
এতক্ষনে আসার সময় হল?তোমার জন্য অফিস-কাছারি বন্ধ করে দিতে হবে দেখছি।প্রায়ই কাজে আসতে দেরি করে মিনতি। সময়ে রান্নার লোক না এলে শুধু অফিসে দেরি হয়, তাই নয় –সারা দিনের রুটিনটাই জট পাকিয়ে যায়। আজও দেরি করায় মেজাজ হারিয়ে কড়া কথা বলে দিতি। তার কথার জবাব না দিয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যায় মিনতি। জবাব না পেয়ে দিতির রাগ আরও বেড়ে যায় । রোজ সকালে একই ঘটনা, আমার ভালো লাগে না। না পোষালে ছেড়ে দাও, কাজের লোকের অভাব হবে না। মিনতি তাতেও চুপ ।দেখ, তুমি জান আমায় অফিসে যেতে হয়। তোমার দাদাও বেরোবে। সাত সকালে সেই সব দেখব না তোমার পথ চেয়ে বসে থাকব।তাই বলছি পোষালে কর না হলে বলে দাও, একটা হেস্তনেস্ত করার সুরে কথা বলে দিতি।মিনতি তবুও চুপ ।এবার সরাসরি তাকেই বলে দিতি, কথার জবাব দিচ্ছ না কেন?ঠিক করে কাজ করবে কিনা বল? কাজ তো করতেই হইব,এখানে না হইলে অন্য কোথাও। কাইজ না করলে আমাগো চলব না।সের লিগ্যাই তো চুপ কইর্যাব শুইন্যা যাইতাছি আপনের কথা। এতক্ষনে জবাব দেয় মিনতি।শুনতাছি মানে?আমি ভুল কিছু বলছি নাকি?আবার মেজাজ হারায় দিতি।না ভুল কিছু বলেন নাই, কিন্তু আমার ঠেকা তো আপনে বুঝবেন না। সেই কথাই কইতাছি।এমনিতেই মিনতির গলার স্বর এত কর্কশ যে সাধারণ কথা বললেও মনে হয় যেন ঝগড়া করছে।তার ওপর যদি রাগ হয় তাহলে সেই আওয়াজে কান পাতা দায়।ফ্ল্যাট বাড়িতে যে কোন কর্তা-গিন্নির পক্ষেই তা খুবই অস্বস্তির।তাই বাধ্য হয়ে নিজেই চুপ করে যায় দিতি।
্মিনতির একটা গুন স্বীকার করতেই হবে। কাজে খুব চটপটে। আর রান্না খারাপ করে না।ঘন্টা খানেকের মধ্যেই সব রান্না সেরে ফেলে।বৌদি, আমার হইয়া গেছে, গেলাম গিয়া।ঠিক আছে, আর শোন কাল রবিবার একটু দেরি করে এলেও চলবে, তবে কামাই করো না।কোন জবাব না দিয়ে চলে যায়।এই ওর আর এক সমস্যা। কোন কথার হ্যাঁ বা নায়ে জবাব দেয় না। আসলে ও সব সময়ই আনপ্রেডিক্টেবল।কোন ভরসা নেই।উপায়ও নেই। রান্নার লোক চট করে পাওয়া যায় না।তাই না রাখার সমস্ত কারণ থাকলেও ছাড়ানো আর হয়ে ওঠে না।
রবিবার একটু বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠে দিতিরা।সেই কারণে মিনতিকে বলা আছে দেরি করে আসতে।সেদিনও সেরকমই এসে কাজ শুরু করে ।রবিবার দিতির রান্নায় একটু ঝামেলা থাকে।মাংস হবেই, সেই সঙ্গে ভাজা চিকেনও চাই, সন্ধ্যেয় ওটা কাজে লাগে।এ ছাড়া মাছ আর কিছু সব্জি রান্না করিয়ে রাখে।মাংস ম্যারিনেট করে তরকারি কাটছে মিনতি। এমন সময় বেজে উঠল তার মোবাইল।কী হইস্যে? ফোন তুলেই কর্কশ গলায় জিঙ্গেস করে মিনতি। যত জোরে সে কথা বলে তাতে ফোনের দরকার হয়না।কিছুক্ষনের নীরবতার পর, সে বলে, এখুনি আইতাসি। বলেই বঁটি নামিয়ে রেখে উঠে পড়ে।তাকে চলে যেতে দেখে দিতি বলে কী হল তুমি চলে যাচ্ছ নাকি? হ, আমারে যাইতেই হইব।আর আমাদের রান্না।আরে আমার মাইয়ার জেবনের থিকা আপনের রান্না তো বড় না।মুখের ওপর বলে দেয় মিনতি।কাঠ বাঙ্গাল একেবারে। সে আপনে যাই কন, অহন আমারে যাইতেই হইব।বলেই হন হন করে বেরিয়ে যায়। এক কাঁড়ি রান্না নিয়ে কী করবে ভেবে পায় না দিতি। তার অবস্থা দেখে মুখ খোলে দেবু, তার স্বামী। বাড়িতে সে যে আছে তা প্রায় টেরই পাওয়া যায় না।