
দোতলার বারান্দার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এক তরুণী। ব্যালকনির টবেতে রাখা সুদৃশ্য গাছগুলির তদারকিতে ব্যস্ত। রাস্তার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুদর্শণ যুবক চা হাতে অপলক নয়নে দেখছে তরুণীটিকে। রোজকার ঘটনা। গাছের চর্চা করতে করতে তরুণীটি ঘেমে নেয়ে একশা। কয়েকটা চুল এসে মুখের সামনে এসে পড়াতে ব্যস্ত হয়ে সরিয়ে দিতে দিতে চকিতে নজর যায় রাস্তার ধারে দাঁড়ানো চা হাতে যুবকটির দিকে। চোখাচোখি। দ্রুত চোখ নামিয়ে কাজে মন দেয় বিপাশা। কিছুটা আনমনা। গাছে জল দিতে গিয়ে কিছুটা চলকে পড়ে মেঝেয়। সম্বিত ফিরে পেয়ে জল ঢালতে থাকে সন্তর্পণে। অজান্তেই চোখ চলে যায় রাস্তার দিকে। আবার নজরে আসে যুবকটির। তখনও অপলক তাকিয়ে।
সেজেগুজে কলেজ ব্যাগ হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে বিপাশা। ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে মাকে ঈশারায় হাত নাড়ে। মাও হাত নেড়ে জানান, ‘সাবধানে যাবি। পৌঁছে একবার ফোন করে দিবি।’ দূর থেকে বিপাশা প্রত্যুত্তর দেয় :’ আচ্ছা, তুমি চিন্তা করবে না,তবে আজ ফিরতে কিছুটা দেরি হবে। ক্লাশ ও টিউশন সেরে ফিরবো’।
‘ঠিক আছে,’ জানান মা। কলেজ গেটের সামনে। হনহন করে আসছে বিপাশা। হাত ঘড়িটা দেখে। কিছুটা সময় বাকি আছে। কিছুটা নিশ্চিন্ত। কপালে ঘামের স্বেদবিন্দু। ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে আলতো করে মুছে নেয়। কলেজ গেটের সামনে আবার চোখাচোখি ছেলেটার সঙ্গে। একবার তাকিয়ে ঢুকে পড়ে কলেজে।
যেতে যেতে স্মৃতিপটে ভেসে আসে ওই ছেলেটির মুখ। কে ও? নিশ্চয়ই এই কলেজের ছাত্র। রাস্তার মোড়ে বাড়ির ব্যালকনি থেকে চকিতে দেখা। চাওনির মধ্যে কেমন একটা ভাল লাগা ভাল লাগা ভাব! হনহন করে চলে যায় ক্লাশের দিকে।
কলেজে হেলথ ক্যাম্প চলছে। এন এস এস এর স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে বিপাশা সহ কয়েকজন ছাত্রীকে স্যার দায়িত্ব দিয়েছেন সুষ্ঠুভাবে শিবির শেষ করার জন্যে। ছাত্র-ছাত্রীরা নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত। সেইসময়ে আবার ওই ছেলেটির প্রবেশ কয়েকজন বন্ধু সহ। ছেলেটিকে দেখে ওর সাথীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লো। এগিয়ে গিয়ে বলতে থাকলো, ‘ আরে আশীষদা আসুন, আসুন। আমাদের কি সৌভাগ্য! আপনি নিজে এসেছেন আমাদের স্বাস্থ্য শিবিরে ! বিপাশা দেখলো এন এস এস এর অনাদিস্যারও এগিয়ে গিয়ে আশীষদাকে সম্ভাষণ জানালেন, ‘ এসো এসো আশীষ, দেখো আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির কেমন চলছে?’ তখনই জানতে পারলো বিপাশা উনি এই কলেজের সিনিয়র দাদা। কলেজ ইউনিয়নের জি এস অর্থাৎ জেনেরাল সেক্রেটারি। ঘুরে ঘুরে দেখতে লিগলেন আশীষদা। নিজে বসে পড়লেন রক্ত পরীক্ষার জন্যে। স্বাস্থ্য শিবিরে পরিচয় হয়ে গেল আশীষদার সঙ্গে বিপাশার।
