
ভিনগাঁয়ে কাজ শেষে বিকেলে বাড়িতে ঢুকতে গিয়েই গৌরাঙ্গ বুঝতে পারলো বাড়িতে কোনো গন্ডগোল হয়েছে। দরজা হাট করে খোলা। বৌ শিবানী চৌকির ওপর না বসে, মেঝেতে থেবড়ে বসে, দেয়ালের দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে কী সব যে বলছে, গৌরাঙ্গ বুঝতে পারলো না। শিবানীর শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সেদিকে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। গৌরাঙ্গ-র পেছনে যে রাসুও আছে, এটা যেন সে জানেই না। নিজের যন্ত্রপাতি রাখার ব্যাগটা শব্দ করে নামালো গৌরাঙ্গ, আর সেই আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকালো শিবানী। গৌরাঙ্গ দেখলো – শিবানীর মুখ ফোলা, চোখের কোনে জলের দাগ। পেছনে তাকিয়ে তাই সে রাসুকে দশটা টাকা ধরিয়ে বললো – ক’টা বিড়ি নিয়ে আয় তো, সাজুর দোকান থিকে, তাইরপর বাড়ি যাস।
রাসু একটুখানি অবাক হয়ে তাকালো, তারপর ওর সাইকেল থেকে কাঠের বাক্সটা নামিয়ে, টাকাটা পকেটে পুরে, সাইকেল হাতে নিয়ে আবার বেরিয়ে গেল। শিবানীও এই সময়ে গায়ের কাপড় সামলে উঠে এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের মাঝখানে। রাসু বেরিয়ে যেতেই, ধরা গলায় বললো – টুম্পা এখুনো বাড়িতে ফিরে নাই।
– গেছলো কুথায়?
– টিউশানি পইড়তে।
– দিয়ে, তা’পর?
– ফিরার সুময়, পথে বন্ধুদের ও বুলেছে, ফুনটা একটু গন্ডগোল কইরছে। তোরা এগাইয়ে যা কেনে, আমি আইসছি।
– তাইলে? ফুনের দুকানে গিয়া জিগাইছিলে?
– কাকে জিগাইব ? ওর ফুন তো বাড়িতেই।
– আঁই? তয় তো এখুন ফাঁড়িতে গিয়্যা রিপোট কইরতে হয়, নাকি?
– থাক, থানা-পুলিশ কইরে আর কাজ নাই।
– কী বুইলছ তুমি? তাইলে কি তুমি জানো, ও কুথায় গিইছে?
– কুথায়, জানি না।
– কার সঙ্গে গিইছে, সেটা লিশ্চয়ই খপর লিছ?
– এখন সিসব জাইনলেও আর লাভ নাই, সি ফিরি আইসবেক নাই – বলেই আঁচলটা মুঠো করে ধরে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলো শিবানী।
ঠিক এমন সময় টুম্পার ফোনটা বেজে উঠলো। পড়ি কি মড়ি করে ছুটে গিয়ে ফোনটা ধরলো শিবানী। এগিয়ে আসছিল গৌরাঙ্গ-ও। তাই দেখে, শিবানী হাত নেড়ে ওকে দূরে সরে থাকার ইশারা করলো।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো গৌরাঙ্গ। তারপর কাঠমিস্ত্রির সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তিতে পা ঘষটে ঘষটে এগিয়ে যেতে লাগলো বাইরের দরজার দিকে। দরজার পর্দা হাওয়ায় নড়ছিলো। তাতেই দেখা গেল, ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে রাসু।
– তুঁই তো সবই শুইনতে পেয়ি গেছিস, লয় কি? ঘরঘরে গলায় যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলো গৌরাঙ্গ।
– এখুন তাইলে কি কইরবে, মিস্ত্রি?
