20 Oct

কিস্তিমাত

লিখেছেন:দেবাশিস মজুমদার


গল্পের সময়ের গল্প

অত ভাবার কিছু নেই দাদা, নিয়ে নিন — দুধেল আলোয় ভাসা কাউন্টারে টাইট ফিটিংস কালো গেঞ্জির ওপর দিয়ে ক্লিভেজ দেখানো বাচ্চা মেয়েটার মিষ্টি হাসি যেন ওর বক্তব্যকেই সমর্থন করল। তবু নিজেকে লোভের কোপ থেকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরে চন্দন নিজেই যুক্তি জুড়লেন– বুঝলাম খুব ভাল, কিন্তু দামটাও যে খুব ভাল। এখন যে এতটা বাজেট পারমিট করবে না।

মেয়েটাও নাছোড়বান্দা, — ‘এত কম বাজেটে ডবল সিম কলিং ট্যাব পাবেন না স্যার।’ কথাগুলো বলতে বলতেই আর একটু এগিয়ে এসে ছোট গোল বুক দুটোকে কাউন্টারের কাচের শোকেসে যেন সাজিয়ে ধরল। হাতে ধরা কলিং ট্যাবটার প্যাকিং বাক্সের পেছনে খুদে খুদে অক্ষরের ফিচার্সগুলো পড়িয়ে দেওয়ার জন্যে যতটা হাতটা এগিয়ে দিল, ঠিক ততটাই যেন বুকের ভাঁজের  ভেতরটাও যেন দেখিয়ে দিল। অনেকটা ভেতরে একটা কালো ছড়ানো মিষ্টি জরুলও চোখে পড়ল চন্দনের। চল্লিশ ছুঁই ছুঁই চন্দনের চোখের সামনে ক্লিভেজ স্তরে স্তরে খুলে গেলে ওই বা কী করে! চোখ তো আর বন্ধ করতে পারে না। কানটা সামান্য একটু গরম হয়। কিন্তু এই টাইট ব্রায়ের মধ্যে  ধরে রাখা দুটি গোল বুক আর ফেসপ্যাক ঠাসা এই ময়দা মামণিরা ঠিক জানে ক্লিভেজের ভাঁজে চোখ টেনে কান মুলে কিভাবে মাথা গলিয়ে দিতে হয় কেনারামবাবুটিকে বেচারামের গলিতে।

–তাহলে বিল করি স্যার?

উত্তর কী দেবে চন্দন! হ্যাঁ, না-এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে!

ট্যাব কেনার শখ বহুদিনের। চন্দনের অফিসের সুনন্দা তো প্রায়ই বলে, — ‘কিনে ফেলুন চন্দনদা। সবাই কিনছে এখন।’

শুধু বাড়িতে সেঁজুতির কথা ভাবলেই পেটের ভেতরটা গুড়গুড় করে। নিয়ে গেলেই চেঁচাবে, –‘আবার একটা নতুন উপদ্রব আনলে? মেয়েটার কথা ভেবে আমিই একটা ফোন কিনলাম না! শেষে বাপ নিয়ে এল ট্যাব! মেয়েটার ভবিষ্যৎটা নষ্ট না করলেই হচ্ছিল না।’

সাত পাঁচের দ্বিধাতেই সাদা আলোর নীচে কালো বুকের দিকে তাকিয়ে খাবি খাচ্চে চন্দন। মহা ঝামেলায় পড়া গেছে। মেয়েটার দিকে তাকালেই বুকদুটোর দিকে চোখ আটকাচ্ছে। আর তখন স্পষ্ট করে নাও করা যাচ্ছে না। চন্দন দেখেছে এই মল কালচারের আধুনিক দুনিয়ায় মাঝবয়সী পুরুষ দেখলেই মালিকরা সব সেলস্‌ গার্লসগুলোকে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যেতে দেয়। আর ওরাও যেন বুক ফুলিয়ে এগিয়ে আসে। বুকের কাছে বিল বইটা টেনে নিয়েছে মেয়েটা। হাতের নেইল পলিশ চকচক করছে। বাঁ হাতে একটা ট্যাটু। খুব সম্ভব শিবের মুখ। ডানহাতে কনুইয়ের নীচে ট্যাটুতে

লেখা, আই লাভ য়্যু। গলা একটু নামিয়ে ভুরুর ওপরে লাগানো ডায়মন্ড রিংটা নাড়িয়ে বলল, — ‘দাদা, স্রেফ ওয়ান থাউজেন্ড ফাইভ হান্ড্রেড ফর টোয়েন্টি ফোর মান্থস। বউদিও খুব খুশি হবেন। আর এখন সামান্য কিছু ডাউন পেমেন্ট।’

হতভম্ব চন্দন বলল, — ‘মানে?’

