চশমা, মুখে স্মিত হাসি, চোখের দৃষ্টি মোলায়েম কিন্তু প্রখর। ঝকঝকে স্মার্ট ব্যক্তিত্ব, পয়সা একটু বেশী-ই আছে। নেই যেটা সেটা হচ্ছে চারিত্রিক শুদ্ধতা। বিভিন্ন রকম দোষ আছে তার। তবে কারো ক্ষতি তিনি করেন না, জোর-জবরদস্তিও না। লোকটার সবচেয়ে বড় গুণ বা দোষ হচ্ছে, যে পরিবেশে বা যে সঙ্গে তাকে রাখা হয়, তিনি তার বা তাদের মত হয়ে যেতে বেশী সময় নেন না। শেখার ক্ষমতা আছে ভদ্রলোকের, প্রচন্ড ডায়নামিক। সুবক্তা, সুচতুর এবং ম্যান ম্যানেজমেন্টে অসাধারণ দক্ষ। এইসব দোষ-গুণ মিলিয়ে কেরিয়ারে সফল হতে কষ্ট হয়নি তার। পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব নেই, কিন্তু সে’সবের অভাব বোধ করেন না তিনি। টাকাতো আছে বিস্তর, ওটা থাকলে আজকাল আর কোনো অভাব-ই অভাব নয়। কড়ি ফেললে তেল তো পাওয়া যায়-ই, তেল মাখানোর লোক-ও পাওয়া যায়।

এ’ জায়গাটা ঝাড়খন্ডের অন্তর্গত, বেশ জঙ্গুলে। বেশীর ভাগ-ই আধা-শিক্ষিত আদিবাসী, তবে জনবসতির চেয়ে কালচে-সবুজ গাছপালা আর ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বেঁটে-বেঁটে টিলার ঘনত্ব বেশী চোখে পড়ে। ইচ্ছে হলে নিজের শহরের বাইরে দু’-চার দিন এসে থাকা যাবে — এই বাসনা থেকে-ই এই বাড়িখানা কিনেছিলেন নীহারবাবু। পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ি, দেওয়ালগুলোর রং পোড়ামাটির মত। সামনে অনেকটা জমি, আগাছার জঙ্গল দুই পাশে। রাস্তা থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় ভিড়-ভাট্টা, ট্র্যাফিকের শব্দ একেবারেই নেই। কয়েকটা দিন নিরিবিলি থাকার পক্ষে আদর্শ জায়গা। খুব-ই সস্তা রেটে নীহারবাবু পেয়েছিলেন প্রাসাদোপম বাড়িটা। আসলে বাড়িটার কোনো মালিক নেই। মানে, কিছুদিন আগে অবধি ছিল না। দিন-দিন অল্প অল্প করে ভেঙে-পড়তে-থাকা পিলার আর সমস্ত দেওয়ালে-কার্নিশে বট-অশ্বত্থের মূলতন্ত্রের প্রশস্ত বিস্তার নিয়ে বহুকাল একা দাঁড়িয়ে রয়েছে এই বাড়িটা। না মালিক, না শরিক, না কোনো ভাড়াটিয়া। সামান্য কিছু টাকা আর আর আরও কিছু টাকার বিনিময়ে জুটে যাওয়ানীচুতলার পলিটিকাল কানেকশান কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিকানা পেতে খুব বেশী ঝামেলা পোহাতে হয় নি নীহারবাবুকে। বাড়িটাকে দেখে-ই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল তার। কিরকম যেন একটা ভিনটেজ ব্যাপার আছে ওটার মধ্যে! সবচেয়ে বড় আর ইউনিক ব্যাপার হচ্ছে বাইরের দেওয়ালে কালচে হয়ে আসা মার্বেল ফলকে লেখা এই বাড়ির নাম — ‘নেগেটিভ’। বসতবাড়ির এ’হেন অলক্ষুণে নামটা দেখে একবার একটু খুঁতখুঁত করেছিলেন নীহারবাবু, কিন্তু পরে এর ইতিহাস জেনে আর দ্বিধান্বিত হন নি।

