
আমার মা বাবার থেকে আমার মাসিদের দরদ কিছু কম ছিল না। মায়ের নিজের যে বোন নেই ছোটবেলায় বুঝিনি তা, দেখতাম আমার মেজ, সেজ, নমাসি, ফুল, কনে, রাঙা, নতুন, ছোট হয়ে যখন আর আঙুলে ধরত না, তখন নাম ধরে ধরে মাসি হত। যেমন পেরু, রীনা, বুড়াই, পুতুল, গীতু, মেমু, বুটা, ঢেঁপি। তারপরে তো মাসিরাই আমার সমবয়সী বা ছোট। এঁরা সকলেই আমার মায়ের মামাতো, মাসতুতো বোন। আমার মা ওদের সকলের প্রিয় বড়দিভাই। হয়তো সেকারণেই সব মাসিরাই আমাদের ভাইবোনেদের একটু বেশি স্নেহ করতেন। অনেকেই আর নেই, যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা নিয়ম করে এ খনও খবর নেন, বকুনি দেন ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন। আরও একটা মজার ব্যাপার রয়েছে, আমার কয়েকজন মাসির সঙ্গে আমার কোনও না কোনও কাকার বিয়ে হয়েছিল, আবার কারও কারও বর সম্পর্কে আমাদের দাদা হন। কাজেই ডাবল ভালোবাসা, ডাবল মজাতেই কেটেছে আমার ছোটবেলা। আমার কেমন মনে হয় এমন প্রোটেক্টেড জীবনে অভ্যস্ত আমি কিন্তু আমার বোনগো, বোনঝিদের তেমন করে প্রোটেকশন দিতে পারিনি।
আমার ফুলমাসি ছিলেন ছোট্টখাটো, আর ফুলমেসোছিলেন ইয়া ভুড়ি আর দশাসই চেহারার। ফুলমাসির নাম ঝর্না, আর মেসোর নাম শঙ্কর। ওঁরা থাকতেন রানাঘাটে, আসা যাওয়া ছিল বেশ ঘনঘন। আমার বাবা তাঁর এই শালিটিকে বেশ পছন্দ করতেন। ফুলমাসির হাতে পোস্তর রকমারি পদ খুব ভালো স্বাদের হতো। মেসোর জন্যে রোজই আলু কি ঝিঙে দিয়ে পোস্ত তো মাস্ট। মায়ের মেজমামার মেয়ে ছিলেন ফুলমাসি, তবে সম্পর্কের দূরত্ব বোঝা যায়নি কোনও দিনই। আমাদের ফুলমাসির গোটা জীবন একটা সিনেমারপ্লট হতে পারে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটির বিয়ে হয়েছিল যে বাড়িতে, সে বাড়িতে বৈভবের ছড়াছড়ি। প্রথমে পেল্লায় তিনতলা বাড়িতেই সংসার পাতেন ফুলমাসি, মেসো আর তাঁর ভাই। পরে সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারার পরে যে বাড়িতে ফুলমাসিরা চলে গেলেন, তার সামনে ফুলের বাগান, পিছনে ফলের বাগান, বাড়ির মধ্যে আস্ত একটা সুইমিং পুল। ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা ঘর, সাজানো গোছানো বাড়িতে জো হুজুর লোক লস্কর ভর্তি। আসবাব নিয়েও সৌখিনতাছিল ঘোষ দম্পতির। সবচেয়ে দামি মডেলের ফ্রিজ, পাখা ইত্যাদি বৈদ্যুতিন সামগ্রী নতুন কিছু বাজারে এলেই তা কিনে ফেলতেন ঝটাঝট। এরই পাশে ৮ জনের বসার মতো শ্বেত পাথরের খাবার টেবল, এই উঁচু পালঙ্ক, তিন আয়না দেওয়া ড্রেসিং টেবল এমন সব সাবেকি জিনিস তো ছিলই। ছিল
