
দেবোপম, দেবদত্ত, দেবপ্রিয় – তিন তরুণ এক দুদিনের তফাতে কলকাতার আয়কর দপ্তরে প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত হয়ে ইন্সপেক্টর পদে যোগদান করলো। বয়েস তাদের বাইশ থেকে চব্বিশ। আর হ্যাঁ, তিনজনেরই নামে ‘দেব’ যোগ থাকাটা নেহাতই কাকতালীয়। তিনমাসের বিভাগীয় প্রশিক্ষণ পর্ব শেষে তিনজনেরই পোস্টিং হলো কলকাতার একই শাখা অফিসে। শহরের সুপরিচিত অফিসবাড়ি পোদ্দার কোর্টের ছ’তলায়। কলকাতার তাবৎ বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর আয়কর নির্ধারিত হয় এই অফিসে। সেই কারণে এই অফিসের জন্য সর্বস্তরের কর্মী নির্বাচন করা হয় একটু দেখেশুনে।
তবে ওদের যোগ্যতা যাচাই হলো কিসের ভিত্তিতে তা অবশ্য ওরা জানেনা। সে যাই হোক, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনজনই ওদের জন্য নির্ধারিত কাজের ধরণধারণ বুঝে নিয়ে অচিরেই অফিসে অপরিহার্য হয়ে উঠলো। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জটিল কোনো কাজের জন্যে তিনজনের মধ্যেই কারুর ডাক পড়ে, বিশেষত অফিসের বাইরে করদাতাদের সম্বন্ধে জরুরী তথ্য সংগ্রহ বা অনুসন্ধান করতে হলে তো কথাই নেই। অফিসে অন্য সহকর্মীদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পেয়ে ওরা খানিক শ্লাঘা বোধ করে। আর শুধু অফিসের কাজ বলে নয়, যেহেতু এই দপ্তরে প্রমোশনের সুযোগ অন্যান্য দপ্তরের তুলনায় অনেকটাই বেশি সে সুযোগের সুবিধে নেওয়ার ব্যাপারেও তারা বেশ আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান।
দেবোত্তম, দেবপ্রিয় একটু বেশি, দেবদত্ত কিছু কম। ওদের মধ্যে দেবপ্রিয় ইন্সপেক্টর পদে প্রত্যক্ষ নিয়োগের আগে এই বিভাগেই স্টেনোগ্রাফার হিসেবে দু’তিন বছর চাকরি করেছে। ফলে প্রমোশনের যাবতীয় ফন্দিফিকির তার আয়ত্তে। তাছাড়া সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রমোশন শুধু নয় জীবনের প্রতিটি বিষয়েই দেবপ্রিয় একই রকম আন্তরিক, লক্ষ্য একদম স্থির। কাজের নিষ্ঠার সঙ্গে বিভাগীয় পরীক্ষাগুলো চটপট উৎরে যাওয়ার ব্যাপারেও তার নিষ্ঠায় কোনো ঘাটতি নেই। এতটাই যে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে যাতে কোনোরকম বাধা না পড়ে তাই টালিগঞ্জের বাড়ির স্থানাভাব হেতু হাতিবাগানে ষ্টার থিয়েটারের উল্টোদিকে বঙ্গশ্রী মেসে এসে উঠেছে। ইস্কুল কলেজের পরীক্ষার মতো কোমর বেঁধে নিয়মিত পড়াশোনা চলছে।
দেবপ্রিয়কে দেখে দেবোত্তমও বেশ উদ্বুদ্ধ। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে মেসের ঘরে দুজনের একদম রুটিন মাফিক প্রস্তুতি। দেবদত্ত দুই বন্ধুর তুলনায় একটু হালকা স্বভাবের। অফিসার হওয়ার জন্যে তার তেমন তাড়া নেই। মাত্রই তো ২৪/২৫ বছর বয়েস, এখনই অফিসারের কাজের দায়িত্ব বা চাপ নেওয়ার ইচ্ছে তার মোটেই নেই। এটুকু আত্মবিশ্বাস ওর আছে যে মোটামুটি প্রস্তুতিতে ঠিক সময়েই পরীক্ষাগুলো উৎরে যাবে।তাই ছুটি নিয়ে আদা জল খেয়ে লেগে পড়ার তাগিদ তার তেমন নেই। সে বরং অফিস পালিয়ে ট্রাম ধরে হাতিবাগানের মেসে এসে দুই বন্ধুর নিবিড় পড়াশোনায় খানিক ব্যাঘাত ঘটিয়ে আর ওদের টিফিনে ভাগ বসিয়ে মজা পায়। অবশ্য বেশিক্ষণ জ্বালায়না। এক কাপ চা আর দু’চারটে টিপস আদায় করে অফিসে ফিরে যায়। শেষ পর্যন্ত খুব একটা হেরফের হয়নি। দেবোত্তম, দেবপ্রিয়র চেয়ে মাত্রই এক বছর দেরিতে দেবদত্তও প্রমোশনের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় বিভাগীয় পরীক্ষাটি পাশ করে গেল।