গঙ্গার পাড়ে বসে বিপাশা ও আশীষদা। আলাপ থেকে পরিচয় তারপরে ঘনিষ্ঠতা। পাশাপাশি বসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে।
‘ বিপাশা সামনে পুজো আসছে। কলেজ তো তখন ছুটি থাকবে। কি করবে পুজোতে?’ বলে আশীষ
‘পুজোকটাদিন চুটিয়ে খাবো দাবো আর ঘুরেফিরে বেড়াবো পুজোমন্ডবগুলোতে। জানায় বিপাশা।
‘বেশ তো সকাল বেলায় প্রাতঃরাশ সেরে আমি তোমাকে তোমাদের বাড়ি থেকে তুলে নেবো আমার বাইকে। খাবো দাবো, ঘুরে ফিরে এসে বিকেলে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে আবার বেড়িয়ে পড়বো সন্ধ্যায়।’ জানায় আশীষ।
‘খুব ভাল আইডিয়া। পুজোকটাদিন খুব এনজয় করবো আমরা। বলে বিপাশা।
চলো এবারে উঠি আমরা, তাড়া দেয় বিপাশা।
কটা বাজে বলতো? জিজ্ঞাসা করে আশীষ।
হাত ঘড়ি দেখে জানায় বিপাশা, ছ’টা।
চলো চলো, আমারও খুব একটা জরুরী মিটিং আছে কলেজের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে’।
ঊঠে পড়ে দুজনায়। বাইকে স্ট্যাট দেয় আশীষ। পেছনে বিপাশা।
গঙ্গার পাড়ে কলেজ ধারে। কি ব্যাপার ফোনে এত জরুরী কল কেন? বলে বিপাশা।
আরে বসো না, বলছি বাবা বলছি, জানায় আশীষ।
‘তুমি তো ভাল গান গাও। এবারে আমাদের কলেজ ফ্যাংশনে তোমাকে একটা গান গাইতে হবে। তোমার পছন্দমত।’
‘আরে না না, অতবড় ফ্যাংশনে আমি গাইতে পারবো না। এমনি বাড়িতে গাওয়া আর বড় ফ্যাংশনে গাওয়া কি এক হলো? বলে বিপাশা।
দেখো, যে রান্না করতে পারে সে চুলও বাঁধতে পারে। আমি কোন ওজর-আপত্তি শুনতে চাই না। ওইদিন তুমি গাইবেই। স্পষ্টভাবে জানায় আশীষ।
‘এতটা জোর আমার উপর? ‘
থাকবে না! বলে আশীষ।
‘সারাটা জীবন ধরে রাখতে পারবে এই জোরটা!’
অভয় ও আশ্বাস দিলে নিশ্চয়ই পারবো ম্যাডাম। জানায় আশীষ।
এখন একটু এগরোল, ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে, চল না খাই।
তথাস্তু। কর্তৃর ইচ্ছেয় কর্ম।
গঙ্গার ধারে ফুচকাওয়ালার সামনে দুজনায়- আশীষ ও বিপাশা।
কটা খেলে? শুধায় আশীষ।
মাত্র আটটা হয়েছে বলে বিপাশা।
শোন না পুজোর সময়ে একটা পুজোমন্ডবে ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতা হয়। ভাবছি তোমার নামটা দিয়ে দেবো বলে আশীষ মুচকি হেসে।
দিয়ে দাও, ঠিক ফাস্ট প্রাইজটা জিতে নেবো, ঠোঁট উলটিয়ে জানায় বিপাশা।
‘তোমার ফুচকা খাওয়ার বহর দেখে মনে হচ্ছে প্রাইজটা পেয়েও যেতে পারো।’
সে আর বলতে!
তা তুমি খাবে না?
