26 Sep

বাকি দু’আনা

লিখেছেন:দীপ্তিপুত্র কৌস্তভ


“মাআআআছ….মাআআআছ লাগবে…ভাল মাআআআছ…জ্যান্ত ইলিশ আছে, পাকা রুই আছে, কথা বলা কাতলা আছে….মাআআআছ লাগবে…মাআআআছ।”

শহরাঞ্চলে কিছু কম…কিন্তু গ্রাম বাংলায় মনসা পুজোর প্রচলন খুবই। সেই উপলক্ষেই আজ বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিনের রান্নাপুজো। ভাদ্র মাসের অরন্ধন। বাড়ির সবাইকে নিয়ে সারা রাত ধরে নানারকম রান্না। পরদিন মা মনসাকে নিবেদন করে প্রসাদী খাওয়াদাওয়া। এর পর যা কিছু উৎসব, সবটাই হবে মহালয়ার পর থেকে। সুপর্বে। এই কারণে দেবী দুর্গার আর এক নাম ‘সুপর্বা’। কিন্তু বাড়ির সবাই আর এখন কোথায়! এখন সব একাবোকার সংসার। অভিভাবক স্থানীয় কেউ থাকার মধ্যে শুধুই শাশুড়ি মা। সক্কাল সক্কাল তাই মাছওয়ালার ডাকটা শুনে স্নান করতে করতে বাথরুমের মধ্যেই লাফিয়ে উঠল তনুশ্রী। ইলিশ মাছ আছে! তাহলে ত নিতেই হবে। না হলে বেলা বেড়ে গেলে আর মাছ পাওয়া যাবে না।

শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার পরে এ বাড়িতে সাধারণতঃ বাজার করার কাজটা সৈকতই করে। কিন্তু সৈকত আজ সকাল সকাল অফিসে বেরিয়ে গেছে। তনুশ্রীরও আজ বাজারে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। বাড়িতে তারও একগাদা কাজ! অরন্ধনে মাছের খুব চাহিদা থাকবে বাজারে। বাবার বাড়িতে ছিল না। তনুশ্রীর শ্বশুরবাড়িতে এই অরন্ধন পালনের নিয়ম। কিন্তু আজ বাড়িতে মাছ এনে রাখা হয় নি! তনুশ্রী বাথরুমের দরজা সামান্য ফাঁক করে চিৎকার ছাড়ল, “এই মাআআআছ!!!…. দাঁড়াআআও….আসছিইইই!!” মাছওয়ালার উত্তর ভেসে এল, “কলেজ কাকীমাকে দিয়ে আসছিইইই…”

যাক! নিশ্চিন্ত! একটু ধীরেসুস্থে গা-মাথা মুছে বেরোন যাবে। না হলে এইরকম ভেজা গায়ে তনুশ্রী কি করেই বা যেত বাইরে! জলের ওপরেই ম্যাক্সি পরতে হত। ম্যাক্সির ওপর দিয়ে জল ফুটে উঠত। চুল থেকে জল ঝরতে থাকত। আলুথালু হয়ে যেত সবটা। বাইরের লোকের সামনে অস্বস্তি তো একটা হতই। এখন অন্ততঃ সেটা আর হবে না। শাশুড়ি মা থাকলে তাও খানিকটা সুবিধা হয়। কিন্তু তাঁকেও তো অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে যেতে হয় সকাল সকাল। বেরিয়ে গেছেন তিনিও অনেকক্ষণ আগেই। তনুশ্রী বাথরুম থেকে বেরিয়ে চুল মুছতে মুছতে ঘরে এসে দেখল বাবান এখনও ঘুমে ডুবে আছে। এই ত ক্লাস সেভেন সবে। অথচ এখনই ছোট্ট ছেলেটা কত রাত পর্যন্ত পড়ে! সঙ্গে অলিম্পিয়াডের ক্লাস। আঁকার ক্লাস। থাক। ঘুমোক একটু। মাছটা কিনে নিয়েই তুলে দেবে না হয়।

এখন যেমন বাড়িতে চারজন থাকলেও বেশ বড় পরিবার, ভরাট ভরাট দেখায়, আগে তো তেমনটা ছিল না। পুরনো হলেও খুব পুরনো বাড়ি নয় তনুশ্রীর শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরমশায়েরই তৈরী। পঁচাত্তর সালের শুরুর দিকে। শ্বশুরমশাই নিজে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সঙ্গে বড় মাপের সরকারী ঠিকাদার ছিলেন। দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ি করেছিলেন তখন। একসময় তনুশ্রীর কাকাশ্বশুররাও এখানে ছিলেন। তাছাড়া সৈকতের দিদি। বাড়িটা তখন এতটা ফাঁকা ফাঁকা লাগত না। গত দশ-বারো বছরের মধ্যে অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেল সব। তোয়ালে দিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে তনুশ্রী একটা বড় স্টিলের গামলা হাতে নিচে নামল।

