
দোতলার সিঁড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠতে উঠতে চিত্তশঙ্কর বললেন, টিঙ্কু, পাত্রের বাবার ফোন এসেছিলো। মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে বললো। তুই রেডি হয়ে গেছিস তো ?
চিত্তশঙ্করের একমাত্র মেয়ে টিঙ্কু, ওরফে সুচেতনা, তার বেডরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল পরছিলো।
মাথা না ঘুরিয়ে বললো, মিনিট পনেরো লাগবে । এসে গেলে তুমি ওদের টুকটাক কথায় ব্যস্ত রেখো ! আমাকে ডাকতে হবে না, আমি নীচে নেমে আসবো । তুমি বরং বিপিনকাকাকে বলে দাও সরবত-মিষ্টির ব্যবস্থাটা করে রাখতে ।
চিত্তশঙ্কর একদৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছিলেন ।
কিছুটা সংশয়ের সুরে বললেন, সে তো বলে দিচ্ছি । কিন্তু ভাবছি সব ঠিকঠাক হবে তো মা ! যাহ্, পাত্র ছেলেটা বাবার সঙ্গে আসছে কি না সেটা আবার জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেলাম !
সুচেতনা এবার মুখটা ঘোরালো বাবার দিকে, হাতে কাজল পেন্সিল । বললো, মা নেই, পাত্র তো আসতেই পারে । আর পাত্র এলে তো ভালোই । তার ভাবনার দিকটাও জানা যাবে । তুমি অতো টেনশন করো না তো ! প্রথমবারে তো তোমাকে এতো নার্ভাস লাগেনি । যাও তো, নীচে যাও। তুমি এখন কিন্তু মেয়েপক্ষ ! যদি মনে করো তাহলে টেনশন ভুলে গেটের কাছে গিয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো !
এই বলে মুচকি হেসে মুখ ঘুরিয়ে আবার সাজে মন দিলো ।
কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যোশিওলজির অধ্যাপক বিপত্নীক চিত্তশঙ্কর সান্যাল বছর দুয়েক রিটায়ার করে এখন সল্ট লেকের বাড়িতে একাই থাকেন।
বিশবছর আগে স্ত্রীবিয়োগের পর অধ্যাপনা আর মেয়ের দেখাশোনা দুই কাজই সামলেছেন একা, পুরনো কাজের লোক, তাঁর ম্যান ফ্রাইডে বিপিনের সাহায্য নিয়ে ।
সেই সুন্দরী মেধাবী মেয়ে টিঙ্কু, ওরফে সুচেতনা, বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশিওলজির উচ্চতম পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে ।
প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়াতে পড়াতে বর্তমানে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স-এ ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গে স্ত্রী-সশক্তিকরণ নিয়ে গবেষণা করছে।
আপাতত হাতে লম্বা সময় নিয়ে কোলকাতায় এসেছে বাবার কাছে ।
গেটের থামে লাগানো ‘সান্যালবাড়ি’ ফলকের সামনে এসে উব্যেরটা দাঁড়াতেই চিত্তশঙ্কর এগিয়ে গেলেন ।
ছেলে প্রসূনকে নিয়ে অজিত লাহিড়ি ক্যাব থেকে নেমে এলেন ।
তিনজনের নমস্কার কুশল বিনিময়ের পর বাইরের ঘরে গিয়ে সোফায় তিনজনে বসলেন ।
অতিথি দুজনে ঘরের এদিক ওদিক দেখছেন, চিত্তশঙ্কর ব্যস্ত হয়ে হাঁক দিলেন, বিপিন, বিপিন ।
সিনিয়র লাহিড়ি বললেন, আরে আপনি ব্যস্ত হবেন না প্রফেসর সান্যাল ।
চিত্তশঙ্কর বললেন, না না, ব্যস্ত আর কি । এই একটু…আপনারা অতদুর থেকে এলেন…
চিত্তশঙ্করের কথার মধ্যেই বিপিন একটা ট্রে-তে করে তিন গ্লাস সরবত এনে সেন্টার টেবিলে রাখলো।
