
কথাটা শুনেই, ভেতরে ভেতরে যেন শুকিয়ে গেল প্রার্থিতা। কাত্তিকের সিনসিনে হাওয়া বইতে শুরু করলে যেমন বাথরুমের মেঝে শুকিয়ে যায় ঠিক তেমন।
মা বলতেন, টানের দিন। লেপ-কম্বলের দিন শুরু হল এবার। বসন্তের মাকে বলে ছাদটা ঝাড় দেওয়াতে হবে। শুধু আচার শুকোতে দেবার জায়গা ঝাড় দেয় রোজ। গোটা ছাদটা ঝাড় দেয় না কখনও। দু কাঠা জমির ওপর ছড়ানো চওড়া বাড়িটায় এত আলো বাতাস ছিল যে প্রার্থিতা যেন প্রকৃতির সব রঙ আলো বাতাসই পেয়ে যেত এই চকচকে লাল মেঝেওয়ালা একতলা চৌহদ্দির মধ্যে। প্রার্থিতার বাবা শখ করে নাম দিয়েছিলেন – সেঁজুতি। পেছনের দুকাঠার বাগানে যেন ছিল প্রকৃতির বারোমাস্যা। সব ঋতু যেন জানান দিয়ে যেত কোনও না কোনও গাছে। বাগানওয়ালা বাড়ির প্রতি বাবা-মা আর মেয়ের এই দুর্বলতা যেন ক্রমশ জাঁকিয়ে বসছিল। বছরে তিনবার বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানাও খোঁজা হত বাগানওয়ালা কোনও বাগান বাড়ি অথবা বাগানওয়ালা কোনও হলিডে হোমে। ভাগ্য তাদের সাথ দিয়ে সেসব শুধু পাইয়েই দেয় নি, নেচার লাভার মেয়েটির ভবিষ্যতের ঠিকানাও বেঁধে দিয়েছিল এক সাতমহল্লা সেনবাড়ির একমাত্র পুত্রের সাথে। প্রার্থিতার বড়মামা তার অফিসের জুনিয়র এর আত্মীয় আই.বি.এম এর প্রফেসর অভিরূপ সেনের সঙ্গে যখন সম্বন্ধ ঠিক করলেন তখনও প্রার্থিতার অজানা ছিল সেন বাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকারী, তার উড বি হাজবেন্ড জমি পুকুর বাগান নিয়ে প্রায় সাড়ে চার বিঘার মালিক হলেও সে মহল্লা সত্যিই এক গড় শ্রীখণ্ডের খণ্ডাহার।
বিয়ের পরের দোল পূর্ণিমার দিন বাড়ির প্রতিষ্ঠিত রাধাবল্লভ জিউর পুজোর ফল কাটতে বসা প্রার্থিতাকে কনুই এর এক ছোট্ট ধাক্কায় আর চোখের ইশারায় তার মধ্যপ্রদেশকে ইঙ্গিত করে চটুল মেয়েলি টোনে সম্পর্কিত বড় জা যখন জানতে চাইলেন – খবর কী রে ছোট? নতুন কোনো খবর আছে?
লজ্জায় মাথাটা নামিয়ে সম্মতি দিয়ে ফেলেছিল প্রার্থিতা। শাশুড়ির সম্পর্কিত ভাইপোর স্ত্রী তমসা হাতটা ধরে বেশ কড়া গলায় বলেছিল- ক’মাস রে ছোটো?
ছোট্ট উত্তর দিয়েছিল ছোট – এই তো তিনমাস চলছে। হাতের কাজ থামিয়ে চারপাশ দেখে কড়া গলায় বলেছিল তমসা – পুজো শেষ হলেই বাপু সোজা বাপের বাড়ি চলে যাবি। একদম থাকিস না। এবাড়িতে কারো কোনও কথা, অনুরোধ, যুক্তি, ভালবাসা কিচ্ছুটি শুনবি না।
চমকে গিয়েছিল প্রার্থিতা – কেন গো দিদি?
-জানবি এ এক গড় শ্রীখণ্ড। নবাগতর কোনও স্থান নেই এই খণ্ডে । কোন অভিশাপে জানি না এ বাড়ির মধ্যে থেকে কোনও নতুন অতিথিকে আনা যায় না, যায়ও নি, একমাত্র একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। শাশুড়ি বলেন নি তোকে একথা?
