14 Apr

গভীর জীবনবোধের মনন-উদ্ভাসিত প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কবিতা

লিখেছেন:দীপক বন্দ্যোপাধ্যায়


DEEPAK BANDO GALPERSANAY CARD

প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত মনেপ্রাণে এবং কবিসত্তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে আপাদমস্তক একজন যথার্থ ‘আধুনিক কবি’ । বিগত শতকের তিরিশ-চল্লিশ দশক পেরিয়ে পঞ্চাশের দশকে বিদগ্ধ কবিদের নক্ষত্রমণ্ডলে কি শব্দের ব্যবহারে, কি কবিতার গঠনগত আঙ্গিক-প্রকরণে, কি বিষয়বস্তুর কাব্যিক উপস্থাপনে বাংলা কবিতার যে তুঙ্গ ‘আধুনিকতা’ প্রকাশ পেয়েছিল, ওই দশকের তাঁর সতীর্থ কবিদের মতোই প্রণবেন্দু দাশগুপ্তও হয়ে উঠেছিলেন তার যথাযোগ্য প্রতিনিধিত্বকারী একজন প্রধান কবি (mejor poet) । প্রণবেন্দুর কবিতায় তার অজস্র স্বাক্ষর রয়ে গেছে । যেমন —

“তাকে মনে রেখে লিখি ; সুদূরান্ত মেঘের দুয়ারে

নিভৃতসঞ্চারী চোখে ছায়াতুর নম্রনত ভাষা

মায়া ঢালে মনে ; উতরোল এ মাহ ভাদরে

ঝুমকোর প্রগাঢ় রঙে দুলে ওঠে অপার প্রত্যাশা ।”

(সন্ধ্যাতারা / এক ঋতু / প্র. দা.)

POET PRANABENDU GALPER SAMAY CARD (2)

প্রণবেন্দু তাঁর ‘প্রাপ্তবয়স্কের সরলতা’-কে বোদ্ধা তথা দীক্ষিত পাঠকের মননে উন্মীলিত ক’রে তুলতে কাব্যভাষ্যের যে-এক নিজস্ব ‘নাগরিক সপ্রতিভতা’ উন্মোচন করেছেন, তাকে সেই যত্নবান পাঠক কবির এই প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এক ঋতু’ (১৯৫৭) থেকে শেষতম কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্রের নখরে’ (২০০২) পর্যন্ত মোট এগারোটি কাব্যগ্রন্থেই যেমন আগাগোড়াই খুঁজে পাবেন, তেমনি তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই আভাসে-ইঙ্গিতে-সংকেতে এবং শব্দচয়নে ও চিত্রকল্পের প্রতীকধর্মীতায় উন্মীলিত প্রগাঢ় জীবনবোধ সচেতন পাঠকের কাছে ধরা দেবে । এখানেই কবিতায় প্রণবেন্দুর আত্মিক সিদ্ধিলাভ ঘটে গেছে । তিনি স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বরিত হয়ে উঠেছেন । কত সহজে তিনি পাঠকের জন্য বিমুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে পারেন —

“টানা বারান্দার মতো ঝাউবন —-

রবারের চাঁদ নেমে আসে ;

এখানে আমার কোনো সঙ্গী নেই, আছে টেলিফোন ;

বুনো কুকুরের দল উঠে আসে ঘরের ফরাসে ।”

(কারিগনানো ডাক-বাংলো থেকে / নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি / প্র. দা.)

প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের এই ধারাবাহিত নিজস্ব কাব্যভাষ্যকে কবি শঙ্খ ঘোষ চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন —“প্রণবেন্দুর নিজেরও যেমন ‘পৃথিবীকে মাঝে মাঝে একটানা গুঞ্জনের মতো মনে হয়’, ওই শিহরণ থেকে পাওয়া তাঁর কবিতাও আমাদের কাছে তেমনি হয়ে থাকে এক প্রবহমান গুঞ্জন । আর যখন ভাবি, পরিব্যাপ্ত তার নীরব নি:সঙ্গতা থেকেই জেগে উঠতে পেরেছে এই গুঞ্জন, সে-নি:সঙ্গতার কাছে আমাদের বিনীত হতে হয় তখন ; দূর দেশের দূর কালের অন্য এক কবির ভাষায় তখন বলতে ইচ্ছে হয় ‘How gracious, how benign, is Solitude’ !”