–‘মানে খুব ইজি। বুক বাজিয়ে কিনুন, বুক বাজিয়ে বাড়ি ঢুকুন, বুক বাজিয়ে ব্যবহার করুন।’

–‘বুঝলাম। ই এম আই পোস্ট ডেটেড চেক দিতে হবে।’

–‘না না, ওসব ব্যাকডেটেড দাদা। এখন ওসব চলে না। এখন আমাদের পাশে আছে ইমপিরিয়াল ফিন্যান্স। সব হেডেক ওদের। ওদের ওখানে আকাউন্ট খুলুন। আপনি বুক বাজিয়ে ঘুরুন।নির্ভয়ে ।বাকিটা ওরাই দেখবে।’

–‘কিন্তু ই এম আই ফেল করলে?’

মেয়েটা খুব হাসছে, হাসির তালে তালে টাইট ব্রেসিয়ারে আটকানো বুক দুটো কাঁপছে। আর ওটা দেখতে দেখতে চন্দনের ভেতরটাও কে যেন কাঁপাচ্ছে। কাউন্টারের অন্যপ্রান্তে পেটমোটা বেলুনের মতো একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল, — ‘আধার, প্যান সব ফোনেই আছে তো দাদা?’

চন্দন বাধা দিয়ে বলল, — ‘না, ফোনে নেই। আমার সঙ্গে আছে। দিচ্ছি।’

চন্দন ব্যাগ খুলে সব দিতে দিতে নিজের মনেই বলল, –‘এর নাম বুক বাজিয়ে ব্যবসা।’ এই ফাঁদেই যে সবাই আটকায় বুঝে গেল। কিন্তু এই বুক বাজানোর আসল রহস্যটা কাউকে মুখ ফুটে বলতেও পারবে না। কারণ কে কী ভাববে ঠিক আছে? বন্ধুদের হয়তো বা বলল, কিন্তু তারাই হয়তো আড়ালে বলবে আর হাসবে, ‘দেখো এই বয়সে কী রকম বুক বাজিয়ে বাচ্চা মেয়েদের বুক দ্যাখে!!

মেয়েদের বুক দেখা ওর যে খুব পুরনো অভ্যেস তা নয় কিন্তু ও লক্ষ্য করে দেখেছে অনেকের বুকই যেন ওর সামনে এসে বাজতে থাকে বা খুলে যায়। অফিসের পাশের টেবিলে সুনন্দাও ফাইল সরাতে গিয়ে বা ফাইল দিতে গিয়ে শাড়ির ফাঁক দিয়ে ওকেই যেন বুক দেখায়।

–‘আরও দেখবেন? না এবার…’ মেয়েটার হঠাৎ ধাক্কা মারা কথায় সম্বিত ফিরে চন্দন মেয়েটার বুক থেকে চোখ সরিয়ে নিজের ব্যাগে ঢোকাল।

— ‘তাহলে বিল প্রিন্ট করছি দাদা।’

–‘না মানে, অতগুলো টাকা! একটু ভয় লাগছে।’

–‘ধুস! আপনি না!’ হাসতে হাসতে মেয়েটা কাউন্টারের কাচের টেবিলে বুক দুটোকে ছড়িয়ে রেখে গড়িয়ে পড়ল, –‘সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের চাকুরে একটা বত্রিশ হাজারের ট্যাবে ভয় লাগলে এরপর লোকে হাসবে।’

–‘হ্যাঁ, একেবারে বত্রিশ হয়তো নয়। কিন্তু অতগুলো মাস যদি দিতে না পারি?’ কথাটা বলতে বলতে চন্দনের চোখ আটকে গেল মেয়েটার হাতে। আমেরিকান ডায়মন্ড পরা আঙ্গুলগুলো ট্যাবটা বাক্স থেকে বের করে কেবল ক্লিভেজের মাঝে রাখছে আর তুলছে। বুকের লুকিয়ে থাকা জরুলটা উঁকি দিয়েই আবার সরে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টিকে এবার ওর দৃষ্টিতে টেনে এনে মেয়েটি ঠোঁটটা কামড়ে ধরে বলল, –‘এটাই চলছে দাদা এখন। এটাই স্টাইল। একটু খেয়াল করুন ভাল করে, বাড়ি গাড়ি ফোন গয়না সব…সব বুক বাজিয়ে কিনছে মানুষ। স্রেফ ই এম আইতে।’