-দিদিও আসছে এখনই । তুই আরেকটা গ্লাস এনে রাখ। বিপিনকে বললেন চিত্তশঙ্কর।
বিপিন ঘাড় নেড়ে চলে গেলো ।
-বেহালা থেকে আপনাদের এতোটা আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো ? চিত্তশঙ্কর হোস্ট, মনের অস্থির ভাব দূরে সরিয়ে রাখতে তিনিই আলাপ শুরু করলেন।
-নাহ ! তবে ওই যতবার আসি, সল্টলেকটা সবসময় অচেনাই লাগে। আজকাল অবশ্য জিপিএসটা থাকায় অনেক সুবিধা।
-আপনার তো ব্যবসা, আপনি স্টিভেডর, ফোনে বলেছিলেন । তা প্রসূন, তুমি কি বাবার ব্যবসাতেই…
অজিত লাহিড়ি চিত্তশঙ্করের কথার মাঝেই বলে উঠলেন, না না ! ও ইনডিপেন্ডন্ট । চাকরি করে । আমি আমার ছেলেকে ইনডিপেন্ডেন্ট রাস্তায় চলারই শিক্ষা দিয়েছি ।
-আমি সেক্টর ফাইভে একটা আইটি কোম্পানিতে আছি, অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার ।
বাবার কথা শেষ হলে প্রসূন একবার বাবার দিকে তাকিয়ে চিত্তশঙ্করকে জবাব দিলো ।
-বাঃ বাঃ, খুব ভালো, খুব ভালো । চিত্তশঙ্কর ক্রমশ সহজ হয়ে আসছেন…কিন্তু মেয়েটা এখনও আসছে না কেন…অ্যাতো দেরি করে…আমাকে এখানে বসিয়ে দিয়ে…ওই তো টিঙ্কু, মানে সুচেতনা, এসে গেছে ! আয় মা এখানে বোস । এই আমার মেয়ে অজিত বাবু !
সুচেতনা ঘরে ঢুকতেই অতিথি দুজনের মাথা ওর দিকে ঘুরে গেলো ।
হাত তুলে দুজনকে নমস্কার করে সুচেতনা হাতের মোবাইলটা সেন্টার টেবিলে রেখে বাবার পাশে সোফায় গিয়ে বসলো।
একটা ভালো সুরুচিসম্পন্ন শাড়ি পরে হালকা সাজগোজ করে সুচেতনা এসেছে, ভারি মিষ্টি লাগছে তাকে দেখতে।
এমনিতেই সুচেতনাকে তার বয়সের থেকে অনেক কমবয়সী লাগে, তার ওপর আজ আবার মন দিয়ে সাজগোজ করেছে…বেহালার পিতাপুত্র তো তাকে দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলো ।
ইতিমধ্যে বিপিন এসে সেন্টার টেবিলে সুচেতনার জন্য সরবত আর দুটো প্লেটে কিছু মিষ্টি রেখে গেলো ।
চিত্তশঙ্কর দুজনের ভাবভঙ্গী লক্ষ্য করছিলেন, আর ওদিকে সুচেতনা আড়চোখে দেখছিলো পাত্র প্রসূনকে…আমি ঘরে ঢোকার পরও যেভাবে বাবার দিকে তাকিয়ে রয়েছে…হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে পিতৃমুখী পুত্র…পিতার মুখ থেকে নিঃসৃত বাক্যই এর কাছে বেদবাক্য হবে ! দেখা যাক…
মেয়ের সান্নিধ্যে অধ্যাপক চিত্তশঙ্কর সপ্রতিভ হয়ে উঠলেন, অজিতবাবু, নিন, আপনারা একটু মিষ্টিমুখ করুন । আর, আমার মেয়ের এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন তো বোধহয় আপনার মনেই আছে। এখন ঘরের নানারকম কাজকর্ম…
চিত্তশঙ্করের কথার মাঝেই অজিত লাহিড়ি বলে উঠলেন, না না, সে-ও তো আপনি পোর্টালে দিয়েছিলেন। আমার কিছু জিজ্ঞেস করার নেই। এখন প্রসূনের যদি কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে, কিরে প্রসূন ?
বলে প্লেট থেকে একটা মিষ্টি তুলে নিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন ।
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, এই যে !
প্রসূন এতক্ষণে আড়চোখে সুচেতনাকে দেখতে শুরু করেছিলো, তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করলো, আপনার রিসার্চ, ইয়ে গবেষণার সাবজেক্টটা কি ?
