14 Apr

পোকা

লিখেছেন:প্রমিত গাঙ্গুলী


GALPER SAMAY STORY POKA

রোববারের সকাল। বাজার বসেছে। ভিড়টা অন্যদিনের তুলনায় তাই সিকি ভাগ বেশি। লোকেদের হাতে রঙবেরঙের নানান সাইজের থলে -কারোরটা পেটরোগা, কারোর নেয়াপাতি, তো কারোরটা আবার আটমাসের পোয়াতি। কেউ ব্যস্তবাগীশ, কেউ দরদামে ব্যস্ত, কেউ বা ছুটির আলস্য গায়ে মেখে সংসার ভুলে খানিক আড্ডায় মজে.. কারোর গায়ে হাল্কা র‍্যাপার জড়ানো, তো কারোর সাবধানি ধুতি হাঁটুর কাছে.. কারোর আটপৌরে ছাপাশাড়িতে তখনো সদ্য ধরানো উনুনের আঁচ, তো কারোর হাতের একগাছা চুড়িতে ঝোলানো সেফটিপিনে কচি পটল বাছতে গিয়ে অযথা চাঞ্চল্য…কেউ এক হাতে ঝুড়ি এগোতে এগোতে অন্য হাতে হিসেব মেলাচ্ছে, তো কেউ হাঁকাহাঁকি করতে করতে ইয়া পেল্লাই কাতলা বঁটিতে চড়াচ্ছে! সব মিলিয়ে বাজার সরগরম, যাকে বলে!

বাজার থেকে সামান্য তফাতেই কৃষ্ণচূড়া গাছটা। বছরের এই সময়ে গাছটা যেন সারা গায়ে লাল পশমিনা জড়িয়ে আছে। গাছের তলাতেও আলগা খসা ফুল-পাতার গালচে। একটা ছাগল ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে। গাছের তলায় তার সঙ্গী বলতে একজনই… সেও বাজার নিয়ে বসেছে। তবে একটু তফাত আছে..

লোকটার গাল তোবড়ানো, থুতনিতে চাবড়া ঘাসের মত ধূসর দাড়ি, মাথার সামনের দিকে দুটো চুল পৃথিবীর টানকে আপাতত অগ্রাহ্য করে ঘুড়ির মত পতপত করে উড়ছে, লোকটার গায়ে তেলচিটে বিবর্ণ পোষাক। সামনে ধুলোমাখা প্লাস্টিক, প্লাস্টিকের শেষাংশ যেন সুন্দরবন অঞ্চলের মানচিত্র,তারওপর সাজানো পসরা- সাড়ে সাতখানা অষ্টাবক্র তামাটে-সবুজ বুড়ো শশা আর পৌনে চারখানা পায়ের কড়ে আঙুল মাপের কমলা-সবুজ উচ্ছে! লোকটা গর্বিত চোখে নিজের রসদ পাহারা দিচ্ছে; যতটা না পাশে ঘুরঘুর করা ছাগলটাকে নিয়ে তার চিন্তা, তার চেয়ে ঢের বেশি চিন্তা পথচলতি লোকগুলোকে নিয়ে!

‘কী খুড়ো, শশা কত করে দিচ্ছ?’

‘আরে যা যা, শশা কিনতে এয়েচে…এ শশার দাম জানিস! তোর চোদ্দ পুরুষে অমন শশা মুখে দেয়নি রে আঁটকুড়ির ব্যাটা!’

‘আরে বলোই না দাম?’

‘সাড়ে তিনশো টাকা কেজি…পারবি দিতে?’

‘সাড়েতিনশো? এত দাম কেন গো, খুড়ো? সোনার শশা নাকি গো?’

‘আ মোলোযা! তোরা কী জানিস চাষার কষ্ট, গু-খেকোর দল যত! গেলো বছর যখন ছেলেটা মরলো, কোথায় ছিলিস নিব্বংশির ব্যাটা?’

