20 Oct

ছোটো ছোটো তাজমহল

লিখেছেন:রাজেন্দ্র যাদব


ছোটো ছোটো তাজমহল/ গল্পের সময়

কথাটা সে বা মীরা কেউ তোলেনি। দেখা করার আগে অবশ্য মনে হয়েছিল, জরুরি একটা বিষয়ে দু’জনের কথা বলা দরকার। তবে যেন সারাক্ষণ তারই আশঙ্কায় প্রসঙ্গটা তারা এড়িয়ে গেল। কথাটা গলা অবধি এসেও আটকে গেল যে, আর এক বার মীরাকে জিজ্ঞেস করে পরিচয়টাকে কি স্থায়ী করা যায় না? তবে এবারও যদি ওর খারাপ লাগে। দু’জনার মধ্যে সেবার কত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তাদের কেন যেন তাজমহল তার কখনোই সুন্দর মনে হয়নি। রোদে শ্বেতপাথরে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, তাই পিঠ ফিরিয়ে বসেছে। তবে রোদে মীরারও চোখ ধাঁধাতে পারে। হয়তো তাজমহল ওর সুন্দর মনে হয়। ছায়াটা বোধহয় যমুনার দিকে, ওদিকটায় শ্বেতপাথর রোদে ঝকঝক করছে। তপ্ত পাথরে হাঁটলে পায়ের তালু ঝলসে যেতে পারে ভেবে সে শিউরে ওঠে।

তিন বছর পর দেখা, দেখে শুধু মুচকি হেসেছে, আশ্বস্ত হবার ভঙ্গিতে, দু’জনে আগের মতোই আছে। তফাতের মধ্যে মীরা আরও আকর্ষণীয়া হয়েছে। সে নিজে অবশ্য কেমন যেন হয়ে গেছে। কত যে কথা মনে মনে মীরাকে সামনে বসিয়ে বলেছিল, ওর প্রতিক্রিয়া কল্পনা করেছিল, অথচ এখন ওকে দেখে শুধু মৃদু হেসেছে। সেই থেকে মনে হচ্ছে, এভাবে দেখা করা অর্থহীন। কী এমন কথা বলবে যা আগে বলেনি। বছরে-ছ’মাসে একে অপরের কুশল-সংবাদ জেনেই নেয়।

হাঁটুর কাছে লনের ঘাসে মীরার হাত। ওর আঙুল-গুলো এমন ভাবে ওঠানামা করছে, যেন সংবেদনশীল কোনো বাদ্যযন্ত্রে সুর বাঁধছে। মীরার হাতে লোহার বালা বোধহয় শনির প্রভাব এড়াবার জন্যে। আস্তে করে ওর কড়ে আঙুলে সে নিজের আঙুল হকের মতো আটকে নিয়েছে। হাতে মৃদু চাপও দিয়েছে। ধীরে ধীরে কথা শুরু হয়।

বিজয়ের চোখে পড়ে, মীরার উন্মুক্ত ঘাড়ের কাছে গোঁফওলা একটা ছোট্ট পোকা। ইচ্ছে করে ঝেড়ে দিতে। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয় প্রবেশ ফটকের সিঁড়ি ঝোপের আড়ালে, ওপরের ধাপগুলোই কেবল চোখে পড়ছে। সংকোচের সঙ্গে ক্যারামের স্ট্রাইকার মারার মতো পোকাটাকে আঙুল দিয়ে ছিটকে দিতেই শরীর জুড়ে শিহরণ নেমে গেল। আঙুল দিয়ে জায়গাটা এমন ভাবে ঝাড়ল যেন নোংরা লেগেছে। মীরা আগের মতো তন্ময়ভাবে বান্ধবীর বিয়ের বর্ণনা দিচ্ছে, ও কিছু বলেনি। এমনকি তার হাতটাও সরায়নি। বিজয় ফের শঙ্কিত চোখে চারপাশে তাকায়। এগিয়ে এসে কাছে টেনে নেয় ওকে। মীরা এতেও আপত্তি করে না। যেন প্রত্যাশা করছিল এমন হবে। প্রথমে কপালে সামান্য ভাঁজ ফুটলেও পরক্ষণে ওর মুখে সেই ঢেউ-খেলানো অদ্ভুত ধূপছায়া হাসি। বিজয়ের ইচ্ছে করছে, মরুভূমিতে ঘুরতে থাকা পিপাসার্ভের মতো দু’হাতে কলসি ধরে ওর হাসিটা উন্মুক্ত আবেগে পান করতে। ওর পাতলা ঠোঁটে অদৃশ্যপ্রায় কাঁপুনি। রোমান্টিক আবেশের মধ্যে বিজয়ের ইচ্ছে হয় মীরা চোখের চশমা খুলুক। তখন সে দেখে, সবুজ ফোয়ারার মতো দু-তিনটে গাছের পেছনে দু-দুটো তাজমহল চশমার জোড়া কাচে নেমে এসেছে। যেন হাতির দাঁতের তৈরি দুটো ছোটো ছোটো খেলনা…।