‘না না আমার ওটা ভাল লাগে না। আমি বরং একটা এগরোল নিচ্ছি।’
ঠিক আছে তাই নাও।
ফুচকা খাওয়ার মাঝে হঠাৎ একটা বাইক এসে দাঁড়ায়। নামে দুটো ষন্ডামার্কা ছেলে। দেখলে কেমন যেন মনে হয়।
হঠাৎ একটা কালো মতন ছেলে একটা জলভরা বেলুন ছুঁড়ে মারে বিপাশার মুখে।
উ! মাগো ! বলে হাত থেকে ফুচকার প্লেটটা গড়িয়ে পড়ে। বিপাশা বসে পড়ে কাতরাতে থাকে। জ্বলে যাচ্ছে, জ্বলে যাচ্ছে আমার মুখটা।
কি হল ! কি হল! বলে হাত থেকে রোলটা ফেলে দিয়ে আশীষ নীঁচু হয়ে দেখতে যায় বিপাশাকে।
ইতিমধ্যে ছেলে দুটো বাইকে স্টাট দিয়ে পালিয়ে যায় চোখের নিমেষে।
আশীষ পকেট থেকে রুমাল বের করে ফুচকাওয়ালার কাছ থেকে জল নিয়ে ভিজিয়ে নেয়। আলতো করে চেপে ধরে বিপাশার মুখে।
বিপাশা তখনও কাতরে চলেছে। জ্বলে জ্বলে যাচ্ছে আমার মুখটা।
আশেপাশের লোকজন এসে ভীড় জমায়। তাড়াতাড়ি ডাক্তারখানায় নিয়ে যান। মুখটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। সম্ভবত এ্য্যসিড বার্ণ হয়েছে।
একটা রিকশা ডেকে বিপাশাকে তুলে আশীষ রওনা দেয় ডাক্তারখানায়।
তড়িঘড়ি ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢুকে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আশীষ বলে, ‘ মাপ করবেন ডাক্তারবাবু। একটু বিপদে পড়ে অনধিকারচর্চা করে ফেললাম।
হঠাৎ করে কেউ বা কারা ওর মুখে এ্যাসিড ছুঁড়ে বার্ণ করে দিয়েছে। যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছে বলে তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লাম।
‘ঠিক ঠিক আছে। ইমারজেন্সি বলে অন্যেরা কেউ কিছু মনে করবেন না। ‘
নিয়ে আসুন আমার কাছে। আমি পরীক্ষা করে দেখছি।
বিপাশা তখনও কাতরাচ্ছে। উ! মাগো। জ্বলে যাচ্ছে আমার মুখটা ডাক্তারবাবু।
আচ্ছা আচ্ছা দেখছি। আলো ফেলে দেখেন ডাক্তারবাবু। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চটপট সেরে ফেলেন।
একটু লিকিউড স্প্রে করাতে কিছুটা যন্ত্রণার উপশম হয় বিপাশার।
কারা ছুঁড়েছে? তাঁদের চেনেন আপনি?
না না ডাক্তারবাবু, আমরা তাদের চিনি না। গঙ্গার ধারে আমরা একটা ফুচকাওয়ালার কাছে খাচ্ছিলাম। সেই সময়ে দুটো ষন্ডামার্কা ছেলে এসে হঠাৎ করে একটা বেলুন ছুড়ে মারে। তারপরেই বাইকে করে পালিয়ে যায়। আমি তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি। আর আশীষ আমাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেই অবসরে ওরা চম্টট দেয়। ধরার কোন সুযোগই ছিল না।’
থানায় তো কোন খবর দেওয়ার সুযোগ পান নি?