নগরপালিকারপোকা-কাটা নথি মোতাবেক, ১৯৩৮ সালে ইংল্যান্ডের লেইস্টারশায়ারের বাসিন্দা সেবাস্টিয়ান বেকফোর্ড নামক এক তরুণ সাহেব নাকি এই বাড়িখানায় বসবাস আরম্ভ করেন। সাহেব কি করতেন সেটা সঠিক জানা যায় না, কিন্তু তিনি নাকি ছিলেন একেবারে ছবি-পাগল। সারাদিন ক্যামেরা নিয়ে বিভিন্ন আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরতেন, অনেক অচেনা, অল্প-চেনা লোককে যেচে ছবি তুলে দিতেন। সেইসময় এই অজ এলাকা কেন, গোটা গ্রাম-বাংলায় পার্সোনাল ক্যামেরা খুব বড় ব্যাপার ছিল নিশ্চই; তাই বেকফোর্ড সাহেবের বিখ্যাত হতে একেবারেই সময় লাগল না। এ’রকম লোকের পক্ষে নিজের ভদ্রাসনের নাম ‘নেগেটিভ’ রাখা খুব আশ্চর্যের নয়। যদিও নীহারবাবুর মতে, ‘ডার্করুম’ নামটা বেশী উপযুক্ত হত, কিন্তু কোনো ভিজিটরের মনে ‘নেগেটিভ’-এর মত দমদার ইমপ্যাক্ট সেটা হয়ত তৈরী করতে পারত না। ১৯৪০ এর দশকের গোড়ায় যখন দেশ জুড়ে আন্দোলনের ঝড় উঠছে, সেই সময়েও বেকফোর্ড এখানে থাকতেন। হঠাৎ একদিন রাতারাতি নাকি হাওয়া হয়ে যান তিনি। ততদিনেআবার ব্রিটিশ-বিরোধ চরমে উঠেছে সর্বত্র। খুব সম্ভবত, গভীর রাতের অন্ধকারে স্বদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি, যদিও এই ব্যাপারে পাকা-পোক্ত কোনো প্রমাণ মেলে না। তবে বেকফোর্ড সাহেবের শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল সেটা নীহারবাবু জানার চেষ্টা করলেন না, স্বাধীনতার পর থেকে এই বাড়ি যে বেওয়ারিশ — এ’টুকু খবরেই তিনি সন্তুষ্ট।কোনো মেইনস্ট্রিম শহর এলাকা হলে এতদিনে বড় ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে যেত নির্ঘাত, কিন্তু এই এলাকায় এখনও সেই কালচার ঢোকে নি তাই রক্ষা। তাছাড়া লোকের অত টাকাও নেই, আর তার উপর আপাতত জনঘনত্ব-ও কম। এই এলাকা চট করে পালটাবে বলে তো মনে হয় না।

বাড়িটার ভেতরে ধুলো-ময়লা ছিল প্রচুর। যেদিন বাড়ি কিনলেন নীহারবাবু, সেদিন বিকেলের দিকে এসে নিজের হাতেই ঘর-দোর সামান্য সাফ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু একটু পরেই তিনি বুঝলেন যে এত কাজ তার দ্বারা হবে না, কাজের লোক ছাড়া গতি নেই। কিন্তু আজ তিনি সাথে কাউকে আনেন নি। আজকের মত আর বৃথা পরিশ্রম না করে বাড়ির ভেতরটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন তিনি। কেনার আগে এই বাড়ির সব ক’টা ঘর তিনি ঘুরে দেখেননি। কাজটা বোকার মত হয়েছে একটু, কিন্তু যে লোকের টাকার পরোয়া একেবারেই নেই তার পক্ষে এ’টুকু ভুল তো মাফ করা-ই যায়। এদিকে ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। একখানা মোমবাতি হাতে এ’ঘর-সে’ঘর দেখতে দেখতে একটা বড় ঘরে তিনি একখানা প্রকান্ড খাট আবিষ্কার করলেন। সম্ভবত এটা সেই বেকফোর্ড সাহেবের পালঙ্ক। এর সাথে একটা বড় কাঠের আলমারি, একটা ভয়ানক ধুলো-পরা আয়না আর টুকিটাকি কিছু জিনিসও রয়েছে। এটা নির্ঘাত বেকফোর্ড সাহেবের বেডরুম ছিল। নীহারবাবুপ্রথমে সেই ঘরটাকে মোটামুটি সাফ করে নিলেন নিজের জন্য।খাট যখন আছে, রাত্রিবাসটা হয়ে যাবে কোনো মতে।

কিছুক্ষণ পরে বাড়ির ভেতরে আর একটা ঘর তিনি আবিষ্কার করলেন যেটার দেওয়াল জুড়ে অনেকগুলো মাঝারি সাইজের ছবি পাতলা কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় ঝুলছে। এ’গুলো যে সেই বেকফোর্ডের তোলা তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই। ছবিগুলোর উপর এত ধুলো জমেছে যে কিছুই প্রায় বোঝা যায় না। তার উপর সাদা-কালো ছবি, তার উপর পুওর কোয়ালিটির পেপারের। সব ক’টার জায়গায় জায়গায় কালো-হলুদ ছোপ, কোনোটাকে আবার পোকায় কেটেছে। বলতে গেলে প্রায় সবগুলো-ই নষ্ট। খালি একটা ছবির কিছুটা অংশ যেন একটু বেশী-ই পরিষ্কার বাকি ছবিদের থেকে। ছবিতে একটা মাঝবয়সী লোকের মুখ বোঝা যাচ্ছে। সাধারণ লোক, সাধা-সিধে চোখ-নাক, আলাদা বিশেষত্ব তো কিছু নজরে এল না নীহারবাবুর। তবে এই ছবিটার বাকি অংশ কিন্তু যথেষ্ট আবছা। কি করে এমন হল সেটা নিয়ে বেশী মাথা ঘামালেন না নীহারবাবু।

