
কথামুখ
স্বাধীন ভারতে ত্রিপুরার ভূমিপুত্র প্রথম বাঙালি কথাসাহিত্যিক ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য। পাঠক ও লেখকমহলে এই নামে পরিচিত হলেও তাঁর পিতৃদত্ত নাম অমিয় ভট্টাচার্য। জন্ম ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসে আগরতলা শহরে। ত্রিপুরার প্রাচীনতম স্কুল উমাকান্ত একাডেমি থেকে বিদ্যালয় শিক্ষা সমাপনের পর মহারাজা বীরবিক্রম কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। এরপর বিএড, বিটি-ও করেন। চাকরি জীবনের সূত্রপাত শিক্ষকতা দিয়ে। এ ছাড়া তিনি ‘ত্রিপুরা দর্পণ’, ‘দৈনিক সংবাদ’ ইত্যাদি খবরের কাগজে সাংবাদিকতা ও সহ সম্পাদনার কাজ করেছেন। কিছুদিন আগরতলা মিউজিয়ামেও চাকরি করেছেন। শেষপর্বে ত্রিপুরা সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে কাজ করার সুবাদে সরকারের মুখপত্র ‘নতুন ত্রিপুরা’ কাগজের সম্পাদনাও করেছেন দক্ষ হাতে। বিভিন্ন সময়ে ত্রিপুরায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় থেকেছেন। তিনি ত্রিপুরায় বাংলা ছোটগল্পচর্চায় স্থানীয় পরিসরের কথনবিশ্ব নির্মাণে অন্যতম প্রধান স্থপতি।
সলতে পাকানো
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের একেবারে গোড়ার দিকে তিনি গল্প লিখতে শুরু করেন। প্রথম গল্প লেখেন হাতে লেখা পত্রিকা ‘পঞ্চভূত’-এ। এর সম্পাদকমণ্ডলী ‘পঞ্চভূত’ এর অন্যতম ভূত ছিলেন তিনি নিজে। তখন স্কুলের শেষ ধাপের পরীক্ষা দিয়েছেন।
যাট সালের শেষদিকে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ‘গান্ধার’ নামে একটি সাময়িক সাহিত্যপত্র প্রকাশ করেন। তিনি ছিলেন ওই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালক ও লেখকদের অন্যতম। প্রথম সংখ্যায় তাঁর লেখার বিষয়বস্তু ছিল ডিরোজিও’র সমাজ-চিন্তা। লেখার পাশাপাশি তিনি পড়ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরীর যাবতীয় লেখা আর সমসাময়িক অগ্রজ লেখকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, জোতিরিন্দ্র নন্দী, বিমল কর, কমলকুমার মজুমদার, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের লেখা ছাড়াও কিছুটা কামু, সাত্র, এলিয়ট- যখন যা হাতের কাছে পেতেন। আর রবীন্দ্রনাথ তো ছিলেনই, সে বালক বয়স থেকেই। এভাবে তাঁর মন ক্রমে পরিশীলিত হয়ে উঠছিল। পাশাপাশি, দৈনন্দিন সাংসারিক ঘাত-প্রতিঘাতজাত অভিজ্ঞতায়ও তাঁর সমাজভাবনা জীবনবোধ একটা নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করছিল, মানবতাবাদ তার বহিঃপ্রকাশ। ভীষ্মদেবের যাবতীয় সৃষ্টিকর্ম ও কর্মতৎপরতার মূল দিশারি হিসেবে কাজ করেছে এই মানবতাবাদ। যদিও কথাসাহিত্যই ছিল তাঁর শেষ আশ্রয়স্থল।
গল্পের ভুবন
