31 Dec

কালো ময়ূরী ও কারনেশন

লিখেছেন:তন্বী মুখোপাধ্যায়


কালো ময়ূরী ও কারনেশন

দিগন্তে কালো রেখা মাঝে মাঝে দপ দপ করছে, যেভাবে অনেকক্ষণ পড়ে থাকা নিভন্ত মশাল ধিক ধিক করে ওঠে।  ঘৃণার মধ্যে মনে কেমন কাম জেগে ওঠে তার অন্ধ তমোময় দীপ্তি একটা তো আছে। এতো যে দ্বেষ কালিমায় পুঞ্জীভূত রাগ তা তো তুষের আগুন। শত্রু নারীদের ধর্ষণ ও যৌন অত্যাচারের পরিণতিতে মৃত্যু আবহমান বিজয়ের সেতু চিহ্ণ। সেহেতু জহরব্রত।

খড় বিচুলি টাল করা, ভেতরে বাঘের চামড়া, হাতির দাঁত, ভাঙা স্থাপত্য, সোনার বিস্কুট।কিন্তু মানুষ, মানুষ যে কথা বলে, বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে, যতক্ষণ না মরে। কাস্টমসের চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারতে হবে। নাহলে কতো মেয়ে নির্বিবাদে কোথায় কোথায় চলে যায়!  আজও মেয়েদের কেনা যায় রাস্ট্রীয় গোয়েন্দাও নাকি কেনে নারীকে! কতো ধারণাই তো আছে, নির্বিচারে মুখে মুখে রটে। আমার ছিলো অজ্ঞানতা।সর্বগ্রাসী এক শুভবোধের আশ্রয়ে থাকা।

এবার অস্থিরতা আমার ভেতরে। উনি বিরাট বড়ো গোয়েন্দা অফিসার। বিদেশ মন্ত্রকে কাজ করে আসছেন এক দশকের বেশি।অকূলে ঠেলে দিয়ে বললেন, চোরা পথে? এরকম হয়না। একটু থেমে ভুরু কুঁচকে বলেন,হয়নি,বলব না, হলে তা অন্যায়,অত্যন্ত খারাপ।  এই গ্লোবে এখন কোনো দেশেই এরকম কিছু যদি হয়ে থাকে, তা সীমাহীন অন্যায়।

আপনাদের অভ্যাসই হচ্ছে প্রশাসনের দিকে আঙুল তোলা।

আমি বললাম, নিজের দায়িত্ব নানাজনে নানা উপায়ে পালন করে না কি? সম্ভবত এও তেমনই। নিরুপায়তা তো ক্ষমতারও আছে। যথাসর্বস্ব পণ করেই ক্ষমতাধিষ্ঠিত জিতে গেছে। অস্বীকার করবেন না নিশ্চয়ই জুয়া প্রকারান্তরে আকাশচুম্বী দম্ভ। তা ছাড়াও শাস্তি পাওয়ার ভয় ও কম।কার্যসিদ্ধি করার যে কোনো পথেই যে কাঁটা, সেকথা বুদ্ধিমান বর্গ বোঝেন।

আমার শোনা কথা। কিছুদূর সেই জায়গাগুলোতে গিয়েওছিলাম। অবশ্য অন্য উদ্দেশ্যে। আপনারা যা বলছেন তা নয়।

উনি বললেন, আপনার এসব বিশ্লেষণ কাজে লাগবে না।

ঘৃণা আর বিরক্তি ছুঁড়ে দিলেন খানিকটা, যাতে আমাকে আর একটু কাবু করা যায়।

বললেন, বলুন, আপনি কতদিন ধরে এই ছবির মধ্যে পাইল করে নানা খবর দিচ্ছেন? যে খবর দিচ্ছেন সেই তথ্য আপনাকে কে বা কারা সাপ্লাই করতো? মনে রাখবেন দেশদ্রোহ স্পাইয়িং এর অভিযোগ আছে আপনার ওপরে।বেশ কিছু প্রমাণ নিয়েই বলছি।

যেভাবে আমি জুড়ে গেছি তার পুরোটাই একটা গল্প-বলতে পারি? বিশ্বাস নাও করতে পারেন, কিন্তু দয়া করে শুনবেন কি?