গার্লস কলেজের পার্টটাইম লেকচারার দেবশ্রী সান্যাল। মাছওয়ালার কলেজ কাকীমা। ওবাড়ির দিক থেকেই সাইকেলের ক্যারিয়ারে মাছের কন্টেনার চাপিয়ে হাঁক পাড়তে পাড়তে এদিকে আসছেন রোগা, ডিগডিগে, তালপাতার সেপাই শ্রীযুক্ত পীতাম্বর, তনুশ্রী যাকে মাঝেমাঝে মজা করে বলে, “এই যে পীতাম্বরদা, তুমি নিজেই এত প্রোটিন বেচো, তোমার গায়ে কি একটুও লাগে না?” পীতাম্বর তখন একগাল হেসে উত্তর দেয়, “আমাদের তো গন্ধে গন্ধেই পোষ্টাই হয়ে যায় দিদি। আর খেয়ে কি হবে!” আরও দু’জন মাছ আনে এ পাড়ায়। রাজা আর কার্তিক। কার্তিকের মাছ বড্ড বাসী হয়। চালানি মাছ আনে। তনুশ্রী বেশ কয়েকবার নিয়ে দেখেছে। ঠকে যাওয়ার পরে এখন আর নেয় না। রাজা আর পীতাম্বরের থেকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তনুশ্রীদের গেটের সামনে এসে সাইকেল স্ট্যান্ড করিয়ে পীতাম্বর দাঁড়াল।

“কী গো পীতাম্বরদা, কি মাছ আছে আজ?”

“আজকের দিনে আর অন্য কিই বা থাকবে বলো দিদি? রান্না পুজোর বাজার। পাকা ইলিশ আছে, দেখো। ভাল কাতলা এনেছি। রুই আছে। দেখো, পছন্দসই হবে।” পীতাম্বর হাতে একটা মাঝারি মাপের ইলিশ তুলে দেখাল।

হাতের ইশারায় তনুশ্রী আরও দুটো ইলিশ তুলতে বলল। কত আর লাগে! বাবানকে নিয়ে বাড়ির এই তো চারজন। আর পাড়ার দু’তিনটে বাড়ি। ব্যস! মুড়ো, ল্যাজা নিয়ে গোটা দশ-বারো টুকরো হলেই তো হয়ে যাবে। তনুশ্রী জিজ্ঞেস করল, “ইলিশগুলো কত করে দিচ্ছ গো পীতাম্বরদা?”

“আরে দিদি, তুমি পছন্দ করো তো আগে। দাম নিয়ে সমস্যা হবে না।”

“না, না..ওসবে আর চিঁড়ে ভিজবে না গো দাদা। তারপর কাটিয়ে নিয়ে একগাদা দাম বলবে, ও হওয়ার নয়। দাম বলো। সুবিধামত হলে নেব। না হলে সেই তো বাজারে ছুটতেই হবে।”

পীতাম্বর খুব বিজ্ঞর মত দু চোখ বন্ধ করে বললে,”তোমাদের সঙ্গে কি আর দামাদামির সম্পর্ক দিদি?! যাক গে, কতটা নেবে বলো।”

“কত আর! ওই ছোট ছোট করে কেটে দশ-বারোটা টুকরো হলেই হয়ে যাবে। সর্ষে ইলিশ করে রাখব রান্নাপুজোর জন্য।”

পীতাম্বর সেই একইভাবে চোখ বন্ধ রেখে, ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল, “আর ইলিশের টক?! চারটে টুকরো দিয়ে ইলিশের টক হবে না? না কি শ্বশুরবাড়ির নিয়মে নেই?”

আহা! জিভে জল আনা একটা কথা এরকম ঝট করে বলে দিল পীতাম্বরদা! কতদিন খাওয়া হয় নি ইলিশের টক! তেঁতুলের ক্বাথ আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে বানান রেসিপিটার কথা মনে এলেই শরীরটায় কেমন যেন শিহরণ খেলে যায়। তেঁতুল কি আছে? মনে পড়ল না তনুশ্রীর। দেখতে হবে। না থাকলে আনতে হবে। যাই হোক। খুশীতে ডগমগ হয়ে গেলে চলবে না। তাহলেই সুযোগ বুঝে একগাদা দাম হাঁকবে। তনুশ্রী গম্ভীরভাবে বলল, “সে না হয় ওই ছোট ছোট পনেরো পিসই হল। তুমি দামটা না বলে এত ভ্যানতারা করো কেন?!”

পীতাম্বর দমে যাওয়ার লোক নয়। সে রাস্তায় ঘুরে মাছ বিক্রি করা মানুষ। এইসব কথার সঙ্গে তার পরিচিতি যথেষ্ট। সে বলল, “ঠিক আছে। তাই হবে। কোনটা দেব দেখো। চারটেই দেড় কেজির আছে। আর আমার হাতেরটা এক কেজির একটু বেশী। কোনটা কাটব?”

