08 Oct

আধ বোতল কেরোসিন

লিখেছেন:সূরজ শর্মা


কুপির সলতে দপ করে জ্বলে ওঠার পর লাল আভা ছড়িয়ে প্রথম আলো তার নাকের উপর পড়ে। সলতে জ্বলে ওঠার পর সেই লালিমা নাক থেকে নেমে ধীরে ধীরে তার মুখ আলোকিত হয়।নির্মলা কোনোদিন টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখেনি। ভোরবেলায় কুপির সলতে জ্বালানোর সময় তার মুখ যে কাঞ্চনজঙ্ঘার মত দেখায় সে কথা আজ পর্যন্ত তাকে কেউ বলেনি। কারণ, অত ভোরে নির্মলারই প্রথম ঘুম ভাঙে। সূর্যোদয় হবার এক দেড় ঘণ্টা আগে নির্মলার রান্নাঘরে কুপির আলো জ্বলে। নির্মলা একা নয়, সেই গ্রামে সবারই রান্নাঘরে প্রায় একই সময় আলো জ্বলে। রান্নাঘরে কুপি জ্বালানোর পর সেইগ্রামের দিনের সূচনা হয়।

নির্মলার গ্রাম পাহাড়ের চা বাগানের এক প্রান্তে।

পাশের ঘর থেকে পাসাঙ বিড়বিড় করে, “এই মেয়েছেলেকে নিয়ে পারি না। এত ভোরে ওঠার কি আছে? কাজে যখন যেতে হচ্ছে না, একটু ঘুমালেই পারে। নিজেও ঘুমায় না, অন্যদেরও ঘুমাতে দেয় না।”

“হ্যাঁ তুমি ঘুমিয়েই থাক। যে দিন থেকে কাজে যেতে হবে, তখন বুঝবে ঠেলা। অভ্যাস নষ্ট কর না, বলে দিলাম।” রান্নাঘর থেকে নির্মলা উত্তর দেয়।

“কাজে যেতে হবে না, মেয়েকেও স্কুলে যেতে হচ্ছে না, তোমার মত তাড়াতাড়ি উঠে করবটা কি বল?” বিছানায় শুয়ে শুয়ে পাসাঙ বলে।


মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করে বড় কিছু বানাবার স্বপ্ন বুনলেও দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধের কারণে সৃজনার লেখাপড়ায় কম ও খেলাধূলায় অধিক মন যায়। আমাদের নিজের আলাদা রাজ্য হলে সবকিছু নিজেদের হাতে চলে আসবে, আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। আমাদের সময় পেরিয়ে গেছে, এখন আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। গত সপ্তাহে চা বাগানের গেট মিটিংয়ে বলরাম ভাষণ দিয়েছিল।


নক্সাদার চাইনিজ এনামেলের মগে গরম চা চলে আসার পর বিছানায় কি আর শুয়ে থাকা যায়? বিছানা ছেড়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাসাঙ নির্মলার কাছে এসে বলে, ‘কাজে না গিয়ে এভাবে বসে বসে খেতে পারলে কত না ভালো হত বল?’

‘হ্যাঁ হতো, যদি আমার শ্বশুর এই চা বাগান কিনে রাখত, তাহলে বসে বসে খেতে পারতাম।” নির্মলা উত্তর দেয়। “তাহলে আর কোনো কথাই নেই। বিয়ের সময় আমার শ্বশুর যদি একটি চা বাগান কিনে যৌতুক দিত, তাহলে আরো ভাল হত।” “পাসাঙের কথা শুনে নির্মলা বলে, “তাহলে আমরা দু-দুটি চা বাগানের মালিক হতাম।”

নির্মলার কথা শুনে পাসাঙ হো হো করে হেঁসে ওঠে। সাথে নির্মলাও হাঁসে, দুজন অনেকক্ষণ ধরে হাঁসে।

এই এলাকার মানুষের জন্য হাঁসাটা আমোদপ্রমোদের এক মাধ্যম। হাঁসার জন্য অন্তত সরকার প্রমোদ কর বসায়নি। এই এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সরকারের খাতে জমা হয়, তাই হয়তো হাঁসির উপর প্রমোদ করের উপর ছাড় দিয়ে রেখেছে সরকার।

