31 Dec

উই ওয়ান্ট জাস্টিস

লিখেছেন:মধুময় পাল


উই ওয়ান্ট জাস্টিস

(বর্বর লালসায় নিহত তরুণী চিকিৎসকের স্মৃতিতে)

 

এক

কোনো কোনো রাতে সমস্ত নক্ষত্র নিয়ে জেগে থাকে আকাশ৷ সেই রাত তেমনই ছিল৷

কোনো কোনো রাতে নক্ষত্র আর মানুষের চোখ লক্ষ কোটি জাগরণ ঘটিয়ে তোলে৷ সেই রাত তেমনই ছিল৷

কোনো কোনো রাতে মানুষের স্পর্ধা শাসকের সব উচ্চারণ উচ্ছিষ্ট করে দিতে পারে৷ সেই রাত তেমনই ছিল৷

অনেক উঁচু থেকে বড়ো বড়ো হরফে জনগর্জন ঝুলছে – আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে৷

কয়েকটা ইতর বর্বর অপজাতের লালসায় ধর্ষিত ও নিহত প্রাণপ্রদীপের প্রতি লক্ষ প্রাণের প্রণতি জানাতে এক মিনিট নীরবতা চাইল সমাবেশ৷ এ নীরবতা শুনশান মাঠের নয়, মন্দিরের নয়, তপোবনের নয়, প্রভুর লাঠির সামনে স্তম্ভিত কুকুরের নীরবতা নয়, নয় শোকের কৃষ্ণ আচ্ছাদনের মতন, এক প্রাণময় নীরবতা, বিস্ফোরিত হবার প্রাকমুহূর্তের স্পন্দনঘন অপেক্ষা৷

এক বালিকা, বছর দশ কি বারো হবে বয়স, হেঁটে যেতে যেতে চিৎকার করে উঠল, উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের হাতের রিভলভার থেকে বুলেট ছিটকে বেরল যেন৷

হাজার কণ্ঠ, দু-হাজার, পাঁচহাজার, দশহাজার, বড়োভাগ মেয়েদের, গর্জে ওঠে সাড়া দিয়ে, উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷ এবং দূর শূন্যে বিশাল একটা পাথর হয়ে ঝুলতে থাকে ইনজাস্টিসের মাথায় ভেঙে পড়বে বলে৷

দুই

তমালদিঘির জল চতুর হাতে মাটি করে মাফিয়া হয়ে হয়ে-ওঠা কাউন্সিলরের শ্যালক ঘোঁতে ‘ভাজা&ভুজি’ নামের রেস্তরাঁর বাইরে দাঁড়িয়েছিল৷ রেস্তরাঁটা আসলে ওর অফিস৷ আর কোথায় দিঘি বা ডোবা আছে, সবজিবাজারে কত লরি ঢুকছে, কোন জমিতে ইট-বালি পড়ছে ও কোথা থেকে পড়ছে, পাড়ায় কোন লোকটা বা কোন ছেলেটা তেড়িবেড়ি করছে, কোন মাস্টার উলটো কথা বলছে, গণতন্ত্র নেই বলে কার বা কাদের মাথা টনটনাচ্ছে ইত্যাদি খবর এখানে নিয়মিত আসে এবং এন্ট্রি করা হয়৷ এবং খবর-দারদের নগদে খুশি করা হয়৷ অফিস মেনটেন করে হরদয়াল যাদব, মুঙ্গেরের আদমি, কাউন্সিলরের নিকটজন৷ পাড়ায় পাড়ায় ছোটো ছোটো ‘বিহার’ বানানো ও সেখানকার ভোট পার্টির দখলে রাখার যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তাতে ওর ইমপর্টান্ট রোল আছে৷ ঘোঁতে ও হরদয়াল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ দেখছিল৷ দেখছিল দু-দশটা চেনা লোক এল প্রথমে, তারপর কত লোক, আরও কত কত লোক এসে শেষ দেখা যায় না এমন ভিড় লাগিয়ে দিল৷ সেই সঙ্গে স্লোগান, বাতাস কেঁপে ওঠে৷

ঘোঁতে বলে, হাত পেতে ভাতা নেবে, আবার পেচুনে কাটি মারবে, ওটা চলবে না৷ গদ্দার দূর হটো৷ ভাতা ছাড়ো, কথা বলো৷

হরদয়াল পুরুচ করে গুটখার থুতু বিপ্লবী আর এল দত্ত সরণিতে ছিটিয়ে, থুতনিতে লাগা থুতু হাত দিয়ে মুছে বলে, ভাতার সোঙ্গে কোথার রিলেশন কী আছে?