তাজমহল অবশ্য তার কখনও ভালো লাগেনি। মনে হয়, অবাঞ্ছিত বৃদ্ধ-প্রহরীর মতো’ পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছে। কথাবার্তার মাঝে ভুলে গিয়েছিল, হঠাৎ মনে পড়ে তারা যেটার ছায়ায় বসে রয়েছে তা মহান সুবিশাল। এত বড়ো সৌধ। এর সমগ্র সৌন্দর্যকে এক সঙ্গে কখনও কল্পনায় আনতে পারেনি। একটা-একটা অংশ দেখে তার তেমন সুন্দর কিছু মনে হয়নি। লোকে আসলে এতে নিজেদের মনের কল্পনা আর সৌন্দর্য আরোপ করে দেখে। কখনও সুযোগ পেলে, সে পেছনে বসে তাজমহলের সৌন্দর্যকে সমগ্রতায় ধরতে চেষ্টা করবে। তেমন কিছু ফোটো দেখে অবশ্য অন্য ধরনের অনুভূতি হয়েছে.. তবে চশমার কাচে ঝলমল করতে থাকা তাজমহল। ভাবনার সুতো সেখানেই ছিঁড়ে যায়। নিজের অজানতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ও হাত সরিয়ে নেয় না, এখানে না। কেউ দেখে ফেলবে…।

ওর কী ইল।

মীরা সতর্ক হয়েছে। লজ্জা গোপন করতে চেয়ে দেখে -আশে পাশে কেউ নেই। পাশের লালরঙের উঁচু দেয়ালে শ্রমিকের মতো কিছু লোক খেলাচ্ছলে একে অন্যের পেছনে ছুটছে। লনে খানিকক্ষণ আগেও মালিরা পাইপ ঘুরিয়ে জল ছিটোচ্ছিল, ওরা হয়তো এখন খেতে গেছে। মীরা শাড়ির আঁচলটা টেনে ঠিক করে। বিজয় আনমনাভাবে একটা ঘাসফুল ছিঁড়ে চোখের সামনে ঘোরাতে থাকে। মীরা চশমা নামিয়ে মুখের ভাপ দিয়ে আঁচলের খুঁটে কাচ পরিষ্কার করে, চুল সরায় কানের পেছনে। চোখে চশমা লাগিয়ে ঘড়ি দেখে।

দু’জনের মাঝখানে এখন ভারি নৈঃশব্দ্য। বিজয়ের মনে হয়, কথা না বললে নৈঃশব্দ্যের দুঃসহ বোঝা দু’জনের সম্পর্কের কোমল অনুভূতিটাকে পিষে ফেলবে। তাই হাতে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে সে বলে- এবার ওঠা যাক, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

মীরা ঘাড় নাড়ে। ও যেন কিছু বলতে গিয়েও থেমে  গেছে। নইলে প্রতীক্ষা করছে বিজয় কিছু বলবে। কিছুক্ষণ নীরবতা, কেউ ওঠে না। শিথিল হাতে সে জুতোর ফিতে বাঁধে, খবরের কাগজে কমলালেবু, চিনেবাদামের খোসা ফেলে। বসবার জন্য পেতে রাখা রুমাল তুলে ভাঁজ করে দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে দরজার দিকে এগোয়।

বোধহয় তিনটে বেজেছে। হাতে ঘড়ি থাকা সত্ত্বেও সে আন্দাজ করে। চড়া রোদে গলার ঘাম মোছে। সেই বারোটায় এসেছে। তখন হাসি পাচ্ছিল, কী বিদঘুটে সময়ে দেখা করছে।

এই সময় থেকে দূরে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ আগের স্মৃতি রোমন্থন করছে: দুপুর বারোটা, জুন মাস আর তাজমহলের লন। সে আগে ভাগে এসে প্রতীক্ষা করছিল। তখন কেমন অস্থিরতা, ব্যগ্রতা ছিল…. সময় কাটছে না কেন। ঘড়িটা অনেক দিন অয়েলিং করা হয়নি, ঠিকমতো চলছে না। ও এখনও এল না। মেয়েদের এই অভ্যাসটাই তো ভালো লাগে না। কখনও সময় মতো আসে না। অপেক্ষা করাতে কী যে আনন্দ পায়। ইচ্ছে করে সে রাস্তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ছিল। আশা করছিল- হঠাৎ তাকিয়ে দেখবে, ও আসছে। কিন্তু দু-তিনবার এমন করা সত্ত্বেও মীরা এল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকাবার চেষ্টা করল, নিজের কথা ভেবেই হাসি পেত। বেশ, সিঁড়ি ভেঙে আসা আরও-তিনজনকে দেখবে, তার মধ্যে মীরা না থাকলে মন দিয়ে বই পড়বে.. যখন খুশি আসুক। এক দুই তিন। হয়তো পরেরটাই ও। বয়ে গেল না এলে। ততক্ষণ ভেবে দেখা যাক, এই তিন বছরে মীরা দেখতে কেমন হয়েছে? কেমন শাড়ি পরে আসবে? পরস্পরকে দেখে ওরা কী করবে? হয়তো আবেগে জড়িয়ে ধরবে, কথা বলতে পারবে না। তেমন অনুভূতি তার হয় না, তবে যদি আবেগের প্রাবল্যে….!