‘গেলো বছরে কই গো! তোমার ছেলে তো সেই তিরিশ বছর আগে পটল তুলেছে;আর তুমি বলছো কিনা গেলো বছর!’ খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলো লোকটা।

‘আয় তোকে খাওয়াচ্ছি শশা… ছেলেটাকে এক বস্তা শশার দাম দিতে পারলিনিকো…এখন শশা খাবে! যা যা, এ শশা তোদের মত যমের অরুচিদের আমি বেচিনা..!’বুড়োকেরাগিয়েপরিতৃপ্তখদ্দেরমুচকিহেসে এগিয়েগেল।

লোকটাএগোতেইতারপিছুপিছুইতস্ততপায়েএসেদাঁড়ালোআরেকজন। লোকটার গায়ের রঙ চন্দ্রমুখি আলুর মত, এলোমেলো চুল-দাড়ি ঠিকযেনশন; লোকটার গায়ের শার্টটা শতচ্ছিন্ন, প্যান্টটা বেঢপ, দু’পায়ের জুতোজোড়া থেকে বুড়ো আঙুল বেরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। লোকটার হাতে একটা বস্তা…তাতে কী আছে, আর কী নেই, তা বলা শক্ত!

লোকটার মধ্যে কেমন একটা সদা সন্ত্রস্ত অস্তিরতা, কোথায় পা ফেলছে, সেটা যেন আগে থেকে দেখে নেওয়া জরুরি। চারদিক তাকিয়ে সে বুড়োর সামনে এসে আপাতত স্থির হল।

‘কোথায় ছিলি বাপ! আয়, আয়, দু’টি শশা নিয়ে যা!’, বুড়ো দু’টো তামাটে শশা পরম যত্নে তুলে দিল লোকটার হাতে। বিনিময়ে ঐ লোকটা জামার পকেট থেকে একটা আধ খাওয়া সিগারেটের টুকরো বুড়োর হাতে দিয়েই আবার পেছন ফিরলো..বুড়ো যখন পরম তৃপ্তিতে সুখটান দিচ্ছে পোড়া সিগারেটে, লোকটা তখন বাজারকে পেছনে রেখে হাঁটছে উল্টোদিকে…

হাঁটা, খামখেয়ালিথামা,ব্যাকুলসন্দিহান চোখে চারপাশে চোখ বোলানো, আবার হাঁটা…এইভাবে চলতে চলতে বুড়ো শিব মন্দিরটা ছাড়িয়ে ক্রমশঃ সে এগিয়ে এল ভাঙাচোরা রকটার কাছে। এ রক তার চেনা, এখানেই লোকটার ভরা সংসার..কত কী যে হাবিজাবি সেখানে জড়ো করা! লোকটা পা ছড়িয়ে বসতেই চারপাশ থেকে ওর বন্ধু মাছিগুলো ওকে সুড়সুড়ি দেবার জন্য চলে এল। লোকটা একটা শশা মুখে পুরে আরামসে চিবোতে শুরু করলো।

এতটা রাস্তা কোনো কথা বলেনি ও; সেই কবে কে যেন বলেছিল, ‘রাস্তায় কারোর সাথে কথা বলবি না’..সে উপদেশ এখনও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। কিন্তু এখন তো আর অচেনা রাস্তা নয়, এ ওরচেনা গন্ধ, চেনা পরিবেশের চেনা ওম। তাইসেইচেনা সংসারে শুরু হল ওর বিড়বিড়ানি..কত কী কথা! নিজেরই মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়, কথার ফাঁকে কোন কথা বেমক্কা ঢুকে পড়ে! তখন আবার খানিক মাথা চুলকে নতুন করে কথা বাঁকবদল শুরু হয়। অনর্গল কথার ফাঁকেই চলছিল শশা খাওয়া। একটা শেষ করে অপরটার অর্ধেক পথেই হঠাৎ কী একটা কথা মনে পড়ে যেতে, আধ খাওয়া শশাটাকে যত্ন করে একপাশে রেখে দিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো লোকটা। তড়াক করে রক থেকে নেমে এদিক সেদিক দেখে সন্তর্পনে চলতে শুরু করল স্টেশন যাবার রাস্তায়!