প্রায় এক মাস হতে চলেছে, অনির্দিষ্টকালীন বন্ধের মধ্যে পাসাঙ ও নির্মলার জীবনের চাকা ঘুরতে থাকলেও কোথায় গিয়ে থামবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করে বড় কিছু বানাবার স্বপ্ন বুনলেও দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধের কারণে সৃজনার লেখাপড়ায় কম ও খেলাধূলায় অধিক মন যায়। আমাদের নিজের আলাদা রাজ্য হলে সবকিছু নিজেদের হাতে চলে আসবে, আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। আমাদের সময় পেরিয়ে গেছে, এখন আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। গত সপ্তাহে চা বাগানের গেট মিটিংয়ে বলরাম ভাষণ দিয়েছিল। বলরামের ভাষণ শুনে পাসাঙ তার মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কল্পনা বুকে বেঁধে বাড়ি ফিরে বৌকে জানায়, “লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে, যতই হোক, আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্ন রয়েছে।” শুনেই নির্মলা উত্তর দেয়, “হ্যাঁ সেই ছিয়াশি সালের আন্দোলনে কুলবাহাদুর কাকা একই কথা বলেছিল। তারপর নিজের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে ম্যালের পিছনে চারতলা বিল্ডিং বানিয়ে দিব্যি রয়েছে। তারপর বাগানে আর ফেরেইনি।”

চায়ের খালি মগ তুলে নির্মলা বলে, “যতই বল, চা বাগানে চটি ঘষা ছাড়া আমাদের উপায় নাই। কুলবাহাদুর কাকার পর এবার হয়তো বলরামদার পালা। এবার যাও, সৃজনাকে তোল, এর তো অভ্যাস পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। লেখাপড়ায় একদম মন নেই।”

“অভ্যাস খারাপ হলে ঠিক করে নেওয়া যায়, কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎই তো অনিশ্চিত এই অনির্দিষ্ট বনধ ও আন্দোলন যে আমাদের কোথায় নিয়ে ভিড়াবে তার কোনও কূলকিনারা নেই।”

ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে পাসাঙ বলে।

পাসাঙ সচরাচর বেশি কথা বলে না। বাইরের লোকেদের সাথে তো একদমই নয়। সাত পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে সে। ছিয়াশির আন্দোলনে চল্লিশ দিন বনধ-এর পর পাহাড়ের আন্দোলন থেমে যায়, সাথে পাসাঙের লেখাপড়াও।

“এই যে শুনছ! রান্না যে করব, জ্বালের কাঠ নেই। যেটুকু জমা করা ছিল তাও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে!” নির্মলার চিন্তা বেড়ে যায়। পাশ থেকে দুটি কাঠ বের করে উনুনে দিয়ে বলে, “কেরোসিনও শেষ হয়ে গেছে।” বর্ষাকালে জঙ্গলে যে যাব তারও কোন জো নেই, সবই তো ভেজা। আনলেও শুকনো পাব তাও কোন ঠিক নেই। নিচে

সিরুবাড়িতে গেলে হয়, সেখানে হয়তো শুকনো কিছু পাওয়া যেতে পারে।” নির্মলার সাথে পাসাঙেরও চিন্তা বেড়ে যায়। “থাক যেতে হবে না। সিরুবাড়ির জঙ্গলে চিতাবাঘ দেখা গেছিল, জান না? এই বর্ষায় সে জঙ্গলও আরো ঘনিয়েছে।” কেটলি থেকে মগে চা ঢেলে নির্মলা কথাগুলি বলে। বরং কেরোসিনের ব্যবস্থা করলে ভাল হয়। গিয়ে দেখ না, সাইলামুদি দোকানে পাওয়া যায়

কি না?” চায়ের মগ পাসাঙের দিকে ঠেলে দিয়ে নির্মলা বলে,”কেরোসিনের দামেও তো আগুন লেগেছে, শুনছি।”

“কোন উপায় আছে কি? দেখ না, চালডাল তো কাঁচা খাওয়া যায় না।”

” ঠিক আছে, চা খেয়েই যাচ্ছি। কত আনতে হবে?”