শেষে ওকে আসতে দেখেছো সে সামনে থেকে চোখ সরানোর চেষ্টা করে, যাতে হঠাৎ সাক্ষাতের থ্রিল অনুভব করতে পারে। অথচ দেখা হলে নিতান্ত সংযত ভাবে বলেছে, ‘নমস্কার মিস মীরা।’

মীরা লজ্জায় হেসে ফেলে। রোদে ওর মুখ লালচে দেখাচ্ছে। এরপর দু’জনে লনে এসে বসে এমন নিরাবেগ, যেন প্রতিদিন দেখা হয়।

‘ভাবলাম- তুমি আসবে না, হয়তো ভুলে গেছ।’ ‘তুমি ডেকেছ, না-এসে পারি? তবে টাইমটা বড়ো গোলমেলে।’

‘হ্যাঁ, আজকের রাতটা কোজাগরি পূর্ণিমার রাত অবশ্যই নয়।’ ঠাট্টাটা নিজেরই তেমন জুতসই মনে হয় না। গরীর হয়ে বলে, ‘এ সময়ে জায়গাটিন একটু ফাঁকা থাকে।’

সত্যি গোলমেলে সময় মীরার সঙ্গে এক-পা এক পা করে ফিরতে গিয়ে ভাবে দুপুরের রোদে প্রেমিক যুগল। কথাটা সে পুনরাবৃত্তি করে। এটা কি প্রেম? যেন বছরের পর বছর নিয়মিত কথা বলা দুই বন্ধু যাদের কথা ফুরিয়ে এসেছে। শ্বেতপাথরের ওপর রোদ বাড়ছে। রোদ প্রতিফলিত হওয়ায় দু’জনাই পিঠ ঘুরিয়ে নিয়েছে। থেকে থেকে বিরক্তি জাগে, কীসের অভিশাপ আমাদের রক্তকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের এ কী হল? দেহমনে উত্তাপ নেই, আবেগ নেই সব কেমন বদলে গেছে। হ্যাঁ, এর মধ্যে মীরার গায়ের বং খুলেছে, শরীরে লাবণ্য এসেছে।

ফেরার সময়েও সে বুঝতে পারে না এই ভার, এই কুণ্ঠা কীসের। দু’জনা লাল পাথরের জালের ওপর হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ি অবধি যাবে দারোয়ানের তীক্ষ্ণদৃষ্টিকে উপেক্ষা করে। টাঙা কিংবা রিকশায় গিয়ে বসবে… মোড় ঘুরলেই সব দৃশ্য আড়ালে চলে যাবে। কাল সে লিখবে মীরা, আমার কালকের ব্যবহারে তুমি হয়তো অবাক হয়েছ। হয়তো তোমার খারাপ লেগেছে কিন্তু…

চশমার কাচে ফের তাজমহল ভেসে ওঠে।

‘তোমার চোখে ভাসছে দুটো তাজমহল’- কী সুন্দর বাক্য (রীতিমতো আধুনিক কবিতা)। রবীন্দ্রনাথ এ দৃশ্য দেখলে ‘কালের কপোলে নেমে আসা অশ্রু বিন্দু’ মোটেই লিখতেন না। লিখতেন ‘কপোলে নেমে আসা অশ্রুতে রুপালি মাছের মতো তাজমহলের ছায়া…’। মীরার চোখে অবশ্য সামান্য আর্দ্রতারও আভাস নেই। আমরা কেমন নির্জীব হয়ে গেছি। কাল চিঠিতে লিখবে, হাক্সলির অনুকরণ করছি না, তবু জানি না কেন তাজমহল আমার কখনও সুন্দর মনে হয়নি। অথচ তোমার চোখে তাজের ছায়া দেখে সত্যি চোখ সরাতে পারিনি। কিছুদিন আগেকার একটা অদ্ভুত অনুভূতি মনে পড়ে গেল সেই মুহূর্তে…