সুচেতনা মুখ ঘুরিয়ে সোজা প্রসূনের দিকে তাকিয়ে বললো, বাংলায় বলতে গেলে পশ্চিমবাংলার কুমারী ও বিবাহিতা মেয়েদের সশক্তিকরণের প্রয়োজনীয়তা, স্থিতাবস্থা ও বৃদ্ধিকরণের সম্ভাব্য উপায় । আই উড নট অনলি ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড দ্য প্রবলেম কারেন্টলি বিয়িং ফেসড বাই জেন্ডার এম্পাওয়ারমেন্ট এন্ডেভারস, বাট অলসো এক্সপ্লোর দ্য পসিবল সলিউশনস !
-আ-চ্ছা ! বুঝতে পেরেছি ! তো আপনার এই গবেষণাটা এখন কি স্টেজে আছে…মানে কতটা কাজ হয়েছে ?
-এখন ডেটা কলেকশন চলছে । আরও বছর দেড়েক তো লাগবেই শেষ হতে ।
স্টিভেডর লাহিড়ির এসব কথাবার্তা বোধহয় খুব একটা মনঃপূত হচ্ছিলো না ।
তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, বাঃ বাঃ ! প্রসূন, তুই কি আর কিছু জিজ্ঞেস করবি ?
-না, বাবা ।
-তাহলে তো হয়েই গেলো ! দেখুন প্রফেসর সান্যাল, আপনার মেয়েকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে । মনে হচ্ছে প্রসূনেরও নিশ্চয়ই পছন্দ হয়েছে । ওর মা তো নেই, আর ওই একটাই ছেলে আমার । খোলাখুলিই কথা বলি ? আপনারও এক মেয়ে, আপনি তো সাজিয়েই পাঠাবেন । আর আমি ডাউরি-টাউরি একেবারেই পছন্দ করি না । তবে…
-সেতো খুব ভালো কথা লাহিড়িমশাই!
অজিত লাহিড়ির কথার মাঝেই চিত্তশঙ্কর একবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন ।
-তবে…ওই যেটা বলতে যাচ্ছিলাম । রিসেপশনের জন্য বেহালায় একটা ফেমাস ব্যাঙ্কোয়েট হল উইথ লন দেখে রেখেছি। ওদের অনেক বড়ো পার্কিং এরিয়া, হল আর লন মিলিয়ে চারশো ইনভাইটি ইজিলি অ্যাকোমোডেট করবে। কন্যাযাত্রী আপনাদের যা আসার আসবে, আর আমার সাড়ে তিনশো তো হবেই । বাড়িতে একমাত্র কাজ, আবার বারেন্দ্র ফ্যামিলি, বুঝতেই তো পারছেন ! আর বেহালার এক নামজাদা কেটারারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি, খুব রিলায়েবল, আমার কোম্পানির জন্যেও জাহাজে খাবার সাপ্লাইয়ের কাজ করে । আমি কি করবো, আপনাকে ব্যাঙ্কোয়েট আর কেটারার, দুজনেরই ফোন নাম্বারটা পাঠিয়ে দেবো । আপনি বরং ওদের সঙ্গে কথা বলে ফাইনালটা করে নেবেন ।
চিত্তশঙ্কর চুপচাপ শুনছিলেন । লাহিড়িবাবুর কথা শেষ হলে মেয়ের দিকে তাকালেন ।
সুচেতনা চোখের ইশারায় জানালো, ঠিক আছে ।
গলা খাঁকারি দিয়ে চিত্তশঙ্কর বললেন, ঠিক আছে । আপনি যেরকম বলেছেন, সেটাই করবো ।
-এই তো ! স-অ-ব কথা হয়ে গেলো । এবার তাহলে আমরা…প্রসূন ! গাড়িটা বুক কর।
বাবার লম্বা ভাষণের সময় প্রসূন প্লেটের মিষ্টিগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।
বাবার ডাক শুনে আধ-খাওয়া রসগোল্লাটা মুখের মধ্যে চালান করে উঠে দাঁড়ালো ।
অজিত লাহিড়িও সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, প্রফেসর সান্যাল, তাহলে শুভদিনটা দেখে আমি আপনাকে হোয়াটস আপ করে দেবো। ওই ব্যাঙ্কোয়েট হলটার আবার খুব ডিমান্ড। আপনি ডেটটা পেয়েই তাড়াতাড়ি…
সুচেতনা সোফা থেকে উঠে বাবার দিকে ফিরে বললো, বাবা !