ভীষ্মদেব কত গল্প লিখেছিলেন, সে সংখ্যা কারও জানা নেই। লেখা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অকৃপণ। ছোট, বড়, লিটল ম্যাগাজিন, শারদ সংখ্যা, ক্লাবের সুভ্যেনির- যাঁরাই তাঁর কাছে গিয়ে অনুরোধ করতেন, ভীষ্মদেব যথাসাধ্য রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। যদিও সেসব রচনার বড় অংশ ফিচারধর্মী বা রম্যরচনা, গল্পের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। তবে সেগুলির কোনও কোনওটির মান তত উন্নত ছিল না। স্বল্প সময়ের পরিসরে নিছক অনুরোধের তাগিদে তাৎক্ষণিক লেখা এসব গল্পের মান উন্নত হওয়াই আশ্চর্যের ছিল। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প সংকলন ‘বুড়া দেবতার মাচাং’, ১৯৮৩ শালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গল্প সংকলন ‘সমিধ’, আর ১৯৯৬ সালে তাঁর অকালপ্রয়াণের পর অক্ষর পাবলিকেশনস্ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর গল্পসংকলন ‘নির্বাচিত ভীষ্মদেব’। বর্তমান নিবন্ধে আমি শেষোক্ত গ্রন্থটি ধরে তাঁর গল্প নিয়ে আলোচনা করব। তারপর আলোচনা করব তাঁর লেখা একমাত্র উপন্যাসিকা ‘অগরুগন্ধা’ নিয়ে। ওই উপন্যাসিকাটিকেও তাঁর সমসাময়িক লেখকরা বড় গল্প আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর গল্পে বিষয়বৈচিত্র লক্ষণীয়। বহুস্তর অভিজ্ঞতা থেকে পরিস্থিতি গড়ে তুলে তিনি তাঁর চরিত্রগুলির বহমান জীবনের দুঃখসুখ, ভাবনাচিন্তা, বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙক্ষা এবং অন্যায়, অবিচার বা অসংগতির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিক্রিয়াকে শব্দরূপ দিয়েছেন। এই প্রতিক্রিয়াকেই তিনি প্রতিবাদ বা ভবিষ্যৎ সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের সূচক হিসেবে পাঠকমনে সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন।
ত্রিপুরার বিশিষ্ট গল্পকার কালিপদ চক্রবর্তী ভীষ্মদেবের গল্প সংকলন ‘নির্বাচিত ভীষ্মদেব -এর ভূমিকায় ভীষ্মদেবের গল্পের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে লিখেছেন – ‘ভীষ্মদেবের গল্পের বিষয়বস্তু উপজাতি জীবন থেকে শুরু করে বহুধা বিস্তৃত। জুমিয়া উপজাতি, বন কেটে বসত গড়া উদ্বাস্তু, মহাজনী শোষণে নিঃস্ব মানুষ, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সিঙ্গল টিচার্স স্কুলের শিক্ষক, শহরের বেকার যুবক, রোজগার প্রত্যাশায় মাটির গভীরে গর্ত খুঁড়ে শীর্ষাসনকারী সাধু, চায়ের দোকানের বয়, অবহেলিত স্বাধীনতা সংগ্রামী, স্মৃতিভারাক্রান্ত বৃদ্ধ, দাঙ্গায় সর্বস্বান্ত মানুষ, শ্মশানের ডোম- বঞ্চিত, নির্যাতিত, অবহেলিত এসব মানুষের সুখ দুঃখ, আশা-নিরাশা, সর্বোপরি জীবনের প্রতি তাদের আত্যন্তিক আকর্ষণকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন তাঁর গল্পে’।
