
আজ প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে গঙ্গার ধার দিয়ে হাঁটছি। তখন পূব দিগন্ত রাঙা হচ্ছে, রাস্তায় বিশেষ মানুষ জন নেই। এমন সময়ে আমার দৃষ্টি আটকে গেল এক অতি চেনা মুখের ওপর। ভিজে কাপড়ে ঘাট থেকে উঠে আসছেন। কম বয়সে এই মানুষটাকে একবার দেখবার জন্যে গ্রাম থেকে এসে ইডেনে ক্রিকেট খেলা দেখেছি। আজ একেবারে চোখের সামনে, কোনও ভিড় নেই, কোনও পাহারা নেই। এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করলাম।
প্রতি নমস্কার করে বললেন, চিনে ফেলেছেন আমাকে?
আমি বললাম, আপনাকে কোন বাঙালি চিনবে না ? আপনি তো আমাদের অল্প বয়সে গুরু। তা আপনি আজ এখানে ?
– আমি এসেছিলাম তর্পণ করতে। আজ পিতৃপক্ষ শেষ। মহালয়া। এই দিনটা আমি পালন করি।
– তা এত ভোরে? সবে তো পুব আকাশ লাল হচ্ছে। আপনি কি এখনও ভিড় এড়িয়ে চলেন?
– না না, তবে আজকের দিনটা একটু আড়ালেই থাকতে চাই। কারণটা একটু অন্য ।
বাঙালি আমাকে অনেক দিয়েছে, এত ভালবাসা, এত সম্মান আমার আর কোনও সহকর্মী পায়নি। চল্লিশ বছর আগে আমি চলে গেছি, কিন্তু এখনও আমার জন্মদিন, মৃত্যুদিন বাঙালি জীবনে একটা বিশেষ দিন, আমি এর কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাইনি।
এটা বোধহয় আপনি একটু বেশি বিনয় করলেন। শুধু শুধু কি মানুষ আপনাকে এই রকম ভাবে মনে রেখেছে?
শুধু শুধু বলব না তবে ভাগ্য বলব, যশভাগ্য। তুমি একবার বাংলা ছবির সেইসব দিকপাল শিল্পীদের কথা ভাব। যেমন ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, বিকাশ রায়, তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় – এঁদের জন্মদিন, মৃত্যুদিন এসে নিঃশব্দে পেরিয়ে যায়।তাদের কথা কেউ উল্লেখ করেনা। বম্বের আমার সমসাময়িক বড় অভিনেতাদের কথা ভাব। তাদের নিয়েও আমার মত উন্মাদনা হয়না। সেদিক থেকে আমি ভাগ্যবান। তাইতো আমি আমার পূর্বপুরুষ ছাড়াও বাংলা ছবির অসংখ্য গুণী পরিচালক, সহ অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীর জন্যেও তর্পন করি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি ভাই, যশ অপযশ যা কিছু পেয়েছি সবই ভাগ্যের দয়া অথবা অদয়ায়।
– আপনার অপযশ ছিল নাকি?
– বাবা, অপযশ ছিল না? বাঙালি ২৪শে জুলাই তারপর ৩রা সেপ্টেম্বর আমাকে মাথায় তুলে নাচে। তারপর মহালয়া আমাকে আছাড় মারার দিন। এই দিনটা আমি একটু আড়ালেই থাকতে চাই। তোমার মনে আছে ১৯৭৬ সালের মহালয়ার কথা? ঐ দিন মহিষাসুরমর্দিনীর পরিবর্তে আকাশবাণী থেকে প্রচারিত হয়েছিল ‘দেবী দুর্গতিহারিণীম’। সেবার নাকি বাঙালি জাতির মহালয়াই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এমনকি দুর্গাপুজোও। এর জন্য দায়ী কে? না এই হতভাগ্য। তারপর থেকে প্রতিবছর মহালয়ার দিন সকালে সবাই রেডিওয় মহিষাসুরমর্দিনী শোনে তারপর আমাকে গালমন্দ করে। তাই তো আজ সকাল সকাল তর্পন করে চলে গেলাম।
– এ রকম বলবেন না।
– নানা আমি অনেক ভেবেই বলছি। এখনও পর্যন্ত মানে প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও মহালয়া এলেই লোকে একবার আমাকে গালাগালি দিয়ে নেয়। ‘উঃ বীরেন ভদ্রর সঙ্গে টক্কর দিতে গেছে !!’ তুমি কতখানি জান জানিনা। আমি জীবনে কারও সঙ্গেই টক্কর দিতে চাইনি।এমনকি তোমরা যাকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে লড়িয়ে দিতে চেয়েছ তাঁর সঙ্গেও আমি টক্কর দিইনি। আমি খুব খুশি যে সে দীর্ঘজীবন পেয়েছিল আর শেষ পর্যন্ত কাজ করে যেতে পেরেছে। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