“দেখ না, আপাতত এক লিটার হলে চলবে।”

টানা বৃষ্টির পর সেদিন আকাশ অনেকটাই খুলে ছিল। আকাশে জমে থাকা মেঘের আড়ি পেতে রোদ কখনো ঝুঁকি মেরে দেখছে আর মেঘের মধ্যে লুকিয়ে পড়ছে। যেন এক লুকোচুরি খেলা। মেঘ আরও চঞ্চল। খেলার ছলে একটু সরে পড়তেই ফের রোদের আলো চা বাগানের উপর বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছে। তখন সে হয় কোনওৎএক রূপবতী সুন্দরি সবুজ শাড়ি পরে দিগন্তের দিকে চেয়ে রয়েছে। চা বাগানের যত সব কষ্ট, দুর্দশা যেন রোদের আলোয় ধুয়ে মুছে গেছে, তাই তো পাসাঙের মুখে একটু হলেও হাঁসি ফুটেছে। চায়ের মগ হাতে নিয়ে নির্বোধ শিশুর মত আকাশের পানে তাকিয়ে রয়েছে পাসাঙ। গ্রামে হালকা কোলাহল শোনা যাচ্ছে, অনেক দিন পর গাড়ির আওয়াজও কানে আসছে। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখে কয়েকটি ছেলে হাতে বাঁশের ফালা নিয়ে এদিক ওদিক করছে। পাসাঙ প্রশ্ন করে “কি খবর? বন্‌ধ কি উঠে গেছে?”

“বন্‌ধ উঠবে কেন? যতদিন না আন্দোলনের কোন নিষ্পত্তি হচ্ছে, বন্ধ ওঠার কোন মানে হয় না।” রাস্তার পাশের গুমটিতে বসে থাকা বলরাম উত্তর দেয়। বলরামকে দেখে পাসাঙ সিঁড়ি ভেঙে রাস্তায় নেমে যায়। “কিসের প্রস্তুতি বলরামদা মিটিং টিটিং আছে না কি?”

“মিটিং নয়, মিছিল আছে। তারপর জনসভা রয়েছে বাজারে। আজ আমাদের পালা। বাগান থেকে পাঁচটি গাড়ি যাবে।” বলরাম উত্তর দেয়।

গত সপ্তাহেও বাগান থেকে চার পাঁচ গাড়ি মিছিলে গিয়েছিল। পাসাঙ যেতে পারেনি। সেদিন নির্মলার আত্মীয়ের অশৌচে যেতে হয়েছিল। অনেকদিন পর মুখের স্বাদ পাল্টেছিল সেদিন, সৃজনাও কয়েকটি রসগোল্লা খেয়ে ফেলেছিল। সৃজনা এখনও সেই অশৌচের কথা বারে বারে বলে।

“যাও, তাড়াতাড়ি কর। যেতে হবে আজ। গত সপ্তাহেও যাওনি তুমি।” বলরামের কথা শুনে পাসাঙের মনে পড়ে যায়। “বাড়িতে একফোটা কেরোসিন নেই, কেরোসিন জোগাড় করতে হবে, মিছিলে আজও যেতে পারব না বলরামদা।’ পাসাঙ উত্তর দেয়। “এরকম সমস্যা ঘরে ঘরে রয়েছে, কার বাড়িতে সমস্যা নেই? সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমাদের মাটির উন্মুক্তি, জান? বাকি সব গৌন। প্রথমে আমাদের মাটিকে মুক্ত করতে হবে।” বলরাম বলে।

“খাঁটি কথা বলেছ বলরামদা, তবে কেরোসিনের ব্যবস্থা না হলে বাড়িতে রান্না হবে না। চট করে দোকান থেকে ঘুরে আসি, তার পর যাব।”এই বলে পাসাঙ নিচের দিকে হাঁটা দেয়।

