
।। উত্তরণ ।।
ওয়েটিংরুমের বড়ো ঘড়িটায় রোমান দুটো বেজে গেছে !
নিশিকান্ত ত্রিবেদী হাতের চা তাড়াতাড়ি শেষ করার দিকে মন দিলেন।
পাটনা জংশন স্টেশনের আপার ক্লাস ওয়েটিংরুমের যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য বেশ ভালো।
প্রশস্ত হল, বসবার চেয়ারের ডিজাইন আধুনিক ।
গোটাচারেক স্প্লিট এয়ার কন্ডিশনার লাগানো আছে বটে কিন্তু এই নভেম্বর মাসে পাখাগুলোই চলছে।
আর তারা অভাবিতভাবে শব্দহীন !
ওয়েটিং রুমের ভেতরেই রেলের পরিচালনায় একটা পরিচ্ছন্ন খাবারের দোকান।
নিশিকান্ত কিছুক্ষণ আগে ওখান থেকে এক প্লেট পকোড়া আর চা নিয়েছিলেন।
তাঁর গাড়ির সময় হয়ে আসছে।
চা-টা শেষ করে তিনি কাপটা সামনের টেবিলে পকোড়ার খালি প্লেটের পাশে নামিয়ে রাখলেন।
তারপর পাশের যাত্রীকে তাঁর ট্রলিব্যাগটার দিকে নজর রাখতে বলে ওয়াশরুমে চলে গেলেন।
ব্রহ্মপুত্র মেল আসতে এখনও মিনিট দশেক দেরি আছে ।
নিশিকান্ত ধীরে সুস্থে ট্রলিব্যাগটা নিয়ে ওয়েটিংরুম থেকে বেরোলেন।
এসি টু-টায়ার দুটো কামরা এই প্লাটফর্মটার ঠিক কোন জায়গাটায় এসে থামবে জানা আছে তাঁর।
অবশ্য প্লাটফর্মের সিলিং থেকে ঝোলানো কোচ পজিশন ইনডিকেটরগুলো আজকাল এসব বুঝিয়ে দেয় ।
এই গাড়িতে নিশিকান্ত বছরে অন্তত দুবার ভাগলপুর যান একমাত্র মেয়ের বাড়িতে, পাটনা থেকে ভাগলপুর।
ট্রেনটা লেট না করলে গন্তব্যে পাঁচঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
নিশিকান্ত একটা ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে এসি টু টায়ারে উঠে পড়েন ।
দিনের বেলায় ঘণ্টা পাঁচেকের জার্নি, তায় প্রৌঢ় মানুষ, সহযাত্রীরা বা টিটি বিশেষ আপত্তি করে না।
আজ ট্রেনটা সময়ে আসছে, নিশিকান্ত খুশী…প্রিয় নাতিটার ঘুমোনোর সময়ের আগেই মনে হয় পৌঁছে যাবেন ।
নিশিকান্তের ঘড়িতে এখন দুটো বেজে দশ মিনিট।
হিসেব মতো ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশনে ঢুকে যাবে।
নিশিকান্ত নির্দিষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ালেন ।
গাড়ি আসার শেষ মুহুর্তের ব্যস্ততা এখনও শুরু হয়নি।
ঝকঝকে পরিষ্কার প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু যাত্রী আশেপাশে দাঁড়িয়ে।
প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে বসে কয়েকজন কুলি আলাপরত।
নিশিকান্তের পাশেই একজন প্রৌঢ় বয়সের কুলি দাঁড়িয়ে আছে।
তার লাল কামিজের হাতায় পেতলের টোকেনটা বাঁধা।
নিশিকান্তের চোখ গেলো লাইনের দিকে।
একপাল বড় বড় ইঁদুর লাইনের কাঠের স্ল্যাবগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ছোটাছুটি করছে এদিক থেকে ওদিক ।
যাত্রীদের ফেলে দেওয়া চিপস বা চকোলেটের প্যাকেট নিয়ে টানাটানি করছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ।
নিশিকান্তের মনে হলো, ঝকঝকে পরিষ্কার স্টেশন প্লাটফর্ম আর তার অন্যান্য সুযোগসুবিধার সঙ্গে রেললাইনের স্লিপারের ফাঁকে ফাঁকে এই ইঁদুরের দল একেবারেই বেমানান।
তিনি মুখ ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়ানো কুলিকে লাইনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, এই চুহাদের ব্যাপারে রেল কিছু করতে পারে না কেন ?