তনুশ্রী একটু বিরক্ত হয়েই এবার বললে,”কি তাই হবে? তাই হবে মানেটা কি? দামটা তো সেই কখন থেকে বলতে বলছি!”

“বেশ। আজ ইলিশ সাড়ে আট’শো টাকা কিলো যাচ্ছে। তোমাকে আট’শোয় এইটা দিয়ে দিলাম, যাও।” কন্টেনার থেকে একটা দেড় কেজির মাছ তুলে নিয়ে পীতাম্বর বলল, “কেটে দেব তো?” কথাটা বলেই পলিথিন শিট পেতে বঁটি রেডি করতে লাগল।

তনুশ্রী ভালই জানে দরদাম না হওয়া পর্যন্ত পীতাম্বর এইরকম নানা কাণ্ড করতেই থাকবে। সে শান্তভাবে বলল,”কেটে দেবে তো বটেই। কিন্তু সাড়ে সাতশর ওপরে একটা টাকাও বেশী দেব না পীতাম্বরদা। হবে কি?”

কি অবাক কাণ্ড! পীতাম্বর আর একটা কথাও না বলে গম্ভীর মুখে মাছ ওজন করতে বসে গেল। তাহলে কি বাজারে রেট আরও অনেকটা কম যাচ্ছে?! তাহলে কি ইলিশটা পচা-ধচা?! তনুশ্রী খানিক ধন্দে পড়ে গিয়ে বললে,”কি গো! কিছু বললে না যে বড়?! সাড়ে সাতশই দেব কিন্তু…!”

“ঈশ্বরের কৃপা দিদি! ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘর সংসার করা। তোমরা দাম বলবে…আমাদের ক্ষমতা কোথায় বলো যে তার ওপরে কলম চালাই!! এই দেখে নাও…এক কিলো তিনশর একটু বেশীই হচ্ছে।” দাঁড়িপাল্লায় মাছ রেখে তুলে ধরে বলল পীতাম্বর।

তনুশ্রী আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইল,”তাহলে কত দিতে হচ্ছে তোমাকে?”

মনে মনে “এদিকে সাত, ওদিকে তিন, শূন্য কত দাও….” এইসব হিসেবনিকেশ করতে করতে পীতাম্বর বললে, “ওই তো হাজার আটাত্তর হচ্ছে। পঁচাত্তর দিও। রেডি করছি তাহলে।” তনুশ্রী সম্মতিসূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়ল। দামটা যে সাড়ে সাতশ থেকে একটু বেড়ে সাতশ সত্তর হয়ে গেছে সেটা সে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেল, না কি তার এ্যান্টেনা ধরতে পারল না…সেটা বরং উহ্যই থাক।

মাছ কাটা তখন মাঝপথে….হঠাৎ রাস্তায় খুব হালকা, টুং করে একটা শব্দ হল!

শব্দটা শুনে হাতে গামলা ধরে অবাক চোখে তনুশ্রী নিচের দিকে তাকাল। মাছ কাটা থামিয়ে একই দিকে অবাক চোখে তাকাল পীতাম্বরও।

মাছের পেট থেকে বেরিয়ে, বঁটির পাশে রাস্তার ওপরে একটা আংটি পড়েছে! দেখে মনে হচ্ছে রুপোর। তাতে একটা সাদা পাথর বসান! ঝিলিক দিচ্ছে। হীরে না কি?! আংটিটা মাছের পেট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ার পরেই শব্দটা হল।

পীতাম্বর সঙ্গে সঙ্গেই মাছ কাটা থামিয়ে ফেলে আংটিটা তুলে নিল। তারপর গম্ভীর মুখে, রক্তমাখা হাতেই সোজা আংটিটা জামার পকেটে চালান করে দিল।

ব্যাপারটা দেখেই তনুশ্রী হাউমাউ করে উঠল। “এ কি পীতাম্বরদা! ওটা নিয়ে নিলে কেন? ওই আংটিটা নিয়ে নিলে কেন?! বার করো! বার করো এখনই!”

পীতাম্বর যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না, এমনভাবে বললে, “ওটা তো আমারই আংটি দিদি। ঢিলে হয়ে গিয়ে হাত থেকে খুলে যায় মাঝে মাঝে।” তারপর আবার এমনভাবে মাছ কাটতে লাগল যেন কিছুই হয় নি!