কালিপদর মন্তব্য থেকে ভীষ্মদেব-এর গল্পের বিষয়-বৈচিত্র্যের কথা জানা যাচ্ছে।ভীষ্মদেব নিতান্ত উপেক্ষিত কোনো এক আদিবাসী মানুষ, একজন হতদরিদ্র পাখিধরা, মানসিক বিকারগ্রস্ত কোনো যুবক, বাঁশগাছের ফুল, সাধুর লাঠি- এইসব নিতান্ত সামান্য ও উপেক্ষিত বিষয় নিয়ে গল্প লিখে পাঠকদের চমকে দিয়েছেন। কত সামান্য বিষয়ও যে গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে তা ভীষ্মদেব দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি এভাবে গল্প রচনার পরিধিকে বহু বিস্তৃত করেছেন।
ভীষ্মদেব যেসব বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন সেগুলির মধ্যে ‘মহাভারত’-এর কাহিনি অবলম্বন করে লেখা গল্পগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যথা ‘মহাভারতীয়’, ‘মহাভারতের কথা’, ‘রাজা হরিশচন্দ্র এবং নিশাপতি গঙ্গাপুত্র’ ইত্যাদি। ‘মহাভারতীয়’ গল্পটিতে লেখক দেখিয়েছেন- ঋষি বিশ্বামিত্র মৃত্যুমুখী স্ত্রী ও পুত্রকে ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচাবার জন্য গভীর রাতে অচ্ছুৎ চণ্ডালের ঘরে ঢুকে কুকুরের মাংস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে জীবনের এই চরম সত্যটি বুঝেছেন যে, তপস্যা, সিদ্ধি, দিব্যজ্ঞান জীবনের চেয়ে বড় নয়। ‘মহাভারত’-এর একলব্যের কাহিনি অবলম্বনে লেখক গুরু দ্রোণাচার্য ও পিতামহ ভীষ্মের ছলচাতুরির পরিচয়টি তুলে ধরেছেন। একলব্যের অতুলনীয় তিরন্দাজির পরিচয় পেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত দ্রোণাচার্য গুরুদক্ষিণার নামে তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি উপহার নিয়ে সুকৌশলে তাকে অর্জুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। লেখক এই গল্পে ব্যঙ্গের ছলে মহাভারতের মহান চরিত্রগুলির মুখোশ খুলে দিয়ে তাঁদের নীচ-মানসিকতা ও স্বার্থপরতার পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে –
‘বালক অবশেষে প্রসারিত গুরুর হাতে তুলে দেয় গুরু-দক্ষিণা। দৈহিক যন্ত্রণা অতিক্রম করে একটা চাপা হাসি কালো ঠোঁটের দুই প্রান্তে খেলে’।
‘রাজা হরিশচন্দ্র এবং নিশাপতি গঙ্গাপুত্র’ গল্পটিতে হরিশচন্দ্রের মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায় শ্মশানের ডোমসর্দার নিশাপতির প্রতি তাঁর গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যে। শাপগ্রস্ত হরিশচন্দ্র ডোমের বৃত্তি থেকে মুক্তি লাভ করে নিজ রাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও তাঁর শ্মশানের সর্দার এবং গঙ্গাপুত্রদের ভোলেননি, নিজের রাজ্য তাদের দান করে তিনি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। মহাভারতের কর্ণ ও রামায়ণের রাজা ভরতের চরিত্রের প্রতীকে ‘সূতপুত্র কর্ণ এবং প্রতুলকুমার’ গল্পের