রাসুর কথায় কোনো জবাব না দিয়ে, হাত বাড়িয়ে ওর কাছ থেকে বিড়ি ক’টা নিয়ে, নিজের বুকপকেটে রাখা দেশলাইয়ের বাক্স বের করে জ্বালাতে গেল গৌরাঙ্গ। প্রথম কাঠিটা বাক্সে ঘষতেই, কাঠিটার ডগা ভেঙে জ্বলন্ত বারুদ ঠিকরে পড়লো সামনের উঠোনে, পড়েই নিভে গেল।
উঠোনের একপাশে তুলসিমঞ্চ, আর একপাশে একটা ঝোপড়া আমগাছ। মেয়েটার আবদারে ওর ছোটবেলায়, এই আমগাছের ডালে একটা দোলনা টাঙিয়ে দিয়েছিল সে। মেয়েটা ছোট্ট একটা ফ্রক পড়ে, চুলের দুপাশে দুটো গার্ডার বেঁধে এই দোলনায় সুযোগ পেলেই দুলছে – চোখ বুঁজলেই এখনো দেখতে পায় গৌরাঙ্গ। একদিন পড়েও তো গেছিল এই দোলনা থেকে। তখন কী আফশোস হয়েছিল ওর। মনে হয়েছিল মেয়েটার চোট না লেগে যদি ওর নিজের চোট লাগতো – ওর পক্ষে সহ্য করা সহজ হতো।
শিবানী এসে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে। চোখ না ফিরিয়েও বুঝতে পারলো গৌরাঙ্গ। রাসু চলে গেছে বাড়ির পেছনদিকে। ওখানে একটা চালাঘর তৈরি করে রাখা আছে। ওখানে বাতিল কাঠের টুকরোগুলো বাক্স থেকে বের করে রাখছে, বোধহয়। শিবানী পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো ওর কাছে। তারপর ওর হাত নিজের মাথায় ঠেকিয়ে বললো – তুমাকে একটা কথা কিন্তু দিতিই হবে। আইজকে রাতেই উরা চইলে যেছে, ইখান থিকে। তুমি কিন্তু কুনো বাধা দিতে পাইরবেক নাই। উয়ারা যখন বেছেই লিছে, নিজেদের …..
আরো কীসব যেন বলছিল শিবানী। গৌরাঙ্গর মাথায় কিছু ঢুকছিল না। মেয়ের মা যখন মেনে নিয়েছে, ঠিক আছে, ও না হয় কিছু বললো না। কিন্তু, কাল থেকে পাড়ার লোকেরা তো জেনে যাবে, তাদের কী বলবে? সবাই আঙুল তুলে দেখাবে ওকে – ঐ যে, ওর মেয়েটাই পাইলেছে, তখন? পরে আবার সে ভাবলো – মেয়ের মায়ের যখন আপত্তি নেই, তখন ও একাই কেন আর আপত্তি করবে? কে জানে কাকে পছন্দ করলো মেয়েটা। সেরকম হলে, ও-ই না হয় মেনেই নিতো, নয়তো আগে থেকেই চলে যেতো দূরে কোথাও কাজ নিয়ে।
শিবানী ঘর থেকে বেরিয়ে এলো দু’থালা মুড়ি নিয়ে। – আইজকে ভাত আর চাপাই নাই। তুমরা দুইজনে এই ক’টা খেইয়ে লাও। সারাদিন তো জুটে নাই কিছু।
আকাশের দিকে তাকালো গৌরাঙ্গ। ঝাঁক বেঁধে পাখিরা সব তাদের বাসায় ফিরে আসছে।
শিবানীকে দরজাটা বন্ধ করতে বলে রাসুকে সঙ্গে নিয়ে পথে নামল গৌরাঙ্গ। হাতে একটা মাঝারি গোছের বাজারের ব্যাগ – ওই ব্যাগেই থাকে তার কাঠের কাজ করার যাবতীয় যন্ত্র। রাসু আড়চোখে একবার তাকিয়ে নেয় ওই ব্যাগটার দিকে। ব্যাগের ভিতর কয়েকটা জিনিসের ওপর ওর অনেকদিনের লোভ। কিন্তু কোন উপায় নেই , এমনকি খুব দরকার না পড়লে গৌরাঙ্গ ব্যাগটা ওকে ধরতেও দেয় না।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু এগোতে না এগোতেই হঠাৎ করে গৌরাঙ্গ রাস্তার পাশের বাঁশবনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর একটা বিড়ি রাসুকে এগিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করে – আইজকে রাতে একটু আমার সঙ্গে থাইকতে পারবি? কালকে তাইলে দুজনেই আর কাজে যাবোক নাই। ঘরে বল্যে আইসবি?
