14 Apr

চৈত্রদিনের হাওয়া

লিখেছেন:মিতালী মিত্র


MITALI MITRA GALPERSAMAY CARD

বসন্তর শেষবেলায় যখন চৈত্রদিনের হাওয়া বইতে শুরু করে তখন বাঘের ডাক শুনতাম আমরা রাত বিরেতে। গুম গুমে সেই ডাকে ঘুম ভাঙা আমরা ভাইবোনেরা গুটিশুটি চাদর মুরি, চোখ টিপে নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকতাম। শহরের একদিকে রাজবাড়িতে বারোদোলের মেলায় আসত সার্কাস, আর সেই সার্কাসের বাঘই অমন পিলে চমকানো ডাক ছাড়তো। জলঙ্গী নদীর ধারে শহরের আর এক প্রান্ত থেকে সার্কাসের সার্চ লাইট দেখে যতটা আনন্দ হতো, বাঘের ডাকে ততটাই ভয় থাকতো। তবে শুধু তো ভয় নয়, সে একটা দুরন্ত উত্তেজনা থাকতো, পরদিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে এই দুটির গল্প চলতো। যে ডাক শোনেনি, যে আলোটা দেখেনি, তাকে দুয়ো দেয়া হতো।

বারোদোলের মেলা আমাদের মফঃস্বল শহরের একটা দুরন্ত উন্মাদনা নিয়ে আসতো। প্রত্যেক মেলার একটা আলাদা গন্ধ আছে। হইচই হাঁকডাক বাদ দিলেও এই গন্ধেই মেলার পরিচয় ঠিক খুঁজে পাওয়া যায়। শহরই হোক, গ্রামই হোক আর কলকাতাই হোক নিজস্ব গন্ধ থাকবেই। শহুরে পরিপাটি হস্তশিল্প মেলা বা সরস মেলাতেও একটা গন্ধ থাকে, তবে সেই গন্ধটা যেন কেমন কেজো ব্যবসা বাণিজ্যের। বারোদোলের মেলায় এখনও সেই সাবেক গন্ধটুকু পাওয়া যায় বলেই শুনেছি। |

খাবারের দোকানে কালো কড়াইতে ভাজা হচ্ছে পাঁপড়, জিলিপি। তার মন মাতানো সুঘ্রান। ওদিকে উঁচু পিরামিড করে সাজানো রয়েছে আঙুলে গজা, মিঠাই-তারও ও একটা টান আছে। কিন্তু বড়রা আবার সেসব বোঝেন না, তারা হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবেনই, চোখের জলে নাকের জলের আবদারে হয়তো মিলবে শুকনো খোলায় ভাজা গরম বাদাম আর এক চিমটে ঝাল নুন। তাই হাতে নিয়ে মেলায় ঘুরতেও বিরাট মজা। কাচের চুড়ি, মাথার ক্লিপ, কাঠের খেলনা এসব তো আছেই। তারপর কথা বলা পুতুল, টিকিট কেটে দেখতে হতো।

রাজবাড়ির কাছেই ছিল আমার মামার বাড়ি। তাই বারোদোলের মেলা শুরু হলে মামারবাড়ি যাওয়া হতো ঘনঘন। তখন বারোদোলের মেলা বলে আত্মীয় স্বজনরা আসতেন কলকাতা থেকে বা অন্য কোথাও থেকে। তাই মেলায় কারোর না কারোর সঙ্গে চলে যাওয়া হত। মূল আকর্ষন ছিল সার্কাসের তাঁবুটা। টিকিট কেটে লাইন দিয়ে ভেতরে গিয়ে চেষ্টা করতাম এরিনার কোল ঘেঁষে বসতে। যে বাঘের ডাক শুনে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার মতো হতো, দুহাত সামনে বসে সেই বাঘকেই বেচারা মনে হতো। হাতি দেখে বরং বেশি আনন্দ হতো। কাকাতুয়ার নানা কারসাজি দেখতে দেখতেই জলহস্তিকে নিয়ে ছবির ভারত মাতার মতো সেজে একজন সুন্দর মেয়ে চলে আসতেন। তবে সত্যি কথা বলতে রঙ মাখা জোকারদের কারসাজির থেকেও বেশি টানত ট্রাপিজিয়ানদের খেলা। ওই টঙের উপর কি কৌশলেই না তারা দোল খেতো, মনে হতো সার্কাসের ওই মেয়ে দের মতো যদি খেলা দেখাতে পারি। হঠাৎ ওঠা কালবৈশাখী ঝড়ে বারোদোলের মেলায় সার্কাসের তাঁবুর ভেতরে হুলুস্থুলুস হতো। বারোদোলের সময় আকাশে মেঘ দেখলেই শহরের অন্য প্রান্তের মেয়েটি ভাবনায় আকুল হতো, ট্রাপিজিয়ানদের কি হবে?