এরপর ফটাফট সব হল। কাগজ বুঝে, প্যাকেট হাতে নিয়ে মধ্যচিত্তে বেরোবার সময় চন্দন মেয়েটিকে বলল, –‘কোনও প্রবলেম হলে কিন্তু তোমাকে, সরি, আপনাকেই ধরব।’

চোখের কোণের হাসি বুকের দিকে নামিয়ে মেয়েটি বলল, — ‘অলওয়েজ। বিলের ডানদিকের নম্বরটা আমার। যে কোনও সময় করবেন। কিন্তু আমি বলছি, যে ট্যাব আপনি নিলেন তা বুক বাজিয়ে ব্যবহার করতে পারবেন।’

চন্দনের মনে মনে কোথাও একটা বিশ্বাস এসে গেছে। চোখের চাউনি মেয়েটার বুকের গেঞ্জির অক্ষরের দিকে এনে বলল, –‘ওখানেই তো লিখেই রেখেছো,—কল মি এনি টাইম অ্যান্ড  ফ্রিডম ফর  অদশ  টাইম।’

–‘ওফ্‌ আপনি না! একেবারে যা তা!’

একটা অদ্ভুত দৃষ্টি চন্দনের বুকটা যেন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে গেল।

–‘এনি টাইম ফোন করবেন।’

–‘অবশ্যই’ কথাটা ছুঁড়ে দিয়ে প্যাকেট হাতে দোকানের বাইরে নিজেকে টেনে বের করে আনল চন্দন। কানের পেছন দিয়ে তখনও একটা তাপ বেরোচ্ছে। কারণ তখনই মনে হচ্ছে বাড়ি ফিরে সেঁজুতিকে বুক বাজিয়ে বলবে কেমন করে!!!

বাড়ি ফিরে সেঁজুতিকে বলার সুযোগের অপেক্ষার আগেই সেঁজুতি বলল, — ‘এই জানো আজ কী হয়েছে? রোমির বান্ধবী অপালার মাকে তোমার মনে আছে? তোমাকে খুব চন্দনদা চন্দনদা করত।’ মেয়ের বান্ধবীর মায়েদের অতটা খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস চন্দনের কোনওকালেই নেই। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে খুব মনে আছে তার স্লিভলেস ব্লাউজের জন্যে। আর পেটের শাড়ি অনেকটা নামিয়ে পরতেন। ভীষণ মড ছিলেন পোশাকে-আশাকে আর কথাবার্তায়। মনের কথা মনেই চেপে বলল, — ‘কী জানি মনে পড়ছে না। দেখলে মনে পড়বে হয়তো।’

চায়ের কাপটা বরের দিকে এগিয়ে দিয়ে সেঁজুতি বলল, — ‘রোজ যাব যাব করেও যাওয়া হচ্ছিল না। আজ চলেই গেলাম।’

চায়ে চুমুক দিয়ে জিভটা যেন পুড়ে গেল চন্দনের। সামলে নিয়ে বলল, –‘কোথায় গো?’

–‘আর বোলো না, শিরীষতলার মুখে যে নতুন শপিংমলটা করেছে না স্মার্ট বাজার। ওখানে। প্রাক্‌ পুজা সেল চলছে তো ফিফটি পার্সেন্ট অফ। আর সব ফার্নিচারের ওপর সিক্সটি ফাইভ পার্সেন্ট অফ্‌, ভাবা যায়? কী সুন্দর সুন্দর সব বেতের চেয়ার টেবিল! ডিজাইনগুলো দেখলেই মন ভরে যাবে।

এই শোনও না, রাগ করো না। তোমাকে জিজ্ঞেস না করেই না একটা সেট বুক করে এসেছি। কাল ডেলিভারি দেবে। রাগারাগি চেঁচামেচি কোরো না। রোমি পড়ছে ওঘরে। আর শোনও না একবারে দিতে হবে না, মাসে মাসে কিস্তিতে কিস্তিতে। ই এম আই। দু বছর ধরে। গায়েও লাগবে না আমাদের। ডাইনিং-এর সোফাগুলোর যা অবস্থা…’