রাসু একটুখানি কী যেন চিন্তা করে। তারপর বলে – ঘুইরে আসি তাইলে একবার ঘর থিকে। বুইলব না হয় – জরুরি একটা কাজের লিগে ফিইরতে দেরি হব্যে।
– সেই ভালো। তুই এখুন ঘর থিকে ঘুইরে আয়, আমি এখুন স্টেশন থিকে একটা কাজ সেইরে আসি। তুর কাজ সারা হইলে পর, সাজুর দুকানের সাইমনে চইলে আসিস, আমাকে না পেইলে টুকুন বইসে থাকিস।
হাঁটাপথে স্টেশন দশ থেকে বারো মিনিট। গৌরাঙ্গ পা চালিয়ে হাঁটতে শুরু করে। এখনো পর্যন্ত কেউ কিছুই জানে না। তাই, কেউ ফিরেও তাকায় না, ওর দিকে। স্টেশনে ওঠার মুখে দেখা হয় রিক্সাওয়ালা হীরুর সঙ্গে। হীরু জানতে চায় – চইললে নাকি কুথাও?
গৌরাঙ্গ মাথা নাড়ে। বলে – একটা খোঁজ লিয়ে আইসছি। প্ল্যাটফর্মে উঠে দেখে শেষ ডাউন ট্রেনটা তখনো যায়নি। স্টেশনে বেশ কিছু লোক। হনহন করে স্টেশনের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত হাঁটতে থাকে গৌরাঙ্গ। আবার ওপার থেকে এপারের দিকে এগিয়ে আসে। জোরালো আলো জ্বেলে ট্রেন আসতে থাকে। লোকজন এগিয়ে আসতে থাকে প্ল্যাটফর্মের ধারেকাছে। পেছন থেকে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গৌরাঙ্গ। ট্রেন আসে, থামে। অনেক লোক নামে। যারা দাঁড়িয়ে ছিল, এবার তারা টপাটপ উঠে পড়ে। ট্রেনটা তবুও কয়েকটা মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ হুইসেল বাজিয়ে চলতে শুরু করে। নেমে আসা লোকজন ওর দুপাশ দিয়ে এগিয়ে চলে যায় রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে। স্টেশন ফাঁকা হয়ে যায়।
মাথা নিচু করে স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসে গৌরাঙ্গ। এই ট্রেনে তো ওরা উঠলো না। এখন তো আর বেশ কিছুক্ষণ কোনো ট্রেন নেই। একটা আছে, সে তো রাত দেড়টায়। সেটাই কি ধরবে ওরা? এলাকায় তখন কেউ থাকবেনা বলে, ঐ সমযটাই কি ওরা পছন্দ করেছে? ভাবতে ভাবতে হোঁচট খায় গৌরাঙ্গ। ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো ঝমঝম করে ওঠে। এখনো তাহলে অনেকটা সময়। সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত লাগে খুব এইসময়। ব্যাগটা হাতে নিয়ে, সামনের দিকে ঝুঁকে টলতে টলতে হাজুর দোকানের দিকে এগিয়ে যায় গৌরাঙ্গ।
কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে থাকে রাসুর জন্য। তারপর রাসু এসে গেলে ওর কাঁধে হাত রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলে – চল এখুন ঘরে যাই। উখানে পৌঁছে কয়েকটা কথা ঠিক করি নিতে হবে। হাতের ব্যাগটা এবার রাসুর হাতে ধরিয়ে দেয় সে। রাসুর কেমন যেন একটু হালকা লাগে ঐ ব্যাগ। তবুও কোনো প্রশ্ন না করে পিছনে পিছনে হেঁটে এসে দুজনে গৌরাঙ্গর বাড়িতে এসে পৌঁছে যায়।