তনুশ্রী এই কথাটা শুনে আর পুরো ব্যাপারটা দেখে একেবারে হাঁ হয়ে গেল! আংটিটা মাছের পেট থেকে বেরিয়ে আসতে নিজের চোখে যদিও দেখে নি সে, কিন্তু ওই যে টুং শব্দটা! কিরকম মায়াময় শব্দ একটা। ওটা চিনতে তো ভুল হবে না! এসব হল ধনসম্পদ রাস্তায় পড়ে যাওয়ার শব্দ। শব্দ করে সেই সম্পদ জানান দেয়, আমি পথে পথে ঘুরছি। আমাকে কেউ আশ্রয় দাও। এ আংটি নির্ঘাত কেউ জলে নেমে হারিয়েছিল। তারপর মাছ সেটাকে কোনক্রমে গিলে বসে আছে! ওটা যে পীতাম্বরের আংটি হতেই পারে না, এটা তনুশ্রীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বারবার বলতে লাগল। খানিকক্ষণ ভ্রূ কুঁচকে থেকে সে বললে, “ওটা তোমারই আংটি পীতাম্বরদা?”

“হ্যাঁ…আমারই…”

“তুমি শিওর তো?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। কেন বল তো দিদি?!”

“না, এমনি কিছু না। আমি কিন্তু আসলে একদম শিওর হতে পারছি না। আংটিটা কোন আঙ্গুলে ছিল তোমার শুনি একটু?”

পীতাম্বর বুঝল ব্যাপারটা কোন দিকে যেতে চলেছে। সে ঢোঁক গিলে ফট করে ডান হাতের তর্জনী তুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “এই যে! দিদি! এই আঙ্গুল! এই আঙ্গুল!” তারপরেই বড় করে জিভ কেটে বসল!

তনুশ্রীর নজর খুব তীক্ষ্ণ। জেরা করার ভঙ্গী নিয়ে সে বলল,”কিন্তু তাহলে তোমার আঙ্গুলে আংটির কোন দাগ নেই কেন পীতাম্বরদা? আংটি পরলে তো দাগ হবে! হবেই হবে!”

“ওই যে! বললাম যে ঢিলে হয়। খুলে যায় খালি। তাই দাগ হয় নি হয়ত। দাঁড়াও দিদি। মাছটা আগে কেটে নিই। আরও কত জায়গায় যেতে হবে! দেরী হয়ে যাচ্ছে যে!”

রান্নাপুজো, বাবানকে ঘুম থেকে তোলা, কাজকম্মো, ব্যস্ততা সব শিকেয় উঠল। তনুশ্রী রাস্তায় নেমে এসে বললে,”দাঁড়াও, দাঁড়াও…ওইসব মাছফাছ হবে পরে। আগে এটার ফয়সালা হোক। আংটিটা বার করো তো আগে। দেখি, ওটা কেমন তোমার আংটি।” এখানে বলে রাখা ভাল, তনুশ্রীর কিন্তু পাড়ায় গোঁয়ার বলে পরিচিতি আছে। তার চার ফুট দশ ইঞ্চির, কালো, গাঁট্টাগোট্টা শরীরটা যখন দু পায়ে সমান ভার রেখে কোমরে দু’হাত রেখে ভ্রূ কুঁচকে দাঁড়ায়, সৈকতের মত ডাকাবুকো ছেলেও বেশ সমস্যায় পড়ে যায়।

পীতাম্বর যেন কিছুই শুনতে পায় নি, এমন মুখ করে মাছ কাটতেই থাকল। তনুশ্রীর মাথার আগুন ধিকিধিকি থেকে ক্রমশঃ বাড়ছে। তার কথাকে পাত্তা না দেওয়া! এত সাহস! কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে সে আবার দাবড়ানি দিল, “কি হল! কি বললাম তোমাকে? আংটিটা বার করো। ওঠো! উঠে পড়ো! আঙ্গুলে পরে দেখাও। না হলে আমি এখানে কুরুক্ষেত্র বাঁধাব বলে রাখলাম!”

পীতাম্বর মনে মনে বলল, “কি গেরো!” তারপর, “এই নাও! এই দেখো! জ্বালাতন!” বলতে বলতে পকেট থেকে আংটিটা বার করে কড়ে আঙ্গুলে গলাতেই সেটা খাপে খাপ বসে গেল।

একবার আঙ্গুল। একবার পীতাম্বরের মুখ। দেখে নিয়েই তনুশ্রী হুঙ্কার ছাড়ল,”চালাকি পেয়েছ না কি?! চালাকি পেয়েছ? এখানে কি কোন মুরুখ‍্যু মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে? যে আঙ্গুল দেখালে সে আঙ্গুলে পরো!”