প্রৌঢ় কুলি একবার লাইনের দিকে তাকালো, তারপর হেসে বললো,
-করতে তো পারে নিশ্চয়ই, তবে বোধহয় ইচ্ছে করে করে না বাবুজি !
নিশিকান্ত মাথা নাড়লেন।
কুলি তাঁর একটু কাছে এসে বললো, কিন্তু পচাস ষাট সাল পহলে এমনটা ছিল না ।
নিশিকান্ত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন ।
কুলি বললো, বাবুজি, এই স্টেশনে আমার লগভগ পচাস সাল হয়ে গেছে। বহোত সাল পহলে স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম তো এতো সাফসুতরা ছিল না। কিন্তু লাইনে চুহাও ছিল না ।
নিশিকান্ত বললেন, প্যাসেঞ্জার আগে লাইনে খাবারের টুকরো ফেলতো না বলছো ?
– ফেলতো নিশ্চয়ই বাবুজি । চুহাও আসতো । তবে গোরা লোগ অনেক বছর আগে থেকেই বুদ্ধি লাগিয়ে এটার একটা তরিকা বার করে ফেলেছিলো। ওটাই সালোসাল চলতো।
নিশিকান্ত অনুসন্ধিৎসু হলেন, কি রকম ?
– বাবুজি, বিহার ঔর ইউপিতে একটা জাত আছে, গঙ্গাজি কা উসপার, তারা দলিত, ‘মুষহর’ নাম কা। নেপাল মে ভি ইসকা কুছ আবাদি হ্যয়।
– এই নামটা শুনেছি বলে মনে হচ্ছে !
– ইয়ে লোগ পুরুখো সে চুহা মারকে খাতা থা । ইসকা শুরুয়াত তো শায়েদ গরিবি কে কারণ হি হুয়া হোগা। আজাদি কে পহেলে রেল কোম্পানি কা গোরা লোগ যখন কোনওরকমে এটা জানতে পেরে গেলো, তখন বুদ্ধি করে এই মুষহরদের রেলের লাইন কা দেখভালের জন্য লাগিয়ে দিলো ! ব্যস। চুহা খতম, লাইন ভি সাফ !
– ওহ ! তাহলে এখন ওই মুষহর লোগ লাইনের মেনটেন্যান্স করে না ?
– হয়তো কেউ কেউ নিশ্চয়ই করে। তবে এখন মুষহরদের অনেকেই অন্য কাম কাজ করে। কুছ লোগ পঢ়াই ভি করকে শহরে নোকরি করে। চাওল রোটি সবজি খায়।
– হুম, বুঝলাম ।
– আর বাবুজি, আভি তো দেশ মে অপনা রাজ হ্যায় না। রেল কোম্পানি চালাতে হ্যয় সব অপনা লোগ। আভি চুহা মারনে কা ইন্তেজাম করে তো কুছ আম লোগোনে রেল কোম্পানি কা উপর চঢ় জায়েগা। বোলে গা গণেশজি কা বাহন কো মারনে নহি দুঙ্গা । জলুশ নিকাল কে রেল কা পটরি পর ব্যঠ জায়েগা ! হা হা হা !
শুনে নিশিকান্ত চমৎকৃত হলেন ।
দূরে ডিসট্যান্ট সিগন্যালের কাছে গাড়ির ইঞ্জিন দেখতে পেয়ে কুলি নমস্তে বাবুজি বলে চলে যাবার উদ্যোগ নিতেই তিনি তাড়াতাড়ি কুলিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এতো সব জানলে কি করে ? তোমার নাম কি ?
কুলি নিশিকান্তের একটু কাছে এগিয়ে এলো ।
তারপর হেসে নীচুগলায় বললো, ভীখন বাবুজি, ভীখন মুষহর। ওয়হ হ্যয় কি, হামারা ছোটী বহু কভি কভি চিকন কা টুকরা ডালকে বহোত উমদা এক নাস্তা বনাতা হ্যয় ঘরকা সবকে লিয়ে। ক্যয়া নাম হ্যয় উসকা…নাস্তা জ্যয়সা হি এক নাম…ভুল রহা হু…হাঁ হাঁ পাস্তা…পাস্তা।
ক্রমবর্ধমান যাত্রীদের ভিড়ে মিশে গেলো ভীখন মুষহর ।
।। মহানগর ।।
বিশ্ববাংলা গেটের ট্রাফিক সিগন্যালটার অনেকটা দূরে অটোটা দাঁড়িয়ে পড়লো ।
সিগন্যালের ঘড়িটা দেখা যাচ্ছে না বটে, তবে লাল সিগন্যালটা নিশ্চয়ই লম্বা টাইম ধরেই আছে ।
পরপর অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে, বিশাল লম্বা লাইন, তাদের বিভিন্ন মেক, নানারকম কালার।
গাড়ির মেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ সুকোমলের মনে হলো, সে ভালো করে খেয়াল করার আগেই কয়েক বছরের মধ্যে কেমন সাদা কালো অ্যামবাসাডরের যুগ শেষ হয়ে গেলো !