সেঁজুতির শেষ কথাগুলো আর কানেই ঢুকছে না চন্দনের। শুধু মুখে বলল, –‘কিনেই যখন ফেলেছ। বুক বাজিয়ে ব্যবহার করো।’

–‘একটা অসভ্য। এই বয়সে বাজে কথা মুখে আটকায় না। মেয়ে পাশের ঘরে। এক মিনিট আসছি…’ বলে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে সেঁজুতি বলল, –‘আজ সব কথা বলে এসেছি। এরপর তোমার একটা ফোন নেব, তারপর আমারও।’

শেষের কথাগুলো যেন বুকেই বাজল চন্দনের। যদিও এ বাজনা মেয়েটার বুকের বাজনার মতো নয়।

সকালের দিকে ঘুম অনেকক্ষণই ভেঙেছিল চন্দনের। ঘুম ভাঙার পরেও বিছানায় গড়ানো চন্দনের একটা পুরনো অভ্যাস। পচার মা ডাইনিং ঝাঁট দিচ্ছে। বউ আর পচার মায়ের কথা কানে আসছে। মনে পড়ল নতুন কেনা ট্যাবটা প্যাকেট বন্দি হয়ে অফিসের ব্যাগেই পড়ে রয়েছে। কাল রাতের চাপ এখনও কাটেনি। পরকীয়া প্রেমের মতন ট্যাবের প্যাকেটটা লুকিয়েই রেখেছে বউয়ের চোখের আড়ালে। আধো ঘুমেই মনে পড়ল কালো গেঞ্জি পরা মেয়েটার কথা। দুষ্টু দুষ্টু। কী মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে বুক দেখিয়ে গছিয়ে দিল ট্যাবটা। ওদের বেচারাম শক্তিকে ওরা বুকে আর মুখেই ধরে রাখে।

হঠাৎ পচার মার একটা কথা কানে এল, –‘তাহলে বউদি নিয়েই নিই বলো?’

–‘অবশ্যই নেবে। একবারে তো দিতে হবে না। ফিনান্সে নেবে। এখন এটাই তো দস্তুর। দাঁড়াও দাঁড়াও কোম্পানীর নামটা কী যেন! হ্যাঁ, মনে পড়েছে। ইম্পিরিয়াল ফিনান্স। কাল আমিও একটা সোফা কিনলাম ওদের থেকে।’

–”ওমা বউদি সোফা কিনেছ? খুব ভাল করেছ গো। আমি তো এসে থেকেই দেখছি ওই পুরনো সোফাটা। কাত হয়ে গেছে।’

–‘হ্যাঁ, ওটা আমার বিয়ের সময়কার।’

–‘হ্যাঁ গো বউদি ওই মাসে মাসের স্কিমে কিনলে?’

–‘ঠিক বলেছ। মাসিক গো। প্রতি মাসে মাসে। ওই কোম্পানিটা ওভাবেই নিচ্ছে।’

–‘বুঝেছি বউদি। ওটাকে ওরা যেন কী বলে!’

–‘ই এম আই। ইচ্ছে মতন আইটেম, ইচ্ছে মতন আইডিয়া।’

–‘জানি। ছেলে বলছিল। ছেলে তো ওভাবেই বাইক আর বউমার দুটো সোনার হার কিনেছে। ফ্রিজটা এভাবে হয়ে যাবে বলো?’

–‘একদম নিয়ে নাও। ছেলেকে বলো, কাকী ফোন করতে বলেছে। কোম্পানির নাম বলে দেবে।’

–‘বলব বউদি, তবে একটাই ঝামেলা। জানো বউদি?’

–‘কী ঝামেলা গো?’