প্রশ্ন শোনাটা পছন্দের নয় ঘোঁতের৷ তার ওপর এই প্রশ্নটায় গদ্দার-গদ্দার গন্ধ আছে৷ হরু কি মিটিংয়ে যাচ্ছে? কোথাও শুনেছে প্রশ্নটা? সে হরুর মুখ দেখে মেপে নেবার চেষ্টা করে৷ বলে, ভাতা মানে হেল্প৷ যে হেল্প দেয় সে হেল্পার৷ যে নেয় সে হেল্পিস৷ হেল্পিস কখনও হেল্পারের এগেনেস্টে কথা বলে না৷ পিরথিবির হিস্টোরিতে লেখা আছে৷ ইংরাজিতে লেখা৷ ইংরাজি বই ঝুট বলে নেভার৷ আমি ইংরাজিতে স্ট্রং আছি৷ তুমি জামাইবাবুর কাছের আদমি আছো, তাই সিম্পিল করে আনডারস্ট্যান্ড করলাম৷

হরদয়াল বলে, দ্যাট মিনস, যে হেল্প দিবে তার এগেনেস্টে কোথা চলবে না৷ নুন খাও, গুণ গাও৷ এটাই তো বুঝালেন? আরও সিম্পিল করে বলি, পে মানি, বাই মাউথ৷

ঘোঁতে জিজ্ঞেস করে, ওদের মিটিং-ফিটিংয়ে যাচ্ছো নাকি, হরদয়াল? এসব কথা আসছে কেন?

বিপ্লবী আর এল দত্ত সরণিতে আরও একদলা থুতু ছিটিয়ে হরদয়াল বলে, হালচাল বুঝতে হোবে তো৷ আপডেট রাখতে হয়৷ আপনেরা ডাউনে আছেন, না আপে, সে খবর টাটকা থাকা লাগে৷ ওরা যদি আপে যায়, আমার জাতভাইকে বুঝাতে হোবে৷ গুরুবারে একটা লোক বলল, আপনেরা যে ভাতা দিতেছেন তা কি আপনেদের ঘোরের টাকা? আপনেদের বাপ-দাদার টাকা? কোশ্চেনটা সচ্ আছে৷ আই অ্যাম অলসো থিংকিং৷

হরু, থিংকিং পেচুনে ভোরে দোবো৷ কোশ্চেনের পেচুনে হান্ড্রেড হনুমান ঢুক্যে দোবো৷ মানুষ আমাদের চায়৷ মানুষ আমাদের ভোট দেয়৷ মানুষকে আমরা ভাতা দিই৷ আমরা মানুষের কষ্ট বুঝি৷ উই আর সিফিলাইজড পারসন৷ উই আর সিফিলাইজেশন৷ ইংরাজিতে আমি স্ট্রং৷ থিংকিং পেচুনে ঝুলবে৷

ইয়ে হুই না বাত৷ হাসতে হাসতে হরদয়াল বলে৷ লেকিন কোশ্চেন কি জওয়াব নেহিঁ মিলা দোস্তজি৷ ভাতা কি আপনের ঘোর থেকে দিতেছেন, ঘোঁতেবাবু?

হ্যাঁ, আমাদের ঘরের টাকা৷ যে দেয় তার টাকা৷ আমরা ডেভেলপমেন জানি৷ তাই দিতে পারি৷ আর কেউ জানে না৷ দিতে পারে না৷ এই যে এখানে দিঘি ছিল৷ জঞ্জাল ফেলে নষ্ট হল৷ আগের সরকার কাজটা শুরু করল৷ আমার এসে জমি বানিয়ে দিলাম নাইট-কে-নাইট৷ বিল্ডিং হল৷ মল হল৷ কত মিস্ত্রি কাজ পেল৷ দোকান হল৷ হাজার হাজার চাকরি হল৷ পাড়ার জমির দাম বাড়ল৷ গরিব বাঙালি জমি-বাড়ি চড়া দরে বেচে চলে গেল দূরে৷ তোমাদের জাতিভাইরা এল৷ বড়োলোকের পাড়া হল৷ বিশ-পঁচিশটা প্রোমোটার ঢুকল৷ তুমি ঢুকলে৷ জামাইবাবুকে হাত করলে৷ তো জাস্টিস চিল্লালে হবে৷ এই ভাতা ডেভেলপমেনের টাকা৷ ডেভেলপমেনের এগেনেস্টে কথা নয়৷ আমরাই জাস্টিস৷ আমাদের এগেনেস্টে কেন কথা হবে? ওদের ভিৎরে জামাইবাবু লোক ঢুকিয়ে দিয়েছে৷ ভাতা ভোগে যাবে৷ মালুম পাবে৷ উই আর ব্রেনি ম্যান৷ আমরা আছি তো ডেভেলপমেন আছে, ভাতা ভি আছে৷