গুদামঘরের পাশের মাঠে পাঁচ ছয়টি গাড়িতে ছেলেপিলেরা ঝান্ডা লাগাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ঝান্ডা সাদা বলেরো গাড়িতে লাগানো হয়েছে। বলরামের বলেরো। মাটির মুক্তি আন্দোলনে তার পুরনো মোটরসাইকেল মুক্তি দিয়ে বলেরো গাড়ি কিনেছে। বেশি দিন হয়নি। সেই বলেরো‌ গাড়িতে চাপার জন্য ছেলেরা হুড়োহুড়ি করে, মাঝেমধ্যে হাতাহাতিও হয়।‌ গুদামঘরের পাশে যমুনা দিদির দোকান। “কেরোসিন আছে যমুনাদি?” দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে পাসাঙ জিজ্ঞাসা করে। “নেইরে পাসাঙ, কাল পর্যন্ত ছিল, শেষ হয়ে গেছে।” ভিতর থেকে উত্তর আসে। ক্ষুন্ন মন নিয়ে পাসাঙ চড়াইখামে হাঁটা শুরু করে।‌ “না, কেরোসিন নেই। যমুনাদির দোকানেও দেখে এসেছি।” পাসাঙের কথা শুনে কাতর মুখ নিয়ে নির্মলা বলে, “থাক, তাহলে আমরা বাড়িতেই অনশন শুরু করে দিই। কি বল?”

“বাড়িতে রান্নার জন্য এক ফোঁটাটা কেরোসিন নেই, শালা বললাম। বলেরো চালানোর জন্য কোথা থেকে তেল পায়?” উঠানে দাঁড়িয়ে পাসাঙ বিড়বিড় করে।”এখানে বলেরোর প্রশ্ন কোথা থেকে এল?” নির্মলা  প্রশ্ন করে। “বাগান থেকে আজ সবাই মিছিলে যাবে। গুদামঘরের পাশে পাঁচ-ছয়টি গাড়ি লাগানো রয়েছে, ছেলেরা গাড়িতে ঝান্ডা লাগাচ্ছে। আর জান, সব থেকে বড় ঝান্ডা কোথায় লাগিয়েছে?…. বলরামের বলেরোতে।” পাসাঙ উত্তর দেয়।


বন্ধ শহরের নীরবতাকে চিরে মাইকের আওয়াজ দূর দূর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ সেই আওয়াজ বন্ধ হওয়ায় বন্ধ শহর স্তব্ধ ও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত মাইকের আওয়াজ না শোনায় সেখান থেকে উঠে সে জনসভার দিকে পা বাড়ায়। জনসভা শেষ হওয়া মানে বাড়ি ফেরা। যে গাড়িতে এসেছিল, সেই গাড়ি চলে গেলে নিজে ফিরবে কিভাবে?


“আর শুনেছ, আমাকেও যেতে বলেছিল। কেরোসিনের জোগাড় হলে যেতাম। বাড়িতে বসে বসে শরীরে জং ধরে গেছে। একমাস বন্ধ থাকলে বাজারটি কিরকম দেখতে লাগে, দেখারও ইচ্ছা ছিল।” রান্নাঘরে বসে নির্মলা পাসাঙের কথা শুনছিল। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘরে ঢুকে টাকার একটি নোট হাতে নিয়ে বেরিয়ে বলে,” একশ টাকা আছে। যাও মিছিলে।”

“এ আবার কি শুরু করলে? কি আশ্চর্য? আমি কি যাব বলেছি?” পাসাঙ হাঁ করে নির্মলার দিকে তাকিয়ে থাকে। “বাজারের দোকানগুলির ঝাঁপ বন্ধ থাকলেও লুকিয়ে লুকিয়ে জিনিসপত্র বিক্রি করে। সেদিন গীতাদি নিজের চোখে দেখে এসেছে। গিয়ে দেখো না, অল্প হলেও কেরোসিন পাওয়া যায় কি না?” নির্মলা তার মত প্রকাশ করে। “মিছিলে যাব না কি কেরোসিনের তল্লাশে? বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে কোথায় যাব?” পাসাঙ উত্তর দেয়।

“তুমি আমার কথা বুঝতে পারছ না। দেখ, বাজার পর্যন্ত যাওয়ার জন্য গাড়িও রয়েছে। তোমার মিছিলে যোগদানও হবে। গ্রামে কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছে না, বাজারে হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। সেজন্যই বলছি, এই সুযোগে ঘুরে আসো। একটি কথাও বোঝে না মানুষটি!” মিছিলে যাওয়ার মতলব পাসাঙকে বুঝিয়ে বলে নির্মলা।