চিত্তশঙ্কর তাড়াতাড়ি বললেন, এই যে মা, আনছি । আপনি একটু অপেক্ষা করুন লাহিড়িমশাই।
প্রফেসর সান্যাল দ্রুতপদে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন ।
সুচেতনা এবার প্রসূনের দিকে ফিরে বললো, এই ব্যাপারে আপনার কি অভিমত ?
প্রসূনের চোখ ছিলো তার ফোনের স্ক্রিনের ওপর । মুখটা তুলে বললো, কোন ব্যাপারে বলুন তো ?
-এই বিয়ের রিসেপশনের অ্যারেঞ্জমেন্টটার ব্যাপারে…আপনার বাবা এখনই যেটা বললেন ?
প্রসূন চকিতে বাবার দিকে তাকালো। তারপর বললো, বাবা যেটা ঠিক করেছে, তার ওপর আমি আর কি বলবো !
-বুঝলাম ! এই ব্যাপারটায় অন্তত আপনার ইনডিপেন্ডেন্ট কোনো মত নেই !
এই কথাবার্তায় লাহিড়ি দৃশ্যতই বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলেন, চিত্তশঙ্কর ঘরে ঢুকে পড়াতে বোধহয় তিনি স্বস্তি পেলেন।
চিত্তশঙ্করের হাতে একটা মুখবন্ধ সাদা খাম । তিনি খামটা অজিত লাহিড়ির হাতে দিলেন ।
অজিত লাহিড়ি এক মুহূর্ত আগের অস্বস্তি কাটাতে হালকা হাসির সঙ্গে জোরগলায় বলে উঠলেন, আরে এটা কি দিলেন প্রফেসর সান্যাল ! আপনাকে বললাম না, বুকিং অ্যাডভান্স-ট্যাডভান্স যা দেওয়ার আপনি ওদের ডাইরেক্টলি…
সুচেতনাও হেসে বললো, ওটাকে কপিপাতার বিকল্প ধরে নিতে পারেন । না, মানে, সরি, আমি একটা জোক করলাম। প্লিজ কিছু মনে করবেন না !
-কপিপাতা ! সরি ! জোক ! বলেই অজিত লাহিড়ি ফড়াৎ করে খামটা খুলে ভেতরে রাখা পাঁচশো টাকার চারটে নোট বার করে ফেলে ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, দুহাজার টাকা ! এসবের মানে কি প্রফেসর সান্যাল ?
চিত্তশঙ্কর মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বললেন, ওটা নিয়ে আপনি ভাববেন না। ওইসব খরচা টিঙ্কুর, মানে সুচেতনার, রিসার্চ গ্রান্ট থেকে অ্যালাউড…মানে দেখলাম আপনারা উব্যের নিয়ে এসেছেন, তাই ভাবলাম আসা যাওয়ার…
চিত্তশঙ্করের কথা শেষ হয়নি, এমন সময় অনভিপ্রেত ঘটনাটা ঘটে গেলো !
চার বছরের বুবলু ঘুমচোখে দৌড়ে ঘরে ঢুকে চারদিকে একবার তাকিয়ে সুচেতনাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, মা !
একেবারে বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে পিতাপুত্র একযোগে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে ক্রমান্বয়ে বুবলূ, সুচেতনা আর চিত্তশঙ্করের দিকে তাকাতে থাকলেন । কয়েক মুহূর্ত মাত্র । অজিত লাহিড়ি সামলে নিয়ে বললেন, এ কি ! আপনার মেয়ে কি তাহলে ডিভোর্সি ? কই, আপনি তো পোর্টালে এসব কিছু…
চিত্তশঙ্কর ঝটিতি বললেন, আরে না না ! শি ইজ ভেরি হ্যাপিলি ম্যারেড ! জামাই আইসিআই ব্যাঙ্কে আছে, এখন লন্ডনেই পোস্টেড । এটা আমার নাতি, বুবলু । আমার কাছে এসো তো দাদুভাই, মা এখন ব্যস্ত, এসো।
বুবলু দাদুর কাছে দৌড়ে চলে আসতে চিত্তশঙ্কর হাসিমুখে ওর মাথার চুলে হাত বোলাতে লাগলেন।
অজিত লাহিড়ি বুবলুর দিকে একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত রাগত গলায় বললেন, আপনার মেয়ে বিবাহিত ! তাহলে এই মেয়ে দেখার আমন্ত্রণ ? এসব কি ! এ তো সরাসরি চিটিংবাজি ! দুজনে মিলে প্ল্যান করে চিটিং করেছেন ।
পেছন থেকে অস্ফুট আওয়াজ এলো, তাইতো ! ঠিক কথা !