“সম্পর্ক যেমনই হোক, তুমি লিখে যাও

আলোছায়া খেলা করে, পাতাবাহারের নড়াচড়া…

মানুষ এসেছে, তার দুই চোখে স্বপ্ন নেই আজ,

তুমি লিখে যাও, তুমি স্পষ্ট লিখে যাও —

মিলেমিশে তৈরি হয় নকশায় সুতোর চাতুরী ।

 

কে ডাকে ওখানে আজ ? কার কথা বলে ?

রাস্তার কুকুর জানে চাঁদ ওঠে কখন আকাশে —

কিছু ভিড় বাড়ে, আর কেউ কেউ আস্তে সরে যায়,

সম্পর্ক যেমনই হোক, সুখদুঃখ আসুক, যেভাবে

আলোছায়া খেলা করে, পাতাবাহারের নড়াচড়া….

তুমি লিখে যাও, তুমি শব্দ লিখে যাও ।”

(তুমি লিখে যাও / হওয়া, স্পর্শ করো / প্র. দা.)

এই টিপিক্যাল্ স্বগত উচ্চারণে কবিতা লেখার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রণবেন্দু বেঁচে থাকবেন তাঁর মুগ্ধ পাঠকের হৃদয়ে । অকপট ও স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি তাঁর কবিতাভাবনাকেও উন্মোচন করেছেন । তাঁর মতে, কবিতা লেখাই একজন কবির সামাজিক কাজ, আর কিছু নয় । তিনি মনে করেন, কবিতা লেখক হিসাবে তাঁর লেখা কবিতা যদি মুষ্টিমেয় কবিতাপাঠকেরও চেতনার উন্মীলন কিংবা উদ্বোধন ঘটাতে পারে, তাহলেই তাঁর সেই ‘সামাজিক কাজ’, অর্থাৎ সামাজিক দায়িত্বটি অনেকাংশে সম্পন্ন হবে । তিনি বলেছেন যে, কবিতা তথা সমস্ত সাহিত্যেরই মূল উৎস হ’ল ‘জীবন’ । তবে সাহিত্য শুধুমাত্র জীবনের দর্পণ নয়, কিংবা ‘ক্রিটিসিজম্ অফ্ লাইফ’-ও নয় ; সাহিত্য হ’ল জীবনের উন্মীলন । জীবনের অনেক অন্ত:শীল যোগসূত্রের উজ্জ্বল উন্মোচন ঘ’টে চলে সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে । কবিতার মধ্যে দিয়ে সাহিত্যের সেই জীবনকেন্দ্রিক কাজটাই সংসাধিত হয় ।

POET PRANABENDU GALPER SAMAY CARD (1)

২৯শে জুলাই ১৯৩৬-এ কলকাতায় জন্মলাভ করা প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের জীবনে ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সাল-দুটি বিশেষ তাৎপর্য বহন ক’রে এনেছিল । ১৯৫৩ সালে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব কবি বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে । তখন তাঁর বয়স সবে সতেরো বছর অতিক্রম করেছে । যা তাঁর পরবর্তী জীবনে একজন বড়ো মাপের কবি হয়ে উঠতে তাঁকে পরোক্ষে বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছিল । বুদ্ধদেব বসুর অনুপ্রেরণাতেই প্রণবেন্দু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে শিক্ষার্থীরূপে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে সেখানে তিনি অধ্যাপনাও করেছেন । অন্যদিকে, ১৯৫৪ সালে তাঁর কবিতা একযোগে প্রথম প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা’, ‘দেশ’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ এবং আলোক সরকার-সম্পাদিত ‘শতভিষা’-র মতো-সব সম্ভ্রান্ত পত্রিকাগুলিতে । অচিরেই পঞ্চাশের কবি-নক্ষত্রমণ্ডলে প্রণবেন্দু নিজের প্রত্যাশিত জায়গাটি অধিকার ক’রে নেন । সেইসঙ্গে কবিপ্রতিভার অনন্যতায় কবিতার ঋদ্ধ পাঠকমহলের কাছ থেকেও সম্ভ্রম আদায় ক’রে নিতে সক্ষম হন ।