প্রতুল ও অবিনাশ চরিত্র দুটি নির্মাণ করেছেন। একালের যুবক প্রতুলকুমার সবরকম চেষ্টা করেও একটি চাকরি জোটাতে না পারায় তার প্রেম, স্বপ্ন সবকিছু ব্যর্থ হয়ে গেছে। মহাবীর কর্ণ যেমন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে রথের প্রোথিত চাকা মাটি থেকে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন প্রতুলকুমারেরও যেন ঠিক সেই অবস্থা। ‘রাজা ভরত’ গল্পের অবিনাশ আগরতলা শহর থেকে বহুদূরের এক পাহাড়ি গ্রামের ‘সিঙ্গল টিচার স্কুলে’ শিক্ষকতার চাকরি করতে গিয়ে শহরে জীবন ও আপনজনদের কাছ থেকে নির্বাসিত হয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয়েছে। রাজা ভরতের নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লেখক তাঁর নির্বাসিত জীবন যাপনের তুলনা করেছেন।
‘সাধুর লাঠির ইতিকথা’ গল্পটি পড়তে পড়তে পরশুরামের ধর্মের নামে ভণ্ডামি-বিষয়ক গল্পগুলির কথা মনে পড়ে যায়। গল্পটিতে সিদ্ধপুরুষ সাধুবাবার চেলাদের লোক ঠকানোর ধূর্ত কৌশলটি চমৎকারভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। সাধুবাবার মৃত্যু হলে তাঁর অসৎ তথা ধূর্ত চেলারা, হরিশ ও তার সাথীরা, স্থায়ী রোজগারের ধান্দায় একটা লাঠিতে মালা ও রঙিন কাপড় দিয়ে মুড়ে দেবযানের ভিতরে দাঁড় করিয়ে দেয় সাধুবাবার প্রতীকরাপে। গল্পের শেষটা চমৎকার, ‘হরিশ আর সাথীরা নিশ্চিত কেননা লাঠি দেহ নয়- রোগ তাপ কিছু করতে পারবে না, বৃদ্ধের দেহটি অজান্তে শায়িত থাকে। এবং ফুল ফোটে, তারা ওঠে, ফসল বাড়ে কমে, খরা-ঝরা আসে, ওলাউঠা মা শীতলা থেকে পোয়াতি নারীর সন্তানও হয়। লাঠির আশ্রম এখন গাঁ থেকে গাঁয়ে নাম ছড়ায়’।
ভীষ্মদেব যে গল্পটির জন্য সর্বপ্রথম পাঠকদের বিশেষ প্রশংসা লাভ করেন সেটি হল ‘বুড়া দেবতার মাচাং’ (১৯৭০)। এই একই নামে ১৯৭২ সালেও তিনি আরও একটি গল্প লেখেন। গল্পটি এরূপ: আদিবাসী শত্রুঘ্নের স্ত্রী মারা গেলে সে তার ছেলে মঙ্গলা বা মুংলাকে অনেক কষ্ট করেও মানুষ করে তুলতে চেষ্টা করেছে। তাকে শহরে পাঠিয়েছিল ইস্কুলে পড়তে। জুমের ফসল বিক্রি করে সে টাকা দিয়ে আসত ছেলেকে। আজ সে অতি বৃদ্ধ অসুস্থ এবং অভুক্তও। মুংলা কিন্তু আর গ্রামে ফিরে আসে না। শক্রঘ্ন অসুস্থ শরীর নিয়ে সব অভিমান ভুলে মুংলাকে একটি কথা বলতে শহরে যাবে: ‘মুংলাবাবু, তুই যাস আর না যাস্- বড়মুড়ায়- এখনও সূর্য ওঠে’। অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় সমাপ্তি। এক অসহায় পিতার প্রতীয় অভিমান, বেদনা ও স্নেহরসধারা ঝরে পড়েছে প্রতিটি শব্দে।
‘বাঘ’ গল্পটিতে আমাদের সমাজে ব্যাঘরূপী (হরি ঘোষের মতো) যেসব মানুষ রয়েছে সেই অদৃশ্য বাঘের সম্বন্ধে গ্রামের সব মানুষের ভ্য-ভীতি প্রকাশের মাধ্যমে তা তুলে ধরা হয়েছে। বাঁশগাছে ফুল ফোটা অমঙ্গল, তাতে নাকি আকাশ দেখা দেয় – এই কুসংস্কারকে কেন্দ্র করে একটি ‘রিফিউজি’ পরিবারের দুঃখ-দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনকথা তুলে ধরা হয়েছে ‘বাঁশের বুকে ফুল’ গল্পটিতে।