এখন বুঝতে পারছে কেন সে অমন ঝিমিয়ে পড়েছিল। কথাটা কি ভোলা সম্ভব? সে লিখবে। মনে হয়, মনে মনে সে যাকে সম্বোধন করে চিঠি লিখছে, সে এই মীরা নয়। দূরের সেই অন্য মীরাই তার আসল বান্ধবী। এর সঙ্গে যখনই দেখা করেছে, উদাস হয়েছে। অথচ সেই মীরার সঙ্গে দেখা করার দুর্বার আকর্ষণই এর কাছে তাকে টেনে আনে। এর অনেক কিছুই তার অপছন্দ। মনে করবার চেষ্টা করে, কী কী তার পছন্দ নয়। যেমন, এখন তার বিরক্তির কারণ, মীরা নিচের জালের পাথরে পা দিয়ে ডাকছে না কেন। এর পরেও দু’জনে কান পেতে থাকে যে অন্যজন কিছু বলবে। একটা  কথা ভেবে তার হাসি পেল, তাদের চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর বয়স হলে হাসতে হাসতে পরস্পরকে শোনাবে কীভাবে তারা গোপনে তাজমহলে গিয়ে দেখা করত।

‘চার-পাঁচ বছর আগের সেই ঘটনাটা তার মনের গভীরে চিঠি লেখা চলছে। সব কথা চিঠিতে লিখবে না, কেবল এই সুযোগে ধারাবাহিক ভাবে সমস্ত ঘটনা মনে করার চেষ্টা করছে। সে নিজে, দেব, রাকা আর মুনমুন- এভাবেই ফিরছিল। বিষন্ন উদাস সন্ধ্যার দীর্ঘচ্ছায়া।

সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর মাস ছিল। কলেজ থেকে ফিরে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই কেউ এসে জানাল, ‘আপনাকে এক ভদ্রলোক ডাকছেন।’

‘আরে আপনি।’

শুনে সে হকচকিয়ে ওঠে, কে এল এই অসময়ে।

‘চিনতে পেরেছেন?’

‘কেন পারব না,’ আসলে সে চিনতে পারেনি। কোথায় যেন দেখেছে। বোধহয় কলকাতায়। তবু চিনতে পারার ভান করে। কথার সূত্র ধরে মনে করার চেষ্টা করছে।

‘আসুন, ভেতরে আসুন,’ আগন্তুককে অভ্যর্থনা জানায়।

‘না মিস্টার মাথুর, বসব না। বাইরে আমার ফ্যামিলি অপেক্ষা করছে…’। ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি কি ব্যস্ত?’

‘বাইরে কেন?… ওদেরও ভেতরে ডেকে নিন না।’ দেখুন, আমরা তাজমহল দেখতে এসেছি। মনে পড়ল, আপনি এখানেই থাকেন। ঠিকানাটা মনে ছিল না, তাই অনেক ঘুরতে হল। যাক গে, দেখা তো হল। যদি ব্যস্ত থাকেন… আসলে আজই আমাদের ফিরতে হবে।’ সিঁড়িতে একটি পা রেখে দাঁড়িয়ে বললেন।

‘সংকোচ করবেন না, চটি পায়ে দিয়েই চলে আসুন।’ বাইরে গাড়ি। পেছনের খোলা দরজা ধরে মাডগার্ডে দাঁড়িয়ে এক সুন্দরী মহিলা। পরনে গাঢ় সবুজ বাঙ্গালোর সিল্কের শাড়ি। বাঙালি ধরনের চাওড়া পাড়, মাঝে-মাঝে রুপালি চুমকি। মাডগার্ডে চার-পাঁচ বছরের একটা মোটামতো বাচ্চা বসে-রয়েছে। ওর হাত ধরে ধুলো মাখা মাডগার্ডে ভদ্রমহিলা আপনমনে লিখছেন টি. এ.জে.।

জুতোর শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে বিজয়কে দেখেই ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। বাচ্চাটাকে নামিয়ে হাত জোড় করেন, ‘আপনাকে কথা দিয়েছিলাম… উনি ইতস্তত করছিলেন।’

ভদ্রলোক বলে ওঠেন, ‘রাকা, ভেতরে এসে বোসো। অন্ধকার হয়ে গেলে দেখার আনন্দটাই মাটি হয়ে যাবে।’

রাকা কিছু-কিছু মনে পড়ছে ঘাট। জইভারের পাশের দিল্লী বসে সে মুখ ঘুরিয়ে দেখে, যেন দোখার ভদ্রলোকের নামটাও লেখা দেখবে।

কেমন আছেন কতদিন পর দেখা। মনে আছে কলকাতায় আলাপ হয়েছিল। সেদিন আপনার অনেক দেরি করিয়ে দিয়েছিলাম।’ সোনার মতো গায়ের রং, কানে গোল রিং, অদৃশ্যগ্রায় লিপস্টিক। শাড়ির আঁচল সামলানোর জন্য দরজায় হাতের কনুই ঠেকানো। মনে পড়েছে, এদের সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে পরিচয় হয়েছিল, নিউ মার্কেটের এক রেস্টুরেন্টে বসে সে বাজনা শুনছিল। হঠাৎ কী খেয়াল হল তার। উঠে দাঁড়িয়ে মাউথ অর্গানে অনেকক্ষণ ধরে সিনেমার গানের সুর বাজাল। মঞ্চ থেকে নেমে যে টেবিলটায় এসে বসেছিল, সেখানেই ছিলেন এঁরা রাকা আর মিস্টার কী যেন। হ্যাঁ, মিস্টার দেব।