বাড়িটা কেনার পরের দিনটা ছিল শনিবার। নীহারবাবু ভাবলেন, উইকেন্ডটা কাটিয়ে গেলে মন্দ হয় না। তাছাড়া কাজের লোক যোগাড় করা, নিকটবর্তী বাজার-দোকানের হদিশ লাগানো, এলাকায় নিজের মুখ দেখানো — এ’সব জিনিসও কর্তব্য। এই এলাকায় ইলেকট্রিসিটি আছে, কিন্তু প্রচন্ড লোডশেডিং হয়। ভোল্টেজ-ও খুব আহামরি নয়, লাইট-পাখা চলে যায় কোনোরকমে। কিন্তু এই বাড়িতে স্বাভাবিকভাবেই ইলেকট্রিসিটির কানেকশান নেই, সেটার ব্যবস্থাও নীহারবাবুকে করতে হবে, অবশ্য-ই লোক লাগিয়ে। সবটা ভেবে নীহারবাবু দিন-দুই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল বাড়িটাকে বাসযোগ্য করে তোলা এবং সেই কাজের জন্য মারাত্মক প্রয়োজনীয় হেল্পিং-হ্যান্ড যোগাড় করা। বাড়ি কেনার ব্যাপারে যাদের থেকে সাহায্য নীহারবাবু পেয়েছেন, যেমন সুলতান ভাই, তারা অবশ্য আশু সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কাজগুলো যতক্ষণ না মিটছে ততক্ষণ নীহারবাবুর স্বস্তি নেই। তাকে কলকাতায়-ও ফিরতে হবে।

সেদিন রাতে সেই খাটে শুয়েখুব-ই বিচিত্র একটা অনুভূতি হল নীহারবাবুর। আধো-ঘুমের ভেতর তার মনে হল, অনেকগুলো লোক যেন হাসি-হাসি মুখে তার দিকে ঝুঁকে রয়েছে। কিন্তু চোখ খুলে কাউকেই তিনি দেখতে পেলেন না। ঘরের কোণায় বড় একটা মোম জ্বলছে, চারপাশটার একটা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু না, কোত্থাও কেউ নেই। তিনি একা শুয়ে আছেন খাটের উপর। উঠে বসলেন নীহারবাবু, তারপর কিছুক্ষণ এভাবে বসে রইলেন। খুব গরম লাগছে তার, বেশ ঘাম দিচ্ছে। আচমকা নীহারবাবুর মুখ থেকে প্রায় আপনা থেকেই বেরিয়ে এল , “ওহ ম্যান! ইট’স বার্নিং!” কথাটা শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথে ঘরের ভেতর কিভাবে যেন একটা ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত বইতে আরম্ভ করল। একবার ডান দিকের দেওয়াল থেকে বাঁ দিকের দেওয়ালের দিকে, তো পরক্ষণেই আবার উলটো পথে। সহসা কেউ যেন অদৃশ্য কোন বিশাল পাখা দিয়ে হাওয়া করছে তাকে। এইবারে একটু ভয় পেলেন নীহারবাবু। ব্যাপার কি? এই হাওয়া এল কোথা থেকে? ঘাবড়ে গিয়ে এদিক-ওদিক চোখ বোলাতেই নীহারবাবুর যাবতীয় ভয় আরেক দফা ঘাম দিয়ে ছেড়ে গেল। সম্ভবত অসতর্কতার বশে-ই ঘরের কোণের একটা জানালা খোলা থেকে গেছে। মোমের আলো সেটার একটা খোলা পাল্লার কোণ থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে। হাওয়াটা যে ওই পথেই আসছে সেটা মেনে নিতে বেশী সময় লাগালেন না নীহারবাবু। খুব ঠান্ডা হাওয়াটা; দূরে কোথাও বৃষ্টি হলে যেমন হাওয়া আসে, অনেকটা সে’রকম।নীহারবাবু আরেকবার শুয়ে পড়লেন। হাওয়ার আরামে ঘুম আসতে এবার আর তার দেরী হল না।

পরের দিন সকালে যেটা ঘটল,ঘটনকালের সামান্য পরেসেটার জন্য নীহারবাবু নিজের বরাতকে যথেষ্ট ধন্যবাদ আর ভগবানকে পর্যাপ্ত সংখ্যক কুর্নিশ জানাতে পারলেন না। খুব ভোরে ওঠেন নীহারবাবু। সেদিন যেন একটু বেশী আগে-ই উঠে পড়লেন, অন্ধকার অনেকটা-ই রয়েছে তখনও। উঠে-ই কি জানি মনেহতে সটান গিয়ে দরজাটা খুলে ফেললেন, আর খুলতেই ভীষণ চমকে গিয়ে এক লাফে প্রায় দুই হাত পিছিয়ে আসলেন। দরজার বাইরে উবু হয়ে একটা লোক বসে রয়েছে! লোকটা রোগা, বেঁটে, মাথায় ঝাঁকরা চুল। জামাকাপড় এই এলাকার গরীব লোকের মত, গলায় আবার গামছা। মুখ-চোখ অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। নীহারবাবু কিছু বলার আগে লোকটা নিজেই হাত জোড় করে অত্যন্ত ভীত এবং মিহি গলায় বলে উঠল, “সাহেব, আমার আসতে একটু দেরী হয়ে গেল। মাফ করবেন। আমি এখনি সব কাজ করে দিচ্ছি।” কথাটা বলেই লোকটা ওই হাত-জোড়-করা অবস্থাতেই সাপের মত বেঁকে-বেঁকে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল এবং অন্ধকার ঘরগুলোর ভেতর নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। হতভম্ভ ভাবটা কাটতে তিন-চার সেকেন্ড সময় লাগল নীহারবাবুর। সেটা কাটতেই রীতিমত ভয় পেলেন তিনি। একটা অচেনা লোক, বলতে গেলে রাতের অন্ধকারে এইভাবে তার ঘরের ভেতর স্বাভাবিক গতিতে ঢুকে পড়ল?! পাগল? … কোনো চোর-ডাকাত নয় তো? ঘর তো ফাঁকা নীহারবাবুর, মোবাইল আর ওয়ালেটখানা তার প্যান্টের পকেটেই আছে। বাড়ি কেনার কাগজপত্র আর তিন-চারটে জামা-কাপড়-গামছা, সেভিং কিট ছাড়া ঘরে কিছুই আর নেই। কিছু না পেয়ে লোকটা যদি তাকে খুন করে, তাহলে??? …এখন কি করবেন তিনি?!

