
জানার শেষ নাই, জেনে তাই কাজ নাই। হীরক রাজার সভাকবির রচিত এই নীতিবাক্য চমকে দিয়েছিল সেইসময়। মনে মনে শিউরে উঠেছি অনেকেই, কি ভয়ঙ্কর সেই দেশ, কি ভয়ঙ্কর সেই সময়। হীরক রাজার দেশে সিনেমা মুক্তি পাওয়ার ৪০ বছর পর, আমার বয়স আরও ৪০ বছর এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছে , সেটাই বোধহয় সত্যি হতে চলেছে। কতটুকু জানতে পারলাম এই ৪০ বছরে। বরং এক একটা বই পড়ার পর আরও একটু হীনমন্যতা ঘিরে ধরে, কতটুকু জানি এই বোধ আকড়ে ধরে। এখন এই উপলব্ধি হচ্ছে, একটা নতুন বই পড়ার পর বুঝতে পারি আমরা কত কিছু জানি না। বিপুলা এই পৃথিবীর রহস্য ভান্ডারের কতটুকু জানতে পারেন একজন মানুষ, তাঁর এক জীবনে? গুপি বাঘার সেই সংলাপ কত কি জানার, কত কি দেখার সবই তো বাকি, কিছুই তো দেখা হয় নাই- সত্যিই মনে হয়, একটা জীবন প্রায় অতিক্রম করে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। ছোটবেলায় মনে হত, একটা ক্লাসে পাস দিয়েছি মানে সেই ক্লাসের, সবই জেনে গেছি। এখন বোধ হয়, বড্ড ছোট ছিলাম সে সময়। পাঠ্যবই থেকে আমরা বেশির ভাগ পড়ুয়াই পরীক্ষায় পাস করার নম্বর তুলতে চেয়েছি। খুব কম সময়েই আরও কিছু জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছ। কারণ স্কুলে অথবা কলেজের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াই ছিল পড়ুয়াদের একমাত্র টাস্ক। এই কারণেই সিলেবাসের বাইরে থাকা একটা লেখাও আমরা পাঠ্যবই থেকে পড়ি নি। এমনকি পাতা উল্টেও দেখিনি। ৪২০ কোটি বছর আগের সৃষ্ট এই সৌরমণ্ডল, এই সৌরমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা অগণিত গ্রহ, তারা-তার কতটুকু জানতে পেরেছি আমরা? দীর্ঘ সে অতীত, অতীতে বাস করা মানুষ, না-মানুষ, প্রকৃতির কিছুই জানতে পারে নি মানুষ। বতর্মানেরও বা কতটুকু জানি? সবথেকে দুঃখের, কতটা যে জানতে পারি নি, সেটাই জানি না ভালো করে। এখন মনে হয় পড়াশোনা মানুষকে কিছুটা শেখায় তো বটেই, তবে তার থেকেও বেশি শেখায় এই সত্য যে আমি কিছুই জানি না। তাই মনে হয়, মানুষ যত বেশি পড়ে, সে তাঁর অজ্ঞানতার কথা ভেবে ততই হীনবল হয়ে পড়ে, হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। পড়াশোনা মানুষকে অনুসন্ধিৎসুই করে তোলে। নতুন কিছু পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। জ্ঞানের ভান্ডার যত বাড়ে, ততই জ্ঞানসাগরের অতল সমুদ্রের গভীরতা চোখে পড়ে, উপলব্ধি হয় কোন অতলে তলিয়ে যেতে হবে, তার একাংশও জানার জন্যে। ব্যাস জ্ঞান বোধহয় এইটুকু শিক্ষাই দেয়।
এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, যে মানুষেরা নিজেকে সবজান্তা হিসেবে জাহির করেন, যিনি দাবি করেন, অনেক কিছু জানেন, তিনি আসলে অ আ ক খ-টাও জেনে উঠতে পারেননি ভালো করে। তাই সব জানার দাবি করতে পারছেন। জ্ঞান মানুষকে এই উপলব্ধিই দেয় বিপুলা এই পৃথিবীতে সে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র এক প্রাণী, কালের একটি পলক ফেলার আগেই সে নিঃশেষ হয়ে যাবে। যে যতই পড়ুন না কেন এই মহাবিশ্ব, এই পৃথিবী, এই পৃথিবীর মানুষ-তাঁদের জীবন, ইতিহাস, ভূগোল সম্পর্কে অতি অল্পই জানতে পেরেছ সে। অতি অল্পই। জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে। না করে কোন উপায়ই নেই তার।