‘দারুণ বাজিয়েছেন। আপনার ভালো প্রাকটিস আছে।’ সে বসামাত্র দেব মন্তব্য করলেন। রুমালে মুছে বাজনাটা পকেটে রাখছে, অমনি চমকে ওঠে। রাকার উজ্জ্বল চোখে মুখে প্রশংসা। কাপ হাতে সে একদৃষ্টে রাকার দিকে তাকিয়েছিল।

‘আপনার চা জুড়িয়ে যাচ্ছে। আর এক কাপ বলছি। বেয়ারা, এদিকে এসো।’ তার আপত্তি সত্ত্বেও আর এক কাপ চা এল। ‘ছুটি কাটাতে এসেছেন। কলকাতা কেমন লাগল? বোম্বের তুলনায় নোংরা হলেও মন বসে গেলে ভালোই লাগবে।’ ফের প্রশংসা, সৌজন্য বিনিময়। গভীর রাত অবধি তাদের লোয়ার সার্কুলার রোডের ফ্ল্যাটে বসে আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর সংগীত। রাকা-র সেতার বাজানোর শখ। দেব এক বিদেশি কোম্পানির ম্যানেজারের সঙ্গে থেকে বিদেশি সিম্ফনি পছন্দ করেন। রিজয়ের মাউথঅর্গান শোনার পর রাকা সেতার বাজালেন। দেব এবার প্লাস্টিকের সুদৃশ্য কভারে রাখা বিদেশি রেকর্ড বের করেন। আধঘন্টার এক-একটি রেকর্ডে তিনটে করে কম্পোজিশন। সব বুঝতে না পারলেও কভারে লেখা পরিচিতি আর শিল্পীদের ছবি সে মন দিয়ে দেখছিল। চায়কোভস্কি ও আর কয়েকজন শিল্পীর নাম। বেশ দামি রেকর্ড। এক ফাঁকে দেব জানালেন, ‘এবার সুযোগ পেলেই আগ্রা যাব। সেই ছেলেবেলায় গিয়েছিলাম, স্মৃতিতে যে ছবিটা আছে তার সঙ্গে হয়তো মিলবে না। বিয়ের পর অনেকবার যাবার প্রোগ্রাম করেছি। ছুটি পেলেই রাকা পেছনে লাগে। আপনি তো ওখানেই আছেন…।’ দু’জনাই দেরি করিয়ে দেবার জন্য মার্জনা চেয়ে নিজেদের গাড়িতে করে বিবেকানন্দ রোড পর্যন্ত ছাড়তে এসেছিলেন। সারা রাস্তায়  কথার টুকরো, সেতারের সুর আর যন্ত্রণাদীর্ণ সিম্ফনির আওয়াজ তাতে অভিভুত করে রাখে সুখী দম্পতি। সব যেখে শুনে তার খুব আনন্দ হয়েছিল। বাচ্চাটা পরে এসেছে, নাম মুনমুন। এদিকে দেব বলছেন, ‘প্রদর্শনীতে আমাদের স্টল থাকায় নিরি এসেছিলাম। ভাবলাম, এত কাছে এসে দেখা না-করে ফেরা ঠিক না। আপনাকে মিছিমিছি টেনে আনলাম।’

‘না-না, অমন ভাবছেন কেন।’ সঙ্গে সঙ্গে সে বলে। সবই মনে পড়ছে, তবে মিস্টার দেবের পুরো নামটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। সেবারের পর আর দেখা হয়নি। মানতে হবে, এদের স্মৃতিশক্তি প্রখর।

‘তাজমহলের প্রসঙ্গ উঠলেই আপনার কথা মনে পড়ত। আর এমন কোনো দিন নেই যেদিন তাজের কথা ওঠেনি।’ বলে উনি রাকা-র দিকে তাকালেন, ‘আজ আমাদের বিয়ের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে… আপনার সামনে মুনমুন ছিল না।’

‘মুনমুন, তুমি কাকুকে নমস্কার করলে না? বলো, আঙ্কল, আজ আমার পাপা-মাম্মির বিয়ের সপ্তম বার্ষিকী।’ রাকা তার হাত ছাড়াতে-ছাড়াতে বলেন, ‘বড্ড দুষ্টু। সারাদিন এর খেয়াল রাখতে হয়।’

‘তাহলে আপনাদের অভিনন্দন জানানো দরকার।’ এত কিছুর পরেও বিজয়ের মনে হয়, কোথাও দম-আটকানো অবস্থা অদৃশ্য কুয়াশার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে, শরীর…’