–‘যা টাকা মাসে মাসে চাইছে আমার আর ছেলের সব টাকা যোগ করলে রোজগারের সব টাকা তো ওখানেই চলে যাবে।’

–‘না না, ওসব নিয়ে ভেবো না। ওরাই ধার মেটাবার বুদ্ধি বাতলে দেবে।’

–‘বউদি সেই কথাটাই একটু ছেলেকে বুঝিয়ে দিও তো। ও ভয়ে মরছে।’

–‘হ্যাঁ, ওকে ফোন করতে বলো।’ বলে ঘরের দিকে আসবার জন্যে উঠে দাঁড়ায় সেঁজুতি, — ‘আমার ফোনটাও বদলাতে হবে। কী সব উল্টোপাল্টা মেসেজ ঢুকছে দেখছি। কে আবার তিন হাজার টাকা পেমেন্ট করেছে ইম্পেরিয়াল ফিনান্সকে।’

–‘আমি আমি।’ ঘুম জড়ানো গলায় ডাহা একটা সত্যি কথা বলেই মিথ্যে জুড়তে শুরু করল চন্দন। –‘কাল অফিসে গ্লোবাল ফোন কোম্পানি হ্যাপি পুজা উইক পালন করেছে। সেখানে অফিস থেকে প্রত্যেক স্টাফকে একটা করে মোবাইল দিয়েছে। দিয়েছে বলা ভুল। ওরা কিছুটা। আমরা কিছুটা। কাল আর বলা হয়নি।’

–‘ওমা তাই? বলোনি তো? ভাল করেছ গো। খুব ভাল কাজ করেছ। ওই বোতাম টেপা ফোনে হয় নাকি! খুব ভাল করেছ।’

–‘ই এম আই কাটবে সামনের মাস থেকে। তখন বুঝবে।’ কথাগুলো ছুঁড়ে বালিশে মাথা গুঁজল চন্দন।

–‘ও যাক গে। ওসব নিয়ে মাথাখারাপ করো না। আমি তো তিনহাজারের মেসেজ দেখে বুকে হাত দিয়ে বসে গেছিলাম প্রায়। যাক বাবা। এই শুনছ, সামনের মাসে না আমিও একটা নেব ভাবছি।’ কথাটা ভেসে আসতেই ঘুমের ঘোরেই হিসেব কষল চন্দন। বাড়ির লোন, গাড়ির লোন, বউয়ের গয়নার লোন তো ছিলই এর সঙ্গে যোগ হল নতুন দুই ফোন আর ফার্নিচারের ই এম আই। এছাড়াও আছে প্রফিডেন্ট ফান্ড আর অন্যান্য ডিডাকশন। সব বাদ দিয়ে হাতে থাকবে সংসার চালানোর জন্যে মাত্র কুড়ি হাজার। এবার সত্যি সত্যি চন্দনের ব্রেসিয়ার ছাড়া ন্যাড়া বুকটা যেন আরও ন্যাড়া হয়ে বেজে উঠল।

দুপুরে অফিসে ব্যাপারটা জানাজানি হতেই খাওয়াতে হল আইসক্রিম। প্যাকেট খুলল অফিসের বক্ষ সুন্দরী সুনন্দা। বুকের জোরেই এ সেকশনে রয়ে গেছে সুনন্দা। এরকম একটা রটনা অফিসে ছড়িয়ে আছে চিরকাল — কত লোক এল গেল। ওই ডেলিভারি ক্লার্কের চেয়ারটি থেকে ওকে কেউ সরাতে পারল না। তাই চন্দনদের মতন মাঝবয়সীদের কাছে ও কখনও বুকি, আবার কখনও মাইমা। এই সব কথাই চলে কোডে কোডে, গোপনে গোপনে কথায় কথায়, আড়ালে আড়ালে। অফিসের কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানে তাই আজও এদের বুকের কোনও গোপন কোণের ডাকে সুনন্দাকে নামতে হয়

ওপেনিং ব্যাটস ম্যান হিসেবে। সুনন্দাই প্যাকেট খুলল তারপর চার্জে বসাল ট্যাবকে আর ট্যাবেরর মালিককে। নির্দ্বিধায় ফোনের মালিকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে পাঁচশো টাকার নোটটা নিয়ে রামশরণকে পাঠাল দশটা কর্ণেটো আনতে। ঘণ্টা তিনেকের

মধ্যে ট্যাব রেডি করে রিংটোন সেট করে দিল। কে প্রথম কাছে এসেছি — এক নম্বর সিমে। আর দু নম্বরে, হয়তো তোমারই জন্যে। ফোন চালু করে উল্টো দিকের চেয়ার টেনে চোখ নাচিয়ে বলল, –‘বউদি জানে?’

অসহায় চন্দন আঁচল সরে যাওয়া চিরচেনা উত্তরপ্রদেশের গ্রস্ত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, — ‘কী’চোখ টিপে মুখ বেঁকিয়ে সুনন্দা বলল, — ‘কী আবার? বউদি জানে তোমার বুকের এত বড় পাটা?’