চেঁচামেচি শুনে সামনের বাড়ি থেকে জয়িতা মুখ বাড়াচ্ছে। ওপাশের বাড়ির দোতলা থেকে উঁকি দিচ্ছে পিকলুদা আর তার বৌ সুমিতা। এরা সবাইই মোটামুটি পীতাম্বরের খদ্দের। আশেপাশে তাকিয়ে পীতাম্বর আংটিটা খুলে ডান হাতের তর্জনীতে পরার চেষ্টা করলে। যথারীতি প্রথম গাঁটটিতেই আটকে গেল। আর ঠেলাঠেলি করেও ভেতরে ঢুকল না।

তনুশ্রী মন দিয়ে দেখছিল ব্যাপারটা। পীতাম্বর আংটি বার করে আবার কড়ে আঙ্গুলে চালান করতে গেলে তনুশ্রী বলল, “কি পীতাম্বরদা? তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল?! আংটি তো তোমার নয়। আংটি মাছের পেটে ছিল। মাছ এখন আমার। সুতরাং আংটিও আমার। চটপট আংটিটা দাও দেখি।”

হঠাৎই পীতাম্বর যেন খুব রেগে গেল! মাছ, বঁটি সবকিছু দুড়দাড় করে তুলতে তুলতে বলল, “আমার মাছ বিক্কিরি নেই। ফালতু ক্যাচড়া পোষায় না। আপনি অন্য মাছওয়ালা দেখুন গা।”

তনুশ্রী লাফিয়ে এসে পীতাম্বরের পথ আটকে দাঁড়াল। “অন্য মাছওয়ালা দেখুন গা মানে? এতক্ষণ মাছ দিচ্ছিলে। আর যেই মাছের পেট থেকে হীরের আংটি বেরোল, অমনি মাছ না কি বিক্কিরি নেই!! গলার সুর বদলে আবার আপনি, আজ্ঞে করা হচ্ছে। আংটি মেরে দেওয়ার ধান্ধা!! ওসব গল্প অন্য জায়গায় হবে কাকা! এইখানেই দাঁড়াবে। আমি পাড়ার লোকজনকে ডাকি আগে। এই জয়তী, জয়তী!…দেখবি আয়, কি অবস্থা!”

যা বোঝা গেল…সবাই ঘরে বসে কান পেতেই ছিল এদিকে। শুনছিল সব ঝামেলাবাজি। এবারে ডাকাডাকি শুনে বেরিয়ে এল কয়েকজন। জয়তীকে নাম ধরে ডাকা হয়েছে। সুতরাং, তাকে বেরোতেই হল। পিকলু, সুমিতা, পলির মা এরা সব এগিয়ে এল।

জয়িতা বলল, “কি হয়েছে রে তানু? কি ব্যাপার?”

সবাই জড়ো হয়ে গেছে। তনুশ্রী খুবই উত্তেজিত। হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে, চোখ মুখ ঘুরিয়ে বলতে লাগল, “আরে দেখ না! আমি এই ইলিশ মাছটা নিয়েছি। আজ রান্নাপুজোর জন্য। তা কি কাণ্ড ভাই কি বলব! পেট কাটতেই হীরের আংটি! এসব তো গল্পকথাতেই শুনেছি। মাছের পেটে এতদিন তো মাছের ডিমই পেয়েছি। গুপ্তধন, মনিমানিক‍্য পাওয়া তো দূর, জীবনে চোখেই তো দেখি নি! আর সেখানে গোটা একটা হীরের আংটি রে ভাই! অথচ কি অবস্থা ভাব…আংটিটা পড়েছে কি পড়ে নি, উনি সোজা তুলে পকেটে চালান করে দিলেন! কি বলবি বল! আবার বলে কি না, ওটা ওনার আংটি। হুঁঃ! হাতে দাগ নেই কিছু না! তাও শোন…কোন আঙ্গুলে পরে জিজ্ঞেস করলাম। তর্জনী আঙ্গুল দেখিয়েছে। তারপর পরতে বলায় আংটি পরছে কড়ে আঙ্গুলে! কি অবস্থা একবার ভাব! চেপে ধরলাম। এখন দেখ! তর্জনীতে তো আর হচ্ছেই না। আবার তেজ কত?! বলে কি, মাছ দেবে না!” একটানা এতগুলো কথা বলে তনুশ্রী আবার পীতাম্বরের দিকে ঘুরে বললে,”এই যে কাকা! মাছ দেবে না তো দেবে না। আমার আংটি এখানে ফেলে তারপর যেখানে ইচ্ছে যাবে।”

পীতাম্বর এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। সে-ও জীবনে কোনদিন এমন অবাক করা ব্যাপার দেখে নি! সে বেশ বুঝল এরকম চলতে থাকলে তার পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা হাতছাড়া হয়ে গেল বলে। এখন সে-ও মরিয়া হয়ে একটু তেড়ে উঠে বললে, “কেন দেব শুনি! হ্যাঁ?! এ কি আপনার মাছ না কি? কক্ষণও না! এ অন্যজনের মাছ। আমি কেটে রেডি করছিলাম। আপনি কি টাকা দিয়েছেন এখনও আমাকে? ওই তো আপনার হাতে ধরা গামলা আর টাকা। এটা আপনার মাছ কেমন করে হয়ে যায়?!”