পঞ্চাশের সতীর্থ কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় সহজ কথায় তাঁর কবিবন্ধু প্রণবেন্দু সম্পর্কে যেমনটি ব্যক্ত করেছেন —“প্রণবেন্দুর লেখা যেমন পরিশীলিত রুচির, মসৃণ এবং গভীর, মানুষটির চরিত্রও তেমনি ।”—তেমনই সহজিয়া ভাষ্যে প্রণবেন্দু নিজেও সত্যের এক দৃঢ়তাকে তুলে ধরেছেন —“পরিবেশ আর পরিস্থিতি সবসময় একজন শিল্পীর মনের স্থির কেন্দ্রকে বিচলিত করার চেষ্টা করে । ওই স্থিরতা বজায় রাখাই যথার্থ শিল্পীর কর্তব্য । তাৎক্ষণিক উপদ্রবে বিব্রত হতে নেই । যা সাময়িক তা কখনো চিরন্তন সত্যকে নষ্ট করতে পারে না ।” সত্যিই, রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতার মতোই যেন প্রণবেন্দুর কবিতার মধ্যে সমাজ-সংসারের, বিশ্বচরাচরের অসংগতিগুলি কেমন মিলে যায় । সেখানে অভিজ্ঞতার শুরু বহির্জগতে হলেও শেষ পর্যন্ত তা পরিণতি পায় অন্তর্জগতে । তাই তার সঙ্গে একাত্ম হতে গিয়ে পাঠককেও অবধারিতভাবে হতশ্বাস থেকে বিশ্বাসের ভূমিতে ফিরে আসতে হয় । পাঠকের কাছে সেই বিশ্বাসে ফিরে আসার কথাটি কবিই বলে দেন বড়ো মরমী উচ্চারণে —-

“ঘরে তো থাকি না, থাকি বাইরেও, যতিচিহ্নহীন

জীবন চলেছে ঐ প্রায়-অপস্রিয়মান সাইকেলচাকায়—-

হয়তো এমন হবে, যখন এ-মহী হবে মানুষবিহীন,

তবু তো থাকবে প্রাণ, তবু কচি-ডাব থেকে জল খাবে বলো কারা ?”

(কিছু থেকে যাবে / রৌদ্রের নগরে / প্র. দা.)

প্রণবেন্দুর কবিতায় নানান প্রতীকের মধ্যে দিয়ে জীবনের চলমানতা প্রকাশ পেয়েছে । এর মধ্যে ‘সাইকেল’ বারবার এসেছে । এই ‘সাইকেল’ জীবনের মন্থর চলমানতাকেই প্রতীকায়িত করেছে তাঁর কবিতায় ।

প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সদর স্ট্রিটের বারান্দা’ (১৯৬৩)-র দুটি কবিতায় সাবলীল ভঙ্গিমায় কবির সেই ‘প্রাপ্তবয়স্কের সরলতা’-টি প্রকাশ পেয়েছে । কবিতা-দুটির অংশবিশেষ তুলে ধরা হ’ল —-

“হয়তো-বা আরো পাঁচজন

যেভাবে প্রবলভাবে বেঁচে যায়,

কথা ঝামরায়, আর

কখনও সুযোগ পেলে

হাত-পা-কাঁধের পেশী দেখিয়ে বেড়ায় …

সেই ভাবে চলতে পারিনি ।”