কেরোসিনের বোতল ঝোলায় নিয়ে পাসাঙ গুদামঘরের দিকে রওনা দেয়। ঝান্ডা লাগানো গাড়িগুলি পর পর দাঁড়িয়ে রয়েছে। মহিলাদের গাড়িতে তোলার পর পুরুষদের পালা। সবাই গাড়িতে ওঠার পর পাসাঙ শেষ গাড়িটির পেছন সিটে বসে পড়ে। কাঁধের ঝোলাকে কোলে রেখে সে বসে। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সেই ঝোলায় প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগে কয়েকটি রুটি ও শুকনো সবজিও বেঁধে দিয়েছিল নির্মলা। বাজার পৌঁছে গাড়িগুলি দাঁড়িয়ে পড়ে। গাড়িতে ওঠার আগে বলরামদার নির্দেশ অনুযায়ী মিছিলের প্রথম সারিতে মহিলা ও শেষে পুরুষরা লাইন করে দাঁড়ায়। মিছিলের একদম শেষে দাঁড়িয়ে পড়ে পাসাঙ। সে গাড়িতে বসেই ঠিক করেছিল, সে মিছিলের শেষেই দাঁড়াবে। এর আগেও কত মিছিলে যোগ দিয়েছে পাসাঙ, তার কোনও হিসেব নেই। মিছিলের স্লোগানগুলি সব মুখস্ত রয়েছে তার। চকবাজারে পৌঁছে মিছিল শেষ হয়, পরে গিয়ে তা জনসভায় পরিণত হয়। “আলাদা রাজ্য গঠনের পথ স্থির করতে হবে। দিল্লির দরজায় কড়া নাড়তে হবে, নইলে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে ফেলতে হবে। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেই লড়াই চালিয়ে গেলে দিল্লি আর দূর নয়। আমাদের কথা শুনতেই হবে। আমাদের মাটির উন্মুক্তি আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।” নেতার জোরালো ভাষণ শুনে সবাই হাততালি দেয়। কাঁধের ঝোলা সামলে পাসাঙও হাততালি দেয়। ভিড় থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পর একটি দোকানের সামনে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভিতর থেকে বন্ধ করা দোকানেরদরজায় কড়া নাড়ে। কোনও উত্তর না মেলায় পাসাঙ সামনের গলিতে এগিয়ে যায়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে আর পা সরে না, কিন্তু বাড়ির উনুন, নির্মলা ও সৃজনার ম্লান মুখের চিন্তায় তাকে বিশ্রাম নিতে দেয় না। কেরোসিন না নিয়ে বাড়ি ফিরবে না তা অভিপ্রায় নিয়েই সে বাজারের অলিগলি ঘুরতে থাকে। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর একটি দোকানের সামনে মানুষের জটলা দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “কেরোসিন পাওয়া যাবে?”