আপনাদের ভিৎরে একটা ভেরি ব্রেনি ম্যান ছিল৷ পিরাদাস নাকি নাম যেন৷ মন্ত্রী হইছিল৷ হামরা তখন ছোটো৷ গিরামের জুনিয়রে ভরতি হলাম৷ দাদা-বাবাদের মুখে শুনছি, পিরাদাসবাবুর টাইমেতে, ব্রেনি পিরাদাসবাবুর টাইমেতে, পরিক্-ষা মেঁ লিখাপড়া ওয়াজ নট নেসেসারি৷ রুমে চোতা মজুত৷ দেখো আর লিখো৷ দ্যাট ওয়াজ দা এজ অফ টুকলিফাইং, দ্যাট মিনস কাপি-কাল৷ টাইম হ্যাজ নো লিমিট৷ পিরাদাসবাবু ইউথদের শাজাদা হইলেন৷ আমাদের ইস্টেট নাকি আপনেদের ফলো করিছিল৷ আমাদের সিনিয়ররা লিখাপড়ায় টাইম বরবাদ করে নাই৷ হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে…

হরদয়ালের কথা শেষ হবার আগেই আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন: বন্দে মাতরম৷

ঘোঁতে চমকে যায়৷ লম্বা লাফ দেয়৷ বলে, অফিস বন্ধ করো, হরদয়াল৷ শাটার নামাও৷ কাস্টমার ভাগাও৷ স্বদেশি আয়া৷ টেররিস্ট অ্যাটাক অন সিভিক সোসাইটি৷

আকাশ এলোমেলা হয়ে যায় গর্জনে গর্জনে: উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷

ঘোঁতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, আমি না৷ আমি না৷ আমার দাদু ধরিয়ে দিয়েছিল৷ আমার বাবা ধরিয়ে দিয়েছিল৷

জাস্টিসের আওয়াজ চারদিক থেকে আসতে থাকে৷

তিন

এবার বলবেন তানিয়া সরকার৷ বিভাবতী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা৷ যিনি বিনা পারিশ্রমিকে গরিব ঘরের মেয়েদের নিজের বাড়িতে পড়ান৷আমরা তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ শুনব৷ তানিয়াদিকে বলব একটু সংক্ষেপে বলতে৷ অনেকে বলবেন৷ সময় বাঁধা৷ আমরা নিরুপায়৷

মঞ্চে বসেছিলেন তানিয়া সরকার৷ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন৷ হাতে মাইক নিলেন৷ বললেন, অনেকে বলবেন৷ সময় বাঁধা৷ আমরা নিরুপায়৷ সঞ্চালিকা পারমিতা জানিয়ে দিয়েছে৷ পারমিতা আমার স্নেহাস্পদা৷ আমরা কিন্তু নিরুপায় নই৷ আমি কিছু বলব না৷ সময় বাঁচল৷ একটা তো উপায় হল!