বেশীক্ষণ তাকে চিন্তা করতে হল না। হঠাৎ তার মনে হল, এত দূষণ-মুক্ত পরিবেশে কাক-ভোরে জগিং করলে কিন্তু মন্দ হয় না। জগিং না করলেও মর্নিং-ওয়াক তো দিব্যি করা চলে। ঘরের ভেতরে যে একটা আস্ত লোক ঢুকে গেছে এই একটু আগে-ই, এই ব্যাপারটা হঠাৎ করেই খুব সহজ হয়ে গেল নীহারবাবুর চেতনায়। তিনি ও’ভাবেই বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লেন। দরজায় তালা অবধি দেওয়ার কথা তার মনে এল না। খুব অদ্ভুতভাবেই তার মনে মন বলে উঠল, চিন্তা কি, ওই লোকটা তো আছে!

শরৎকাল, পুজো আসতেও বেশী বাকি নেই। এই সময়টায় ভোরের দিকে হালকা শিশির জমে থাকে রাস্তার ধারের ঘাসে-পাতায়। রাস্তায় বেড়িয়ে ওরকম কিছু ঘাসের দিকে-ই প্রথম চোখ গেল আজ নীহারবাবুর। তিনি এ’সব কোনোকালেই খেয়াল করেন না, কিন্তু আজকে করলেন। আসলে চারপাশের বদল ঘটলে মানসিকতারও বদল একটু-আধটু ঘটে থাকে — এটা নীহারবাবু বরাবর প্রত্যক্ষ করে এসেছেন। ঘাসের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল ঘাসের উপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুর উপর। ভোরের হালকা নীল আলো কেমন যেন আটকে গেছে ওটার ভেতর, আর সেই রং জলের কণাটার দেওয়ালে-দেওয়ালে অভিঘাত হেনে যেন কত বিচিত্র রং ফুটিয়ে তুলছে। আহা, কি অসাধারণ সাবজেক্ট! হঠাৎ একটা ক্যামেরার অভাব বোধ করলেন নীহারবাবু। ফোন সাথে আছে, কিন্তু ক্যামেরার লেন্সের সাথে সেটার তুলনা চলে না। মনটা একটু দমে গেল নীহারবাবুর। আজ ক্যামেরার অভাবে একটা সেরা ফ্রেম হাতছাড়া হয়ে গেল … ইস! … না, একটা দামী ক্যামেরা কিনতেই হচ্ছে!

এগোতে লাগলেন তিনি। যেদিকেই তাকাচ্ছেন আজ, যার দিকেই তাকাচ্ছেন, সেটাকেই ফটোজেনিক মনে হচ্ছে। এমনকী তার পেছনের কালো কুকুরটা-ও। দেশী কুকুর, লেজ নাড়তে-নাড়তে পিছু নিয়েছে নীহারবাবুর। আগে দেখেননি তিনি কুকুরটাকে, কিন্তু কুকুরটা যেন তাকে বহুদিন ধরে চেনে — এমনভাব করছে। খাবারের আশায় হয়ত। বেশ বড় আর মিশমিশে কালো কুকুরটা; ঝোলা-ঝোলা কান। স্বাস্থ্য মোটামুটি, দিব্যি দেখতে। পিছন পিছন চলছে যখন চলুক, বাসায় ফেরা অবধি যদি থাকে, কিছু নাহয় খাইয়ে দেওয়া যাবে — মর্নিং-ওয়াকের সঙ্গীকে দেখে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল নীহারবাবুর ঠোঁটে। কিন্তু আজ তার সাথে একটা ভালো ক্যামেরা থাকলে কি ভালো-ই না হ’ত …

কুকুরটা কিন্তু নীহারবাবুর পিছন ছাড়ল না। ‘নেগেটিভ’-এর দরজায় তিনি যখন এসে দাঁড়িয়েছেন, কুকুরটা তখনও তার ঠিক পেছনে লম্বা জিভ বের করে লেজ নাড়ছে ধীর গতিতে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে-ই নীহারবাবু ভাবলেন, ব্যাগে কিছু বিস্কুট আছে … এটাকে দিলে ভালোই হবে। বাড়ির পাহারার কাজটাও হয়ত …

– ‘এই নিন সাহেব, দুধ আর রুটি!’