তারপর প্রায় স্বগতোক্তির মতো বললো, বাব্বা, কতো গাড়ি ! কি ট্রাফিক ! এই দুপুর বেলায় !
প্রৌঢ় অটোচালক ঘাড় ঘুরিয়ে বললো, পনেরো বিশ বছর আগেও এসব জায়গা এরকম ছিলো না স্যার। কোন সিগন্যাল ছিল না, এই দুপুরবেলায় পুরো সুনসান, কোন ফ্ল্যাটবাড়ি নেই, চওড়া রাস্তায় গাড়িগুলো হু হু করে বেরিয়ে যেতো । চারদিকে কেবল ঝোপজঙ্গল, গরীব লোকেদের বাথরুম করার জায়গা !
বলে অটো ড্রাইভার হালকা করে হাসলো।
সুকোমল বললো, আপনি অনেকদিন অটো চালাচ্ছেন ?
-হ্যাঁ, তা প্রায় চল্লিশ বছর হবে।
-চল্লিশ বছর !
-হ্যাঁ । নদীয়া জেলার বেথুয়াডহরি চেনেন ? ওখানকার একটা গ্রাম থেকে কুড়ি বছর বয়সে যখন এলাম তখন সল্ট লেকে কেবল অটোই চলতো । সদ্য সদ্য শুরু হয়েছিলো, পুরো বুকিং করে। এখনকার মতো শেয়ার করে প্যাসেঞ্জার নেওয়ার চল ছিল না ।
-তাই !
-হ্যাঁ । এখন দুটোই চলে । পাঁচজনের শেয়ার কাস্টমার যদি দিয়ে দিতে চায় তাহলে পুরো বুকিং। যাদের তাড়া আছে তাদের জন্য অনেক সুবিধা, ওয়েটিং-এর ঝামেলা নেই। আপনি যেমন এখন নিলেন ।
-আপনি থাকেন কোথায় ?
-আমার বাড়ি, এই যে অ্যাকশান এরিয়া বলে, এর পেছনে কেষ্টপুর এলাকায় । বাড়ি মানে আর কি ! বস্তিতে একটা বড়ো ঘর স্যার, মাথা গোঁজার ঠাই। এই শহরে আমাদের আর ঘর কোথায় ।
বলে অটো ড্রাইভার আবার হাসলো।
ড্রাইভারের আলাপটা সুকোমলের দারুণ লাগছিলো, ক্রুশিয়াল বিজনেস মিটিংয়ের আগে যেন স্ট্রেসবাস্টার !
-কেন ? চল্লিশ বছরে এই এতো বড়ো শহরে একটা পার্মানেন্ট কিছু করে উঠতে পারলেন না ?
-পার্মানেন্ট ! আপনি স্যার, উলটোডাঙ্গায় অটোতে ওঠার সময় ওই লোকটাকে দেখলেন না, গলায় ব্যাগ ঝুলিয়ে ঘুরছিলো…ওই যে, যে লোকটা আপনার ট্রিপের জন্য আমার দুশো টাকা ভাড়াটা ঠিক করে দিলো !
-হ্যাঁ, মনে পড়ছে বটে ! খুব তেল দিয়ে আঁচড়ানো টেরিকাটা চুল, সেই লোকটা তো ?
-হ্যাঁ হ্যাঁ ! একদম ঠিক বলেছেন ! ওই ওরা সব স্ট্যান্ডের দালাল, গুন্ডা সব । এই শহরের সব অটো স্ট্যান্ডে বোধহয় ওরা আছে ! আমার ভাড়া দুশো টাকার থেকে কুড়ি টাকা কমিশন ওদের দিতে হবে ।
-সে কি ! কেন ?
সিগন্যাল খুলে গেছে বোধহয় । লাইনে অনেক দূরের গাড়িগুলো নড়তে শুরু করেছে ।
ড্রাইভার অটোটা স্টার্ট করে বললো, না দিলে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে দেবে না । ব্যস ! তাহলে বুঝুন, দিনে যদি আমার হাজার বারশো রোজগার থেকে একশো কুড়ি টাকার মতো এভাবে চলে যায়, তাহলে মাসে তিনহাজার, বছরে চল্লিশ হাজারের মতো রোজগার কম। ওই টাকাটা হাতে জমতে থাকলে দশ-বারো বছরে হয়তো বস্তিতেও একটা নিজের ঘর করতে পারতাম স্যার !