তানিয়া সরকার মাইক বাড়িয়ে ধরেন৷

পারমিতা ছুটে আসে৷ হাত জোড় করে বলে, আমার ভুল হয়ে গেছে, দিদি৷ আপনি বলুন৷

সমাবেশ সমস্বরে দাবি জানায়, আপনি বলুন৷

তানিয়া সরকার বলেন, অনেক বছর হল শিক্ষকতা করছি৷ কিছু কম ছত্রিশ বছর৷ বহু ছাত্রী পেয়েছি৷ পেয়েছি সেদিনের ছাত্রী আর এদিনের ছাত্রীও৷ সেদিনের ছাত্রীদের একদল আসত জ্ঞান অর্জনের জন্য; আরেকদল আসত ডিগ্রির জন্য, চাকরি করবে বলে; তৃতীয়দলটা আসত যতদিন বিয়ে না হয় ততদিনের জন্য৷ এদিনের একদল ছাত্রী আসে ডিগ্রির জন্য, ভালো রেজাল্ট করবার জন্য, তাদের সবাইকে ফার্স্ট হতে হবে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর হতে হবে, জ্ঞান তাদের বিচারে গৌণ, অভিভাবকরা বলে দিয়েছে; দ্বিতীয়দলটি আসে শুধুই পড়বে বলে, রেজাল্টে তারা পিছিয়ে পড়ে, দৌড়ে জয়ী হবার মতো উপাদান তাদের নেই, উপকরণ দেবার মতো পারিবারিক জোর নেই, তারা এগিয়ে যায় অন্ধগলির দিকে, যে গলি তৈরি করে সমাজ, যে গলির আলো নিভিয়ে রাখে রাষ্ট্র৷ আরেকদল মেয়ে, বাড়ির চোখে যারা বেয়াড়া, স্কুলে তাদের পাঠানো হয় মেরামত করতে, কিন্তু কে করবে তাদের মেরামত, তারা দ্বিতীয়দলে ভিড়ে যায়৷ বাবা-মায়েরা শুনবেন, আপনাদের মেয়েরা ঠিক নেই৷ ঠিক করবার কথা আপনাদেরই ভাবতে হবে৷ মনে রাখবেন, স্কুল আর শিক্ষকদের হাতে নেই, যেমন এ দেশ দেশবাসীর হাতে নেই, এই বাংলা বাঙালির হাতে নেই৷

সমাবেশ করতালি দিয়ে সমর্থন জানায়৷

এবার বলবেন নীলিমা সেন৷ আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু৷

নীলিমা দাঁড়িয়েছিল বিরাট পোস্টারের পাশে, যেখানে লেখা:

কোনো হাত নেই সমুদ্রের গলা টিপে ধরে

কোনো লাঠি নেই আমাদের রাত নেবে কেড়ে

নীলিমা সেন বলে, সত্যি এ দেশ আর দেশবাসীর হাতে নেই৷ আমরা নেই আমাদের হাতে৷ আমাদের কারা চালায়, জানেন? চালায় পলিটিক্স, চালায় ধর্ম, চালায় চ্যানেল আর বিজ্ঞাপন৷ আমরা কী ভাববো, কী ভাববো না, কীভাবে ভাববো, কেন ভাববো, কী বলব, কী বলব না, কী পরব, গায়ে কী সাবান মাখব সব ঠিক করে দেয় এরা, আমরা টের পাই না৷ আর, চালায় মদ আর নেশা৷ আমাদের নিজস্ব কোনো বয়ান নেই৷ যে-দেশ মদের টাকায় চলে, মদের টাকায় নেশার টাকায় ভর দিয়ে যে-দেশের বাজেট তৈরি হয়, সে-দেশের মেয়েরা রোজ নির্যাতিত হয়, লুণ্ঠিত হয়, খুন হয়৷ খবর হয় না৷ কেউ কিছু বলে না৷ এই পোস্টার যদি বাংলার লক্ষ মেয়ের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তবেই আমরা সসম্মানে বাঁচব, নচেৎ নয়৷ যদি এটা শুধু একটা রাত দখলের বিষয় হয়, একটা রাত জাগার বিষয় হয়, তাহলে হবে আরেকটা এনটারটেইনিং আইটেম, যা সফল করতে পারার আনন্দে আমরা তীব্র মদ ও চাট নিয়ে বসব৷

ঠিক বলেছিস, মেয়ে! একটি গলা বেজে ওঠে ভিড়ের মাঝখানে সরু পথে৷ যে সমাবেশ প্রধানত দাঁড়িয়ে আছে, তার চেয়ে কিছুটা উঁচুতে মাথা, এলোমেলো চুল, পাঞ্জাবির নীচে রোগা শরীর, ঢোলা হাতার নীচে চওড়া হাড়ের হাত, লম্বা লম্বা আঙুল তুলে তিনি বললেন, ঠিক বলেছিস, মেয়ে! বিনোদন, ফুর্তি, হাজার মজা৷