ডায়ামণ্ড সুজনিটা কাচা হয়েছিল। পরিপাটি ভাঁজ করে এবার খাটের নীচের বক্সে বন্দী হয়ে পড়লা। আবার ওর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হবে পুজোর পরে। হালকা শীতে গায়ে চাপা দিতে আমার বড় পছন্দের এই সুজনিটা। অসমের যেমন লেইসেম্পি তেমনই এই সুজনি বা খেস। আমাদের কৃষ্ণনগরে মহিলা সমিতিতে এই সুজনি বোনা হত পুরনো কাপড় দিয়ে। কাপড়ের পার দিয়েও তাঁতে বোনা হত একটু মোটা সুজনি, যেগুলো অনেক সময় সতরঞ্চি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাঁতের পুরনো কাপড় পাঁচ কি ছয়খান আর শুধুমাত্র সুতোর দাম আর সামান্য মজুরি দিলেই এই সুজনিটা হয়ে যেত। এখন দেখি অনেক দামে তা বিক্রি হয়। যাহোক সুজনিটা হাতে নিয়ে কত কথা যে মনে পড়ে যায়। দিদিভাইয়ের | বিয়ের পরে মা দুই জামাইয়ের জন্য দুটি সুজনি তৈরি করান।‘

আমার বড়পিসি তখন থাকতেন পাত্রবাজারে। তার কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে মহিলা সমিতি গড়েছিলেন তখনকার কৃষ্ণনগরের একদল শিক্ষিত মহিলা।অভাবি মেয়েরা এখানে পোশাক আসাক, শাড়িতে এমব্রয়ডারি ইত্যাদি সেলাই করতেন। তাঁত বসিয়ে সেখানেই সুজনি তৈরি হতো। শহরের বহু পরিবারের মেয়েরা এখান থেকেই স্বনির্ভর হয়েছেন মর্যাদা নিয়ে। যাহোক বড়পিসির সঙ্গে মহিলা সমিতিতে গিয়ে আমি দেখতাম ওঁদের কাজ করা। তখন আমি ক্লাস থ্রি কি ফোর। আমার মনে হতো একটু বড় হই, তাঁতে মা, দিদিদের জন্য শাড়ি বুনে নিয়ে যাব। যাহোক, সুজনি বানানোর কৌশলটা বলি, যতটুকু মনে পড়ে।

একটা বড় ঘরে পুরোনো কাচা কাপড়গুলো কাঁচি দিয়ে একটু কেটে নিয়ে টেনে ছিঁড়ে সলতে পাকানোর মতো করে পাকিয়ে রাখা হতো। তাঁতে এই সলতেগুলো জুড়ে সুতো দিয়ে তার ওপর নকশা করা হতো। তাই কখনও ডায়ামন্ড, কখনও কখনও চিরেতন এমনই। জোড়া হরিণ, জোড়া ময়ুর এসবও নকশায় আসতো। আসন তৈরি করা হতো ওই সুজনির মতোই ছোট ছোট। সেসব এখনও আমরা ব্যবহার করি। সুতোর রঙ এত ভালো ছিল, একটুও নষ্ট হয়নি। সুতোর বাঁধন এতো মজবুত যে ছিঁড়েও যায়নি। এখন মনে হয় যদি বোনার আর নকশা করার কৌশলটা শিখে রাখতাম তখন, তা হয়নি। মায়ের যত্নে রাখা সুজনিটা তখন কিন্তু হাতে কাচা হতো, ওরে বাবা কী ভারি হয়ে যেত। এখন আমরা ওয়াশিং মেশিনে কাচি, কষ্ট নেই। স্মৃতি আছে লেপটে বুননের মধ্যে মধ্যে। হালকা ঠান্ডায় এই সুজনি গায়ে দিয়ে যেন মায়ের হাতের ওম পাই।

জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক। যাক ভেসে যাক। বৈশাখী উৎসবের রিহার্সাল চলছে। গান ভেসে আসছে সেখান থেকেই। সব পুরাতন কি ভাসিয়ে দেওয়া যায়? যায় না তো। চৈত্রের কালবৈশাখীও কি পারে সব পুরাতনকে ভাসিয়ে দিতে? সেইসব কথার তোড়াই আমার হ্যাড্ডা ব্যাড্ডা কথা। এই শব্দবন্দ টা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করত জলি বিশ্বাস। ক্লাস এইটে আমাদের সঙ্গে পড়তে এলো লেডি কারমাইকেল গার্লস স্কুলে। হাসিখুশি মুখ আর দরাজ দিল নিয়ে যতদিন পেরেছে নিজের মতো করে লড়াই করেছে পরিবার, সমাজের বিরুদ্ধে। এজন্য কোনও অভিমান ছিল না, তুমি খোঁজ নিলে ভালো, না নিলেও জলি রাগ করবে না। শহরের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে একটা অজ গাঁয়ে থাকতে চলে গেল বিয়ে করে। ছোট্ট ফার্ম হাউসে ওদের দুজনের সংসারে মাঝে মাঝে আমরা বন্ধুরা যেতাম হইচই করতে। তবে সূর্য ডোবার আগেই ফিরে যেতে তাড়া দিত। কারণ রাস্তাঘাটে সাপ, শেয়ালের দেখা মিলতে পারে। ধানচাষ তো বটেই, সব ধরণের সবজি চাষও হতো ওদের জমিতে। ওরা গোবর গ্যাসে রান্না করতো, লাইট জ্বালাতো। জমিজমা, গরু, হাঁস, মুরগির বিরাট পরিবারের মালকিন হয়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে। I

মনে পড়ে রান্না ঘরে সাপ ঢুকছে দেখে যখন আমরা আঁতকে উঠেছি, জলি তখন জল দিয়ে দিয়ে সাপ তাড়াচ্ছে। এই জীবনে যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠল, তখন হঠাৎ সব ছেড়ে দিয়ে চলে গেল  নৈনীতালের কাছে টনকপুরের হার্বাল গার্ডেনে। সেখানেই কোনও একটা আশ্রমে কত্তা গিন্নি থাকতো আর লাইব্রেরি আর বাগানে ভলানটারি সার্ভিস দিত। বেশ কয়েক বছর আর কোনও যোগাযোগ নেই, তারপরে ফিরল ওরা অসুস্থ হয়ে, কিডনি বদল করতে হবে। সেসবও মিটে গেল ভালোয় ভালোয়। কৃষ্ণনগরে শহরের মধ্যে মেয়ে জামাই নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসারে দেখা হলো জলির সঙ্গে। যখন সব ঠিকঠাক মনে করা হচ্ছে, তখনই আবার সংক্রমণ। ওষুধ, হাসপাতাল বাঁচার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলেছিল ঝলমলে জলি। হ্যাড্ডা ব্যাড্ডা কথা বলে হাহা হাসি হাসতে পারতো না। জলি গিটার বাজাতো, ওর হাতে যেন গিটার গেয়ে উঠতো। চলে যেতে যেতে দিন বলে যায়…। ভোরের আলোর কথা ভেবেই স্বপ্ন সাজিয়ে রাত পার হতে চেয়েছিল জলি। মাঝপথে ওর পথটাই  ফুরিয়ে গেল।

[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

GALPER SAMAY 2026 BOISAKH

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