ওবাড়ির পিকলু এতক্ষণ কিছু বলে নি। এবার তার বুদ্ধি কিছু খুলল। সে তেরিয়া হয়ে বললে, “তাহলে তুমি তানুকে দাঁড় করিয়ে রেখে অন্য লোকের মাছ এখানে বসে কাটছিলেই বা কোন সাহসে?! ওসব ছাড়ো। এখন বেকায়দায় পড়ে বাজে কথা বললে তো হবে না।”

পীতাম্বর চেতে উঠে বলল, “তা নিক না উনি। কে বারণ করেছে নিতে? মাছ বেচতেই তো এসেছি! মাছ কাটছিলামই তো! উনিই ত মাছ না নিয়ে আংটি আংটি করে হেদিয়ে গেলেন! দরদাম সব সারলেন। তারপর থেকে তো খালি ঝগড়া করে চলেছেন!”

পিকলু বললে, “বাঃ! ভেরি গুড! দরদাম হয়ে গেছে মানেই তো তুমি তানুর জন্যই মাছ কাটছিলে বাপু! ওই মাছ তাহলে তানুরই। এই পাড়ার আংটি অন্য কোথাও যায় কিভাবে আমি একবার দেখছি।”

তনুশ্রী কথাটা শুনে ভারী খুশী হতে হতে বেশ ভাবনায় পড়ে গেল। পাড়ার আংটি! কথাটা কেমন একটু অন্যরকম শোনাল না?! আংটি আবার পাড়ার হয় না কি? তার মানে কি এরাও দখল নিতে চাইছে? এই হয়। বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়লে এমন করেই দশ ভূতে লুটেপুটে নিতে চায়। এই যে জয়িতা! এখন মুখে রা-টি কাড়ছে না। অথচ ওর ঠাকুমার বাতের ওষুধের জন্য তনুশ্রীই তো রাস্তা চিনে, রিকশা ভাড়া দিয়ে নিয়ে গেছিল কবিরাজের বাড়িতে। সেই কবিরাজের ওষুধেই তো ঠাকুমা এখন হেঁটে চলে বেড়াচ্ছেন! আর এই পিকলুদা কি না সৈকতের ছোটবেলার বন্ধু। সৈকতের সঙ্গে এই পিকলুদাই তো সাবিরের রেজালা, অনাদির মোগলাই, গোলবাড়ির কষা মাংস আর সূর্য্য সেন স্ট্রিটের তেলেভাজা খেয়ে খেয়ে বেড়াত। সে তো সৈকতেরই পয়সায়। অথচ এখন কি না তার বৌ-এর প্রাপ্য জিনিষটা পাড়ার হয়ে গেল! এইজন্য মানুষের উপকার করতে নেই!

“ওরে বাবা! চাঁদের হাট বসিয়ে দিয়েছিস যে রে সবাই মিলে! কী ব্যাপার?! বিশ্বকর্মা পুজোয় বড় কোন ফিস্টির প্ল্যান হচ্ছে না কি? এ্যাঁ?!”

পিকলুদের চারটে বাড়ির পরের বাড়ির গণেশবাবু হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছেন। তনুশ্রী, সৈকতরা গণেশকাকা বলে। তনুশ্রীর শ্বশুরমশায়ের ভারী হলায়-গলায় বন্ধু ছিলেন এককালে। পাড়ার একজন অভিভাবকস্থানীয় মানুষ গণেশকাকা। সবাই মিলে তাঁকে দাঁড় করাল। পলির মা তাঁর কাছাকাছি বয়সী প্রায়। তিনিই সবটা বলে ইতি টানলেন, “দেখুন দেখি। ভাল সমস্যা হল তো!”

গণেশকাকার শান্ত, সৌম্য ধরণের চেহারা হলে কি হবে, কথা খুব ট্যাঁকস ট্যাঁকস। দেখতে অনেকটা প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মত। তিনি সব শুনে বললেন ,”বটে!” তারপর পীতাম্বরের কাছে এসে বললেন, “কি রে! পীতাম্বর! আর তো মাছ বেচে খেতে হবে না রে, হ্যাঁ?! এবার তো একেবারে ভেড়ি কিনে ফেলবি, না কি?! মাছের পেটে হীরের আংটি?! বাপের কালে শুনি নি! রাজরাজড়াদের গপ্পে হত এককালে। ওই সামনের কলে ধুয়ে নিয়ে এসে দেখা তো দেখি একবার! চক্ষু সার্থক করি।”

পীতাম্বরের কিছু করার নেই। পাড়ার লোক সব এক হয়েছে। “হ্যাঁ, এইবার সবাইকে দেখাও…সবাইকে কৈফেত দাও…ভারী জ্বালা হল…” এইসব বলে গজগজ করতে করতে সে গিয়ে কল খুলে আংটি ধুয়ে নিয়ে এসে গণেশকাকার হাতে দিলে। তিনি আংটিটা তুলে উপর দিকে আলোয় ধরে, চোখ সরু করে কিছুক্ষণ দেখলেন। দেখে বললেন, “বাবা রে! পীতাম্বর! এ করেছিস কি?! এ ত সাত রাজার ধন এক মাণিক পেয়ে গেছিস রে, হ্যাঁ! ভাগ্য বটে তোর! ভাবলেও হিংসে হয়! বাজারে তো এর কুড়ির মত দাম যাচ্ছে রে! আর আংটিটা নিয়ে ধর তিরিশ!”