– না সেভাবে বলেন নি। আর আমি ওসব ঠিক মানিও না। তবে তুমি যখন বলছ বাবা মাকে বলে দেখব। বাবা এমনিই চুঁচুড়াতে নিয়ে যাবে বলেছিল।
মুখে মানি না বললেও ভেতরে ভেতরে প্রার্থিতাকে বেশ শুকিয়ে দিচ্ছিল আচমকা উড়ে আসা কথাটা।
ব্যাপারটা বুঝেই তমসা অনেকটা খোলসা করেছিল–
-একদম সোজা চলে যাবি। শোন, তোর শ্বশুরের বাবাই এই বাড়িতে একমাত্র বেঁচে যাওয়া সন্তানের বংশ। তাও গোপালের কাছে মানত করে। তাই তো অমন নাম থাক্গোপাল সেন। তার আগের নয়টি সন্তান খরচার খাতায়, ইনক্লুডিং দুই স্ত্রী। জানিস না এসব?
– না গো দিদি।
শাশুড়ি এসে পড়ায় খেই কাটল। কিন্তু রাতে মাকে খবরটি বলায় পুজো শেষ হবার রাতেই প্রার্থিতা তার চুঁচুড়ার লাল মেঝের বাড়িতে।
২
এই চুঁচুড়ায় চলে আসার পেছনে নিজের সায় কতটা ছিল আর স্বামীর সম্মতি কতটা পেয়েছিল এবং তা সমানুপাতিক না ব্যস্তানুপাতিক সে রহস্য উদ্ঘাটন যুক্তিবাদী বা ভাববাদীরা বা অনুসন্ধিৎসুরা করে ফেলতেই পারেন কিন্তু কয়েক মাস নিজের বাড়ি কাটিয়েও এমন পরিপূর্ণ সময়ে কার্তিকের প্রথম কুয়াশা মাখা গাছের পাতাগুলো ধরতে না পারার দুঃখ প্রার্থিতাকে তাড়া করেই বেড়াত। আসলে মনে প্রাণে প্রার্থিতা যেন হয়ে উঠেছিল এক শীতের শাশ্বতী। তাই ঋতুমতী হওয়ার বহু আগে থেকেই সে মনে মনে পাতা ঝরার মরশুমের ঋতুপর্ণা। পাতা ঝরার শব্দ শুরু হলেই ও পাতা ঝরানোর হাওয়ার মতন বাঁধনহারা। ওর সে আনন্দ দেখে কে? পেছনের বাগান থেকে শুরু করে দূরের খালধার পর্যন্ত বিস্তৃত কুয়াশামাখা বনে যখন ধোঁয়াশা ছড়িয়ে যখন হেমন্তের সন্ধ্যে ঝুপ করে নেমে আসত আর গায়ে হালকা স্টোলটা চাপানোর মতন শীত করত , তখন সে একাই ছাদে ঘুরঘুর করত, উদ্দেশ্যহীনভাবে। হেমন্তের এই বিকেলগুলোকে চেটেপুটে ভোগ করবে বলে শেষ দুপুরের রোদ পড়ে এলেই নানা অছিলায় ছাদে যেত আবার কখনও হাতলভাঙা চেয়ারটা টেনে পা ছড়িয়ে বসে থাকত।
একবার এক রোববার ওর স্বামীর দুপুরের ঘুম হঠাৎ ভেঙে যাওয়ায় আর ওকে বাড়ির কোথাও খুঁজে না পাওয়ায় খুঁজতে খুঁজতে ছাদে উঠে ওকে দেখতে পেয়ে ঠাট্টা করে বলেছিল, শীতকাঙালি কোথাকার। প্রার্থিতা হেসে বলেছিল – বুঝলেন মশাই, ডিস্টোপিয়ান প্রেমিক এ যুগে খুব দুর্লভ। সামলে রাখতে শিখুন। সত্যি হেমন্ত এলেই ও মনে মনে হয় যায় শীত কাঙালি। তবে যে খুব কনকনে শীতের ও প্রত্যাশী তা নয়। মাইনাস শীতের দেশ নয়, ওদেশের বসন্তে মোড়া শীতই ওর চাই। শ্বশুরমশাইও একবার খুব আনন্দ করে ফোন করে আশাহতই হয়েছিলেন। ইংল্যাণ্ড থেকে ফোনে বলেছিলেন – আসবে নাকি এখানে? এখন মাইনাস দুই যাচ্ছে। নিরুত্তাপ গলায় প্রার্থিতা বলেছিল – না গো বাবা তুমি উপভোগ কর। আমায় কাত্তিকের মতন মজা কেউ দিতে পারবে না।
৩
চুঁচুড়ার বাড়িতে এই কমাসে অনেকে এসেছেন। থেকেছেন শ্বশুর, শাশুড়ি পর্যন্ত। কিন্তু মুখে রা টি কাড়েন নি কেউ। কেন কাড়েন নি বলতে পারবে না কেউ! শুধু একদিন প্রার্থিতার মুখে কার্তিকের গল্প উঠতেই অভিরূপের এক দূরসম্পর্কের মুক্তি পিসিমা শুনিয়েছিলেন সেই শুন্যতার গল্প। বুড়ি মুখ নাড়িয়ে বলেছিল – থাম বাপু ও বড় মরা মাস। আমাদের বাড়িতে ও হল মরা কাত্তিক। আমার ন দাদুর বাবা এ মাস এলেই বলত – আবার এ মরা কাল এল রে। এত বড় বাড়িটা ফাঁকা হয়েছে এ মাসেই। জোড়া কাত্তিক পড়েছিল সেবারে – পুজো সেরে ওঠার পরই সেই যে বিদায় দিতে শুরু করেছি তারপর বাতি দেবার কাউকেই পাই নি। রয়ে গেছে শুধুই এই থাক্গোপাল আর ব্যাচেলার আমি। কি যে খণ্ডাহার তৈরি হয়েছে এ বাড়িতে কে জানে।

