
[ অনিন্দ্য সৌরভ। প্রায় চার দশক ধরে বাংলা অনুবাদ কর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। করেছেন একশোটির বেশি গল্পের বাংলা অনুবাদ। উচ্চমাধ্যমিক বাংলা পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর অনুদিত গল্প – ‘অলৌকিক’। পেশাগত জীবনে শিক্ষকতা ছাড়া সাহিত্য চর্চাই তাঁর একমাত্র নেশা। ‘শিল্পসাহিত্য’ নামে একটি মননশীল সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা ছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্যিকের সাহিত্য কর্মের ওপর নানা মননশীল প্রবন্ধ রচনা করেছেন এবং নিয়েছেন তাঁদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। তাঁর এমন নানা কাজ নিয়ে এক বিশেষ আলাপচারিতায় লেখক। আলাপ করেছেন ‘গল্পের সময়’ অনলাইন পত্রিকার অন্যতম সদস্য দেবাশিস মজুমদার। অনুবাদ সাহিত্যের হাল হকিকৎ ও তার সুলুকসন্ধান – এই ছিল আলোচনার বিষয়বস্তু ]
দেবাশিস মজুমদারঃ দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে অনুবাদ করেছেন, একশটির মতন গল্প। প্রথম অনুদিত গল্প কোনটি?
অনিন্দ্য সৌরভঃ প্রথম অনুদিত গল্প – অমৃতলাল নাগরের লেখা ‘নেপথ্য সরকার’ গল্পটি। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে দেশ পত্রিকায়। হিন্দি গল্প। মূল হিন্দি থেকেই অনুদিত।
দেবাশিস মজুমদারঃ আপনি হিন্দি থেকেই বেশি অনুবাদ করেছেন?
অনিন্দ্য সৌরভঃ হ্যাঁ। হিন্দি থেকেই বেশি অনুবাদ করেছি। তবে হিন্দি ছাড়াও ওড়িয়া, অসমীয়া, রাজস্থানী গল্পও অনুবাদ করেছি। ওই ভাষাগুলো আমি জানি। ইংরেজি থেকে খুব কমই করেছি।
দেবাশিস মজুমদারঃ মূলত ভারতীয় নানা ভাষার গল্পের প্রতি আপনার বেশি আগ্রহ, মানে অনুবাদের ব্যাপারে?
অনিন্দ্য সৌরভঃ হ্যাঁ ভারতীয় সাহিত্যের নানা ভাষায় নানা উন্নতমানের সাহিত্য রচনা হয়েছে এবং হচ্ছেও। সেগুলি বাংলার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটা আগ্রহ চিরকাল ছিল। বাংলা ভাষায় বিদেশি সাহিত্য যত অনুবাদ হয়েছে, সেই তুলনায় ভারতীয় সাহিত্য কমই অনুদিত হয়েছে। অথচ ভারতীয় সাহিত্যের নানা ভাষায় খুবই উন্নতমানের সাহিত্য রচনা নানা সময় হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। তাই ইংরেজি অনুবাদের সময় ভারতীয় ভাষার ইংরেজি লেখক আর. কে. নারায়ণের গল্পই ছিল আমার পছন্দের তালিকায়।
দেবাশিস মজুমদারঃ হিন্দি সাহিত্যের লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গল্প অনুবাদ করেছেন কোন লেখকের?
অনিন্দ্য সৌরভঃ কারোরই তিন চারটে গল্পের বেশি করিনি। আসলে পছন্দ হলে তবেই করি। ভীষ্ম সাহানির তিনটি গল্পের অনুবাদ করেছি। এছাড়া নির্মল ভার্মা, শৈলেশ মাটিয়ানি, উদয় প্রকাশ সহ অনেকেই আছেন।
দেবাশিস মজুমদারঃ সাহিত্য একাদেমি থেকে প্রকাশিত বইটিও তো হিন্দি ভাষা থেকেই অনুদিত?
অনিন্দ্য সৌরভঃ হ্যাঁ। কর্তার সিং দুগগাল – এর বইয়ের অনুবাদ। আমি তো পাঞ্জাবি জানি না। দুগ্গাল নিজে ওটি হিন্দি করেছিলেন। তাই ওটি আমি বাছাই করেছিলাম। বইটির নাম ছিল – ‘জ্যোৎস্নারাতের ট্র্যাজেডি’।
দেবাশিস মজুমদারঃ এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি – আপনি তো আগে পারমিশন নিয়ে তবে অনুবাদ করেন? আপনার অনুবাদ প্রক্রিয়াটা শেখবার মতন।
অনিন্দ্য সৌরভঃ হ্যাঁ, অবশ্যই। আগে লেখকের বেশ কিছু গল্প পড়ে মনে ধরা গল্পটির অনুমতি জোগাড় করে তবেই অনুবাদ করি। দুগগাল সাহেবের বইটি যেহেতু সাহিত্য একাদেমির, তাই দায়িত্ব সবই ওদের ছিল। তবে অনুবাদের সময় যখন আমি একটা কাজে দিল্লিতে গিয়েছিলাম তখন দক্ষিণ দিল্লির হাউসখাস অঞ্চলে থাকতেন, ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। কথা হয়েছিল, খুব সুন্দর আপ্যায়ন করেছিলেন। আসলে তখনকার যে সমস্ত লেখকদের পারমিশন নিয়েছি প্রত্যেকেই খুব আন্তরিক ব্যবহার করতেন, উৎসাহিত হয়ে পড়তেন – অনুবাদ হচ্ছে শুনে। ইদানীংকালে সেই উদ্দীপনা চোখে পড়ে না বলব না তবে ব্যতিক্রমী ব্যবহারও পাই। অথচ সে যুগের বহু বিখ্যাত লেখকরা পারমিশন তো দিতেনই। আগ্রহী হয়ে বলতেন –প্রকাশ হলে পত্রিকা বা বইটির একটা কপি দিয়ে যেও, বা পাঠিয়ে দিও।
দেবাশিস মজুমদারঃ আপনার সঙ্গে শিবনারায়ণ রায়ের খুব যোগাযোগ ছিল?