একটু দূরেই তখন একদল ছেলে ঢিল ছুড়ছে আর সুর করে চেঁচাচ্ছে, ‘জলের পোকা, আরে ও জলের পোকা…’ আর সাথে সাথে জবাবি কাঁচা খিস্তি ভেসে আসছে বয়স্কা মহিলাটার থেকে!

মাথার চুল যেন বলদ বাঁধার কাছি গোল পাকিয়ে রাখা, ডান কপালে জড়ুল, আম বেশি পেকে গেলে খোসাটা যেমন ন্যাতানো আর কোঁচকানো হয়ে যায়, এনার মুখটাও কতকটা সেরকম। ভেজা শাড়ির জরি বিবর্ণ, ব্লাউজের কয়েকটা হুক উড়ে গেছে, পায়ে হাজা। দু’পা এগোচ্ছে আর পেছনে ফিরে হাত তুলে বাপ-বাপান্ত করছে ছেলেপিলেদের। এইমাত্র পাশের পুকুর থেকে দিনের তৃতীয় স্নান সেরে উঠেছে। জলের সঙ্গে ওর দোস্তি অনেকদিনের, অবশ্য দোস্তি বলাটা ঠিক হবে কিনা কে জানে! দাগার ওপরে মামড়ি শক্ত হলেও ভেতরটা যেমন দগদগে থাকে, ওর ক্ষেত্রেও কতকটা সেরকমের। লোক মুখে শোনা, অনেককাল আগে নাকি পুকুরে ডুবে মরেছিল ওর তিন বছরের মেয়েটা! তারপর থেকেই ওর ঐ বাতিক, ক্ষণে ক্ষণে নেমে পড়ে পুকুরে। প্রথম প্রথম মরা মেয়েটাকে খোঁজার চেষ্টা করতো, আস্তে আস্তে এখন ভুলে গেছে কেন পুকুরে নামে, শুধু অভ্যাসটুকু রয়ে গেছে। আর ঐ অভ্যাসটুকুই বাঁচিয়ে রেখেছে ওকে, নইলে উদ্দেশ্য তো সেই কবেই নিরূদ্দেশ।

গালমন্দ দিতে দিতে আজকাল হাঁফ ধরে যায়, তাই ভেজা কাপড়েই বসে পড়লো ওই ভাঙাচোরা রকটায়। একটু খিদে খিদে পাচ্ছে বটে, পোঁটলা থেকে মিয়ানো মুড়ি মুখে দিতেই চোখে পড়ল আধ খাওয়া শশাটার দিকে – হাতে তুলে নিয়ে কামড় বসাতে যাবে…হঠাৎ একজনের সাথে চোখাচোখি হয়ে যেতেই সব গুলিয়ে গেল বুড়ির!

বাজারের কাছে চায়ের দোকানটায় গাড়িটা থামিয়েছিল দীপেশ। কোমরের ব্যাথাটার জন্য একটানা গাড়ি চালাতে বারণ করেছে ডাক্তার। লোকজনের ভিড় টপকে দু’কাপ চিনি ছাড়া দুধ চায়ের অর্ডার দিল ও, আর সঙ্গে নিয়ে ফিরলো দুটো বেকারি বিস্কুট। আমি তখন বাইরের বেঞ্চে বসে। রোববারের বাজার, তাই বোধহয় ভিড় বেশি। এদিককার বাজারে সবসময়ই টাটকা  শাকসবজি পাওয়া যায়;কী বাজার বসেছে, তাই একটু দেখে আসতে সাধ হল..

ব্যস্ত বাজার ছাড়াতেই চোখে পড়ল একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। কৃষ্ণচূড়া আমার খুব পছন্দের গাছ। আমাদের বাড়ির সামনেও একটা লাগিয়েছি, দীপেশ নার্সারি থেকে এনে দিয়েছিল। কিন্তু আমাদের গাছটায়এত ফুল আসে না.. পায়ে পায়ে গাছটার নীচে এসে দাঁড়ালাম। একটা পাগলাটে লোক বসে আছে আর একটা ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ করেই কেন জানিনামনে হল,গাছতলার ওই মাইলফলকটার পাশে কোনো বাঁশের দোকান ছিলবোধহয়…

‘দাদা শুনুন, আচ্ছাএখানে কি কোনো দোকান ছিল কখনো?’