ভীষ্মদেবের একটি সুপরিচিত গল্প ‘বংশীর ভাতার’ এক ব্যতিক্রমধর্মী গল্প।একজন পাখি-ধরা বংশীর ভাতের জোগাড় হয় ফাঁদ পেতে পাখি ধরে বিক্রি করার মধ্যে দিয়ে। তাই পাখিরাই তার ‘ভাতার’। পেটের জ্বালা বিষম জ্বালা তাই যেখানে ভাত সেখানেই ক্ষুধার জ্বালায় সবাই যায় ভাতের ফাঁদে ধরা দিতে – সে পাখিই হোক বা মানুষই। বংশী ভাতের জোগাড় করতে না পারায় একদিন তার বউও ঠিকাদারের ভাতের ফাঁদে ধরা দিতে ঘর ছেড়ে চলে যায়। গল্পটিতে একদিকে যেমন পাখি-ধরার কলাকৌশলের চমৎকার বিবরণ রয়েছে। অন্যদিকে তেমনই পাখিধরাদের বেদনাময় জীবনের ছবি অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচিত গল্পগুলি ছাড়াও ভীষ্মদেব আরও অনেক ভালো গল্প লিখেছেন। যথাঃ ‘রোহিনী চকাত্তি যাবেন না’ (এক অবহেলিত প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবনকথা), ‘লুম্বিনী উদ্যান’, ‘ঠিকানার সন্ধান’, ‘ভাসান’, ‘অধঃপতনের সূত্র’, ‘দেয়ালে মাকড়সার জাল’, ‘বিবরে লুকনো সুখ’, ‘হাতে কম্পাস’, ‘কম্পিত স্বর, নিঃসাড় বৃক্ষপত্র’ প্রভৃতি।
ভীষ্মদেব প্রেম ও যৌনতা-নির্ভর গল্পের পরিবর্তে আমাদের অজানা বিষয় অবলম্বনে অনেক গল্প লিখেছেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে নিতান্ত অজ্ঞাত পাখিধরাদের জীবনকথা, বাঁশের ফুল সম্বন্ধে কুসংস্কার, আদিবাসীদের দুঃসহ জীবনকথা, সিঙ্গল টিচার ইস্কুলের শিক্ষকের নির্বাসিত জীবনকথা, ডোম শ্রেণির জীবনকথা, ধর্মের নামে মানুষের ধান্দাবাজি ইত্যাদি বিষয় অবলম্বনে রচিত গল্পগুলির কথা। ভীষ্মদেব মনস্তত্ত্বমূলক গল্পগুলিতে সাংকেতিক ভাষা যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনই সাধারণ গ্রাম্য চরিত্রগুলির ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। আর তার ফলে তাঁর গল্পগুলির চরিত্রগুলি যথাযথ বাস্তব রূপ লাভ করেছে।
তাঁর সময়ের বিখ্যাত গল্পকার কার্তিক লাহিড়ীর মতে, ‘ভীষ্মদেব সেই লেখকদের একজন যিনি গল্পের শুরু ও শেষ কোথায় হবে তা বিলক্ষণ জানেন কারণ তিনি সমাজ সংসার থেকে মিনারবাসী হননি। তাঁর গল্পের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে ত্রিপুরার মানুষজন পথ-ঘাট আকাশ বাতাস আর তিনি তুচ্ছ ঘটনা দু-একটি সংক্ষিপ্ত অথচ সহজ স্বাভাবিক মনোবেগ নিয়ে সৃষ্টি করেন অমোঘগল্প’।
অগরুগন্ধা
আগেই লিখেছি ভীষ্মদেব ভট্টাচার্যের জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা শহর আগরতলায়। তাঁর লেখা একমাত্র উপন্যাসিকা ‘অগরুগন্ধা’ (১৯৯৫)। তাই আগরতলার নাগরিক স্বভাবের রূপান্তরকে ধরতে কিছুটা সক্ষম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিসরের পরিবর্তনও বিধৃত হয়েছে। লেখকের কলমেই আমরা ‘অগরুগন্ধা’ নামকরণের তাৎপর্য জানতে পারি,