‘এই কে রে!’ বলে পিছিয়ে আসলেন নীহারবাবু। কারণ তার একেবারে সামনে একটা বাটি হাতে দাঁড়িয়েছে সকালের সেই লোকটা। সে কি! এ যায় নি এখনও?! বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন নীহারবাবু। কে লোকটা? কি চায়? হাতে আবার বাটি! একটু উঁকি দিয়ে তিনি দেখলেন, সত্যি-ই ওতে দুধ আর রুটির টুকরো মেশানো রয়েছে।

– ‘এই … ইয়ে … আপনি কে বলুন তো? …… আর বাড়িতে ঢুকে বসে আছেন কোন সাহসে? যান, কেটে পড়ুন! …… কি হল, যাবেন নাকি পুলিশ ডাকব?’ মনের ঘাবড়ানিটা যথাসম্ভব অপ্রকাশিত রাখার চেষ্টা করলেন নীহাররঞ্জন ভৌমিক। এই প্রথম তার কনফিডেন্স একটু নড়ে গেছে।

লোকটা কিন্তু ঘাবড়াল না। হাতের বাটিটা কুকুরটা সামনে রেখে সে হাসি-হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। আর কুকুরটাও বিনা বাক্যব্যয়ে এগিয়ে এসে লেজ নাড়তে-নাড়তেই চুকচুক করে দুধ-রুটি খেতে আরম্ভ করল। এরপরে কথা বলল লোকটা, “সাহেব, আমি তো কাজ করার জন্য এসেছি। আপনার চাই না কাজের লোক?”

নীহারবাবুর কানে দুর্দান্ত শোনালো কথাটা। বাহ! এ তো দারুণ ব্যাপার! রাতারাতি কাজের লোক যোগাড় হয়ে গেল! আর কি চাই! কিন্তু উৎসাহটা একটু চাপা দিয়ে তিনি বললেন, “ওহ, আচ্ছা। কি নাম? … আর বাটির ওই দুধ-রুটি পেলে কোথা থেকে? … ঘরে তো ওসব কিছু নেই!”

একগাল হাসল লোকটা। তারপর বলল, “সে আর কি এমন কথা সাহেব! রামুয়া কে বললাম, ও নিয়ে এল বাজার থেকে। ও-ও তো এসে গেছে! … আর আমার নাম তো লাখন, সাহেব!”

– “রামুয়া?! … সে আবার কে?”

– “ও তো বাজার-টাজার করে, বাইরের ফাই-ফরমাশ খাটে। আমার-ই বন্ধু সাহেব, ভয় পাবেন না!”

বাহ, একটার সাথে আরেকটা চাকর ফ্রি! কেয়া বাত! কিন্তু টাকা-পয়সার ব্যাপারটা ……

– “বেশ … তা মাসে কত নেবে?”

– “থাকা-খাওয়া বাদে সাহেব যা দেবেন। আমাদের বেশী চাহিদা নেই, গরীব মানুষ আমরা সাহেব … ” বলে লোকটা একবার অমায়িক প্রকৃতির হাসি হেসে হাত কচলাল।

নীহারবাবুর ব্যাপারটা খুব জটিল লাগল না। পরিচিতরা বলেছিল লোক যোগাড় করে দেবে, তাদের-ই কেউ পাঠিয়ে থাকবে লাখনকে। আর লাখন সুযোগ দেখে ভাই-বন্ধু রামুয়াকে যোগাড় করে নিয়েছে। একদিকে ভালোই হয়েছে, দু’-দুটো লোক রাত্রে বাড়িতে থাকলে বাড়িটা নিরাপদে থাকবে। অবশ্য বেশী কিছু আপাতত বাড়িতে রাখা যাবে না, লোকদুটোকে কিছুদিন পরখ করে নেওয়া দরকার। তার অবর্তমানে বাড়ির দেখ-রেখ হবে এটা ভেবে বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে। তাছাড়া ওই কালো কুকুরটাকেও রেগুলার একটু খাবার দিয়ে ম্যানেজ করে নিলে …

কুকুরটার কথা মনে হতেই ফের পিছনে ফিরলেন নীহারবাবু। কিন্তু পেছনে কেউ নেই। খালি বাটিটাকে ফেলে কুকুরটা কখন যেন নিঃশব্দে পিঠটান দিয়েছে। লাখন এসে বাটিটা তুলে নিল সাবলীলভাবে, যেন বাড়ির পোষা জীবের খাওয়ার বাটি তুলছে। বাটিখানা তুলতে-তুলতে সে নীহারবাবুর উদ্দেশ্যে বলল, “চিন্তা করবেন না সাহেব, বেলাকি আবার রাতে আসবে … রোজ আসবে …”

নীহারবাবুর অকারণে-ই পিত্তি জ্বলে গেল দুম করে। যত্তসব ব্লাডি অশিক্ষিত, গোঁয়ারের দল! বেশ ক্রুর গলায় তিনি বলে উঠলেন, “ওফ লাখন! বেলাকি নয়, ইট’স ব্ল্যাকি! ব্ল্যাকি!”

