
টিকটিকি
-কিচ্ছু না, কালপ্রিট তুমি নিজে। কতবার পই পই করে বারণ করেছি, বার বার সাবধান করেছি প্রোফাইল লক করো, প্রোফাইল লক করো, সবাই করছে। এটাও খেয়াল করোনি। নিজে এথনিক হ্যাকিং টেকনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেও যদি এটুকু বুদ্ধি না হয় তাহলে এখন কান্নাকাটি করছ কেন? আমাদের ছবি ছড়িয়ে ওরা ভাইরাল করছে বলে!
একটানে কথাগুলো বলে একটু দম নেওয়ার জন্যে থামে এথনিক হ্যাকিং টেকনোলোজির ছাত্রী অলিভিয়া।
– হ্যাঁ রে, কী হৈল রে, কার কী হৈল? নাতনির ফোনালাপের আসল তল পেতে তাদের কথায় ঢুঁ-মারতে চাইলেন নবতিপর বৃদ্ধা ডালিয়া মুখোপাধ্যায়।
বাঁ-হাতে ইশারায় ঠাম্মিকে থামিয়ে আবার শুরু করল অলিভিয়া, -আবার বাজে বকছ? কতবার বলেছি ফেসবুক এখন নজরদারির জায়গা। পরশুদিন যখন কমেন্টবক্সে দেখলে, সাবধান টিকটিকি ঘুরছে তাহলে কেন বাবু লক না করে অ্যাকাউন্ট ফেলে রাখা! এখন বোঝো! এত ক্যালাস তুমি যে কী বলব। যা বোঝো তাই করো। এখন কান্নাকাটি করে কিস্যু হবে না। লাইন কেটে রাগে ফোনটা সোফায় ছুঁড়ল অলিভিয়া।
সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা তুলে নিল অলিভিয়ার ছোটভাই গুড্ডু। এই এতক্ষণ চুপচাপ সোফায় বসে ঠাম্মি আর দিদিদের কথাগুলো গিলছিল বছর ছয়ের নাদুশ-নুদুশ গুড্ডু। লাফিয়ে উঠল অলিভিয়া। ফোনটা হাতে নিয়ে ছুটে পালাতে গেল গুড্ডু।
চীৎকার করতে করতে ওর পিছু নিল অলিভিয়া। গুড্ডু তখন চেঁচাচ্ছে, -কেন রে! ফোনে টিকটিকি আছে?
ঠাম্মি তখনও বলে চলেছেন, – দেখ কবে থেকে ছোটখোকাকে বলছি, আমার ঠাকুরঘরের টিকটিকিগুলোর কিছু একটা ব্যবস্থা কর। নইলে ওরা আমার সব নেবে। কানেই নেয় না সে কথা। এখন দেখছিস তো বন্ধুও বলছে টিকটিকির উপদ্রবের কথা। নিজে কানেই তো শুনলি! এবার বাবাকে বল।
ডালিয়া কথা শেষ করার আগেই ছোট নাতনি জিনিয়া হেসে উঠল, – সত্যিই ঠাম্মি, তোমারই হবে! তুমি পারোও! কোথাকার টিকটিকি কোথায় এনে ফেললে।
কথা শুরু করলে থামেন না ডালিয়া, -কী পারি রে? কোথাকার টিকটিকি আবার কী, আমার ঠাকুর ঘরের। পাগল করে দিল ওই শয়তানের দল। হেগে হেগে সারা ঠাকুরঘর ভরিয়ে দিচ্ছে, আর প্রতিদিন দেখি সংখ্যায় বাড়ছে। আজকাল আবার মেঝেতেও করে রাখে দেখছি। সাদাগুলোকে দেখলে গা-টা কেমন করে ওঠে। কালোগুলো আরও খারাপ, একটা তো একদিন গায়ে উঠে পড়েছিল। তোর বাবাকে কতবার বলেছি কিছু একটা
কর। টিকটিকির জ্বালায় ঠাকুরঘর ছাড়তে হবে আমায়।
হাঁপাতে-হাঁপাতে ঘরে ঢুকল অলিভিয়া। জিনিয়া বলল, – জানো ঠাম্মি, টিকটিকি খুব পয়া জিনিস। বিশেষ করে ঠাকুরঘরে থাকা খুব ভাল। শ্রীবৃদ্ধি হয়। কখনও মারতে নেই। সেদিন ইউটিউবে দেখছিলাম। বাঁ-হাতে ছুড়িটা বের করে নিয়ে সব্জি কাটতে কাটতে ডালিয়া বললেন, – নিকুচি করেছে তোদের পয়া-র। হাড়মাস এক করে দিল। রোজ দুবার চান করতে হয় শয়তানগুলোর পায়খানা পরিষ্কার করার পর। সেদিন আমার গোপালের গায়ে ছ্যা ছ্যা ছ্যা! রোজ ঠাকুরের বিছানার চাদর পাল্টাতে হচ্ছে রোজ। আর মেয়ে বলে কিনা পয়া।
হাত তুলে ঠাকুমাকে আশ্বস্ত করে জিনিয়া, – আচ্ছা তোমাকে ময়ূরের পালক এনে দেব আমি। ডিমের খোসা তো ঠাকুরঘরে রাখতে দেবে না! ময়ূরের পালক রাখো সব পালাবে যাহোক!