’জব চার্ণকের মতো কেউ এসে নোঙর গেড়ে বসেনি। গড়ে তোলেনি বাণিজ্য ও রাজনীতির কোনও সিংহদুয়ার। পুরাণ হাউলী থেকে কৃষ্ণকিশোর এসেছিলেন শিকারের সন্ধানে। বনজঙ্গল আর জলার এই মধ্যবর্তী এলাকাটায়। আগরতলা জলা জঙ্গলা কাটিয়ে মাথা তুলে আস্তে আস্তে দাঁড়ায়। অগরু গাছের গন্ধ যেমন চিনিয়ে দেয় অন্য বনস্পতি থেকে তার পার্থক্য আগরতলাও চিনিয়ে দিয়েছে নিজেকে। উদার ভালোবাসা ডেকে এনেছে অনেককে। কালের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে নিজেকে কেমন নীরব সাক্ষী রেখেছে’।
এটুকু পড়ে বোঝা যায় যে শহরের প্রতি লেখকের আকৈশোর লালিত ভালোবাসাও এর কথনে মিশে গেছে। কালস্রোতের অভিঘাতে ইতিহাসের গর্ভ থেকে জায়মান শহরের রূপান্তরের প্রতীক এই ‘অগরুগন্ধা’।
ভালোবাসামাখা মেদুর উপন্যাসিকাটিকে অনায়াসে একটি বড় গল্প বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। প্রাণেশ চৌধুরী, শিবানী, অবনীমোহন, সরমা, নিশি, রমণীমোহন, সমস্ত কিংবদন্তি ও নানা ধরনের সংস্কারের আধার ত্রিপুরার রাজপরিবার এই উপন্যাসে মূর্ত হয়ে উঠলেও এর পাঠকৃতি কখনোই একবাচনিক সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। গানের ধুয়ার (দোহারের) মতন এক নাতিপ্রচ্ছন্ন বিষণ্ণতা লেখক-স্বরে বার বার ফিরে আসে, তিনি বার বার লেখেন, ‘আগরতলা আর আগরতলা নেই’, উপন্যাসের শুরুতে কথনের বিশেষ ধরনই ইঙ্গিত দেয় যে একটা বিগত দিনের গল্প পড়ছি, যার নৈসর্গিক অনুপুঙ্খগুলি ফেলে আসা সময়ের বৃত্তান্ত; যখন ত্রিপুরা স্বাধীন ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্তা ভেসে বেড়াচ্ছিল নাগরিক বাতাসে। ‘মাঠ খা খা করে, গোলা শূন্য করে, বাজার খালি করে মিলিটারিরা ধান নিয়ে যাচ্ছে’। কিন্তু এতে রাজতান্ত্রিক (এক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিকও বলা চলে) আরাম আয়েস সবই স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে। আগরতলার বুকে অজস্র ফুলের গন্ধ নিয়ে রীতিমাফিক শরৎ আসে। লেখকের বয়ানে, ‘… এ জীবন বড় দুলকি চালের। অগাধ সময় যেন অপেক্ষায়। হবে, হচ্ছে, হয়ে যাবে’।
যদিও সময় যে কখনও থেমে থাকে না, কারও অপেক্ষায় থাকে না সেটা লেখক জানতেন। সেজন্যেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের তাৎপর্য ত্রিপুরার রাজা কিংবা রাজকর্মচারী প্রাণেশ চৌধুরীদের বোধগম্য না-হলেও একদিন এর ঢেউ আগরতলায় পৌঁছয়। আগরতলায় ‘ঘুমের মেজাজ ভাঙ্গে একটু একটু করে’। অবধারিতভাবেই প্রতিবেশের বাস্তব এখানেও একরকম অভিঘাত সৃষ্টি করেও নিজের অজান্তেই নাগরিক ব্যক্তি পরিসরে ও শিক্ষিত মানুষের মনোজগতে রূপান্তরের ছোঁয়া লাগে। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ কীভাবে সাধারণ মানুষকে সংগ্রামমুখী করে তুলেছে, মহাত্মা গান্ধি, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আদর্শ সংবাদপত্র প্রবাহিত হয়ে রাজপুরোহিত বংশের নবীন সদস্য অবনীমোহনদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। লেখকের বয়ানে, ‘পুজো আর্চা, নারায়ণ শিলার পর, আর একটা জীবন কোথা থেকে চড়ার মতো জেগে ওঠে- যেমন পাথর বুকে জেগে উঠে হঠাৎ করে বিস্তীর্ণ কিছু’।
এই জায়মান অস্তিত্বের বোধও সময়জাত। সেই সময়ের অভিঘাতেই তখন সুরেন্দ্র লাহার বড় ছেলে ‘প্রজা সমাজ’ গড়ে তোলে, বন্দেমাতরম বলে, ব্যায়াম কুস্তির আখড়া বানিয়ে আগরতলার তরঙ্গহীন জীবনে ঢেউ তোলে। এসব দেখে সংবেদনশীল অবনীমোহন অনুভব করে ‘ভেতরে কোথায় যেন ধ্বস নেমে যাচ্ছে’, ‘…. কেমন এক অসহায় বোধ জাগে। তিলে তিলে গড়ে ওঠা জীবনের ছক বাঁধা পথটাকে কেমন যেন অকারণ মনে হয়।… কেবল দর্শক-কেবল দেখে যাওয়া- ছোট্ট আগরতলা ছাড়িয়ে যাচ্ছে- লোক বাড়ছে… আগরতলার ভেতরের শান্তি আর সুখ যেন থাকছে না। চাও না চাও বদলে তো যাচ্ছেই- উপরের দিকে তাকালে সব ঠিক- কিন্তু ভেতরে যেন এক অদ্ভুত দোলা’।
এই প্রেক্ষিতেই উপন্যাসিকার প্রস্তাবনা। পঞ্চাশের মন্বন্তরের অভিঘাতে পুরনো শহরের ভেতর থেকে নতুন কালের বাতাস নিয়ে জেগে ওঠে আগরতলা। ‘চালের মন আট টাকা’- এই খবর অবনীমোহনের দাদা রমণীমোহনকে হতবাক করে দেয়। তিনি নিজ স্ব সামন্ততান্ত্রিক সংস্কার থেকে বলেন, ‘পাপ ধাইয়্যা আইতেছে পুর্ব থাইক্যা’, পাশাপাশি অবনীমোহন ভাবে, “আকালের দীর্ঘ হাত আগরতলাতেও অবশেষে এসে পৌঁছেছে।” ‘… কেউ দূরে থাকতে পারে না। এ এক সময়, এ সময়ে আগরতলাই বল আর যাই বল দুদিন আগুপিছু শকুনের ডানার ছায়া পড়বেই’। এই অনুভব সামন্ততান্ত্রিক সংস্কারের অচলায়তনে বড়সড় আঘাত হানে। উপন্যাসিকার শেষে সরমার সন্তান প্রসব সংক্রান্ত বিবরণে এই উপলব্ধির কথা পড়ি যা অবনীমোহনের ভাবনায় ঢেউ তোলে। দুর্গাপূজার সময় জাতক অশৌচ লুকিয়ে রাখার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত আশঙ্কা ব্যর্থ হয়ে পড়ে।
সময়ের গর্ভ থেকেই উঠে এসেছে এই অসহায়তা। রূপান্তরের উপলব্ধি নিয়ে কথন শেষ হলেও পাঠকের মনে নানা প্রশ্ন জেগে উঠতে থাকে।
রাজ অন্তঃপুরে ব্যভিচারের ইঙ্গিতও থেমে থাকা সময়ের প্রতীক। অবনীমোহন আসন্ন ভবিষ্যতের মানুষ। কুসুমকুমারী চন্দ্রমুখী কিংবা শৈল রুদ্ধতার অনুঘটক। অবনীমোহন পুরোহিত বাড়ির ‘একমাত্র ব্যক্তি যিনি সেলাই করা শার্ট পরেন, ধুতির সাথে শার্ট’। একমাত্র তিনিই অনুভব করেন, ‘একটি নতুন বাতাস খুব আস্তে হলেও বইছে’। তিনি রাশিয়ার বিপ্লব, চীনের বিপ্লবী লড়াই সম্পর্কে অবহিত। এই সময়ের অভিঘাতে কিছু লেখার তীব্র আবেগ তার মনে জাগে। পাশাপাশি পাহাড়ি