বাইরের দরজাটা হাট করে খোলা। যেন মেয়েটা নেই বলে, আগল রাখার দরকারটুকুও ফুরিয়েছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে উঠোনের একপাশে এসে দাঁড়ায় সে। সন্ধ্যার আধো আধো অন্ধকারে সে দেখতে পায়, রান্নাঘরের একপাশে কাঠের উনুনে অ্যালুমনিয়ামের হাঁড়িতে ভাত চাপিয়েছে শিবানী। হাঁড়ির নিচেটা কাদা দিয়ে লেপা। দাউদাউ করে জ্বলছে আগুন। বাঁ-হাতে করে একটু একটু কাঠ এগিয়ে দিচ্ছে সে উনুনের ভেতরে। এদিকে হাঁড়ির ভেতরে টগবগ করে ফুটতে ফুটতে অস্থির হয়ে ওঠা চাল আর জল যেন কতো কথাই না বলছে শিবানীর সঙ্গে।
রাসু আড়চোখে একবার দেখে নেয়, শিবানী আর গৌরাঙ্গকে। তারপর বলে – আর তো বুধহয় তুমি কুথাও যাব্যেই না। আমাকে আর তা’লে রাইখ্যে কী হব্যে? আমি ঘর চল্যে যাই, এইবেলা।
শিবানী ঘাড় ফিরিয়ে দেখে। একসাথে এদের দুজনকে দেখে বেশ খানিকটা স্বস্তি বোধ করে। তারপর বলে – ভাতটা চাইপ্যেই দিছি। একমুঠ খেইয়ে তবে যাস। রাসু আড়চোখে একবার গৌরাঙ্গর দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় – তার মনমেজাজ এখন কেমন। সেটা খুব জুতের নয় দেখে বলে – আইজকে থাক বউদি, আমি বরং আর একদিন এইস্যে খেইয়ে যাব।
– শিবানী বলে – আমি যে তুয়ার সুদ্ধু চাল-ও নিছিলাম রে।
– সি যাই হোক। এখুন তো সবে সইন্ধ্যে। আমি চইল্যেই যাই।
রাসু চলে গেলে, একটা চটের বস্তা টেনে শিবানীর কাছে এসে বসে পড়ে গৌরাঙ্গ। বলে – মিয়াটা তো হামারো, টুকুন আগে কিছু বইল্যে না।
শিবানী সহসা জবাব দেয় না। তারপর বলে – কিন্তু আমি তো তাকে পইপই কইরে বারণ করলাম, শুইনলো কুথায়। বললাম, একটাই মিয়া তুঁই। এখন পড়াশুনা কর। তুর বাবা তুর জন্যে ঠিক সময়ে ব্যবস্থা কইরবে।
– কলেজে ভর্তি কইরেই কি বিপদটা হইলো? বাড়িতে থাইকলে –
– মেয়েটাকে কি কৌটায় পুইরে বন্ধ কইরে রাইখতে? সে বাইরে কি আইসতো না?
– আমি তো ভাইবলম যে সন্ধ্যায় শেষ ডাউনের ট্রেনটই হয়তো ধইরবে উয়ারা। তাই স্টেশনে গেইছিলম।
– সিটা তো আমি আন্দাজ করেইছিলম। তবে, সিখানেই যদি গেইলে, কাজে যাবার ব্যাগটা লিয়ে গেইছিলে কেন?
– গেইলাম। এই ব্যাগ-ট হাতে থাইকলে লুকে সন্দেহ কইরতে লাইরবে।
– আমি তো ডরাইং গেলম, উই ব্যাগট লিয়ে যাইচ্ছ দিখে।
– ডর লাইগলো? কেনে?
– তুমার ব্যাগে তো ধারালো হেতেল খুব কম নাই।
– তা সিটা ভাইবলে, সিগুলান লিয়ে যখন বেইর হলম, তুমি হামাক রুকলে না তো?
উনুনের গোঁড়া থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ টেনে বের করে নিয়ে এসে, শিবানী বললো – আমার মনে লিছিলো যে, উয়ারা তো এখন ইখানে নাই।
– তুমি জাইনতে? তাও হামাকে কুছু বল নাই?