ছিল একটা অস্টিন আর একটা অ্যাম্বাসেডর গাড়ি। সেই গাড়ি চড়েই কলকাতায় আসতো ওরা গান শুনতে, থিয়েটার দেখতে। কেনাকাটা সবই হতো কলকাতা থেকে, চশমার ফ্রেম কিনতো ওরা- হয় আরসি ঘোষ, নয় জিকেবি থেকে। শঙ্কর মেসোর ছিল পরিবহণ ব্যবসা। অনেকগুলো লড়ি, গাড়ি ভাড়ায় খাটতো। আর ছিল মোহন নামে এক বিশ্বস্ত ম্যানেজার, যাকে ব্যবসার ভার দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে মেসো মাসি বেড়িয়ে বেড়াতো। মাসির দুই মেয়ে আর এক ছেলে, সবাই ভালোস্কুলে পড়তো, নাচ গান শিখতো, হাল ফ্যাশনের জামা কাপড় পরতো। এভাবেই চলছিল সব সুখে শান্তিতে। তারপর ধীরে ধীরে মাসিমেসোর ভাঁড়ারে যখন টান পড়তে শুরু করে, তখন মোহনের ব্যাবহারেও আসে একটা পরিবর্তন। ওদের দুর্দিনে মোহন চাকরি ছেড়ে উধাও হয়ে যায়। খোঁজ খবর নিতে গিয়ে আবিস্কার হয় সেই ম্যানেজার মোহনই এখন মস্ত কারবারের মালিক হয়েছে আর নিজের গ্রামে প্রাসাদের মতো বাড়ি তৈরি করে সেখানেই থাকছে।
দেখেশুনে ভ্যাবাচাকা হয়ে যান ভালোমানুষ ফুলমেসো। এদিকে বাড়িতে দুবেলা পাওনাদারদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়, হাতে তাদের মেসোর সই করা গাদা গাদা হ্যান্ড নোট। ধার মেটাতে অপমানিত অসহায় ফুলমাসিরা বাড়ি-গাড়ি-লরি সব বিক্রি করে চলে যান মেসোর মামার বাড়ি মগরায়। সেখানে থেকে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করেন শঙ্কর মেসো আর ফুলমাসি। বছরখানেকের মধ্যেই অবশ্য নিজেদের একটা বাড়ি করে মামাবাড়ির আশ্রিত হওয়ার অসম্মানের জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। ধীরে ধীরে ফিরে পেয়েছিলেন বাহুল্যহীন মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখশান্তিও।
সেজমাসি উমা ছিলেন আমার মায়ের মেজমাসির মেয়ে। খুব ফর্সা কিন্তু বেঁটে খাটো মানুষ। তবে মেজমাসির বড় বড় চোখের খুব বাহার ছিল। বিয়ে হয়েছিল সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে, যাঁকে দেখতেছিল সত্যজিৎ রায়ের আঁকা প্রফেসর শঙ্কুর মতো। আমার সেই ডাক্তার মেসোর বদলির চাকরি বলে মাসিও ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার এ মাথা থেকে ও মাথা। ফলে তাঁদের সঙ্গে আমার মায়েদের দেখাশোনা কমই হত। মেজো মেসো রিটায়ার করার পরে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন কলেজ স্ট্রিটে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে। ততদিনে ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত, আনন্দেইছিলেন ওঁরা। মেসো -মাসির জুটি ছিল দারুণ রোমান্টিক। জুটি ভেঙে মেসোই আগে চলে যান। তারপরে কী যে হলো, আমার মাসি একের পর এক প্রেমে পড়তে লাগলেন। মাসির মনে হতো তাঁর চোখের ডাক্তার, হার্টের ডাক্তার তো বটেই এমনকী নাতি নাতনিদের বন্ধুদের দাদুরাও তাঁকে পছন্দ করছেন। উল্টোদিকের মানুষটির মনে কী থাকতো তা জানা যায়নি। তবে
তাঁকে পছন্দ করছেন। উল্টোদিকের মানুষটির মনে কী থাকতো তা জানা যায়নি। তবে মেজমাসি যে ভালোবাসায় উথলে উঠতেন, কারও অদর্শনে কষ্ট পেতেন, ফোনে কথা বলার সময় একটু নিভৃতি খুঁজে নিতেন তা জানতো সকলেই। হাসিখুশি মাসি নিজেই সকলকে বলতেন এসব কথা মজা করে। কেউ বিশ্বাস করত, কেউ ঠাট্টা বলে উড়িয়ে দিত। মেজমাসি মজার সব গল্প করতেন, গান গাইতেন, কারণে অকারণে হা হা করে হাসতেন, গল্পের বই পড়তেন, টিভিতে খেলা দেখে হইহই