আরও চারজন শাদা পোশাকের অফিসার ঢুকলেন, জুতোয় কারুর শব্দ হলো না। কোথায় যেন পিরিয়ড শেষের ঘন্টার শব্দ হলো।

আমি কারুর অনুমতির অপেক্ষা করলাম না। বলতে শুরু করি সেই সব কথা।কালো ময়ূরীর জন্য এসব সত্য পৃথিবীতে আরো কেউ কেউ তো জানুক।

‘আষাঢ়ে কিছু ফাঁদবেন না’- শিরোধার্য করে বলা নয়, বলানোর তাগিদ ঠেলে ওঠে-

না। আমি আর্ট স্কুলের  ছাত্র। আর যথারীতি অর্থকরী বিদ্যে যেমন তা অনেকের ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে না, আমারও তাই হয়েছিল।

ঘাড় নাড়লেন অফিসার।

ময়ূরী আমার ছবি দেখতে চেয়েছিল। দেখিয়েছিলাম। ওর ইঙ্গিত ছিলো, নারী শরীর এঁকে আমি প্রচুর অর্থ বা আরো ফেম পেতে পারি, আর আমার প্রথম মডেল হতে চায় সে।

ময়ূরী ওর নাম নয়। অবশ্য স্পাইদের এরকম অনেক ভুয়ো নাম পরিচয় থাকে। ইশারায় আমাকে থামতে বারণ করলেন।

সিমেন্টের প্লাস্টার না হওয়া সার সার বাড়ির কলোনিতে কোনও একটা থেকে সে বেরিয়ে আসত, এসে একটা কুলগাছের তলায় দাঁড়াতো।সপ্তদশীর পক্ষে একটু মোটা ঠোঁট, নাক প্রায় কুমোরটুলিতে তৈরি, চোখ পিঙ্গল –অফিসার বাদ দিতে বলেন, একটা ফটো আমার দিকে এগিয়ে দেন। ঘাড় নাড়ি। এই ফটো আমিই তো দিয়েছি।

আপনার মডেল? না! আমি আবারও ঘাড় নাড়ি, এবার আপত্তিসূচক। ও কোনোভাবে কিছু টাকা লুকিয়ে রোজগার করতে চাইতো।এই আমি বুঝেছিলাম। জায়গাটা মালভূমি, কয়েকটা ঝর্ণা ছিলো।ল্যান্ডস্কেপ করছিলাম, যে-জন্য আসা।হঠাৎ, দশাসই চেহারার এক বৃদ্ধ সামনে, মুখে হাজার বলিরেখা, তাঁকে সামনে পেয়ে যাই। তিনি রাজিও হন, পোজ দেন।খাতাভরে স্কেচ করি।

অনেকদিন আগে একবার ঘুরতে ঘুরতে এদিকটাতে এসেছি।দেখার মতো এখানে মাটির রঙ, রাত্তিরে দেবশিশুর চোখের প্রায় আকাশও দেখার মতো। অদ্ভুত ঘটনা । মেয়েটিকে শরীর হিসেবে ব্যবহার করিনি। কিন্তু ওর কিছু ছবি আঁকলাম। একটা এক্সজিবিশনে পাঠিয়েছিলাম। ব্যাপারটা কোনওভাবে ক্লিক করে গেলো।খ্যাতি পেলাম-আর্টিস্টের খ্যাতি। ও পালিয়ে বেড়াত আবার একদিন চুপটি করে এসে বসত, অবাক চোখে দেখত পাহাড়-জঙ্গলের ছবির ধাতে রঙ-মিলোনো।একদিন অনেক রুপোর গয়না পরে এসেছিল।অথচ সেদিন ওর ছবি নয়, এঁকেছি ওর সঙ্গীর ছবি। ভালবেসে নয়,ভয়ে।

আমার আঁকা সেই পোর্ট্রেটখানা এ হাত থেকে ও হাতে গেলো।তারপর হঠাৎ -কাছেই কোথাও, খুবই কাছে কোথাও-ধাতব আওয়াজ হলো,বেলের মতো, শুনতে পেলাম। ঘরের মধ্যে একজন ক্রুশ্-চিহ্ন আঁকলেন।

সব অফিসার, তাঁদের দেহরক্ষী, নিরাপত্তারক্ষী তারপর কোথায় চলে গেলেন।বিচিত্র অন্ধকারে আমি পড়ে থাকলাম রাতভোর।সকাল হতে আবিষ্কার করি, চেয়ারে বসেই ঘুমিয়েছি।তবে কি, যে জল খেয়েছিলাম তাতে কোনও ঘুমের ওষুধ জাতীয় কিছু মেশানো ছিলো? বলতে পারবো না গায়ে এতো ব্যথা কেন? নিচে মনে হলো আমারই দু-চার ফোঁটা রক্ত পড়েছে মেঝেতে। কেন মনে হলো জানিনা।

একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আজও এজাহার দেবো কিনা! ইশারায় সম্মতি দিলাম।