‘আরে না, ঠিক আছে।’ রাকা দু’হাতে চুলের ক্লিপ ঠিক করে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করেন,’ টানা পাঁচ ঘন্টা গাড়িতে বসেছিলাম। এক ঘন্টা ধরে উনি আপনাকে খুঁজছেন।’

‘অত কষ্ট করার কী দরকার ছিল। ‘কৃতজ্ঞভাবে বিজয় বলে, ‘হাতমুখ ধুয়ে ফেলতে পারেন রাকাজি।’

‘কেন… আজই ফিরতে হবে।’

সকলে ঘুরে ঘুরে তাজমহল দেখছে। মুনমুনের একটা হাত দেবের হাতে, অন্যটা রাকা-র। মাঝে-মাঝে তিনজনই নিজেদের মধ্যে এমন হারিয়ে যাচ্ছেন যে বিজয়ের মনে হয়, ওদের মধ্যে সে অবাঞ্ছিত বাধা সৃষ্টি করছে। ওপরের সাদা কালো চাতালে পয়সা গড়িয়ে দিয়ে দেব পেছন-পেছন ছুটছেন। এদিকে বিজয়ের সঙ্গে রাকা জালের নকশা, দরজায় কোরানের আয়াতের নকশা দেখছে। সন্ধ্যার হলদে স্নিগ্ধ রোদ লনে কালচে হয়ে আসছে, ময়ূরপঙ্খী আর প্রশস্ত তালপাতার মতো গম্বুজাকৃতি কুঞ্জ মোমবাতির সবুজ-সোনালি শিখার মতো দেখাচ্ছে যেন আনন্দে ফুলে-ফুলে ওঠা পায়রা। উল্লসিত হলেই চারপাশে আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে  পড়বে। পায়রাগুলো কবরের পাশে আওয়াজ করছে, ঢেউ তুলে আকাশে ভাসছে। যেন সুক্ষ্ম তত্ত্ব দিয়ে তৈরি, ঘড়ির বল-স্প্রিং-এর মতো বড়ো বর্তুলাকার কিছু, যা একসময় ৩টিয়ে আসে। দেবের গলা, ‘রাকা… রাকা… রাকা’ গায়ে-গায়ে আছড়ে পড়া শব্দ… দূরে হারিয়ে যেতে থাকা, কোনোও অচেনা উপত্যকার গভীরে ‘মুনমুন …. মুনমুউ-উ-উন…।’ দেব অনেকক্ষণ এই খেলায় ডুবে রইলেন। মনে হয়, ওঁর মনের গভীরে কিছু ঘটছে খেলায় সেটাই অভিব্যক্ত হচ্ছে। উনি রাকা আর মুনমুনের নাম উচ্চারণ করছেন। দীর্ঘক্ষণ শব্দগুলোকে ডুবতে-হারাতে দেখছেন, যেন হাত বাড়িয়ে সেগুলোকে ফের ধরতে চান। কবরের প্রতি ওঁর আগ্রহই নেই। অনেকক্ষণ পর ঘোর কাটিয়ে বেরিয়ে এলে ওঁকে বড়ো বিহ্বল দেখায়। মুনমুনকে টেনে বুকে চেপে ধরেন।

বিজয় বেরিয়ে এসে দেখে, নদীতীরের ছোটো গম্বুজটার কাছে দাঁড়িয়ে রাকা দূরের শহর, লাল সেতুর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন। সিঁদুররঙা আকাশে প্লেট রঙের মেঘ নদীর ওপর ওয়াশ-কালারের মতো ছড়িয়ে। ছোটো গম্বুজ থেকে শুরু করে মাঝখানের মকবরা পর্যন্ত চাতালের সাদা-কালো সতরঞ্জিকে নিস্তেজ রোদ তেরছা ভাগ করেছে…. বাতাসে ওর গায়ে শাড়ি লেপটে গেছে, কানের পাশের চুল এলোমেলো। দেব অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন, যেন ওকে চেনেন না। সেই পরিবেশে, শ্বেতপাথরের বিরাট বন্দিশালায় যেন কোনও অভিশপ্ত জলপরিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিজয় মনে-মনে বলে ইচ্ছে করে অন্যদিকে সরে গেল। রাকা সম্ভবত মুমতাজের প্রেমের কথা ভেরে-ভেবে মৃত্যুর পর নিজের এরকম একখানা স্মৃতিসৌধের আকাঙ্ক্ষা করছে। ব্রিজের ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেন, তাজকে দেখে সৌন্দর্য-কল্পনার স্তব্ধ উচ্চতায় হারিয়ে গেছে…