কেউ চিনতে পারল৷ ঋত্বিক ঘটক৷

মেয়েটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া৷ গরিব ঘরের সুন্দরী মেয়ে৷ বিপদ তো সেখানেই৷ একে গরিব, তায় সুন্দরী৷ এ সমাজ লুটে খেতে চায়৷ বাঁচাবে এমন কেউ নেই৷ যদিও আমাদের রোজকার কথাবার্তায় গরিবের দুঃখকষ্ট একটা অভ্যাস হয়ে আছে, আসলে গরিবি একটা আইটেম৷ এক যুব পার্টিবাজ, নেতা নয়, নেতা বানায় তো মিডিয়া, নেতা হবার একদানা মুরোদ নেই, এমন এক যুব পার্টিবাজ বিষ্ণুপ্রিয়াকে নিয়ে ফুর্তি করল৷ জবরদস্তি৷ মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হল৷ এবং একদিন পুড়ে গেল৷

সভার মাঝখানে পৌঁছে গেছেন ঋত্বিক ঘটক৷

১৯৭২ সালের ঘটনা৷ যতদূর মনে পড়ে৷ কাগজে লেখা হল, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে৷ পরে খবর নিয়ে জানলাম, সি ওয়জ রেপড অ্যান্ড বার্নট্ টু ডেথ৷ একটা গরিব ছবিওলা কী আর করতে পারে! সে ভাবল সিনেমা করবে৷ কিন্তু কেউ টাকা ঢালতে রাজি হয়নি৷ নাটক করলাম৷ ‘জ্বলন্ত’ নামে৷ মঞ্চস্থ হল এক সকালে৷ নাটক দেখে সবাই এত মজা পেল যে খুব কষে হাততালি দিল৷ হল ভরতি হাততালি চটচট করছে৷ রাগে দুঃখে দু-হাতে পর্দা সরিয়ে মুখ বের করে আমি জিজ্ঞেস করলাম, খুব মজা পেলেন, তাই না? গরিব ঘরের অসহায় মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারল বজ্জাতরা৷ খুব ফুর্তি! একদিন সতীদাহে আহ্লাদে আটখানা হতেন আপনাদের পূর্বপুরুষ৷ সেই বীজ, সেই লোভ লালসা আর নৃশংসতার বীজ আপনাদের রক্তে খেলা করে৷ আপনাদের মন নেই, বোধ নেই, ভাষা নেই, প্রতিবাদ নেই৷ বলেছিলাম কি? হয়তো বলতে চেয়েছিলাম৷ নাটকে শেষ সংলাপ ছিল: আপনারা যারা নাটক দখেতে এসেছেন, বাড়ি গিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়বেন৷ কিন্তু এ অত্যাচার চলতেই থাকবে৷ এর কি কোন রাস্তা নেই? এই অত্যাচার দমন করার জন্য আমরা কি সঙ্ঘবদ্ধ হতে পারি না? ক্ষেপে উঠতে পারি না?

ঋত্বিক ঘটকের বর্ণনা শুনে স্তব্ধ সমাবেশের এক মেয়ে, বছর কুড়ি-বাইশের, গর্জে ওঠে, উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷

হাজার গলা সায় দিল, উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷

একটি পুরুষকণ্ঠ, সমাবেশের কিছুটা উঁচুতে মাথা, রোগা হাত তুলে জানাল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ৷

চার

রাত ফুরিয়ে ভোর হচ্ছে৷ নদীর তীরে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আলো৷ ভাদ্রের গুমোট সরিয়ে ঝিরি ঝিরি হাওয়া দিচ্ছে৷ নদীর ওপারে কবেকার বন্ধ কারখানার সুউচ্চ চিমনি৷ রাতজাগা মানুষগুলো তখনও সজীব৷ মাঝে মাঝে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ হেঁকে তারা শরীর ও মন তাজা করে নিচ্ছে৷

আমি অমলা ঘোষ৷

মাইক হাতে এক বৃদ্ধা মঞ্চে৷ সাদা চুল, মুখে ভাটার টানের রেখাবলি, শরীর সামান্য ঝুঁকেছে৷