হ্যাঁ কী বলছিলাম যেন? টক্কর।আসলে আমি চিরকাল নিজের সঙ্গেই টক্কর দিয়েছি।লোকে প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিলেও আমি একটা একটা করে নিজের ত্রুটি খুঁজেছি। পরের ছবিতে যেন তার পুনরাবৃত্তি না হয়। মানিকদা তো নায়ক ছবিতে এটা দেখিয়েছেন। আমাকে দেখেই তো মানিকদা নায়ক সিনেমার পরিকল্পনা করেছিলেন। বীরেনবাবুকে আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁর সঙ্গে টক্কর দেবার কথা শুনে সত্যিই আমার দুঃখ হয়েছিল।
– হ্যাঁ, আমার মনে আছে সব।
– কিন্তু পেছনের ঘটনা হয়তো তুমি জাননা সবটা।তোমাকে আমি সেইটা একটু মনে করিয়ে দিই। মহিষাসুরমর্দিনী একটি অপরূপ অনুষ্ঠান। এটা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। এরকম বিশেষ দেখা যায় না। বাজারে রেকর্ড বেরিয়ে যাবার ফলে এটি ঘরে ঘরে বাজতে থাকে। মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী প্রচারিত অনুষ্ঠানটির আকর্ষণ এর ফলে কিছুটা কমে যায়। আমার মনে হয় হয়তো সেই কারণেই আকাশবাণীর দিল্লী কর্তৃপক্ষ কলকাতাকে নির্দেশ দেন নতুন একটি অনুষ্ঠান তৈরি করতে। অন্য কোনো কারণও থাকতে পারে,তবে সেটা আমার অজানা। তৈরি হয় দেবীং দুর্গতিহারিণীম। আমাকে অনুরোধ করা হয় শুরুতে কয়েক মিনিটের পাঠ করে দিতে। আমি প্রথমে রাজি না হলে আমাকে বলা হয় সামান্য কাজ, একদিন গেলেই হবে। অবশেষে আমি এক দিন যাই, দুয়েকবার পড়ার পর পরিচালক ‘ওকে’ করেন। রেকর্ড হয়ে যায়। মোট পাঁচ মিনিটের কাজ।
অনুষ্ঠানটির স্ক্রিপ্ট লেখেন ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী, স্তোত্র পড়েন ডঃ গোবিন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং মাধুরি মুখোপাধ্যায়। সঙ্গীত পরিচালনা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, গীত রচনা শ্যামল গুপ্ত। গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় স্বয়ং, লতা মুঙ্গেস্কর,আশা ভোঁসলে এবং আরও অনেকে। গ্রন্থনায় ছিলাম আমি, বসন্ত চৌধুরি, পার্থ ঘোষ এবং ছন্দা সেন।আরও অনেক নামি দামী মানুষ জড়িত ছিলেন এতে। কোন কারণে অনুষ্ঠানটা মানুষের ভাল লাগেনি। এতো হতেই পারে। কত যত্নে তোলা সিনেমা মানুষ পছন্দ করেনা। কিন্তু এখানে যারা মুখ্য ভূমিকায় ছিল মানুষ তাদের ছেড়ে দিয়ে শুধু আমাকেই গালমন্দ করে। আমার জন্যেই নাকি ডুবে গিয়েছিল সমগ্র অনুষ্ঠানটা।তাই বলছিলাম না কপাল? কপালে ছিল বদনাম। তাই আমি গেলাম পাঁচ মিনিটের একটা ভাষ্য পড়তে। ব্যাস আমার কোনও দায় না থাকলেও চিরকালের জন্যে আমার গায়ে কলঙ্কের দাগ পড়ে গেল। আমাকে কত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল জানো? আড়াইশো টাকা। বলে হা হা করে হেসে উঠলেন।
আকাশ অনেকটা পরিস্কার হয়ে এসেছে। উত্তমকুমার বললেন আসি ভাই। এবার ভীড় হয়ে যাবে।ধীরে ধীরে তিনি মিলিয়ে গেলেন।
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: একটি কাল্পনিক সাক্ষাৎকার, গল্প, গল্পের সময়
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।