লাখন বাটি নিয়ে বাড়ির ভেতর দিকে পা বাড়িয়েছে ততক্ষণে। তার পিঠ তখন নীহারবাবুর দিকে। নীহারবাবুর কথা শুনে ওভাবেই সে ঘাড়টা সামান্য বেঁকিয়ে দাঁত বার করে বলল, “হ্যাঁ সাহেব, যা বলেছেন! … আমার বরাবরের ভুল … হি হি …” হাসতে-হাসতে-ই ঘরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল লাখন।

এদিকে নীহারবাবুরও এবার ঘরে যাওয়া দরকার। স্নান-খাওয়া সেরে লাখনদের ঘাড়ে বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে একবেলার জন্য কলকাতা যাওয়ার দরকার। ভালো একখানা ক্যামেরা না কিনলেই নয়! … ঘরের ভেতর যেতে যেতে তিনি ভাবলেন, “হুম … ব্ল্যাকি! … নাইস নেম!”পাশাপাশি আরেকটা ভাবনাও তার মনে জেগে উঠল। এই লাখনকে তার অল্প চেনা-চেনা লাগছে কেন? … কোথায় যেন এই মুখ তিনি দেখেছেন … কিন্তু কোথায়?

দামী একটা ডিএসএলআর কিনে নীহারবাবু ‘নেগেটিভ’-এ ফিরলেন পরদিন দুপুরে। ট্রেনটা মাঝপথে ঝোলালো। বাড়ি ফিরে রামুয়ার দেখা পেলেন তিনি। লম্বা, কালো চেহারা, মাথায় কোঁকরা চুল। মজবুত শরীর, কিন্তু মোটা নয়। চোখ দেখে বোঝা যায়, লোকটার মাথায় বিশেষ বুদ্ধি নেই। কিন্তু সবচেয়ে যে জিনিসটা লোকের চোখে পড়বে সেটা হচ্ছে, লোকটার বাঁ গালের ইঞ্চি দুয়েক লম্বা একটা কাটা দাগ। সরু, কিন্তু চোখে পড়ে।

দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে বেশ চমক লাগল নীহারবাবুর। মাছ, মাংস, ডিম তো আছেই, সাথে দু’রকমের তরকারি। রামুয়া নাকি বাজার করে এনেছে, রেঁধেছে লাখন। এত খান না নীহারবাবু। কিন্তু আজ খেতে ভালোই লাগছে,  হয়ত ধকলের জন্য আর এলাকার জলের গুণে খিদে চাগিয়ে উঠেছে। রান্নায় ঝাল-মশলা খুব-ই কম, কিন্তু নীহাবাবুর মনে হল এর চেয়ে বেশী তেল-ঝাল তার সইত না। ব্ল্যাকি নাকি দিনে আসে না, সন্ধ্যের পর এসে হাজির হয়। নীহারবাবু ক্লান্ত ছিলেন, ওসব আর গায়ে মাখলেন না। বিছানায় শুতে-ই তার ঘুম চলে এল।

ঘুম ভাঙল বিকেলের মাঝামাঝি। ঘুম ভাঙার পরেই নীহারবাবুর মনে প্রথম খেয়াল এল — আর দেরী নয়, ভালো ছবি তুলতে হলে এখনি ক্যামেরাটা নিয়ে বের হওয়া দরকার। দোকানদার ক্যামেরা রেডি করে-ই দিয়েছিল, আর বেসিক অপারেশান-ও বুঝিয়ে দিয়েছিল। কাজেই ছবি তুলতে বিশেষ বাধা নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন নীহারবাবু, তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে। খালি বেরোবার মুখে অদৃশ্য লাখনের উদ্দেশ্যে হাঁক দিলেন, “দরজা ক্লোজ কর লাখন! বাইরে যাচ্ছি।” লাখনের কোনো সাড়া এল না। খালি কিছুটা দূর আসার পরে নীহারবাবুর কানে এল নেগেটিভ-এর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

অনেক কিছুর ছবি তুললেন নীহারবাবু। গাছপালা, প্রজাপতি, রঙিন পোকা, দূরের একটা মাঠের ফসল — দারুণ সব ছবি। সাবজেক্ট খুব-ই সাধারণ, কিন্তু ছবি উঠল অসামান্য। নিজের ছবি তোলার হাত যে এত দুর্দান্ত এটা নীহারবাবুর জানা ছিল না। হতে পারে ক্যামেরার গুণ। আজকাল টেকনোলজির যে কত উন্নতি হয়েছে …

সন্ধ্যে যখন প্রায় সমাগত, ছবি তুলতে তুলতে তখন একটা মাঠের কাছাকাছি উপস্থিত হলেন নীহারবাবু। মাঠ ঠিক না, বিশাল বড় বড় পাথর ঘেরা বড় একটা শুকনো জায়গা। আশেপাশে হালকা জঙ্গল।জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই। পাথরগুলোর পেছনে যে পশ্চিমের জঙ্গল আছে সূর্য এখন সেটার আড়ালে, সেখান থেকে একটা পাখির সুন্দর শিস কানে আসছে নীহারবাবুর। লেন্সটাকে জুম করে পাখিটার খোঁজ চালাতে লাগলেন নীহারবাবু। পাখি তো নজরে এল না, এল অন্য একটা জিনিস। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাথরগুলোর ভাঁজে। লম্বা, খোলা চুল, উজ্জ্বল পাতলা গড়ন। পরনে একটা কাপড়, সেটা দিয়ে সারা গা-মাথা মোটামুটি আবৃত। চোখ-মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না লেন্স দিয়েও, কিন্তু নীহারবাবুর অভিজ্ঞ চোখ। এসব ব্যাপারে তিনি খামের উপর থেকে চিঠির পয়গাম পড়ে নিতে পারেন। মেয়েটা যে অসামান্য রূপবতী এটা আন্দাজ করতে সমস্যা হল না নীহারবাবু। ইতিমধ্যে-ই অনেকদিন শীতঘুমে থাকা একটা সাপ ফণা তুলতে শুরু করেছে তার মাথার ভেতরে।