না, বসবার দরকার নেই৷ দাঁড়িয়ে বলব৷ আমার বয়স বিরাশি ছোঁবে আর তিন মাস একুশ দিন পর৷ এই যে লম্বা একটা সময় কাটিয়ে এলাম, খামোকা কাটানো নয়, নিছক বুড়িয়ে যাওয়া নয়, দাঙ্গা দেশভাগ উদবাস্তুজীবন কলোনি খাদ্যআন্দোলন ক্ষমতাবদল নকশালবাড়ি বরানগর-কাশীপুর জরুরিঅবস্থা বামফ্রন্ট বিশ্বাসঘাতকতা এইসব নিয়ে স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার পাহাড় জমিয়েছি৷ এখনও যে খ্যানখেনে ঘ্যানঘেনে ফোকলাবুড়ি হয়ে যাইনি সেটা বোধহয় এই সভায় হাজির থাকব বলে, কথা বলব বলে৷ যেন পেরিয়ে এলাম অন্তবিহীন পথ আসিতে তোমার দ্বারে— এই জাগরণের দ্বারে৷ উত্তাল বাংলা অনেক দেখেছি, কিন্তু নারীর এমন জাগরণ আগে দেখিনি৷

উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷ গর্জে ওঠে সমাবেশ৷

আলো ছড়িয়ে পড়েছে৷ নদীজলে রোদের ঝিকিমিকি৷

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা মনে পড়ছে:

আমার সন্তান যাক প্রত্যহ নরকে

ছিঁড়ুক সর্বাঙ্গ তার ভাড়াটে জল্লাদ;

উপড়ে নিক চক্ষু, জিহ্বা দিবা—দ্বিপ্রহরে

নিশাচর শ্বাপদেরা; করুক আহ্লাদ

তার শৃঙ্খলিত ছিন্নভিন্ন হাত-পা নিয়ে

শকুনেরা৷ কতটুকু আসে-যায় তাতে

আমার, যে আমি করি প্রত্যহ প্রার্থনা

‘তোমার সন্তান যেন থাকে দুধ ভাতে৷’

 

উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷ ভোরের বাতাস আলোড়িত হয়৷

অমলা বলেন, এই মেয়েটির সর্বাঙ্গ ছিঁড়েছে ভাড়াটে জল্লাদ৷ নিশাচর শ্বাপদেরা তাকে রক্তাক্ত করেছে৷ ছিন্নভিন্ন হাত-পা নিয়ে আহ্লাদ করেছে শকুনেরা৷ আমিও এই মেয়েটির মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারতাম ১৯৭৪ সালে৷ ৩০ মে আমাকে লালবাজারে ভাড়াটে জল্লাদ রুনু গুহনিয়োগীর টর্চার চেম্বারে টেবিলে তোলা হল৷ উপুড় করে শুইয়ে কম্বল চাপা দিয়ে কোমরের নীচ থেকে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পেটানো হল ভীষণ জোরে মোটা লাঠি মেরে মেরে৷ পেটাচ্ছিল দুই টর্চার স্পেশালিস্ট৷ আমাদের করের টাকায় যাদের বেতন হয়৷ মদের নেশায় তারা পশু হয়ে উঠেছিল৷ তত্ত্বাবধান করছিল রুনু গুহনিয়োগী আর উমাশঙ্কর লাহিড়ী৷ আমি জ্ঞান হারাই৷ তিনদিন চিৎ হয়ে শুতে পারিনি৷ বসতে পারিনি৷ হাঁটতে পারিনি৷ শরীর জুড়ে ব্যথা৷ ঘুমোতে পারিনি৷ কোমরের নীচে চামড়া ফেটে চুঁইয়ে রক্ত পড়েছে৷ পচে ঘা হয়েছে৷ আবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওই চেম্বারে৷ এবার মানসিক নির্যাতন৷ জবাব বের করতে না পেরে ব্রহ্মতালুতে রুলের ঘা মেরেছে রুনু৷ চারদিকে সর্ষেফুল দেখতে দেখতে মাটিতে পড়ে গেছি৷ একদিন আমার দেহ নিয়ে ছোড়াছুড়ি খেলল ওরা৷ রুনু আর উমাশঙ্কর দেহটা ছুড়ে দেয় দেওয়ালের দিকে৷ ওদিকে দুই জল্লাদ শঙ্কর আর আদিত্য লুফে নেয়৷ ওদের নোংরা হাত দেহটা ছুড়ে ফিরিয়ে দেয় ওদের প্রভুদের কাছে৷ এভাবে চলে যতক্ষণ না আমি জ্ঞান হারাই৷ তারপর বোতল বোতল মদ গিলে ওরা নতুন পদ্ধতি বের করে৷ আমি চিৎকার করেছি যন্ত্রণায়৷ ওরা অট্টহাসি হেসেছে৷
অমলা ঘোষ একটু থামেন৷