(অনুযোগ)

“বাড়ির বিষয়ে এত কম জানি,

দু’দণ্ড কোথাও টিকলে, মনে হয়

ঘর পেয়ে গেছি ।

মনে হয়, তুমি কোনো বিশেষ অভয় দিয়ে

পৃথিবী গড়েছ । মনে হয়, বন্ধুদের সব হৈচৈ

ছাত পেটানোর শব্দ । যেন চিরকাল

নারকোল গাছের পাশে দাদুর-দেখানো ইঁটখোলা

বড়-বড় ইঁট শুধু আমার বাড়ির জন্যে

পাঠিয়ে চলেছে ।

বাড়ির বিষয়ে আমি এত কম জানি ।”

‌              (বাড়ির বিষয়ে)

রিলকের কবিতার ভক্ত প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত বিশ্বসাহিত্যের একজন মনোযোগী পাঠক ছিলেন । আমেরিকায় গিয়ে তিনি ‘ইয়েটস্ ও রবীন্দ্রনাথ’ বিষয়ে গবেষণা ক’রে  পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি সাফল্যের সঙ্গে অর্জন করেন । বিদেশবাসকালে ১৯৬৩ সালে শিকাগোতে তিনি শিল্প-সমালোচক ও পরবর্তীতে বিদেশি টেলিভিশনের অভিনেত্রী ম্যারিয়ন ব্রাওয়ারের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন ।  উল্লেখ্য যে, পারিবারিক ঐতিহ্যের অনুবর্তী হয়ে প্রণবেন্দু নিজেও চিত্রাঙ্কনচর্চা করেছেন এবং সেইসঙ্গে একজন প্রতিষ্ঠিত চিত্র-সমালোচকও হয়ে ওঠেন । দেশে ফিরে অধ্যাপনা করাকালে ১৯৬৪ সাল থেকে ‘অলিন্দ’ নামে একটি মননশীল সাহিত্যপত্র সম্পাদনা ক’রে চলতে থাকেন । ২০০২ সালে তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্রের নখরে’ প্রকাশিত হলে পরের বছর ২০০৩ সালে ওই কাব্যগ্রন্থের জন্যে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ অর্জন করেন । অবশেষে, ২০০৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ক্রমশ নি:সঙ্গ হয়ে পড়া মেধাবী কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকুরিয়ার একটি নার্সিংহোমে ৭১ বছর বয়সে প্রয়াত হন ।

জীবনপ্রেমিক ও আত্মমগ্ন স্বভাবের কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের নীচুস্বরের নম্র-উচ্চারিত কবিতায় এক ধরণের আত্মিক নি:সঙ্গতা ছায়া ফেললেও তারই মধ্যে তাঁর কবিতায় খুব সাবলীল টানে বারবার উঠে এসেছে জীবনের কথা, জীবনকে ছুঁতে চাওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে । তারই দৃষ্টান্ত হিসাবে তাঁর কবিতার আর-সামান্য কিছু  উদ্ধৃত ক’রে প্রবন্ধের ইতি টানা যাক —-

“কঠিন বিষয় আমি কখনো মানিনি ।

এই অপরাধ হোক জ্যোৎস্নার ভেতরে জানাজানি ।

 

যদি ক্ষমা কর, ভালো ; যদি ভর্ৎসনা কর, তাও ভালো ;

এই সরলতা হোক জ্যোৎস্নার ভেতরে জানাজানি ।।”

(স্বীকারোক্তি / নিজস্ব ঘুড়ির প্রতি / প্র. দা.)

—– এবং —–

“ঘুরে ফিরে, সমুদ্রের কথা ভাবি

ঘুরে ফিরে, পাহাড়ের কথা ভাবি

ঘুরে ফিরে মানুষের কথা ”

(এখন চল্লিশে এসে / মানুষের দিকে / প্র. দা.)

[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

Dipak Bandyopadhyay GALPERSAMAY CARD

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