কথা প্রায় বলেই না। সে তার নিজের স্বভাবের কারণে না বউ এর কারণে তা আজও স্পষ্ট নয়।অত ভেব না। দেখ না ঘন্টা খানেক । এমনিতেই তো আমরা ছুটির দিন দেরিতে খাই। আজ না হয় আরও একটু বেলা হবে।আর ও যদি নাই আসে?তাতেও কিছু হবে না।মাংস, সব্জি সব ফ্রীজে ঢুকিয়ে দেব।তাহলে দুপুরে খাব কী?অসহায় শোনায় দিতির গলা।আবার অভয় দেয় দেবু।ভাবছ কেন?ওই কি একটা আছে না? যেখানে ফোন করলেই খাবার দিয়ে যায়-দরকার হলে তাদের ফোন করে দেব।এতক্ষনে একটু স্বস্তি পায় দিতি। মুখে বলে ধুস, মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।
এই একটা দিন, নিজের গিন্নির সামনে বসার সুযোগ পায় দেবু।আজ রান্নার লোক না থাকায় সুবিধেই হয়েছে।একটু সাহস সঞ্চয় করে দেবু প্রশ্ন করে, আচ্ছা ্মিনতির সমস্যাটা ঠিক কী বলবে।আরে সে যদি আমি নিজেই ঠিক মতো জানতাম তাহলে তো কিছু একটা করার চেষ্টা করতাম। স্পষ্ট করে বলেও তো না কিছু।ও, থাকে কোথায়, কে আছে সংসারে?পর পর প্রশ্ন করে যায় দেবু।সব কথা আমারও জানা নেই,ও যতটুক বলেছে তাই বলছি।
বাংলাদেশ থেকে ওরা বেশীদিন আসেনি।বৈধ কাগজ পত্র আছে কিনা তাও জানিনা।বলেও নি কোনদিন।স্বামী, দেওর আর দুটি ছেলে।এই তো ওর সংসার। মেয়ে একটা ছিল, সে নিজেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে। ওকে নিয়েই তো যত সমস্যা।কেন?আর কেন,ছেলেরা চায় না মা-বোনের সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ রাখুক।মায়ের মন কী তা মানতে পারে, পারে না।দরকারে অদরকারে মেয়েকে সাহাযা করে। আমার তো মনে হয়, এই যে ও কাজ করে তা ওর মেয়ের জন্যই।তা ওর বাপ, কাকা মেয়েকে নিয়ে কী বলে?আরে কাকা কী নিজের নাকি? তা হলে?সে আসলে মিনতির বরের কারিগর ছিল।ওদের সঙ্গেই থাকত।কারিগর মানে?ওর বর মেলায় মেলায় খাবার তৈরি করে বিক্রি করত, ও সেই খাবার তৈরির কারিগর, তাই ছেলে-মেয়েরা কাকা বলে ডাকে।তিন কূলে কেউ নেই, তাই মিনতিদের সঙ্গেই রয়েছে। এখন কাজ-কর্মও তেমন হয়না, ওই পড়ে থাকে এক কোনে।সংসারের কোনও কিছুতেই সে থাকে না। কথা-বার্তাও খুব একটা বলে না বলেই শুনেছি।ওই দুবেলা খাবারটা জুটে যায়।বাব্বা, তুমি তো পূরো হিস্ট্রি বলে দিলে। বেশ অদ্ভুত তো, সচরাচর এমনটা শোনা যায় না। যাই হোক খুব ইন্টারেস্টিং।তুমি কী বল? সব শুনে মন্তব্য করে দেবু।এতেই ইন্টারেস্ট খুঁজে পাচ্ছ। আরও একটা কথা শুনলে কী বলবে? আরও আছে?এই দিতি একদিনে এতটা হজম হবে না।আরে শোন না। বল-আজ ষোল বছর ধরে মিনতির সঙ্গে ওর বরের কোনও সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তার মানে? কী বলছ তুমি? ঠিকই বলছি।ওদের মধ্যে সরাসরি কথা হয় না।সবই ভাব বাচ্যে।এই যেমন ধর ভাত দেওয়া হয়েছে।ভাতের থালা নিয়ে বসে থাকতে পারব না। এই রকম আর কী। সত্যি বলছো? বাজে কথা বলে আমার লাভ? তা ঠিক, কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই বলছি আর কী। বিশ্বাস কী আমারও হয়েছিল, পরে বহুবারই মিনতি একই কথা বলেছে। কিন্তু কেন,কারণ কী? তা বলতে পারব না, সে কথা ও আমায় বলেনি-আমিও জোরাজুরি করিনি। ভাবতে পারছি না, এমনও হয়, গল্পকেও হার মানাবে দেখছি, নিজের বিস্ময় চেপে না রেখে বলে দেবু। তাই বটে-দিতির ছোট্ট জবাবে মিনতি প্রসঙ্গ চাপা পড়ে যায়।