লাহিড়িমশাই ঘুরে গিয়ে ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে তারপর কড়া গলায় চিত্তশঙ্করকে বললেন, প্রফেসর সান্যাল, আপনার আর আপনার মেয়ের নামে আমি চিটিংবাজির কেস করবো ।
এবার সুচেতনা সেন্টার টেবিলে তার মোবাইলটার দিকে ইঙ্গিত করে ফোনটা তুলে নিয়ে সিরিয়াস সুরে বললো, উঁহু, মিঃ লাহিড়ি, সেসব চিন্তা একেবারেই মাথায় আনবেন না । এই মোবাইলে আমাদের সকলের এখনকার সব কথাবার্তা, ওই যে আপনার ফেমাস ব্যাঙ্কোয়েট, রিলায়েবল কেটারার, সব রেকর্ড করা আছে ! ডিমান্ডিং ডাউরি ডাইরেকটলি অর ইনডাইরেকটলি ইজ এ ক্রিমিনাল অফেন্স, সেকশন ফোর, ডাউরি অ্যাক্ট ১৯৬১, ম্যাক্সিমাম দুবছর, তার সঙ্গে দশ হাজার টাকা জরিমানা। তবে ভয় পাবেন না, রেকর্ড করে রাখাটা জাস্ট একটা প্রিভেন্টিভ মেজার । আসল কথাটা হচ্ছে, আমার রিসার্চের জন্যে আমি একেবারে মাঠে নেমে প্রাইমারি ডেটা কলেকশন করতে পছন্দ করি । আমাদের এই পশ্চিমবাংলায়, শিক্ষিত সমাজে, ডাউরির বর্তমান চেহারাটা জানা আমার রিসার্চের জন্য খুব জরুরী। তাই এই বিবাহ ডট কম-এর প্ল্যাটফর্মটা ব্যবহার করেছি, হ্যাঁ, আমার বাবার খুব আপত্তি সত্ত্বেও । কন্যাপণ নিয়ে ডাইরেক্ট সার্ভে করলে, কোনো বাবা-মা কি কিছু বলবে ! আপনি বলতেন ? তবে আপনার চিন্তা নেই, আপনাদের নামধাম কিছুই থাকবে না আমার থিসিসে । প্রথম থেকে সবই তো ঠিকঠাক চলছিলো, মাঝখানে ভগ্নদূতের মতো বুবলুটা ঢুকে…সুচেতনা এবার হাসতে লাগলো ।
বুবলু মা-র মুখে নিজের নামটা শুনে আবার দাদুর কাছ থেকে মায়ের কাছে চলে এলো ।
এতক্ষণ অজিত লাহিড়ি বিস্ফারিত চোখে সুচেতনার কথা শুনছিলেন।
এবার ভাঙ্গা গলায় বললেন, আপনারা তো ডেঞ্জারাস পরিবার মশাই । মেয়ে দেখতে এসে স্টিং অপারেশন…সেকশন ফোর ! ওরে প্রসূন, ক্যাবের কি হলো ?
-আসছে বাবা, এক মিনিট দূরে ।
– এক মিনিটও আর এখানে নয়, চল চল ! নে এই খামটা পকেটে রাখ।
চিত্তশঙ্কর এগিয়ে এলেন, ডোন্ট ওয়রি মিঃ লাহিড়ী । আপনি এভাবেই ভাবুন না কেন যে, টিঙ্কুর থিসিসে একটা ইম্পরট্যান্ট কনট্রিবিউশন করলেন ! চলুন, আপনাদের সি অফ করে আসি। সাতটায় আবার আর এক পার্টি আসবে!
[বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: গবেষণা, গল্প, গল্পের সময়, সিদ্ধার্থ সান্যাল
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।