– ঠাকুর জলে পড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া দিলেই সব হাত পা সবই যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসে। তারপর নরম হাতখানা দিয়ে প্রার্থিতার শাঁখা পরা হাতটা টেনে নিয়ে বলেছিল- তুমি মা আবার এই শীতেই আবাহনী গাইছো? কি জানি,ভয়ে আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে।
প্রার্থিতা ঠাণ্ডা স্বরেই বলেছিল – না পিসিমা একদম ভাববেন না। প্রকৃতির নিয়মে সব ঠিক হয়ে যাবে।প্রকৃতি তার নিজের সন্তানের যত্ন নিজেই করেন। এই যে এত ফুল, ফল হয়, প্রাণীরা নষ্ট না করলে নিজের জায়গাতেই থাকে আপনমনে। আর আমি তাই ঠিক করেছি, মেয়ে হলে আমার মেয়ের নাম দেবো হৈমন্তী।
৪
মাঝে মাঝে নিজের মনেই হাসে প্রার্থিতা। তার নিজের নামটাই তো হৈমন্তী হলে সে বোধহয় সবচেয়ে খুশী হত। রথের দড়িতে টান পড়লেই তার মনে কোথায় যেন একটা ভাল লাগা শুরু হয় – ওই বুঝি সে আসছে – ঠিক যেন নিজের ভাইয়ের আসার খবর দিয়ে ডাকে চিঠি এল। ওদের বাড়িতে আগে যে রাণু পিসি থাকত আর খুব সুন্দর আমের আচার করত আর শীতের প্রতীক্ষায় শুধু উলের গোলা ছড়িয়ে সোয়েটার বুনত – কার জন্য কে জানে আর ছাদের রোদ বাড়লে বালতিতে করে রোদে জল গরম করে সেই জলে প্রার্থিতাকে চান করাত। সেই রাণু পিসি মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলত – তোমার দূরসম্পক্কের ওরা দু’টি ভাই- কাত্তিক আর হেমন্ত। তাই তোমার এত টান। সত্যি মন কেমন করা টান হয় প্রার্থিতার। কাউকে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। মাঝে মাঝে মনে হয় হেমন্ত সত্যি এক উপোসী পুরুষ ঋতু। যেমন বর্ষার মতন মেয়েলি ঋতুমতী নারীর আগমনের পরেই নরম গরমে মোড়া স্ট্যান্টবাজ চ্যাংড়া শরৎ। এদেশের কবিরা বর্ষাকে বেশি মাত্রা দিয়েছে বলেই প্রার্থিতার মনে হয়। আর কাত্তিকের ভাষাহীন বিষণ্ণ পৌরষত্ব যেন মনে মনে অঘ্রাণের বর্ধিষ্ণু নারীত্বে আত্মসমর্পণ করে এক অন্য রকম মাত্রায় ঋতুকল্পা। আর কুয়াশার মতন মায়াবী সুন্দরকে যে সঙ্গে বয়ে ঘুরতে পারে যে তার কাছে তো সব কিছু বাজি ধরা যায় -এমনকি পারিবারিক অভিশাপ পর্যন্ত। তাই শিশির ভেজা ভোরের পাশে কুয়াশার চাদরে ঢাকা কাত্তিকের সন্ধ্যে দেখতে না পেয়ে মনে মনে নিজেকে যেন নজরবন্দী বেগম সাহেবা ভাবত কখনও কখনও। সে যে নিজে মনে মনে শুধু হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যান নয়, হতেই চায় হেমন্তের বিকেলের ডাক ও তার বাবু।
৫
অবশেষে এল যে শীতের বেলা। সেই অঘ্রাণের শেষের দিনের আগের সন্ধ্যেতেই চুঁচুড়ার সারদা সেবা নিকেতনের সামনে পার্কিং লনে গাড়ি পার্ক করছে অভিরূপ। দেখলেন বেড়িয়ে যাচ্ছেন ডাঃ বিশ্বরূপ সামন্ত। হাসলেন গুড নিউজ। ওপরে যান।
-রিয়েলি?