সেঁজুতির উৎসাহ আর সুনন্দার অত্যুৎসাহী আচরণে মনে মনে ফুর্তিতেই ছিল চন্দন। নাটক দেখার পুরনো অভ্যেসটা এদিন আবার যেন বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। চারটে নাগাদ ক্যান্টিনে চা খেতে নেমে দেখা হয়ে গেল রিক্রিয়েশন ক্লাবের শচীনের সঙ্গে। নাটকের লোক। বলল, — ‘কী দাদা, নাটক দেখা ছেড়েই দিলেন?’

–‘আর সময় হয় না। তবে ইচ্ছে করে যেতে খুব।’

–‘যাবেন নাকি আজ? একটা এক্সট্রা আছে একাডেমিতে।’

–”কী নাটক গো?’

–‘আজকের শাইলক। উজান নাট্যগোষ্ঠীর।’

–‘ওরেব্বাস! ওদের প্রোডাকশান তো দারুণ হয় গো। ওদের এর আগের প্রোডাকশন সক্রেটিসের জবানবন্দী তো দারুণ। ওদের ডিরেকটর তপন মোদক, আলোক চ্যাটার্জিকে চেনো তো? আমার বিশেষ পরিচিত।’

–‘তাহলে যাচ্ছেন তো?’

–‘চলো, যাই। যা থাকে কপালে।’

–‘কপালের দোহাই দিয়ে নয় দাদা। নাটক দেখুন বুক বাজিয়ে। এখন সিনেমার নয়, এখন নাটকের দিন। বুকের পাটা লাগে নাটকে।’

সেঁজুতিকে কিন্তু ফোনে বলল না নাটক দেখতে যাওয়ার কথা। বলল, — ‘ফোনের কোম্পানির লোকের সঙ্গে ইম্পির‍্যাল ফ্রিনান্স আর অফিসের একটা মিটিং আছে। ফিরতে রাত দশটা বাজবে।’

সেঁজুতি কথাটা শুনে বারণ তো করলই না বরং বলল, — ‘আমার জন্যে একটা বেশি কিস্তিতে পাওয়া যায় নাকি দেখো তো।’

নতুন ট্যাবটা ভাইব্রেটিং মোডে দিয়ে ফুল প্যাকডআপ হলে নাটক দেখতে ঢুকল চন্দন। এ সি চলছে সপ্তমে। শচীন আর ওর সিট পাশাপাশি নয়, একটু দূরে দূরে। শচীনের যে বন্ধুর আসার কথা ছিল সে আলাদা কেটেছিল, না আসতে পারায় ওকে দিয়ে গেছে। হলে ঢোকার মুখে তপনবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। কম কথার মানুষ, হেসে বললেন, –‘আজকাল কম আসা হচ্ছে? এ প্রোডাকশন খুব বিতর্কিত হয়েছে। শাইলককে একদম আধুনিক করে নামিয়েছি। দেখে জানাবেন কেমন লাগল।’

নাটক শুরুতেই জমে গেল, শাইলকের অনুগামীনীদের উপস্থিতিতে। শাইলককে ঘিরে রয়েছে ছোট্ট ছোট্ট প্যান্ট, কালো গেঞ্জি আর গোল গোল বুকের বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা। এরাই শাইলকের বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী। এরাই কথা দিয়ে, শরীর দিয়ে আধুনিক ব্যবসার রীতিনীতি বোঝাচ্ছে শাইলককে।

মঞ্চটাকে সাদা-কালো দাবার ছক বানিয়ে কুশীলবরা এক একটা ঘরে পা ফেলে ফেলে ঘুরছে।

দেখতে দেখতে হলের সেন্ট্রাল এসির ঠাণ্ডায় চোখ লেগে এল চন্দনের। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে ভাসছে পাড়ার তরুণদলের দাবা কম্পিটিশন। পাড়ার ওস্তাদ দাবারু খ্যাপাদা চেঁচিয়ে উঠছে, — ‘রাজা চেক।’

বোর্ডের উল্টোদিকের টেবিলে বসে আছে গতকালের মোবাইল  শপে দেখা কালো গেঞ্জি পরা মেয়েটা। নরম গলায় বলছে, –‘এত ভয় কিসের? আমরা তো আছি। ই এম আই আছে। ক্রেডিট কার্ড আছে।’

