
২৬ অগাস্ট, আকাশবাণীর ১০০ বছর পূর্তি হল এ বছর। ভাবতে ভাল লাগে এই শতায়ু আকাশবাণীর একটি কণা ছিলাম আমরা। বড় গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকব তা ছিল স্বপ্নের অতীত। তবুও চোরা স্বপ্ন একদিন সফল হল। সালটা ছিল ১৯৮৮। প্রথম বছর অডিয়েন্স রিসার্চ ইউনিটে কাজ করা। তারপর এক বছরের মধ্যে মূল প্রোগ্রাম বিভাগে কাজ করার সুযোগ পাওয়া। সে কী উন্মাদনা তখন। ডিউটি রুম, স্টুডিওর ভিতর, নাটক বিভাগ, সঙ্গীত বিভাগ। চারিদিকে শুধু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ভিড়।
শুরু মাত্র ৬০ টাকার বিনিময়ে জীবনের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট শুরু। ইন্টারভিউ নিতে যেতে হবে আলিপুর আবহাওয়া দফতরের অধিকর্তার। শহর কলকাতার রাস্তাঘাট তথন চেনা ছিল না। বাবা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রথম দিন। সেই অনুভূতি অনন্য। রেকর্ড বন্দি হল অধিকর্তার কথা। তারপর অফিসে ফিরে এসে তাকে ট্রান্সফার করা স্পুলে। সিনিয়র দাদাদের সাহায্য নিতে হয়েছিল। অডিও এডিটিং তাদের কাছে শেখা। প্রথম মাসে দুটো অ্যাসাইনমেন্ট মিলেছিল অর্থাৎ ১২০ টাকা। কি যে আনন্দ, তা বলে বোঝানো যাবে না।
ধীরে ধীরে আমার কাজের পরিধি বাড়তে থাকল। ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিভাগে কাজের সূত্র ধরে অনেক বড় বড় কারখানায় শ্রমিকদের কথা তুলে ধরতাম। কাজের ফাঁকে সংস্কৃতি চর্চা হয় কিনা তা জানার জন্য একটা অভিনব অনুষ্ঠান হত। নাম ছিল কারখানায় সংস্কৃতি চর্চা। গতানুগতিক জীবনের বাইরেও যে অন্য জগত আছে, মূলত তাই ধরা হত এই অনুষ্ঠানে। কেউ গান, কেউ কবিতা, কেউ বা প্রবন্ধ পাঠ করতেন। এ যেন ছিল তাদের বাড়তি অক্সিজেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে আমরা তুলে ধরতাম নানা সরকারি অনুষ্ঠান। সেখানে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছিল। মনে পড়ে গেল রাজভবনে যাওয়ার কথা। অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে কি যে খুশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক হাত দূরে বসে আছেন তৎকালীন রাজ্যপাল প্রয়াত নুরুল হাসান। প্রতিভা আগরওয়ালের বুক রিলিজ অনুষ্ঠান ছিল সেটা। ছোট্ট রেকর্ডারে ধরা হল পুরোটা। এসে রেডিও রিপোর্ট তৈরি করে দিলাম। সেদিনই সম্প্রচার হল সেই অনুষ্ঠান।
স্পোকেন ওয়ার্ড বিভাগে এলাম প্রাত্যহিকীর হাত ধরে। টানা কাজ আবর্তিত হল। একটা বিষয়ের উপর শ্রোতাদের চিঠি আসা, এবং পড়ে সেই চিঠি নির্বাচন করতেন প্রোগ্রাম এগজিকিউটিভ। নির্বাচিত সেই বিষয়ে তখন নানা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মত সংগ্রহ করতে হত। কে ছিলেন না সেই তালিকায়। কৃষ্ণা বসু, অন্নদা শংকর রায়, লীলা মজুমদার, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী যূথিকা রায়, সুপ্রভা সরকার, অভিনেত্রী সরযূবালা দেবী সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী-সহ আরও কত কে। সেছিল এক ঘোর লাগা কাজের সময়।
গিয়েছিলাম লালবাজার, সে আরও এক অন্য অভিজ্ঞতা। হাতে রেকর্ডার নিয়ে শুধু গেটে বলে ঢুকে যাওয়া। ৯০-এর দশকে বেতার মানে ছিল এক বিশেষ ব্যাপার। অ্যাসাইনমেন্ট পেলাম তৎকালীন পুলিস কমিশনার বি কে সিং-এর সাক্ষাৎকার নিতে হবে। টেবিলের এপাশে আমি আর ওপাশে নগরপাল। বুক ঢিপঢিপ করছিল। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে অন করলাম রেকর্ডার, বন্দি হল উত্তর। বিষয় কী ছিল আজ আর মনে নেই।
কাজ করেছিলাম বাজেটের সময়, রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাম কমা- বাড়ার উপর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া নিতে হত। যাকে সাংবাদিকদের পরিভাষায় বলে ভক্সপপ। ডালহৌসী অফিস চত্বর থেকে শেয়ার মার্কেট খবর সংগ্রহ করেছিলাম।
আর পুজো আসার আগে তো কোনও কথাই নেই। কে কোন জেলার পুজো কভারেজের দায়িত্ব পাবে তা নিয়ে আকাশবাণীর করিডোরে চলত গুঞ্জন। ডিএমের গাড়ি করে জেলার বিশিষ্ট পুজোর প্রস্তুতি তুলে আনার গুরু দায়িত্ব ছিল কাঁধে। সে যে কি উন্মাদনা আর সঙ্গে সম্মান , তা আজও মনে পড়লে ভাল লাগে। নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এই তিনটে জেলা কভারেজ করেছিলাম একেক বছরে। এ পর তো শুরু হত প্রোডাকশনের কাজ। স্ক্রিপ্ট লেখা, মিউজিক পছন্দ করা ইত্যাদি। এডিট রুম পাওয়া নিয়ে সমস্যা। ইট পেতে রাখতে হত। ঘোষক বা ঘোষিকাদের দিয়ে ভয়েস ওভার করাতে হত। পুজোর অনুষ্ঠানের এডিটিং এক জন সিনিয়রকে দিয়ে করাতাম। অসাধারণ তাঁর মিক্সিং-এর কাজ। এই ফাঁকে তাঁর প্রতি আরও একবার কৃতজ্ঞতা জানালাম।
এরকম আরও অনেক অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছি। যা পরের পর্বে বলব। এবার এটুকুই থাক।
[ মতামত ও বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

Tags: গল্পের সময়, গল্পের সময় ব্লগ, রেডিওর গল্প, শাশ্বতী বসু
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।