সুকোমল ড্রাইভারের মানসাঙ্কের দক্ষতায় চমৎকৃত হলো।
অটো চলতে শুরু করেছে ।
সুকোমল বললো, এই অটোটা আপনার নিজের ?
অটোর ইঞ্জিনের আওয়াজের ওপরে গলার স্বরটা তুলে ড্রাইভার বললো, স্যার, চল্লিশ বছরে এ শহর আমাকে কিছুই দেয়নি, এই অটোটা ছাড়া । তাও এর জন্য লোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো এক বন্ধু । এখনও ইএমআই চলছে । মিটে গেলে অটো বেচে দিয়ে বেথুয়াডহরির গ্রামে চলে যাবো । এ শহরটায় চল্লিশটা বছর কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু এ আমাকে নিজের করলো না স্যার।
-গ্রামে গিয়ে আপনাকে কিছু তো করতে হবে। আপনি এখনও কাজ করার জন্য পুরো ফিট আছেন।
– করবো তো ! আমার গ্রামের বাড়ির পাশের রাস্তায় বাস স্টপেজ হয়েছে এখন, ঘরের পাশেই । চা, বিস্কুট, পুরি সবজির দোকান দেবো, প্ল্যান করে রেখেছি । একটা পেট, চলে যাবে । নিন, আপনার বিজনেস ক্লাব এসে গেছে স্যার ।
সুকোমল নেমে দাঁড়িয়ে পার্স খুলে ভাড়ার টাকা দিলো ।
-আপনি তো দুশো পঞ্চাশ দিয়েছেন স্যার !
-ওর থেকে কুড়ি টাকা তো আপনার ওই দালালকে দিতে হবে, বাকিটা আপনার। আপনার গ্রামের দোকানের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইলো ।
– আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার । বাড়তি টাকার জন্য নয় ! চল্লিশ বছরে এ শহরে কেউ আমাকে আপনি করে কথা বলেনি ! আপনি ভালো মানুষ, যে কাজে যাচ্ছেন, আমার মন বলছে, সেটা ভালো হবে স্যার।
।। আবহমান ।।
উল্টোডাঙ্গা প্লাটফর্ম থেকে রেলওয়ে ওভারব্রিজটা সোজা সরু গলিটার মধ্যে নেমে গেছে ।
গলির দুপাশের ধাবা টাইপের খাবার দোকানগুলোর জন্যে জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি লাগে।
দোকানগুলোর বাইরে রাস্তার ধারে খদ্দেরের জন্য বেঞ্চি পাতা, পাশে উচ্ছিষ্টে উপচে-পড়া ডাস্টবিন আর তার চারপাশে ছুটকো-ছাটকা নেড়ি কুকুরের দল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বিপুল সমাদ্দার নিজের রোজকার চায়ের দোকানটার দিকে তাকালেন।
বেঞ্চিতে বসে প্রচুর লোকজন, তার মানে আরও খদ্দের চালার নীচে থাকবেই।
বিপুলের হাতে আজ সময় আছে, বসে চা আর তার সঙ্গে অন্য কিছু খাওয়ার ।
বস ছুটিতে, আজ একটু দেরি করে অফিস যাওয়াই চলে !
বিপুল দোকানে ঢুকে কাউন্টারের পাশে একমাত্র খালি বেঞ্চটায় বসে পড়লেন ।
বিপুল এসে বসে পড়তেই প্রৌঢ় দোকানি প্রচুর ব্যস্ততার মধ্যেই রোজকার খদ্দেরের দিকে চোখ তুলে পরিচিতির হাসির ভঙ্গি করলো।
সেই মুহূর্তে বিপুলের মনে হলো, প্রায় একবছর ধরে সকালে অফিস যাওয়ার আগে রোজ এই দোকানে তিনি চা খাচ্ছেন, অথচ এই দোকানির নামটা পর্যন্ত জানেন না !