এতক্ষণে সবার মনে পড়ল। আরে! গণেশকাকা তো নিজেই জহুরী! তাঁদের পারিবারিক সোনার কারবার। যদিও পরিবারে তিনিই একমাত্র ব্ল্যাকশিপ। ব্যবসা ছেড়ে সরকারী চাকরী করেছেন। এখন রিটায়ার্ড। কিন্তু জহুরীর পাকা চোখ দুটো যাবে কোথায়?! তারা তো সঙ্গেই আছে। তনুশ্রী তড়বড় করে উঠে জিজ্ঞাসা করল, “বলেন কি গণেশকাকা! কুড়িইইই হাজাআআর!! হ্যাঁ, তা তো হবেই। হীরে আফটার অল! যত ছোটই হোক, দাম তো একটা আছেই।”

“কুড়ি টাকা রে মা, কুড়ি টাকা!! হাজার, লাখ, কোটি কিছুই না। দুই এর পাশে একটাই শূন্য বসবে। আর আংটিটা নিয়ে টোটাল তিরিশ টাকা ধর। এ হল মেলাতলার ছেলেভুলোন ঝুটো আংটি। হুঁঃ! কুড়ি টাকার গুপ্তধন নিয়ে কুড়ি ঘন্টা কচলাকচলি!! নাও, তোমাদের ধনসম্পত্তি। কে নেবে নাও এবার।” গণেশকাকা নির্লিপ্ত ভাবে হাত বাড়িয়ে বলে দিলেন।

সবাই হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারুর মুখ থেকে বাক‍্যি সরে না আর। শুধু পিকলু একবার বলল, “এ বাবা! এটা নকল আংটি?! তুমি শিওর গণেশকাকা?!”

গণেশকাকা ভারী বিরক্ত হলেন দেখা গেল! “এটুকুই যদি না শিওর হলাম, এতদিন ধরে তাহলে আর কি রক্ত বওয়ালাম শরীরে আর কিই বা শিখলাম বাপ ঠাকুর্দার কাছ থেকে? যা না। গিয়ে শ্যামা স্যাকরার দোকান থেকে টেস্ট করিয়ে নিয়ে আয় গা। কুড়িটা টাকা যাবে। আংটির দামও উঠবে না। একবারে পাতি মাল এসব। ইলিশটার পছন্দ খুব খারাপ দেখা যাচ্ছে!” বলে আংটিটা গণেশকাকা গুঁজে দিলেন পিকলুর হাতে।

পিকলু ভাবছিল, আংটিটা যদি পীতাম্বরের থেকে নিয়ে, কোন রকমে বেচে দেওয়া যায়! আর টাকাটা যদি এই কয়েকজনের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়! খুব ভাল হয় তাহলে। পাড়ার লোক হয়ে পাড়ার লোকের উপকারে এল। বিপদে পাশে এসে দাঁড়াল! তাও আবার বৌ সমেত। হাজার পাঁচেক তো তার পাওনা হয়ই। কিন্তু গণেশকাকা তো আশায় পুরো এক ঘড়া জল ঢেলে দিল। পিকলু বলল,”ধুর! এ কি আমি পেয়েছি না কি যে আমাকে দিচ্ছ? আমি তো গণ্ডগোল হচ্ছে দেখে এলুম। তবে যাই বলো….মাছের পেট থেকে আংটি পাওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু জব্বর! এই তানু ডাকল, তাই এলাম। নে তানু। তোর আংটি তুইই ধর। আমি চলি। এই সুমি…চলো, চলো।” পিকলু আংটিটা হতভম্ব তনুশ্রীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে, সুমিতাকে নিয়ে চলে গেল। পলির মা তাদের সঙ্গেই চলে গেলেন। “এই তানু, আসি রে, এক ঢিপি কাজ ফেলে এসেছি। পরে কথা হবে…”, বলে টুক করে ঘরে ঢুকে গেল জয়িতাও।

তনুশ্রী এতক্ষণ ভাবছিল, আংটি থেকে হীরেটা খুলিয়ে নিয়ে একটা নাকছাবি করাবে। গত দশ-বারো বছর ধরে একটা হীরের নাকছাবির খুব ইচ্ছে। সৈকতকে বলেওছে বারকয়েক। পাত্তা দেয় নি সৈকত বিশেষ। আংটিটা পেলে এবারে হয়ত হয়েই যেত। কিন্তু সে গুড়ে তো দেখা যাচ্ছে মোটা দানার বালি! সবাইকে চলে যেতে দেখে তনুশ্রী খুব বিরক্ত হয়ে বলল, “ও আংটি আমার লাগবে না। সক্কালবেলায় মাথাই নষ্ট! ও তুমিই রেখে দাও পীতাম্বরদা।” বলে আংটিটা পীতাম্বরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,”আর আমার মাছটা কি দেবে? না কি দেবে না?! আর কতক্ষণ গামলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকব?!”