পাখি ভুলে এক পা , এক পা করে এগোতে লাগলেন তিনি। মেয়েটা কিন্তু নড়ল না। আরও এগোতে লাগলেন নীহারবাবু। যেই না মেয়েটার অবয়ব সুস্পষ্ট রূপরেখা নিতে আরম্ভ করেছে, মেয়েটা উলটো দিকে চলতে আরম্ভ করল। যেদিকে মেয়েটা যাচ্ছে, আর কিছুটা গেলেই ও পাথরগুলোর আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাবে। নীহারবাবু মরিয়া হয়ে ডাক দিলেন, “শুনছেন?” কোনো সাড়া দিল না মেয়েটা, একভাবে এগোতে লাগল ধীর লয়ে। ফের ডাকলেন নীহারবাবু, “শুনছেন? … হেই মিস! শুড আই … আই মিন, আপনার একটা ছবি তুলে দিতে পারি? … ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড …… হ্যালো …” মেয়েটার মধ্যে বিশেষ চাঞ্চল্য দেখা গেল না। সে এগোতেই লাগল। দেখতে দেখতে সে বড় একটা পাথরের সারির আড়ালে মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে গেল। এদিকে সন্ধ্যের অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে, জায়গা অচেনা। ইচ্ছে থাকলেও নীহারবাবু আর এগোলেন না। পরে আবার দেখা যাবে, আজ বাড়ি ফেরা যাক।

বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বললেন না নীহার ভৌমিক, কিন্তু পুরো না দেখা সত্ত্বেও মেয়েটার চিন্তা তার সমস্ত মনকে পুরো গ্রাস করে ফেলেছে ওই কয়েক মুহূর্তেই। একে-ই বোধ হয় ‘রূপের যাদু’ বলে।

ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা হয়নি এখনও। মোমের আলোয় খেতে বসেছিলেন নীহারবাবু। দূরে বসে আছে লাখন আর রামুয়া। বাইরে হাজির হয়েছে ব্ল্যাকি। নীহারবাবুর মন খালি সেই মেয়েটার কথাই ভেবে চলেছে। খাওয়ার মাঝে হঠাৎ লাখন বলে উঠল, “সাহেব, আপনি সন্ধ্যেবেলা ফের বেরিয়ে ছিলেন দেখলাম … তা সাহেব, একটা কথা মনে রাখবেন, আলো পড়ে এলে পশ্চিম দিকের টিলার মাঠের দিকে যাবেন না কিন্তু! … সাবধান!”

চমকে উঠলেন নীহারবাবু। পশ্চিমের টিলার মাঠ … তিনি তো সম্ভবত ওখানেই আজ …

মুখে বললেন, “কেন? কি আছে টিলার মাঠে?”

কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। রামুয়ার সাথে লাখনের যে একটা চোরা চোখাচোখি ঘটে গেল সেটা নীহারবাবুর দৃষ্টি এড়াল না। আধো-অন্ধকারে ওদের চোখগুলো যেন একটু অন্যরকম লাগছে। একটু পরে গলার স্বর অত্যন্ত রহস্যময় ও গাঢ় করে কথা বলল লাখন, “মোহিনী! ওই মাঠে মোহিনী আছে সাহেব … মোহিনী!”

খুব অবাক হলেন নীহারবাবু, “মোহিনী? সে আবার কে?”

এবার রামুয়া একটু দেহাতি সুরে বলল, “সাহেব, মোহিনী কোনো মেয়ে মানুষ নয়। ও ছালাওয়া আছে … সুন্দরী মেয়ের বেশে আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে … তারপর ……”

– “ধুস! ওসব আবার হয় নাকি?” অবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন নীহারবাবু।

রামুয়া গোল গোল চোখে বলল, “হয় সাহেব, হয়! এসব আমাদের বানানো কাহানি না সাহেব … বহুদিন আগে থেকেই এসব হয়ে আসছে। আমাদের দাদা-পরদাদারা বলতেন এসব। এখনও আছে, চিরকাল থাকবে। এসব জিনিসের জন্ম, মৃত্যু হয় না … যে জায়গায় এরা থাকে, কায়ামাত তক ওখানেই থাকে … এ’সব জিনিস ……”

– “আচ্ছা, ঠিক আছে। ছাড়ো ওসব। আমার খাওয়া শেষ, তোমরাও খেয়ে নাও।” উঠে পড়লেন নীহারবাবু।

রাতটা অবশ্য নির্বিঘ্নেই কাটল। খালি ঘুমের ভেতর একটা দূরাগত নারীকণ্ঠ ভেসে আসতে লাগল নীহারবাবুর কানে। কিন্তু সেটা যে কার, বা সে ঠিক কি বলছে — সেটা স্পষ্ট শোনা গেল না।