সেদিন তো বটেই টানা দুদিন মিনতির কোনও পাত্তা নেই।এই দু দিন কী করে যে অফিস-সংসার সামলেছে তা শুধু দিতিই জানে।দেবুও অবশ্য তার হাতে হাতে কাজ করে দিয়েছে।দুদিন পর যখন অন্য লোকের কথা ভাবতে শুরু করেছে সেদিনই উদয় হয় মিনতি।তাকে দেখে রাগে গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল দিতির। ভেবে পাচ্ছিল না কী বলবে।তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কথা বলে মিনতি।বউদি আপনে রাইগ্যা আছেন আমি জানি।বলেন তো কাজ আর করুম না।কিন্তু সেদিন আমি না গ্যেলে মেয়েডা আমার বাঁচত না। কোনমতে ঘরে ফিরাইয়া আনতে পারছি বউদি।তার কথায় থতমত হয়ে যায় দিতি আর দেবু। মিনতির গলা পেয়ে দেবুও নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।আরে না না, সে ঠিক আছে, রাগ তো হওয়ারই কথা, কিন্তু মেয়ের হয়েছিলটা কী? বলছ কোনও মতে প্রানে বেঁচেছে। কী আর কমু সবই আমার কপাল।আপনেরে ত আগেই কইছি, রানি নিজে পলায় গিয়ে বিয়া করছিল।পোলাটা ভালো না ।নেশা করে, মাইয়ারে মাইরধর করে, বাপের ঘর থেকে টাকা আনার জন্য চাপ দেয়। বউদি, শুনেন, শুধু অর লইগ্যাই আমি কাম করি।অর বাপ-ভাইয়েরা অরে টাকা-পয়সা দেওয়া পছন্দ করে না। আমি অদের লুকাইয়া মাইয়ারে টাকা-পয়সা দিই।
সেদিন যখন ফোন আসল, তখনও বুঝি নাই এত্ত বড় ঘটনা ঘইট্যা গেছে।বাড়ি গিয়া দেখি মাইয়া আমার রক্তে ভাইস্যা যাইতাছে।নেশা খাইয়্যা অর বর মাথা ফাঠাইয়া দেসে। সেকি?দেবু-দিতি দুজনেই আঁতকে ওঠে। হ বউদি, ওই দেইখ্যা আমার তো মাথা ঘুরাইয়া ওঠছে। পইড়া যাইতে নিছিলাম, বড় পোলা ধইরা নেয়।পাড়ার লোক সকলে আইস্যা পড়সে।সবাই কইল, আর দেরি না কইরা হাসপাতালে নিয়া যাও। দুই পোলা একখান গাড়ি আইন্যা তাতে কইরা নিব কইল। পোলাদের দুই বন্ধুও বাইক নিয়ে গেছিল।হাসপাতালের ডাক্তার তো দেইখ্যাই কইল আগে দুই বোতল রক্ত নিয়া আস, নাহলে বাঁচান যাইব না। তাড়াতাড়ি রক্ত জোগাড় কর। কি করুম বুঝতে পারতাছি না। এদিকে মাইয়া আমার নেতাইয়া পড়তাছে।
তারপর, তারপর –রক্ত জোগাড় করলে কী করে? এ দিকে তো কোনও ব্লাড ব্যাঙ্ক নেই।এ কথার কোনও জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে মিনতি।দিতি তাকিয়ে দেখে তার দু চোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে।তুমি কাঁদছ কেন, আর রক্তই বা দিল কে?আরও খানিক্ষন চুপ থাকার পর মিনতি বলল, অর কাকায় রক্ত দেল।তারমানে প্রায় চিৎকার করে ওঠে দিতি।সে কোথা থেকে এল।আমরা খেয়াল করিনাই,সে কখন আমাগো পিছে পিছে আইস্যা পড়স্যে।পোলারা চইল্যা যাইতেই সে ডাক্তারের ঘরে ঢুইক্যা পড়ে। ডাক্তারে কয়, আমার রক্ত নেন।ডাক্তারে কইল সে হবে না।কেন হইব না, রুইখ্যা উইঠ্যা সে কইল ওর শরীরে আমার রক্ত, তাড়াতাড়ি ওরে আমার থিকা রক্ত দেন ও বাঁইচ্যা যাইব।তেনারা কী বোঝলেন কইতে পারুম না।একজন আইস্যা তার হাত থিকা একটু রক্ত নিয়া গেল। শেষে তাইর রক্তেই মাইয়া সাইরা ওঠল। তোমার ছেলেরা কিছু জিঙ্গেস করেনি?করছিল, ডাক্তারবাবু কইছেন তাঁরাই রক্ত যোগাড় কইর্যাঙ আনছেন। কিন্তু তুমি তো জান, মিনতি।আবারও মাথা নিচু করে থাকে মিনতি।তাকে দেখে যা বোঝার বুঝে যায় দিতি-দেবু। অনেক না বলা কথার জবাব লেখা হয়ে যায় মিনতির মুখে।
Tags: গল্প, গল্পের সময়, জটাশঙ্কর লাহিড়ী, রক্ত
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।