পীতাম্বর গোমড়া মুখে আংটিটা পকেটে ভরে বলল, “আমি কি বলেছি না কি যে দেব না? তুমিই তো গোলমাল করে এমন একটা হুল্লোড় বাঁধালে যে মাথা গরম হয়ে গেল…”

গণেশকাকা বললেন,”যা পারিস কর বাপু। মাছ দে। আংটি দে। যা ইচ্ছে কর। আমি চললাম। হ্যাঁ, ভাল কথা। পীতাম্বরকে দেখে মনে পড়ল। হ্যাঁ রে পীতাম্বর, তোর খুব তেল হয়েছে না রে?! আগে পাড়ায় ঢুকে বাড়িতে কলিং বেল বাজিয়ে ডাকতিস। এখন যে আর ডাকিস না বড়?! তোর কাকিমা তো এখনও সিঁথিতে সিঁদুর পরে বলেই শুনেছি। মাছও তো ভালোই খাচ্ছে।”

পীতাম্বর এতক্ষণ ভাবছিল আংটিটা পেলে গরীবের ঘরে চাঁদের আলো হবে খানিকটা। মেয়েটা বড় হচ্ছে দিনদিন। ক্লাস ফোর হয়ে গেল। পড়াশোনাটা করাতে তো হবে। বিয়ের জন্য চিন্তাও অনেকটাই কমবে। যদিও সরকারী স্কিম আছে কয়েকটা। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। তা চাঁদের আলো তো এসেও চলেই গেল। অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়! যাক গে! ঝুটা আংটিই মেয়েটাকে দেবেখন। আনন্দ পাবে মেয়েটা। মাছের পেট থেকে গুপ্তধন বেরোবার গল্পটাও তো কম মজাদার নয়! সে ভারী হতাশ হয়ে বললে, “আচ্ছা। কাল থেকে বেল মারবখন।”

গণেশকাকা রেগে গিয়ে বললেন,”কেন রে হতভাগা?! আজকের দিনটা কি দিন নয়? আজ একবার বেল মারতে কি তোমার হাতে বাতের ব্যাথা চাগাড় মারছে?! এখানে দেওয়া হলে একবার বাড়িতে যেও দয়া করে। কাকীমা সকাল থেকে হা-পিত‍্যেশ করে বসে আছে মাছের আশায়। আমি যাই গা। মাছ কিনতেই যাচ্ছিলাম। এখন ধর্মর চায়ের দোকান ডাকছে। চলি রে তানু-মা। সবাই ভাল আছে তো বাড়িতে?বৌদি? নাতি? সব ভাল তো?”

তনুশ্রী বড় করে মাথা নেড়ে বললে, “হ্যাঁ কাকা। এই চলে যাচ্ছে নানারকম করে….”

ভালোই রোদ উঠে গেছে কড়কড়ে। রায়দের বাড়ির আমগাছটার পিছনে এখন সূর্য। মাঝেমাঝেই বেশ গরম একটা হাওয়া ছাড়ছে। লু এর মত। কিন্তু লু নয়। তনুশ্রীকে মাছ দেওয়া হয়ে গেলে পীতাম্বর জামার হাতায় ঘাম মুছতে মুছতে, সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে গণেশকাকার বাড়িতে এসে বেল বাজাল।

মিনিট খানেকের মধ্যে দরজাটা খুলে গেল। গণেশকাকা মুখ বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখে নিয়ে বললেন, “মাছ লাগবে না। আজ বেশীক্ষণ ঘোরাঘুরি করিস না। আংটিটা সাবধানে রাখিস। ঈশ্বরের দান! আর মাছের ভেড়িটা কিনলে আমাকে রোজ ফ্রিতে মাছ খাইয়ে যাবি কেমন?! মনে থাকে যেন। যা, যা। পালা! কেউ দেখে ফেললে বিপদ।” দরজার পাল্লাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।

পীতাম্বরের চোখ আবার বড় বড়!! সে একবার বুকপকেটে হাত দিল। তারপরেই গলা তুলে চেঁচাল, “মাআআআছ….মাআআআছ লাগবে…ভাল মাআআআছ…জ্যান্ত ইলিশ আছে, পাকা রুই আছে, কথা বলা কাতলা আছে….মাআআআছ লাগবে…মাআআআছ।”

[মতামত ও বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2022 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