করতেন। তাঁর মাথার বালিশের পাশে মুঠোয় ধরা যেত এমন ছোট্ট একটা ফিলিপস রেডিও থাকতো। মায়ের কাছে শুনেছি, ছোট থেকেই মাসি এমনই ছিলেন। সব বোনেরা যখন সেলাই করছে, কি রান্না শিখছে, মেজমাসির তাতে মোটেই আগ্রহ ছিল না, তিনি সেসময় গল্পের বই পড়ে তাদের শোনাতেন। রেডিওতে গান শুনে শুনে কাগজে লিখে নিয়ে সেই গান গাইতেন। বিয়ের পরেও এমনই রোমান্টিক নিশ্চিন্ত জীবন কাটিয়েছেন। কলেজ স্ট্রিটের সাবেকি বাড়ি বিক্রি করে ছেলেরা যখন আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট কিনে নেয়, সেখানে অসুবিধেই বেশি হয় তাঁর। শেষ বয়সে তাই চলে গিয়েছিলেন বর্ধমানের গ্রামে শ্বশুরের ভিটেতে। আর দেখা হয়নি।
মায়ের সেজমাসির মেয়ে আমাদের ন মাসিকে দেখেছি লেক টাউনে একটা দু কামরার ঘরে থাকতে। ফরমায়েসি সেলাই করে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেন, একা একা। ছিপছিপে রোগা হলেও একটা লাবণ্য ছিল মাসির প্লাস পয়েন্ট। আর ছিল এক ঢাল ঘন কালো চুল। আমার মনে ন মাসির এই চেহারাটাই আটকে রয়েছে। এই মাসির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল না বহুকাল, কারণটা তখন জানতে পারিনি, পরে শুনেছি। মাসির জীবনের গল্পটা বড় অদ্ভুত। বিয়ে হয়েছিল চাকদহে। অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়ি ঘুরে শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরে মাস খানেকের মধ্যেই আম পাড়তে গাছে উঠে পরে গিয়ে মারা যান নতুন মেসো। এই অকাল মৃত্যুর দায় মাসির ঘারে চাপিয়ে তাঁকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সেসময় জানা যায় মাসি সন্তানসম্ভবা। তাতেই দুবাড়িতে ঠেলাঠেলির মধ্যে পড়ে যান ন মাসি। ছেলে হয় মাসির, তাকে নাকি অবিকল নতুন মেসোর মতোই দেখতে হয়, তবুও শ্বশুরবাড়ি ওই ছেলেকে তাদের বংশধর বলে স্বীকার করে না। সমস্যা তৈরি হয় বাপের বাড়িতেও। ছেলেকে নিয়ে মাসি বাড়ি ছেড়ে পরিবার ছেড়ে চলে আসেন খিদিরপুর ওয়াটগঞ্জে এক বন্ধুর বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে।
সেলাইজানতেন, কাপড়ে জড়ি বসানোর কাজ থেকে ব্লাউজ শার্ট সেলাই-করে ছেলেকে মানুষ করতে থাকেন। একা নারী নিজেকে রক্ষা করতে বোরখা পরতে শুরু করেন। বয়স আরও একটু বাড়লে খিদিরপুর থেকে লেকটাউনে চলে এসে একটা বাড়ির গ্যারেজ ভাড়া নিয়ে ছেলেকে নিয়ে গুছিয়ে বসেন নমাসি। বাপের বাড়ির সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি হয় ঠিকই, তবে ছেলেটিকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পারেননি নমাসি। তাই শেষ জীবনেও একলাই কাটাতে হয়েছে। এক ঢাল চুলের সামনেটা অল্প পাকা, গম্ভীর বিষাদমাখা এক মূর্তির সেই ছবিটাই মনে রয়ে গিয়েছে। অল্প কিছুদিন নমাসিকে আমাদের মধ্যে পেয়েছিলাম। নীরবেই মারা যান সাহসীনি বিদ্রোহী মাসি।
Tags: গল্পের সময়, ব্লগ, মাসি ও আশপাশের গল্প, মিতালী মিত্র
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।