ময়ুরী যা বলেছিলো, তা হলো তাকে পাচার করে দেওয়া হয়েছিলো, আদিবাসী সুষ্ঠু শরীরের চোদ্দ-পনেরো বছরের কিশোরী।

অফিসার বললেন , এতো ভেবে ভেবে কেন বলছেন? কুইক, কুইক।না হলে আপনার ময়ূরী আবার পাচার হয়ে যাবে।

কৌতুকটিতে হাসলাম, এই অবস্থাতেও।

ও বলেছিলো, ওকে চাকরি দেওয়া হবে বলে ওর মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসে গ্রামেরই একজন লোক।তারপর নিয়ে যায় একটা বড়ো গাড়ি-বারান্দা দেওয়া বিল্ডিঙে।সবুজ দেশের মেয়ে ও, চলে আসে একেবারে প্রাণহীন কাঁটাগাছ-সর্বস্ব অঞ্চলে।শুধু ও বলেছে, চোখ ভরে দেখেছিলাম গাড়িবারান্দা ঘিরে থাকা অগুন্তি টব, তার মধ্যে ফুটেছে সে কী অদ্ভুত লাল ফুল! পরে সে বলেছিল, ফুলের নাম কারনেশন।

ময়ূরী কিছু ম্যাপ আর কোডে লেখা প্ল্যান আমাকে এনে দিয়েছিলো। ভুল করে কাগজগুলো ছবির সঙ্গে গোল পাকিয়ে সহরে চলে গিয়েছিলো। আর তখনই কথা শুরু হয়। অবাক করা পথের ইতিকাহিনী।

।। ২ ।।

গতদিনে একটা শোওয়ার খাট পেয়েছি, তবু ঘুম ভাঙলো সারা গায়ে প্রবল ব্যথা নিয়ে। অথচ সরাসরি কোনো শারীরিক নিগ্রহ আমার ওপর হয় নি, এও সত্যি।

আমার সাংবাদিক বন্ধুকে ভুলভাল বলতে পারি নি, কোনদিনই পারি নি। তবে ও বলেছে, যেন ছবি আঁকি। কেউ কেউ বোঝার চেষ্টা করে লোকটা সত্যিই স্পাই কিংবা এটা কোনও আর্টিস্টকে নেহাত সামান্য কারণে অপরাধী সাব্যস্ত করা। ও বলেছে, ছবি বাইরে এলে মানুষের সহানুভূতি জন্মাবে।

ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে মনে হলো, কোমর থেকে নিচের অংশ যেন অসাড়। পায়ের রঙ যেন হয়েছে পেতলের মতো। অসাড় পা-দুটোকে প্রাণপণে টানছি,তখনই ছবির আইডিয়াটা মাথায় এসে গেলো চকিতে।

যদি আঁকার অনুমতি পেতাম। দেখুন আমার বিরুদ্ধে তো এখনো চার্জশিট ফ্রেম করেন নি, বলতে দিয়েছেন আমার কথা, যদি এজাহারের পর একটু… রঙ-তুলি্‌… প্রভৃতি আছে আমার কিটটায়, তুতলিয়ে অনুমতি চাইতে গিয়ে হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলো, অনুমতি না দেওয়ার কারণ কী হতে পারে, আমি মানুষটাই তো আপনাদের জিম্মায়। আমার ইচ্ছে, আমি ছবি আঁকবো।এর মধ্যে কোনো কোড, কোনো স্পাইয়িং নেই দেখতে পাবেন। এমনকী যৌনতাও সর্বস্ব নয়, মিলিয়ে নিতে পারেন।

আগেও বলেছি, মেয়েটির প্রতি দুর্বলতা আমার ছিল। তবে তার মানে এই নয়, সে যদি দেশদ্রোহিতা করে থাকে, তার প্রতি প্রেমের জন্য সামিল হয়েছি আমিও। সামনে দাঁড়িয়ে একজন প্রহরী কাম সুইপার গোছের লোক। আমাকে বলল, চুপ।ইঙ্গিতে বলল লিখে দিন।

তুলির রঙ বাক্স ভরে কবে  ছিল? ছিল সেই বাদামি,হলুদ, লাল পাতাঝরা বনপথে।ভায়োলেট ফুলে।কমলা পাথরে।হলুদ সোনাল পাখির পাখা মেলার সময়ে।জলার ধারের সূর্যাস্তের সরু সরু রেখা আঁকা আকাশি জমিতে। সকলের মনের রঙের বাক্স এই রঙে ভরা, ময়ূরীর কাছে শুনেছি অনেকবার। ভালোবাসার হাল্কা থেকে গাঢ় হওয়া এই রঙ।