সত্যিই যদি জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে তোলে তাহলে সেই জ্ঞান ফলাবার. আমি কতটা জানি, তা দেখানোরও কোন প্রয়োজন হয় না। কারণ সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ার কথা, কতটা সে জানে না। তাহলে উপলব্ধি এইরকমই হওয়া ভালো বোধহয়, এই বিষয়টা আমি জানি, ও জানে না। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে, যা উনি জানেন, কিন্তু আমি জানি না। উদাহরণ দিয়ে যদি সমুদ্রের গভীরে যাওয়া কোন মৎস্যজীবীর সঙ্গে কোন বিদ্বানের তুলনা করি। একজন মৎস্যজীবীকে সমুদ্রের গভীরে যেতে হয়, তাঁর জীবিকার প্রয়োজনে। তারপক্ষে হয়তো স্কুল, কলেজ যাওয়া সম্ভব নয়। এরকমও হতে পারে তাঁর অক্ষর পরিচয়ও হয়নি, বা হলেও সেই অক্ষর জ্ঞানে কোন বই পড়ে তার অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। একজন বিদ্বান মানুষের অবস্থান সম্পূর্ণ তার বিপরীতে। তিনি জীবনে অনেক বই পড়েছেন, এমন অনেক বিষয়ে তিনি অবহিত, যা হয়তো তাঁর আশেপাশের আর কেউই জানেন না। শক্ত শক্ত বিষয়ের মোটা মোটা বই পড়ে অনায়াসে তার অর্থ নিজের মতো করে উপলব্ধি করতে পারেন। এখন এই বিদ্বান মানুষটি যদি মৎস্যজীবীকে মুর্খ বলে ভাবেন এবং সে যে কিছুই জানেন না, এটা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগেন, তাহলে কি ওই বিদ্বান মানুষটি সম্পূর্ণ ঠিক কাজ করবেন? আমার মতে নয়। কারণ সমুদ্র সম্পর্কে ওই বিদ্বান মানুষের জ্ঞান বই পড়ে কিছুটা হলেও হতে পারে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগবে সেই জ্ঞান? জোয়ার ভাটা, সমুদ্রের জলের স্রোত দেখে সমুদ্রের মতিগতির আন্দাজ পাওয়া, আকাশের একখণ্ড মেঘই যে প্রলয়ঙ্কর ঝড় হয়ে আছড়ে পড়তে চলেছে – তা একজন মৎস্যজীবী যেভাবে জানেন, সেভাবে কি জানেন ওই বিদ্বান মানুষটি? মোহনার স্রোত দেখে অনেক মৎস্যজীবী নিভুর্লভাব বলে দিতে পারেন ইলিশের ঝাঁক মিলবে কি না সেখানে। তাহলে এইগুলোও কি জ্ঞান নয়? নাকি ওই বিদ্বান মানুষটির বই পড়াই প্রকৃত জ্ঞানীর সংজ্ঞা? বিদ্বান যে জ্ঞানী, সে বিষয়ে কেউ অস্বীকার করছি না। একটিও বই না পড়ে ওই মৎস্যজীবী বাস্তব জীবন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছেন, সেটাও কি জ্ঞান নয়? কারের পক্ষেই কি তা অস্বীকার করা সম্ভব? যদি কেউ অস্বীকার করেন, তাহলে বুঝতে হবে, যত বই-ই তিনি পড়ুন না কেন, তিনি জ্ঞান আহরণ করতে পারেন নি।
এত কথা বলে মনে হচ্ছে, একটু টাইপ করতে শিখে আমিও কতটা জ্ঞান ফলালাম। আমি যে কথাগুলো লিখলাম, তা হয়তো সবারই জানা। তাহলে তারপরেও কেন লিখলাম? নিজের নাম দেখার লোভে? নাকি ওই, আমি কতটা জানি, তা জাহির করার অমোঘ, অপ্রতিরোধ্য বাসনায়?
[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।