-কিছু একটা কর মা যা হোক।
কথার মাঝে ঢুকে পড়ল গুড্ডু, – তোরা পারিসও বটে টিকটিকি তাড়াতে ময়ূর! আচ্ছা আমাকে বল তো গোয়েন্দাদের টিকটিকি বলে কেন? সেদিন টিভিতে শুনছিলাম। একটা গোয়েন্দাকে সন্দেহ করে অন্য একটা ক্রিমিনাল বলছে।
গুড্ডুকে সমর্থন করে এবার এগিয়ে এল অলিভিয়া, – ভাল বলেছিস তো।
এবার অলিভিয়ার দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে হাসল জিনিয়া — তোর ওকেই জিজ্ঞাসা কর না, ওরই তো সাবজেক্ট। সামনের টেবিলে রাখা ফোনটা আলো জ্বলে কাঁপতে লাগল। লাফিয়ে ফোনটা তুলে আবাড় দৌড় দিল গুড্ডু। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, – আকাশনীল। পেয়ে গেছি টিকটিকি।
-ফোন দে, ফোন দে। বলে গুড্ডুর পিছু নিল অলিভিয়া। ততক্ষণে ফোন ছুঁড়ে সোফায় ফেলে দিয়েছে গুড্ডু, আর চেঁচাচ্ছে, – ঠাম্মি ধরে ফেলেছি টিকটিকি। শোনও এখানেই থাকে টিকটিকি। ওই ফোনেই সব টিকটিকির বাসা।
অবাক চোখে হতভম্ভের মতো নাতি নাতনিদের কাণ্ড দেখে কিছুক্ষণ থেমে তারপর ডালিয়া মুখোপাধ্যায় বললেন, – কয় কিরে ছেলেটা? অ জিনিয়া!
জিনিয়া বলে উঠল, – ও তুমি বুঝবে না ঠাম্মি, এ হল এথনিক হ্যাকিং। আসলি টিকটিকির কাজ।
……………………
টক-ঝাল-মিষ্টি
– বাবু, লাগবে?
– হ্যাঁ, দে। আজ তো শনিবার। গত শনিবার তোরা কেউ আসিসনি। খুব অসুবিধায় পড়েছি। স্টেশনের ধার থেকে বেলায় আনতে হয়েছিল।
হাতে ঝোলানো প্লাস্টিকের হাতব্যাগ থেকে সুতোয় বাঁধা লেবু লঙ্কার একটা পবিত্র বন্ধনি এগিইয়ে দিল ফ্রক পরা বছর আষ্টেকের একটা মেয়ে।
দোকানের ড্রয়ার থেকে দশটাকার একটা নোট মেয়েটির হাতে তুলে দিয়ে বৃদ্ধ বিকাশবাবু প্রশ্ন ছুঁড়লেন, – আগে যে ভদ্রমহিলা রোজ আসতেন, তিনি মাঝে মাঝে আসছেন না। তাঁর কী হয়েছে?
-তিনি আমার মা। রোগ হইছে। বাড়িতে আছে।
– ওহ্! তিনি তো বলতেন, আমাকে লেবুর মা বলেই সবাই চেনে। তা তোর নাম কী লেবু?
মেয়েটি একটু হেসে বলল, – না, আমার বড়দার নাম।
দোকানদার একটু থেমে চমকে বললেন, – হপ্তা দুই আগে একটা রোগা মতন ছেলেও এসেছিল, সেই বুঝি লেবু?
– না, না আমার বড়দা বাইরে থাকে। মিস্ত্রির কাজ করে। এসব ও বেচে না। যে এসেছিল সে হল আমার মেজদা লঙ্কা।
হো হো করে হেসে ফেললেন বিকাশবাবু, – বাহ্! দারুণ তো! একই বাড়িতে টক আর ঝাল! আর তুই?
মিষ্টি হেসে মুখ নামিয়ে মেয়েটি বলল, – হ্যাঁ, আমিই তো মিষ্টি।
Tags: অণু গল্প, গল্প, টিকটিকি ও অন্য গল্প, দেবাশিস মজুমদার
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।