বাক্স দিতেও চান না তাঁরা, কালো ছাই ছাই চারপাশ। লাল- কালো রঙ আর একটা ফ্ল্যাট তুলি দিলো। অফিসার ভদ্রলোক নিজে থেকে দিলেন ইজেল ও ক্যানভাসও।অদ্ভুত দায় নাকি শিল্প! ভদ্রলোকে দেখাতে চান তাঁদেরই আসল দায়।

শুনেছি আসলে রতিও একপ্রকার কলা।রাক্ষস মানুষ হয়তো তার ক্রমে তার সম্পন্নতা আবিষ্কার করেছে, আনন্দের মূর্তি এঁকেছে। ইতর জীবের জগৎ পরিচ্ছন্ন পরিমিত।তাদের খাজুরাহো নেই।আবার তারা রাক্ষসও নয়। সৃষ্টিকে বাঁচানোর জন্য যৌনাচারে বাঁধা। নির্দিষ্ট ঋতুকাল ছেড়ে দিলে তারা জীবনধারণে পোষণে সদাসর্বদা প্রেমিকের বাহুলগ্ন হয়ে থাকতেও চায় না। খাবার যোগাড়ের, খুশির স্নানের, সদলে জলপানের, নীড় বানানোর অন্য কাজের বিশেষ ঋতু তাদের রয়েছে।

ময়ূরীর সঙ্গে ওদের গ্রামে যাই একবার। সে বিমূঢ় হয়ে ছুটে ফেরে এদিকে সেদিকে। বারবার আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দিতে চায়।এখানেই তো ছিল ঘরটা।দুটো খোলা ছাওয়া ঘর, একটা দাওয়া, ক্ষেত। এবড়ো-খেবড়ো জায়গা হয়ে আছে, শিগগিরি নতুন বাড়ি উঠবে, নতুন পিচঢালা রাস্তার ধারে। তার প্রস্তুতি চলছে।

এখনও তার চিৎকার শুনতে পাই, ‘ইখানে মোদের ঘরটা থে, গোইল কোহারে? মোর মা দিদারে, বুনটারে-এ”- আকাশ- বিদারী চিৎকারে সকলে থমকে থাকে। পাগলের মতো আমার হাত ধরে টানে, অনির্দেশ্যভাবে ছুটে যায় একদিকে। বলে আমাকে টাকা দাও। অদের খুঁজে দাও।আমি ওদের চাকরি করে টাকা এনে দিব বুলে গেছি।আমি চিৎকার করি-“ ময়ূ—রী।“

নতুন লোক। প্লট করে বিক্রি হয়ে গেছে জায়গা। তিন- চার বছরে গড়ে উঠছে ক্রমশ ভারতের একটি নতুন মফস্বল শহর।কিন্তু কোনো পুরনো লোক নেই? কেউ বেরিয়ে আসে না। কেউ চেনা দেয় না।ভাষাহারা চোখ ময়ুরী লাল করে ফেলেছে, তাও আকাশ হাতড়ে কিছু মেলে না।

এবার চলে আসতে হয় একটু ত্বরিত গতিতে। আজকের ময়ূরী যে লোকটার সঙ্গে থাকে তার মালভূমি দেশের ঘরেই ফেরে। এরপর কোন খাতে যাবে মেয়েটার জীবন ভেবে আর কিছুদিন আমার শহরে ফিরি না, ফিরতে পারি না।

।।  ৩ ।। 

বয়ান দেওয়া শেষ হতে না হতে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। দিনের মধ্যে যখনতখন। নিশ্ছিদ্র অবিশাসী চোখসর্বস্ব এক কক্ষ গিলে খেতে থাকে, ধমকাতে থাকে।

আবার জিজ্ঞাসা- মেয়েটি কি আপনাকে জানিয়েছিল, ওকে কী ধরনের কাজ করতে হতো?

-“ বলেছিলো, সে ছিলো হানিট্র্যাপ।‘

– কোনো টাকা-পয়সার লেনদেন?

‘তাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হতো, সেখানে সে ঘর- আসবাব, খাদ্য- বস্ত্র সব পেতো। কাঁচাটাকা কখনও পায় নি। নিজের ইচ্ছেতে কোথাও যায় নি।

তাকে বলা হয়েছিলো তার সালারি জমা হচ্ছে। হানি ট্র্যাপে ফেলে শিকারকে অসুস্থ বা অজ্ঞান করে দিয়ে সে পালিয়ে যেতো।

আবার যথাস্থানে তাকে পিক আপ করা হতো।‘

আপনার সঙ্গে তার কতটা সম্পর্ক হয়?