প্রজাদের মধ্যে রাজার নিয়ম পালটে দেওয়ার লক্ষণ নিয়ে মন্ত্রীর দুশ্চিন্তা, রিয়াং উপজাতিদের মধ্যে জেগে উঠতে থাকা বিদ্রোহের পূর্বাভাস, রাজার বন্ধ্যা ক্রোধ ইত্যাদির উল্লেখ করে ভূগোল ও ইতিহাসের অন্তর্বয়নকে সময়ের নিরিখে শিল্পায়িত করেন ভীষ্মদেব। তবে অনেক ক্ষেত্রেই উপন্যাসিকার বয়ান খুব এলোমেলো। এর মধ্যেই কিছু কিছু কথা হঠাৎ তাৎপর্যবাহী হয়ে ওঠে, যেমন, ‘গণ্ডীর বাইরেও জীবন আছে- এ কথাটা আগরতলার মেঘচাপা আকাশে দু-একটা ক্ষীণ নক্ষত্রের মত ভেসে আসে’। রক্ষণশীলরা যতই ভাবুক, ‘আগরতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে’, প্রত্যেক ক্রান্তিকালেই এই উপন্যাসের অবনীমোহনের মতন কেউ হঠাৎ স্থবিরতার জমাট বাঁধা আঁধার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। তার মধ্যে সময়ের দ্বন্দ্ব প্রতিভাত হয়। সে আসন্ন ভবিষ্যতের দিকে এক পা এগিয়ে আবার আজন্মলালিত সংস্কারের দিকে এক পা পিছোয়। যেহেতু সে সামান্য আলোকপ্রাপ্ত তাই সংস্কারকে অন্ধের মতন আঁকড়ে থাকতে পারে না আবার দুরু দুরু বুকে অজানা ভবিষ্যৎকে আবাহন জানাতেও তাঁর দ্বিধা। লেখক সফলভাবে এই দ্বিধা দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। এই দ্বন্দ্বের আলোছায়ায় ক্রান্তিকালের এই ছোট্ট উপন্যাসিকা (ইংরেজিতে একে নভেলেট বলা যায়) শেষ বিন্দুতে পৌঁছে দেয়,
‘তাহলে কি সব বদলে যাচ্ছে। হাজার হাজার বছরের বিশ্বাস নিয়ে যে বাড়ির ভাবনা তাকে ভাবাচ্ছিল- একটি পরিবারের উপর চাপ সৃষ্টি করছিল, রাজ্যের কল্যাণ অকল্যাণের ভাবনায় ভাবিয়ে তুলেছিল- তা মিথ্যা হয়ে গেল। আটকাল না। তাহলে দেবী কি দেখেননি? তা বিশ্বাস করতে ভয় করে। অবনীমোহনের মনে ধ্বস নামে আরো বিরাট জায়গা জুড়ে। আসন্ন ছয় মাসের যাবতীয় সুখ সম্পদ যার আশীর্বাদে পেলেন তাঁর প্রতি অবিশ্বাস কেমন যন্ত্রণা দেয়’।
ত্রিপুরার ছোটগল্পের কথা লিখতে গিয়ে ভীষ্মদেবকে আমি ওই পরিসরের নিজস্ব কথনবিশ্ব সৃষ্টির অন্যতম প্রধান স্থপতি বলেছি। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সেটা প্রযোজ্য, তবে প্রধান স্থপতি হিসেবে নয়, কেননা এই একটিমাত্র নভেলেট ছাড়া তিনি আর কোনো বড় লেখা লেখেননি। এক্ষেত্রে তাঁকে আমরা অন্যতম স্থপতি বলতে পারি। তাঁর কথাসাহিত্যে বার বার ত্রিপুরার জল, হাওয়া মাটি, মানুষের জীবনে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলি পরিস্ফুট হলেও সে সব রচনার আবেদন কখনোই বিশেষ অঞ্চল বা সময়কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
………………..
নির্বাচিত ভীষ্মদেব, ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, অক্ষর পাবলিকেশনস্, আগরতলা, ১৯৯৭ (প্রথম প্রকাশ), ২০০২ (দ্বিতীয় প্রকাশ)।

email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।