বুক সমান উঁচু পেছনের দেয়াল থেকে মুনমুন নদীর দিকে উঁকি দিয়ে, হাত নেড়ে নেড়ে নিচের বাচ্চাদের ডাকছে। কাকগুলো কা-কা করছে। মুনমুনের পাশে শ্বেতপাথরের দেয়ালে ঝুঁকে বিজয় সামনের জনস্রোত গাছপালা দেখছে। কখন যেন দেবও পাশে এসে দাঁড়ালেন। দূরে আগের মতোই ছোটো গম্বুজটার পাশে ঝুঁকে রাকা… বাতাসে উড়ছে শাড়ির আঁচল।

‘ভেতরের আওয়াজ, গুঞ্জন শুনে অদ্ভুত অনুভূতি হয়, তাই না? যেন নিঝুম অরণ্যে-পাহাড়ে আপনজন কেউ হারিয়ে গেছে- আপনার নিষ্ফল আকুল ডাক তাকে খুঁজে খুঁজে হারিয়ে যাচ্ছে। আপনজন আর আওয়াজ কিছুই ফিরে আসে না। যেন যুগ-যুগ ধরে কারও উদ্‌ভ্রান্ত আত্মা ডেকে চলেছে। প্রতিধ্বনিত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে।’ দেবের দু’চোখে জল।

‘এমন পরিবেশে এরকমই হয়’ বিজয় মনে মনে বলে, পরিস্থিতিকে যেন ভাষা দিয়ে বুঝতে চায়। মুখে বলে, ‘কাউকে ভীষণ ভালোবাসলে, এরকম বিষন্ন-সুন্দর জায়গায় এসে এ ধরনের অনুভূতি মনে জাগে। লনে হাঁটলে, মুনমুনের সঙ্গে হাসাহাসি করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

দেব শুনলেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিমর্ষ চোখে তাকালেন বিজয়ের দিকে। কিছু বলতে গিয়ে থামলেন। নীরবে হাঁটতে হাঁটতে দু’জনে সামনে এলেন। মুনমুন রাকার কাছে। নিচের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে দেব আচমকা বিজয়ের কাঁধে হাত রাখেন। কথা বলতে গিয়ে গলা কাঁপে, ‘জানেন, মিস্টার বিজয়…’

কিছু বলবেন?

ওপরে এক ঝলক সবুজ শাড়ি চোখে পড়ে, দু’জনে সিঁড়ি ভেঙে নামেন। জুতো পরতে পরতে দেব বলেন, ‘নিশ্চয় অবাক হয়েছেন যেভাবে আপনাকে ডেকে এনেছি।’

‘না, অবাক হবার কী আছে।’ বিজয় পালটা সৌজন্য প্রকাশ করে।

‘সামান্য ব্যাপার হলেও আসলে ততটা সামান্য নয়।’ আবার দীর্ঘশ্বাস।

বিজয়ের মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কোনোও কথা দেবের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য ছটফট করছে। সেই প্রথম তার মনোযোগ পরিস্থিতির বিচিত্রতার দিকে গেল। চাতাল পর্যন্ত দু’জনে নীরব… চাতালটার এক কোণে হৌজে (বাঁধানো জলাশয়) যেন আগুন লেগেছে…. লাল-গোলাপি মেঘের বক নেমে এসেছে ঘন কালো আকাশে। উলটো তাজের ছায়া মুমুর্ষু সাপের মতো ফনা খুঁড়ছে তাদের পায়ে। ওপরের ছোটো গম্বুজে রোদ গুটিয়ে এসেছে। দেব সেদিকে অপলক চেয়ে। রাকা মুনমুনকে নিয়ে আসছেন। যেন কেউ কাউকে দেখছে না। বিজয় একবার একে, একবার ওঁকে, কখনও বা মশক হাতে ভিসতিকে দেখছে। দেব সাহস সঞ্চয় করে, টেনে টেনে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি… বিস্ফোরণের স্তরে চলে যাওয়া টেনশন, ভয়াবহ অবস্থা, সম্পর্কের এই বরফ শীতলতা ….সম্ভবত আমাদের দু’জনের কেউ-ই এটা সইতে পারত না। একজনকে দরকার ছিল যে আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখতে পারবে।’

‘ঠিক বুঝতে পারছি না, মিস্টার দেব।’ ঘাবড়ে গিয়ে বিজয় মন্তব্য করে। সামান্য কাত হয়ে দাঁড়িয়ে দেব স্মিত হাসলেন,’ আপনি… আপনি… বিজয়, এটা আমাদের শেষ  সন্ধ্যা।’ বিজয় কিছু বলবার আগেই দেব কথা শেষ করেন, ‘আমি আর রাকা ঠিক করেছি আমাদের আলাদা থাকা দরকার সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে। টেনশন আমাকে-ওকে পাগলের মতো উলটো পালটা আচরণ করতে বাধ্য করে। তার চেয়ে আলাদা থাকাই ভালো। ও যদি কারুর সঙ্গে সেটল করে আমার আপত্তি নেই। মুনমুনকে ও নিজের কাছে রাখতে চায়, রাখুক। অবশ্য ওকে নিয়ে কখনও অসুবিধে হলে স্বাচ্ছন্দে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে পারে…।’