খ্যাপাদা বলছে, –‘নো নো, নেভার। রাজা চেক। ফ্যামিলি চেক। দুনিয়া চেক।’

মেয়েটি আরও ঠান্ডা গলায় বলল, –‘নো, নো, নো। ইউ কান্ট সে ই এম আই চেক।’

হঠাৎ পাশের লোকটার ধাক্কায় তন্দ্রা ছুটল চন্দনের। সম্বিত ফিরতেই বুঝল বুক পকেটের নতুন কলিং ট্যাবটা ভাইব্রেট করছে আলো জ্বালিয়ে। সেকেণ্ড সিম কলিং — হয়তো তোমারই জন্যে। পাশের লোকটা টানা গজ গজ করছে, –‘কী করেন? নাটক দেখতে আসেন না ঘুমিয়ে কাটাতে আসেন? ফোন সুইচ অফ করেন না। ভাইব্রেট করেন কেন? এক…নাকের গোঁ গোঁ সঙ্গে ভাইব্রেটিং-এর গোঁ-গো…অসহ্য। ডিসগাস্টিং।’

কল ডিকলাইন করে লজ্জা পেয়েও বুক সোজা করে চিতিয়ে চোখ ফেলল মঞ্চে। দাবার ছকের ঘরে ঘরে নায়িকা ঘুরছে আর বলছে, –‘ওদের চালের বিপরীতে চাল দিন। শাইলককে সুযোগ দেবেন না।’

আবার ট্যাব ভাইব্রেট করছে। সিম ওয়ান, — কে প্রথম কাছে এসেছি…ইমপিরিয়াল ফ্রিনান্স কলিং। সেই মেয়েটি। হলের বাইরে দৌড়ে এসে কলটা রিসিভ করল ।

–‘স্যরি স্যার একটু ডিস্টার্ব করলাম। সেঁজুতি রায় আপনার স্ত্রী? রিয়েলি আমরা জানতাম না। এইমাত্র জানলাম। উনিও না আমাদের খুব ভ্যালুয়েবল কাস্টমার। গতকাল আমাদের অন্য শপে পার্চেস করেছেন। এইমাত্র আমাদের এই শপে এসেছেন। আর একটা আইফোন নিতে চাইছেন।

আপনাদের দুটো আকাউন্ট মার্জ করিয়ে দেব স্যার?’

আঁতকে উঠল চন্দন, — ‘সেকী? অনেক টাকার ই এম আই পড়বে! আমার সব মাইনের টাকাই তো ই এম আইতে চলে যাবে।’

মেয়েটি আরও আবদারি গলায় বলল, –‘ওরম বললে হবে না। তাহলে আপনার সঙ্গে আড়ি। কোনওওওওওদিন ফোন করব না আর। আমাউন্টটা একটু হেভি হচ্ছে, বাট নট টু বি ওরিড। আমি নিজের দায়িত্বে আর একটা পার্সোনাল লোন করিয়ে দেব যেটা দিয়ে এই ই এম আইগুলো

শোধ হয়ে যাবে। খুব কম রেট। কোনও চাপ হবে না।’

চন্দনের হাত পা কাঁপছে। আবার লোন, আবার ই এম আই! এতো ধারের ওপর দেনা।

ওপাশের কণ্ঠ বলছে, — ‘সারা দেশ চলছে ধার দেনায়। আমি আপনি কী স্যর! নিয়ে নিন স্যর। বুক বাজিয়ে ঘুরবেন। এই ই এম আই দিয়ে আর নিয়ে।

-‘এতো এন্ডলেস মানিটারি ইন্সটলমেন্ট গো!’

–‘ইয়েস, ঠিক বলেছেন। দুনিয়া জয়ের চাবিকাঠি।’

হলের ভেতর থেকে কেউ একজন বেরিয়ে এল। দরজাটা খুলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে হলের ভেতর থেকে ছোট একটা মেয়ের আর একটা ছেলের গলা ভেসে আসছে  –‘বুক চিতিয়ে বলো — চেক শাইলক চেক,বুক বাজিয়ে বলো ‘বি ডট পণ্যে কিস্তিমাত!’

ডায়লগের পাশে পাশেই  একদল মেয়ে গাইছে তালি দিয়ে দিয়েই একসাথে—

চেক শাইলক চেক।শেখো বিলাসী দানের কিস্তিমাত।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2024 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