ঠিক তাই।
এরপরে ডাক্তারবাবু একটা প্রেসক্রিপশন লিখে আশীষের হাতে ধরিয়ে বলেন: ওষুধ আর ইনজেকশন লেখা আছে। খাওয়াবেন। খুব সাবধানে রাখবেন। কেননা অনেকটা কেমিকাল বার্ণ হয়েছে। সারতে সময় লাগবে। ধৈর্য্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।
ফেরার পথে লোকাল থানায় একটা ‘আননোন টু আস’ বলে একটা এফ আই আর করে যাবেন।
যেভাবে হোক অপরাধীদের ধরতেই হবে। ভয় পেলে চলবে না।
বলেই হাতের মুঠোফোন থেকে লোকাল থানার আই সি কে ফোন করে সবটা জানিয়ে দেন ডাক্তারবাবু।
ওরা ডাক্তারবাবুকে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে যায়।
অন্ধকার ঘরে বসে একা বিপাশা। মা এসে লাইটা জ্বালতেই, ককিয়ে ওঠে বিপাশা, লাইটটা জ্বেলো না মা প্লিজ!
অন্ধকার ঘরে একা বসে আছিস কেন? দেখ মুখের দাগটা তো ডাক্তারবাবুরা বলছেন ওটা মিলাতে সময় লাগবে। তুই এত ভেঙে পড়ছিস কেন? কলেজে যাচ্ছিস না, আশীষ এসে বারে বারে ফিরে যাচ্ছে। তুই ওর সঙ্গে দেখাও করতে চাইছিস না কেন?
বেচারা তো পাগল পাগল অবস্থা। ও নিজেকে খুব অপরাধী ভাবছে।
তুমি আলোটা নিবেই দাও। আলো আমার সহ্য হচ্ছে না।
তোকে তো আমরা অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারি না?
আগে ব্যালকনিতে দাঁড়াতিস, গাছগুলোর কত যত্ন নিতিস। এখন তো সেসব কিছুই করছিস না। গাছগুলোর কথা শুনে একটা উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে বিপাশা, ‘মা! গাছগুলো বেঁচে আছে তো? ‘
না না তোর দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। আমি আর তোর দাদা সময়মতো গিয়ে জল সার সব দিয়ে আসি। আশীষও এসে হাত লাগায়। তোর কাছে আসতে চায়। তোর আপত্তি থাকায় নিজেকে গুটিয়ে রাখে।
দুর্ঘটনার পর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে বিপাশা। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সকলের কাছ থেকে। এমনকি আশীষের কাছ থেকেও। কষ্ট যে পাচ্ছে না তা তো নয়। তবুও ওই পোড়া মুখটা আর কাউকে দেখাতে চায় নি। কারা যে ওর এই অবস্থা করলো সেটাও জানে না। অপরাধীরা এখনও অধরা। আদৌ ধরা পড়বে কি না কে জানে?
একদিন মা এসে জানায়, শোন বিপাশা, সামনের রবিবার আমরা তোকে বিদেশে নিয়ে যাবো তোর মুখের প্লাস্টিক সার্জারি করাবো বলে। সঙ্গে আশীষও যাবে।
আশীষ! ও কেন?
বা রে! ওই সব ডাক্তারবাবুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের জানিয়েছে। সেইমত আমরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।
একটা খুশির হাওয়া বয়ে যায় বিপাশার চোখেমুখে।গুণগুণ করে গান ধরে: ‘আমার চোখের আলোয় দেখেছিলাম আমার চোখের বাহিরে’।
অনেকদিন পরে বিপাশার মুখে গান শুনে আশ্বস্ত হন বিপাশার মা।
বিদেশ থেকে ফিরে
বিপাশা আবার ঘরের ব্যালকনিতে: গাছগুলোর চর্চা করতে করতে দৃষ্টি যায় পথের ধারে। দেখে দূরে দাঁড়িয়ে আশীষ। চোখাচোখি হতে হাত নেড়ে ঈশারায় ডাকে আশীষকে। আশীষ চলে আসে। ব্যালকনিতে তখন বিপাশা দাঁড়িয়ে আশীষের প্রতীক্ষায়। আশীষকে দেখতে পেয়ে গেয়ে ওঠে: সখী ভালবাসা কারে কয়, সে কি কেবলই যাতনাময়।’
অপলক দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে বিপাশার দিকে।
[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: গল্প, গল্পের সময়, ডা. প্রদীপ কুমার দাস, ব্যালকনি
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।