অনিন্দ্য সৌরভঃ হ্যাঁ, শান্তিনিকেতনে পড়াশোনার সময় আলাপ হয়। ওনার ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় আমার দু’টি অনুবাদ গল্প বেরিয়েছিল। বিজয়দান দেথার ‘দ্বিধা’ গল্পটি বেরিয়েছিল। এটি পরে সিনেমা হয় – অমল পালেকর ‘পহেলী’ নামে একটি ছবি করেছিলেন এই গল্পটি অবলম্বনে। এর আগে এই গল্প নিয়েই ছবি করেছিলেন মনি কাউল – ‘দু বিধা’ নামে। অমল পালেকরের ওটা ছিল রি মেকিং ফ্লিম। এছাড়া উদয় প্রকাশের ‘তিরিছ’ নামের একটি গল্পও অনুবাদ করি। তিরিছ মানে সরীসৃপ গোষ্ঠীর তক্ষক। প্রথমটি রাজস্থানী, দ্বিতীয়টি হিন্দি। ওইসময় ওনার বাড়িতে নানা সাহিত্য আলোচনা হত, আড্ডা হত। জিজ্ঞাসা পত্রিকায় দু’টি বড় প্রবন্ধও লিখেছিলাম – একটি অমিয়ভূষণ মজুমদারকে নিয়ে ‘আধুনিক ওডিসি’ আর একটি আবুল বাশারের ‘মরুস্বর্গ’ নিয়ে।
দেবাশিস মজুমদারঃ বাংলা অনুবাদের মূল সমস্যাটা কোথায়?
অনিন্দ্য সৌরভঃ সমস্যাটি হল বইয়ের প্রকাশক আর ভাল পত্রিকার উৎসাহের অভাব। ভারতীয় সাহিত্য এরা প্রকাশ করতে চায় না, যতটা বিদেশি সাহিত্য চায়। আমি যেমন বিদেশি সাহিত্য অনুবাদ করি না। ওগুলো করার অনেক লোক আছে। ফলে বড় পত্রিকার উৎসাহ কম হলে, পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সমস্যা থেকেই যায়। পাঠকের কাছে উপস্থিত করলে তবেই না পাঠক বাড়বে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। মাঝেমধ্যে একটা দু’টো ছাপালে হবে না। আপনি দেখুন না, ভারতের অন্যান্য ভাষার গল্প, উপন্যাস হিন্দি ভাষায় যত পরিমাণে অনুবাদ হচ্ছে, বাংলা ভাষায় সেই পরিমাণ হয় না। বাংলা পাঠক কম বললে হবেনা। বাংলা পাঠক প্রচুর। তাঁদের সামনে ভারতীয় সাহিত্য কম আসে। যতটা নোবেল প্রাপকদের বা অন্যান্য বিদেশি ভাষার লেখকদের লেখা আসে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর উৎসাহও কম। যেমন উত্তরবঙ্গের দৈনিকপত্র ‘উত্তরবঙ্গ সংবাদ’ কিছু করে।এছাড়া ‘অনুবাদ’ পত্রিকা বেশকিছু অনুবাদ প্রকাশ করছে। তবুও খুব আশাপ্রদ নয়। অথচ আগে চতুরঙ্গ, পরিচয়, অনুষ্টুপ এর মতন পত্রপত্রিকা অনেক অনুবাদে উৎসাহ দিত বা দেয়। আমিই করেছি কত অনুবাদ। এছাড়া আরেকটি সমস্যা হল – শব্দের অর্থ। প্রবাদ প্রবচন এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। সবক্ষেত্রে ভাবানুবাদ চলে না। অন্ততঃ খুব কাছাকাছি একটা মানে বের করতে হয়। ঐ জন্য আমার একটু সময় লাগে। আর একটা ব্যাপার হল – হিন্দি বা রাজস্থানী ভাষায় বেশ বড় গল্প লেখা হয়, যেমন – বিজয়দান দেথার কয়েকটি গল্প করেছি ত্রিশ পাতার মতন বড়। সবচেয়ে আলোচিত লেখক উদয় প্রকাশের গল্পগুলোও অনেক বড়। এমনকি আধুনিক লেখকদের মধ্যে মনোজ রূপরা যে প্রায় আমাদের বয়সী, নাগপুরে থাকে। ওর গল্পও তো প্রায় চল্লিশ পৃষ্ঠার কাছালাছি। বাংলাতে এত বড় গল্প লেখা হয় খুব কম। এটা একটা ধারা কিন্তু। দীর্ঘ গল্পের প্রতি ঝোঁক।
দেবাশিস মজুমদারঃ উপন্যাস অনুবাদ করেছেন?