ঠিক এই ছন্দেই বেশ কয়েকটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল নীহারবাবুর। ফোন অফ হয়ে গেছে চার্জের অভাবে, ব্যবসার সাথে কোনো যোগাযোগ-ই নেই। কলকাতায় তিনি যে থাকতেন এটা একটা বহু পুরোনো স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। কোনো দিকে-ই কোনো খেয়াল নেই নীহারবাবুর। এই বাড়িটায় তিনি পুরো মজে রয়েছেন। সকালে ব্ল্যাকির সাথে মর্নিং ওয়াকে যান, নানারকম ছবি তোলেন। দুপুরে লাখন-রামুয়ার দৌলতে ভালো-মন্দ খান। আর সন্ধ্যের দিকে যান সেই পশ্চিমের টিলার মাঠে। সে-ও রোজ আসে ওখানে। দেখা হয়, পিছু নেওয়া হয়; কিন্তু কথা আর এগোয় না। নীহারবাবুর প্রতীক্ষা দীর্ঘায়িত হয়, কিন্তু তিনি অধৈর্য হন না। এই খেলায় যে এটাও একটা টেকনিক, তার চেয়ে ভালো আর কোন লোক তা জানবে।

কিন্তু একদিন নীহারবাবুর ধৈর্য টাল খেয়ে গেল। সেদিন সন্ধ্যের প্রায়ান্ধকারে এক-ই ভাবে ছবি তোলার অছিলায় সেই নারীমূর্তির নিকটবর্তী হচ্ছিলেন নীহারবাবু। কিন্তু সেদিন আর মেয়েটি সরে যাচ্ছিল না। ব্যাপার দেখে নীহারবাবু খুব-ই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। সিগনাল তো হলুদ হয়ে আছে, আজ-ই কি তাহলে সবুজ হয়ে যাবে? নীহারবাবু খুব উৎসাহিতভাবে এগোতে লাগলেন, মুখে সে-ই বুলি, “হেই! আপনার কি একটা ছবি তুলতে পারি ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড … শুড আই …”

মেয়েটা কিন্তু নিশ্চল আজ। নীহারবাবুর সাথে তার দূরত্ব যখন হাত দশেক, সেই সময় মেয়েটা কাছে ডাকার ভঙ্গিতে হাত তুলল নীহারবাবুর দিকে, তারপর-ই চলা শুরু করল সেই পাথরগুলোর পিছনদিকে যাওয়ার রাস্তাটায়। অন্য কেউ হলে ডাকার ওই ভঙ্গি দেখে কি করত বলা যায় না, কিন্তু নীহারবাবু যেন আনন্দে সব ভুলে গেলেন। মেয়েটা দেখতে দেখতে পাথরগুলোর পেছনে আড়াল হয়ে গেল, একটু তফাতে চলতে লাগলেন নীহারবাবুও। কিছুক্ষণ বাদে তিনিও পাথরের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখানে যাওয়ার পরেই নীহারবাবুর মন থেকে সমস্ত বোধ-বুদ্ধি-চেতনা-অনুভূতি কেউ যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিল। নিষ্পলক খোলা চোখ আর গলায় ঝোলানো ক্যামেরা নিয়ে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে চলতে লাগলেন। সামনে … সামনে …… কেবল আরও সামনে …

 

পুনশ্চঃ অনেকদিন কোনো খবর না পেয়ে সুলতান একদিন কাক-ভোরে নিজেই খোঁজ নিতে এল নীহারবাবুর। কিন্তু একটা ধুলো-ভর্তি ঘরে বাড়ির কাগজপত্র আর দু’-একটা নিত্য ব্যবহারের টুকিটাকি জিনিস ছাড়া কিছুই সে আর পেল না। নীহারবাবুর খোঁজে সে একটা ঘরে গিয়ে ঢুকলো যেটার দেওয়ালে অনেক ঝুলন্ত ছবি। ছবিগুলোর সব ক’টা-ই প্রায় নষ্ট, কিন্তু তিনটে ছবির অবস্থা অদ্ভুতভাবে সামান্য হলেও ভালো। কেউ যেন বছরে একবার হলেও সেগুলো পরিষ্কার করে। এগুলোর একটা ছবিতে একটা বেঁটে-রোগা লোক, গলায় গামছা আর মুখে অমায়িক হাসি। আরেকটাতে একটা বড়, ঝোলা-কানওয়ালা কালো কুকুর বাটিতে কি যেন খাচ্ছে, আর শেষটাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা শক্তপোক্ত লোক, লম্বা চেহারা আর লোকটার বাঁ গালে একটা সরু অথচ লম্বা কাটা দাগ।

পুলিশে খবর দিলে তার-ই হাঙ্গামা, কাজেই ওসব করে আর তার লাভ নেই। কাগজগুলো এইবেলা সরিয়ে ফেলা ভালো, নাহলে পরের খদ্দের আসলে ঝামেলা হবে। বাড়ি থেকে চুপিসারে বেরিয়ে আসার সময় মার্বেলের নেমপ্লেটের দিকে নজর গেল সুলতানের। একটা তেতো হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। সত্যি-ই … সার্থক নাম বটে এই বাড়িটার!রাতারাতি এইরকম লোক হাওয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রথম তো নয় এটাতে, তার ঠাকুরদার আমল থেকে ঘটে আসছে … এক-ই ছবি যেন বারবার ডেভেলপ হচ্ছে একখানা পুরোনো নেগেটিভ থেকে। তাজ্জব ব্যাপার বটে!

[মতামত ও বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