– লিচ্চয় কইরে জানতম না, তবে উয়ারা যখন ফুন করছিল, তখনই আমি আশেপাশের লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ পেইয়েছি। উ বুধহয় ট্রেনে উইঠে পড়েই আমাকে ফুন কইরেছিল।
উঠে পড়লো শিবানী। একটা ঢাকনা এনে চাপা দিল হাঁড়ির মাথায়। এবার একটা ন্যাকড়া দিয়ে ঢাকনাসুদ্ধু হাঁড়িটাকে তুলে ধরে এগিয়ে চললো সেটাকে উপুড় করে দিতে।
একটু পরে ফিরে এসে শিবানী হাত রাখলো গৌরাঙ্গ-র কাঁধে। বললো – লাও, ইভাবে উঠোনের মাইঝখানে বইসে না থিকে, ইবার গা ধুইয়ে আইসো চট কইরে। সকালের সবজিটো গরম করি, খেইয়ে লাও।
– আজকে আমরা শুধু দুইজনেই খাইবো?
– কী আর করা যাব্যে, একদিন তো ইরকম হতুই।
– বড্ড বেশি হুড়াহুড়ি কইরেই দিনটা চইলে এইলো।
শিবানী জবাব দিলো না। দরজার কাছে ওর ব্যাগটা নামিয়ে রাখা দেখে জানতে চাইলো – কী লিয়ে গেইছিলে, তুমার ব্যাগে।
– রেইখে দাও, তুইলে। একদিন তো আইসবেকই। তখনই না হয় দিও উয়াদের হাতে।
অন্ধকারে তো ঠিক দেখতে পাওয়া যায় না। তাই একটা কুপি জ্বালিয়ে ঘরের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো শিবানী। দরজার চৌকাঠের ওপাশ থেকে যখন সে বেরিয়ে আসছে, তখন তাকে দেখে অনেক আগের দেখা শিবানীর মুখ মনে পড়লো গৌরাঙ্গর। আর একই সঙ্গে মনে পড়লো, টুম্পা বড়ো হয়ে ওর মায়ের মতোই এক-একদিন আলাদা কাপড় পড়ে সন্ধ্যা দিতে আসতো উঠোনের ধারের ঐ তুলসিতলায়। মেয়েটা কি এখনো ট্রেনে করে যাচ্ছে? নাকি সে নেমে পড়েছে এখন? নতুন একটা বাড়িতে পৌঁছে গেছে হয়তো এখন। ওকে কেউ বরণ করে নিচ্ছে তো? শিবানী কিন্তু এই বাড়িতে এলে, ওর সামনে নতুন বাড়ির কেউ একজন একটা থালায় দুধ আর জল মিশিয়ে মাটিতে নামিয়ে রেখেছিল। আলতা পড়া তার পা সেই থালায় রেখে শিবানী এই বাড়িতে প্রথম এসেছিল।
কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছিল, তবুও নিজেকে নিজেই শাসন করে বারবার বলছিল গৌরাঙ্গ – শিবানী যখন কাঁদছে না, তখন পুরুষ মানুষ হয়ে, ওর চোখের জল ফেলাটা মোটেও ভালো দেখায় না। ঠিক এই সময়ে কোনো একটা রাতচরা পাখি যেন উঠোনের পাশের আমগাছের ডালে বসে শিস দিয়ে ডেকে উঠলো। চমকে উঠে সেই আমগাছের দিকে তাকালো গৌরাঙ্গ। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেছে – ওর মনে হলো। আমগাছের সবটুকুও যেন একবারে তার নজরে এসে পড়ছে না। তবুও ঐ ঝাপসা চোখের সামনেও এইটুকু সে দেখতে পেলো যে, ঐ আমগাছের ডালে টাঙানো আছে একটা দোলনা। আর সেই দোলনাটা যেন রাতের এই আধো অন্ধকারে অল্প অল্প করে হলেও দুলছে। এই এপাশে আবার হুই ঐপাশে।
[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: Galper Samay, অরিন্দম গোস্বামী, গল্প, দোলনা
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।