বিজয়ের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। হৌজের গভীরতায় ডুবে থাকা তাজের ছায়ার দিকে সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

‘কিন্তু আপনারা দু’জনে…?’ বিজয় বলতে চায়। দেব হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, ‘সব কিছু অতীত হয়ে গেছে। তাই ঠিক করেছি, শেষ মিলিত সন্ধ্যা হাসিখুশিতে কাটানোই ভালো, বন্ধুর মতো বিদায় নেওয়া যাক…।’ খানিকক্ষণ থেমে আরও বললেন, ‘রাকা-র বড়ো ইচ্ছে ছিল তাজমহল দেখার। ফাস্ট নাইটে ও চেয়েছিল এখানেই হনিমুন করতে। কিন্তু…. কিন্তু…’ এবার দেব হাত ঝাড়া দিলেন, ‘অদ্ভুত সিকোয়েন্স না?’ বিজয়ের মনে হয় সে যেন কোনো ড্যামের রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। নিচে লক্ষ লক্ষ টন জল হুশ-হুশ করে পড়ছে পড়েই চলেছে… তার মাথা ঘুরছে। দেব যেন কিছু বলেননি। এসব সে নিছক কল্পনা করছে। এমন কোনো ঘটনা…

দেবের গলা শুনে তার ধ্যানভঙ্গ হল, ‘ওকে থামাও রাকা, মালিরা আপত্তি করবে… না, মুনমুন গাছে হাত দিতে নেই।’ গলার স্বর বেশ নরম। দেব ছুটে গিয়ে মুনমুনকে সমেহে কোলে তুলে নিলেন। বাবার আদরে বাচ্চাটা খিলখিল করে হেসে ওঠে, রাকার চোখে স্নেহের হাসি। না, সে যা শুনেছে ওদের দাম্পত্য জীবনে তা হতে পারে না।

বিজয় বারবার রাকা-র মুখ দেখতে চায়। রাকা মনে হয় পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ব্যস্ত। পাখি ডাকছে।জালের ওপর ওরা হাঁটছে। কাছে এসে দেব ফিশফিশ করেন, ‘রাকাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।’

কী জিজ্ঞেস করবে রাকাকে।

‘সরি, আপনাকে মিছিমিছি টেনে আনলাম।’

এবার সংকোচের পালা বিজয়ের, ‘আপনি অযথা বিব্রত হচ্ছেন।’

চার-পাঁচ বছর আগের ঘটনাটা যেন এখন সজীব হয়ে উঠেছে। সে, দেব, রাকা আর মুনমুন এভাবেই ফিরছে… বিষন্ন উদাস মনে। সন্ধ্যা রাত্রির দিকে গড়িয়ে চলেছে। যেন সবাই কোনও সুদীর্ঘ ঝড়ো অভিযান সেরে ফিরছে। গাছগাছালি আর সৌধের ছায়া পেছনে সরে গেছে… লনের সবুজ আশ্চর্য সতেজ দেখাচ্ছে। সবুজের মাঝে ঝাপসা কাচে ভাসছে সাদা ফুল… মীরার চশমায় তাদের ছায়া দেখে স্মৃতিটা জেগে উঠেছে। সেদিন হৌজে আকাশি জর্জেটের পেছনে তাজমহল উঁকি দিচ্ছিল। অন্যদিকে নিজের সঙ্গে লড়তে লড়তে দেব তাকে বলছিলেন…। আজ দেব উপস্থিত থাকলে সে কী বলত? তারাও সেভাবে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে?

বিজয় চমকে গিয়ে মীরাকে দেখে। মনে হয় ও কিছু বলছে- ‘কিছু বলছ?’

‘আমি? না তো?’ আবার সেই বিষাদ।

মনে হয়, একটা মৃত মুহূর্তের একদিক মীরা ধরে রেখেছে, অন্যটা সে। দু’জনেই গোপনে রাতের নিস্তব্ধতায় তাকে কবর দিতে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ দেখে না ফেলে, সারাক্ষণ এই ভয়- কেউ যেন জানতে না পারে তারা হত্যাকারী। ঝাড়ের পেছনে লাশটা ফেলে দিয়ে, রুমালে রক্ত মুছতে মুছতে ভিড়ে হারিয়ে যাবে।

বাইরে এসেই ওরা টাঙা নেবে। হুট করে মোড় ঘুরে। টাঙাটা ঢালু রাস্তায় ছুটবে… তাজমহল পেছনে সরতে থাকবে। অবশেষে ‘আসি’ বলে শুকনো ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ঝুলিয়ে পরস্পরের কাছে বিদায় নেবে।।

[ হিন্দি থেকে ভাষান্তরঃ অনিন্দ্য সৌরভ] 

Tags: , , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।