দোকানের ভিতর থেকে উত্তর আসে, “আছে, কিন্তু আধ লিটার দিতে পারব। অল্প অল্প করে হলেও সবাইকে দিতে হবে। আধ লিটার কেরোসিন বোতলে নিয়ে ঝোলায় পুরে পাসাঙ সেখান থেকে হাঁটা দেয়। খানিকক্ষণ হাঁটার পর দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকায় তারপর একটি বন্ধ দোকানের সামনে ঝোলা থেকে রুটি ক্যারিব্যাগ বের করে চুপচাপ বসে পড়ে। মাইকের ভেসে আসা ভাষণ শুনতে শুনতে দুটি রুটি শেষ করতে করতেই মাইকের আওয়াজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ শহরের নীরবতাকে চিরে মাইকের আওয়াজ দূর দূর পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ সেই আওয়াজ বন্ধ হওয়ায় বন্ধ শহর স্তব্ধ ও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত মাইকের আওয়াজ না শোনায় সেখান থেকে উঠে সে জনসভার দিকে পা বাড়ায়। জনসভা শেষ হওয়া মানে বাড়ি ফেরা। যে গাড়িতে এসেছিল, সেই গাড়ি চলে গেলে নিজে ফিরবে কিভাবে? জনসভা নয়, সকালে যেখানে গাড়িগুলি রাখা ছিল, সেদিকেই যেতে হবে ভেবে পাসাঙ ফের উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করে। “একটিও গাড়ি নেই। কোথায় গেল সব গাড়ি?” পাসাঙ হতচকিত হয়ে চারদিকে তাকায়। গাড়িগুলি সকালে যেখানে রাখা ছিল, সেখানে একটিও গাড়ি ছিল না। সে আবার জনসভার দিকেই ছুটতে শুরু করে। দেখে, মানুষও চারদিকে ছোটাছুটি করছে। সেই দৌড়াদৌড়ি ও বিশৃঙ্খলতার মধ্যে পাসাঙ তার পরিচিত মুখগুলি খুঁজতে থাকে। হঠাৎ দেখে, ভিড়ের পিছনে পুলিশও ছুটছে। কিন্তু বুঝে ওঠার আগেই সে ফের উল্টোদিকে দৌড়তে শুরু করে। এর আগেও পাসাঙ বহুবার মিছিল ও জনসভায় এসেছে কিন্তু এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনদিন হতে হয়নি। বড়দের মুখ থেকে এই ধরনের ঘটনাবলি শুনেছে বহুবার, তবে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কি করতে হয় তা জানে না পাসাঙ। বড়রাও বলেনি। পালানো ছাড়া আর কোনও গতি নেই- তা অবশ্যই জেনে গেছে ততক্ষণে। নিজের শরীরের সামর্থ ও সর্বোচ্চ গতি সেদিন টের পায় পাসাঙ।

একটি গলির ভিতরে দোকানের পেছনে সে ধপ করে বসে পড়ে। মাথায় নানারকম চিন্তা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত পাসাঙ অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে থাকে। মাথায় আর অন্য কোন বিকল্প ও উপায় আসছিল না। যেমন ভাবেই হোক গ্রামের লোকজনের সাথে দেখা হলে বেঁচে যায় আর অন্যদিকে পুলিশের সাথে দেখা না হলে বেঁচে যায়। নিরুপায় হয়ে চুপচাপ বসে থাকে পাসাঙ।

হঠাৎ একটি শক্ত হাত কাঁধে ও অন্য হাত কোমরের পেটি ধরে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে বলে “চল ওঠ।” পাঁচ-ছ জন পুলিশ পাসাঙকে ধরে রাস্তায় বের করে। দূর থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ির সাইরেন ও পুলিশের গাড়ির ঘন ঘন চলাচলে শহরের নিস্তব্ধতাকে চিরে যাচ্ছে। “বড়সাহেব এসে প্রেসমিট করবেন” এক পুলিশ ইন্সপেক্টার সাংবাদিকদের খবর দেয়। ততক্ষণে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, থানায় পুলিশের তৎপরতা বেড়ে গেছে। সারাদিনের খবর সংগ্রহ করতে সাংবাদিকদের ভিড় জমে গিছে থানায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই এস.পি-র গাড়ি চলে আসে।

“আজ শহরে অবৈধ জমায়েত, মারামারি, সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটনার জেরে মোট সতেরোজনকে আমরা আটক করেছি। আজকের ঘটনায় তিনটি সরকারি অফিস ভাঙচুর হয়েছে, দুটি সরকারি ও একটি বেসরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এক সাব-ইন্সপেক্টার পাঁচজন পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন।

আটকদের মধ্যে বারোজনকে কাল আদালতে পেশ করা হবে, বাকি পাঁচজনকে  জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরপরাধ পাওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আজকের ঘটনায় মূল পাণ্ডা ও আন্দোলনের সক্রিয় নেতাকে গ্রেপ্তার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মুখ্য অভিযুক্তকে আমরা হাতেনাতে ধরতে পেরেছি।

নাম পাসাঙ তামাং, বয়স ৩৫।

আধ বোতল কেরোসিন / সূরজ শর্মা / গল্পের সময়

 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।