হার মানিনি৷ রুনুদের বিচার হয়নি৷ প্রমোশন হয়েছে৷ যারা বলেছিল বিচার হবে, এবং এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, সেই বিশ্বাসঘাতকদের কাছে হেরে গেছি৷ বিচার হয়নি বিষ্ণুপ্রিয়ার ধর্ষক-খুনেদের৷ বিচার হয়নি সত্তর দশকের ক্রিমিনাল ও পুলিশদের৷ বিচার হয়নি উত্তর-সত্তরের লুম্পেনদের৷ সব বিচারের দাবি আজ জোট বেঁধেছে৷

সমাবেশ দূর আকাশে পৌঁছে দেয়, উই ওয়ান্ট জাস্টিস৷

অমলা ঘোষ বলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ৷

সমাবেশে তখন নতুন সকাল৷

হাজার কণ্ঠ বিচার চায় নতুন ভোরে৷

অমলা ঘোষ বলেন, বিশ্বাসঘাতকরা নিপাত যাক৷

পাতায় পাতায় গাছের প্রাণযাত্রা৷

পাঁচ

মহাত্মা শশীভূষণ ঘোষ স্ট্রিট থেকে, বিপ্লবী আর এল দত্ত সরণি থেকে, দেশপ্রাণ সুবোধ হাজরা রোড থেকে, বকুলবাগান থেকে, কালীবাবুর বাজার থেকে, পটুয়াটোলা থেকে, মসজিদবাড়ি থেকে, মন্দিরতলা থেকে, জোড়াগির্জা থেকে বিচার চাওয়া গর্জনগুলি এগোয়৷ এগোতে এগোতে তারা স্লোগান বানায়: খুনিকে বাঁচায় কারা/চিনে নাও তার চেহারা; আমার গলা ধরেছ টিপে/লক্ষ আওয়াজ দিকে দিকে; ভেবেছ তুমি জিতে যাবে যা খুশি তাই করে/এবার তুমি বুঝবে ঠেলা হেঁচকা টানে পড়ে; মিছিল হাঁটছে, আঁধার টুটছে/ভয় ভাঙছে, সূর্য উঠছে ইত্যাদি৷

মিছিলগুলি দূর থেকে দেখতে পায় বিরাট একটা বেদির ওপর কতগুলো মনুষ্যাকৃতি লাঠি হাতে, লোহার ডান্ডা হাতে প্রাণপণে ভাঙচুর চালাচ্ছে৷ তাদের পোশাক পালটে পালটে যায়— কখনও পুলিশের উর্দি, কখনও মন্ত্রীর, কখনও লুম্পেনের বা মাস্টারের৷ তারা কী ভাঙছে? মানুষের হাড়? নিয়মমাফিক টর্চার? তবে কি সেমিনার হল? হাসপাতলের ওষুধের স্টক? নাকি ভেন্টিলেটর? লাফিয়ে কী ভাঙছে ওরা? সিসি ক্যামেরা? ওরা এত জোরে লোহার ডান্ডা চালাচ্ছে যেন ঐতিহ্যের দরদালান ভাঙছে যেন অপকর্মের কালোবাড়িটা ভাঙছে ৷ ওই ভাঙচুরিয়াদের কিছু ভাঙাচোরা উচ্চারণ শোনা যায়: একজন বলল, হরদয়াল, হিট দেয়ার সাহস, ব্রেক দেম৷ একজন বলল, লোপাট করে দিয়েছি, বস, সব সাফ৷ একজন বলল, ঘেঁতোবাবু, উই ওয়ান্ট জাস্টিস বলবে? একজন বলল, জামাইবাবু কী বলছে? জবাব এল, পোঁতাবাবু বেঙ্গলিতে বিচার চাই বলছে৷ জবাব শোনা গেল, আমরাও ওইটা বলতে বলতে হাওয়া হয়ে যাব৷

ভাঙচুরিয়ারা ধ্বংসস্তূপ থেকে লাফিয়ে বেরিয়েই দেখে চারদিকে মিছিল, ঘিরে ফেলেছে তাদের৷ তারা পালাবার চেষ্টা করে৷ পথ পায় না৷ একটি ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে  আরেকটি ধ্বংসস্তূপে পৌঁছে দেখে তারা মিছিলের থাবার ভেতর ঢুকে পড়ছে ।

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