-একদম। ডবল গুড নিউজ।
-হোয়াট?
-ইয়েস ওপরে যান না।
ওপরে প্রায় ছুটতে ছুটতে যখন উঠছেন অভিরূপ সিঁড়ির পাশে লাগানো মোটা কাঁচের ওপারে তখন সন্ধ্যা নামছে। প্রার্থিতার প্রিয় কার্তিক যেন দাঁড়িয়ে আছে হেমন্তকে সঙ্গে নিয়ে।
মনে পড়ছে, একদিন প্রার্থিতা বলেছিল- জানো তো বৈষ্ণবদের কাছে এই কাত্তিক খুব পবিত্র একটা মাস অথচ আমি তো বৈষ্ণবী নই। তবু এই কার্তিককে এত ভালবাসি কেন? কখনও পুজোও তো করিনি।
সান্ত্বনা দিয়ে অভিরূপ বলেছিল বৈষ্ণবদের কাছে কার্তিক রূপে নয়, গুণেই মহৎ। তাই তো দ্বাদশীর প্রদীপে পোড়া ঘি এর গুণের স্পর্শ পেতে চায় কজন আর হেমন্তকে চিনতেই বা পারে কজন? তোমার মতন ভালোবাসা তো দূর অস্ত।
হাসতে হাসতেই প্রার্থিতা প্রশ্ন করেছিল – তাহলে হেমন্ত কিসের ঋতু?
আচমকাই অভির মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল- মায়ায় বাঁধা ছায়া ছড়ানো এক কায়ার ঋতু।
হঠাৎ হাতে আলতো ছোঁয়ায় চমকে উঠল অভিরূপ। মা সঙ্গে বাবা। কিন্তু মুখ গম্ভীর। জোড়া নাতির মুখ দেখেও কেন যে গম্ভীর বোঝার আগেই ছুটে এলেন প্রার্থিতার বাবা।
– শিগ্গির যাও, প্রার্থিতা ডাকছে। দুই ছেলের নামকরণ ও করেই ফেলেছে। শুধু তোমার অ্যাপ্রুভালটা জরুরি। হেসে ফেলল অভিরূপ।
সবাইকে সরিয়ে প্রার্থিতার কেবিনে ঢুকতে যাবে, পথ আটকালেন ওর বাবা।
ব্যাপার বুঝে অভিরূপ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল – কি নাম দিয়েছ প্রার্থিতা?
লাফিয়ে উঠলেন প্রার্থিতার বাবা- আকাশপ্রদীপ। সবই ঠিক আছে কিন্তু একটু ব্যাক ডেটেড হয়ে গেল না?
এবার এগিয়ে এলেন অভিরূপের বাবা, যেন এক সাবধান বাণী উচ্চারণ করলেন – সব বুঝলাম। কিন্তু আমাদের বাড়িতে গোপাল আছে মনে রেখো। ও না জানলেও তোমার জানা আছে বোধহয় তাকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয় আমাদের নামের সাথে। যেমন আমার রাখহরি বা তোমার অন্তত কুষ্টিতে রাখা হয়েছিল- প্রাণগোবিন্দ।বংশের বাতিটা যেন না নেভে।
মনে মনে হাসল অভিরূপ। হেমন্ত আর কাত্তিকের বোনের উপোসী বংশের যোগ্য উত্তরাধিকারী বেছেছে প্রার্থিতা- আকাশ-প্রদীপ।
মুখে তবু বলল – ঠিক সেইজন্যেই তো আকাশপ্রদীপ। হারিয়ে যাওয়া বংশের হারিয়ে যাওয়া বাতিকে জ্বালাবে। তোমার বউমার-এর মতন হেমন্তের সন্ধ্যার এক ডিস্টেপিয়ান প্রেমিক হয়ে।
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

Tags: গল্প, গল্পের সময়, দেবাশিস মজুমদার, সেনাপতি
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।