আমি বলেছিলাম তার আঠেরো পুরলে তাকে আমি বিয়ে করবো।মজা করেই বলেছিলাম। বড়ই বেশি সে পুলকিত হয়েছিলো। তার থেকে কুড়ি বছরের বেশি বয়সের পুরুষের গললগ্ন হয়ে থেকেছিলো অনেকক্ষণ। জঙ্গলে পাখিরা ডাক থামিয়েছিলো।শিরায় শিরায় রোমাঞ্চ হয়েছে- ময়ূরী, তুমি আমাকে ভরিয়ে দিয়েছো।তারপর সে সেই স্তব্ধতা ভেঙে খসখস শব্দ তুলে বনান্তরে হারিয়ে গিয়েছিলো।

তারপর সে কি একেবারেই হারিয়ে গেলো?

আপনাকে বলতেই হবে? আপনি জানেন। আপনাকে বলতেই হবে।

আমি বলতে পারি না? না। আমার ভাষা অবোধ্য হয়ে গেলো? ময়ুরের মতো হয়ে গেলো কি আমার গলা? ঐ মালভূমির কালোমাটির বাইরে সে ভাষা কেউই জানে না। গলা চিরে রক্ত পড়ছে, দেখতে পান না অফিসার?পেতলের মতো গলা আমার, ময়ূরকণ্ঠী, আশ্চর্য গলা, জল যায় না গলা দিয়ে, গড়িয়ে পড়ে।

শুধু চলেছিলো আমার হাত। ছবিটা শেষ করতে হবে ।অত্যাচারের অবসাদে ভেঙে পড়ার আগে আমাকে আঁকতে হবে আমার শেষ ছবি, কালো ময়ূরী ও লাল কারনেশান।

।।  ৪ ।। 

প্রায় বিছানায় বসে শেষটানটুনগুলো দিচ্ছি। ছবিটা হয়ে এসেছে।

আজই আমার বিচারের কাজ শুরু হবে। বিশেষ কোর্ট বসবে তার জন্য।

আমার দুর্মর একটা বিশ্বাস তাও আমাকে যেন আলিপ্ত করে রেখেছে। অজানা সে, অপার্থিব সে তৃপ্তি।

অফিসাররা এলেন।

ছবির খুব কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, চোখের ঠিক নিচে মেয়েটির এরকম ঘন লাল তিল।  এমন মায়াময় মুখ-এতো অ্যাট্রাক্টিভ ঠোঁট। কোথায় দেখেছি?  তদন্তকারি সকলের চোখ আকাশের তারার মতো কিছু মিটমিট করে ক্ষণেক স্থির হয়ে গেছে।

এ তো সে, যার নাম চেহারা কেউ জানবে না ।হুবহু ফটো, পুলিস এর ফটো দিয়েছিলো্‌ …। “তাহলে”… বলে একটা অস্পষ্ট ঢোঁক গিললেন একজন, একজন অনিবারিত চোখে আর্টিস্টকে দেখে নিয়ে বললেন- ‘তারপর!’

একজন খালি ঘাড় বাড়িয়ে ছবি দেখে বললেন- ‘অসাধারণ, দুটি রঙে এমন ছবি। ভাইরাল।‘

একজন খালি পুলিসের সঙ্গে দূরে গিয়ে কথা বলছিলেন।

কালপ্রিটরা তো ধরা পড়েছে।যার সঙ্গে মেয়েটি থাকতো সেই শুধু পালিয়ে গেছে।সে তো শোনা যাচ্ছে পিজিবি-এজেন্ট। আর কি এ তল্লাটে আছে?

প্রথম যিনি আমার বয়ান নিয়েছিলেন তিনি বলে ওঠেন ,আর একটা ওনারই আঁকা ছবিতে, এই পর্যন্ত বলে যেন ভয় পেয়ে থমকে যান।

এরকম রেপকেসের ভিক্টিমের সারা শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েও অক্ষত মুখখানা কী করে যেন তকতক করছিল! চিরকালের ইতিহাসে থাকবে এমন একটা বিরল হিনাস ক্রাইম।কী ভীষণ।

এসব কথা শুনতে শুনতে চোখ বুজে আসে। আমার দিকে আর কেউ দেখছে না।আবেশে তুলিতে লিখি ‘ময়ূরী।‘ জড়ানো গলায় বলি, ‘ আগের ছবিতে তুমি ছিলে না, কোনও না কোনওভাবে তোমাকে পালটে নিয়েছি।তোমার খারাপ লেগেছিলো বুঝি?এ যে কী প্রতিশোধ!এখানে তোমাকে এঁকেছি, সেই রুপোর দুল, কপালে কুচো চুল, মুখের লাল তিলসুদ্ধু।’

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