অনিন্দ্য সৌরভঃ না। প্রকাশক নেই। প্রকাশকের অভাব – উৎসাহ দেয় নি। কবিতা করেছি প্রচুর। বাংলায় শুধু আমি নই অনেকেই কবিতা অনুবাদ করেছেন। আমার করা অনুবাদের মধ্যে অসমীয়া কবিতা, ওড়িয়া কবিতা, হিন্দি কবিতা প্রচুর। সীতাকান্ত মহাপাত্র, রমাকান্ত রথ, সৌভাগ্য কুমার মিশ্রদের কবিতার অনুবাদ করেছি। কিন্তু আমার অনুদিত কবিতার কোনও সংকলন নেই। আসলে সাহিত্যের পাঠক খুব কমে যাচ্ছে। ফলে অনুবাদও প্রয়োজন হারাচ্ছে। এটা উপন্যাস অনুবাদকদেরও সমস্যা। পাঠক সব দর্শকে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে, আধুনিক যুগে।
দেবাশিস মজুমদারঃ এবারে একটু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে বলি – বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বা খ্যাতিমান লেখকরা বিদেশি সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক দেখিয়েছেন বা ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে ততটা আগ্রহ দেখান নি। নানা সময়ে আমাদের আড্ডায় এই কথা উঠে এসেছে।
অনিন্দ্য সৌরভঃ একদমই দেখান নি। শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যতিক্রম। মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত’র মতন কয়েকজন ভীষণ আগ্রহী ছিলেন ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে। বাকিদের ব্যাপার অত্যন্ত দুঃখের।অনুবাদের কথা বলতে বিদেশি সাহিত্য যেমন ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য, ফরাসী বা জার্মান সাহিত্য নিয়ে যত আলোচনা করেছেন তার সিকিভাগও ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে করেন নি। তাঁদের অনেকের কোনও ধারণাই নেই ভারতীয় সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। অথচ দেখুন মালয়ালম, কন্নড়, মারাঠি, তামিল ভাষার সাহিত্যে মারাত্মক সব কাজ হয়েছে এবং হচ্ছেও। হিন্দি পত্রিকা ‘ধর্মযুগ’ সারিকা কত ভাল ভাল লেখা বের করেছে। আধুনিক কালে হনস্ এখনও করছে। ওদের লিটল ম্যাগ তদ্ভব, বসুধা পহাল নিয়ে কোথায় লেখালেখি হয়? পহাল-এর জ্ঞানরঞ্জন খুব বড় লেখক। অনুবাদ করেছি। কী লেখালেখি হয়েছে ওনাকে নিয়ে? বরং কবিতা অনুবাদ হয়েছে বেশি অন্যান্য ভাষা থেকে। এটা অতিক্রম করতে না পারলে মোবাইলের দাপটে আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য হারিয়ে যাবে বাংলা থেকে। এটা চিন্তার।
দেবাশিস মজুমদারঃ আধুনিক এ.আই. বা ট্রান্সলেটর কি ভবিষ্যতে অনুবাদক হয়ে উঠবে?
অনিন্দ্য সৌরভঃ না পারবে না। হালকা অফিশিয়াল কাজ পারলেও সাহিত্যের অনুভূতি আর ব্যাখ্যা ওগুলো করতে পারবে না। বিকট কেঠো অক্ষর আসবে। সাহিত্যের মূল রসদ, ভাবনা। অক্ষর বদল নয়। অনুবাদ আক্ষরিক নয় কখনও। যেমন ধরুন আমি সত্যজিৎ রায়ের একটি গল্প হিন্দিতে অনুবাদের চেষ্টা করেও ছেড়ে দিয়েছি – কারণ হিন্দিতে ভাবতে পারিনা বলে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্য ভাষা পড়তে পারা, বলতে পারা আর সেই ভাষাকে নিজের ভাষার মতন করে বদলে লেখা এক নয়। এখানেই মাতৃভাষার গুরুত্ব। প্রতি মূহূর্তে ভাবনাগুলো খুব জরুরি। এটা মনে রাখতে হবে যে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক নয় কোনও কিছুই।
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: গল্পের সময়, দেবাশিস মজুমদার, পাঠক সব দর্শকে পরিণত হয়ে যাচ্ছেঃ অনিন্দ্য সৌরভ, সাক্ষাৎকার
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।