দোকানের বাইরের সাইনবোর্ডে অবশ্য একটা নাম লেখা আছে।
রোজকার মতো এই অফিস টাইমে দোকানে প্রচুর খদ্দের।
কাউন্টারে মালিক আর চালার মধ্যে দুটো বাচ্চা ছেলে তাদের সামলাতে সামলাতে গলদঘর্ম হচ্ছে ।
ছেলে দুটোও সকালের রেগুলার খদ্দের বিপুলকে ভালোরকম চিনে গেছে ।
একটা ছেলে প্রথম সুযোগেই ধোঁয়া-ওঠা চায়ের একটা ভরাভরতি গ্লাস বিপুলের সামনে এনে রাখলো।
মালিকের ক্যাশ কাউন্টারের ওপরে অনেকগুলো বয়ামে নানারকম বিস্কুট রাখা আছে ।
বিপুল উঠে গিয়ে মালিককে একটা বয়ামের দিকে দেখিয়ে বললেন, দুটো দিন ।
তারপর আলাপ করার সুরে বললেন, দোকানের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা নবীনের চায়ের দোকান ! ওটা কি আপনার নাম ?
দোকানি বিস্কুট বার করতে করতে বললো, না, আমার ছেলের ।
-ওহ ! এক-ই ছেলে আপনার ?
-হ্যাঁ । বছর কুড়ি বয়েস ।
-তা আপনার দোকানে তো এই অফিসের সময়ে ভীষণ ভিড় থাকে । দেখছি তো এতো দিন, আপনার একা সামলাতে বেশ অসুবিধা হয় । ছেলেকে বললে সে এসে আপনাকে হেল্প করতে পারে না ?
প্রৌঢ় দোকানি একটা প্লেটে বিস্কুট দুটো বিপুলকে দিলো ।
তারপর বিপুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যেন একটু শ্লেষের সুরে বললো, আপনাদের ছেলেরা পড়াশোনা করে চাকরি করবে, অফিসার হবে, বাড়ি গাড়ি করবে, আর আমার ছেলে সারাজীবন চা বেচবে, এইটাই বলতে চাইছেন তো !
বিপুল সমাদ্দার ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে বললেন, না না, আমি ঠিক ওসব ভেবে কথাটা বলিনি । আপনি দোকানের নাম ছেলের নামে করেছেন, তাই-ই…
বোধহয় কাজের চাপে বিধ্বস্ত প্রৌঢ় দোকানির মুখ থেকে ফসকে কথাগুলো বেরিয়ে গিয়েছিলো ।
এবার সে নরম সুরে বললো, আপনি আমার রেগুলার কাস্টমার, আমার ভালো ভেবেই আপনি কথাটা বলেছেন। বরং আমারই আপনাকে ওভাবে জবাব দেওয়াটা উচিত হয়নি । আপনি আমাকে মাপ করবেন ।
-না না, ঠিক আছে । এখন এতো ব্যস্ত আপনি, এরকম তো হতেই…
বিপুলের কথার মাঝেই প্রৌঢ় দোকানি বলে উঠলো দোকানের নাম আগে আমার স্বর্গত মায়ের নামে ছিল, মিনু টি স্টল । ছেলেকে যেদিন থেকে ওই আইএএস-এর কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছি, সেদিন থেকে দোকানের নাম বদলে দিয়েছি ! কেন জানেন ?
প্রায় অভাবিত এ কথা শুনে বিপুল এবার বেশ অবাক আর সেই সঙ্গে কৌতূহলীও হলেন, কেন ?
-এই স্টেশনের পেছনে বাগমারি খালের পাশে এক বস্তিতে আমার বাড়ি । সকালে কলেজ করে, বিকেলে এই দোকানের সামনে দিয়ে হপ্তায় পাঁচদিন ছেলেটা থিয়েটার রোডের কোচিং সেন্টারে যায় । সেন্টারের জন্য অনেক খরচা, জানেন। তবুও কোনও রকমে টেনে যাচ্ছি। ছেলেটাকে বলেছি, সেন্টারে যেতে যেতে রোজ এই সাইনবোর্ডটা দেখবি । যদি পরীক্ষায়, ইন্টারভিউয়ে পাশ করতে না পারিস, তাহলে এই-ই তোর কপালে নাচছে…সারা জীবন আমার মতো চা বেচে খেতে হবে। এটা একটা ভালো আইডিয়া করেছি না, বলুন স্যার ?
বিপুল সমাদ্দার চমৎকৃত হয়ে হাসলেন, নিশ্চয়ই !
-বলছি যে, স্যার, সময় থাকলে একটা মামলেট খাবেন ? আমার তরফে ! তাড়াতাড়ি করে দেবো ।
বিপুল সমাদ্দার এবার বড়ো করে হাসলেন, দিন ! তবে দাম নিতে হবে কিন্তু !
Tags: গল্প, গল্পের সময়, মহানগর ও আরও দুটি গল্প, সিদ্ধার্থ সান্যাল
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।