ঘটনাচক্রে ইন্সপেক্টর ক্রমতালিকায় দেবোত্তম দেবদত্তর স্থান একটু ওপরের দিকে, দেবপ্রিয় খানিকটা নিচে। পরীক্ষা- বৈতরণী পার হওয়া গেছে, ক্রমতালিকা অনুযায়ী প্রমোশন সময়মতো হয়েই যাবে। এই সন্ধিক্ষণে দেবদত্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো প্রমোশন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দীর্ঘ আট বছরের প্রণয়ের পরিণতি ঘটাতে হবে পরিণয়ে। দেবদত্তর বিয়েটা হয়ে গেল, কয়েক মাসের মধ্যে দেবোপমও সে পর্ব সেরে ফেললো। কিন্তু ওদের চেয়ে বয়েসে বছর দুয়েকের বড় দেবপ্রিয়র তেমন হেলদোল দেখা যাচ্ছেনা। বিয়ের ব্যাপারেও তার একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বলেই মনে হয়। সেটা সে প্রকাশ করেও ফেলেছিল – ডাক্তার মেয়ে ছাড়া সে বিয়ে করবে না। ধনুর্ভাঙা পণ, লক্ষ্যভেদে অর্জুন। শুধু পাত্রী নির্বাচনে নয়, বিয়ের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও। অফিসার পদে প্রমোশন পেয়ে তবেই হবে বিয়ে। সুপরিকল্পিত চেষ্টায় পছন্দমতো ডাক্তার পাত্রী পাওয়া গেল।
হয়তো নেহাতই সমাপতন যে প্রমোশনের জন্য প্রয়োজনীয় কমিটির মিটিংও নির্ধারিত হয়েছে।কিন্তু মুশকিলটা হলো ক্রমতালিকার যতটা নিচে দেবপ্রিয়র অবস্থান তাতে এই মিটিং থেকে ওর প্রমোশন স্বাভাবিক হিসেবে হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দেবপ্রিয় প্রমোশন পেলো এবং পেলো শুধু তাই নয় ক্রমতালিকায় ওর ওপরে থাকা একশো জনকে টপকে প্রমোশনের আদেশে দেবপ্রিয়র নাম এক নম্বরে। নিচে থেকে একজন সর্বোচ্চ জায়গায় উঠে এলে স্বাভাবিক কারণেই অন্য যোগ্য একজন বঞ্চিত হয়। এক্ষেত্রে সেই যোগ্য বঞ্চিত ব্যক্তিটি হলো দেবদত্ত। আহত হলেও সে মেনে নিল কারণ অন্যায্য সুবিধে যে পেলো ঘটনাচক্রে সে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
পণরক্ষার্থে অতঃপর দেবপ্রিয়র বিবাহ। সস্ত্রীক দেবদত্তর সে অনুষ্ঠানে যথোপযুক্ত অংশগ্রহণ। একই আদেশে দেবোপমও প্রোমোশন পেয়েছে। উচ্চতর পদে দুজনেরই অন্য অফিসে পোস্টিং হয়েছে। ফলত পুরোনো অফিসে দেবদত্ত একা হয়ে পড়লো, বন্ধুদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ নেই। দেবপ্রিয়র সঙ্গে তার একটা মৃদু মানসিক দূরত্বও তৈরি হয়েছে। খবরটা দেবোপমই দিলো। দেবপ্রিয় নাকি একটা অভিনব হানিমুন পর্ব সেরে এসেছে। দেবোপমের কথায় – সে এক রোমাঞ্চকর কান্ড। বিয়েও যেমন নিজের শর্তে, হানিমুনেও তেমনি অনন্য।অফিস থেকে একদিনও ছুটি না নিয়ে সম্ভবত পৃথিবীর সংক্ষিপ্ততম মধুচন্দ্রিমা পর্ব।
মাসের দ্বিতীয় শনিবারের (তখন ঐ দিনটি কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর বন্ধ থাকতো) আগের শুক্রবার হাওড়া-নিউ দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণিতে দুই বার্থের কুপের( রাজধানী এক্সপ্রেস এবং অন্য ট্রেনের এসি প্রথম শ্রেণির কামরায় এরকম একটি করে কুপে থাকে। এটিকে একসময় হানিমুন কুপে বলা হতো এবং এর টিকিট পাওয়া ছিল হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো) টিকিটে শনিবার সকালে নিউ দিল্লি পৌঁছে, মাঝের ঘন্টা সাতেক সময় নিউ দিল্লি স্টেশনের ভিআইপি রিটায়ারিং রুমে কাটিয়ে আবার শনিবার সন্ধের নিউ দিল্লি-হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেসের ঐ একই দু বার্থের কুপেতে রাত্রিবাস করে রবিবার সকালে হাওড়া ফেরা এবং গৃহে প্রত্যাবর্তন। সোমবার থেকে যথারীতি অফিস। কেউ জানতেও পারলোনা দেবপ্রিয় একটা ছকভাঙা অনন্যসাধারণ হানিমুন পর্ব সেরে এলো।
সব শুনে দেবদত্ত ভাবলো এরকম একটা অসম্ভব কান্ড দেবপ্রিয় ঘটিয়ে ফেললো কী করে! অবশ্য কাজের সূত্রে কলকাতার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী মহলে দেবপ্রিয় যে স্তরের যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল তাতে এইসব দুর্লভ সুবিধেগুলো যোগাড় করে নেওয়া সহজেই সম্ভব হয়েছে।গত শতকের সত্তরের দশকে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিমন্ডলে বিবাহোত্তর মধুচন্দ্রিমার ইতিহাসে বিপ্লবের নাম দেবপ্রিয়।
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: অভিনব মধুচন্দ্রিমা, গল্প, গল্পের সময়, দেবনাথ মুখোপাধ্যায়
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।