‘দোকান..আমি তো দেখিনি..ও বুড়োদা, দেখ দেখি, দিদিমনি কী বলছে – এখানে কোনো দোকান-টোকান ছিল নাকি?’, পথচলতিআরেকবয়স্কভদ্রলোককেজিজ্ঞাসাকরলেনউনি…

‘দোকান, দোকান একটা ছিল অনেক কাল আগে…ওই হারুরই তো দোকান ছিল – আনাজপাতি, টুকিটাকি জিনিস বেচতো। জোয়ান ছেলেটা মারা গেল, পুরোপরিবারটাইতছনছহয়েগেল, দোকানটাও উঠে গেল! ওর দোকানটাই তো এই সকালবাজারের প্রথম দোকান…’

সকালবাজার..বেশ সুন্দর নাম তো! মফস্বল বলেই হয়তো এখানকার লোকজন এতো আন্তরিক, কথা বলার ফুরসত আছে…

‘কী করে মারা গেল ছেলেটা? কী হয়েছিল?’

‘কী আর হবে..সে অনেক কাল আগের কথা, সেই যেবার ভালো জল হল না..ফসলও ভালো হল না..বোধহয় মহাজনের থেকে ধারদেনা করে ফেলেছিল..শেষে বিষ খেল!…  জোয়ান ছেলেটা মরে গেল, হারুটারও শেষ অব্দি মাথা খারাপ হয়ে গেল..!’

জিভটাকে আলটাগরায় বারকয়েক ঠেকিয়ে আওয়াজ সহ আক্ষেপ করতে করতে বয়স্ক ভদ্রলোক ইশারা করলেন গাছের আড়ালে বসা একটা অবিন্যস্ত পাগলাটে বুড়োর দিকে..

‘… তোমার ছেলে তো সেই তিরিশ বছর আগে পটল তুলেছে!’…একটালোককেদেখলামবুড়োটাকেউত্যক্তকরছে।

ওই লোকটার পেছন পেছনেই কোথা থেকে আরেকটা পাগলাটে লোক এসে জুটল, বয়স ঠাওর করা বেশ কঠিন, চোখ কটা, সারা মুখে সদ্য ছাড়ানো নারকোল ছোবড়ার মত চুল-দাড়ি, গায়ের পোশাক তথৈবচ। দেখেই কেমন মায়া হয়। পার্স খুলে টাকা দিতে গেলাম – নিলনা।কিন্তু ওই বুড়োটার শশা দিতেই হাত পেতে নিয়ে নিল। তবে মাগনায় নিল না, পকেট থেকে একটা আধ খাওয়া সিগারেট বার করে দিল…

লোকটার পিছু নিলাম নিজের অজান্তেই.. লোকটা কোথায় যাচ্ছে, সেটা জানা যেন জরুরী। লোকটার হাঁটাচলায় যাকে পাতি বাঙলায় পাগলামি বলে, সেই ছাপ স্পষ্ট। লোকটার পেছনে পেছনে কিছুটা এগোতেই চোখে পড়ল একটা বুড়ো শিব মন্দির, বটগাছের তলায়। বটের ঝুড়িতে টায়ার বেঁধে তখন দোল খাচ্ছে কচিকাচারা। পোষাকের মালিন্য চাপা পড়ে যাচ্ছে ওদের উজ্জ্বল হাসিতে…

‘এই ছেলেরা, শোন, এখানে আশেপাশে কোনো বাঁধানো ঘাটওলা পুকুর আছে?’, অজান্তেই প্রশ্ন করে বসলাম। কেন করলাম জানিনা!

‘হ্যাঁ, আছে তো.. ওই পাগলটা যেদিকে যাচ্ছে, ওর পেছনে চলে যাও..জলের পোকার পুকুর পাবে…’

‘জলের পোকার পুকুর!’,

‘যাও না, তা’লেই বুঝবে…’, বলে মুখ টিপে হেসে উঠল ছেলের দল!একেতোনিজেরমধ্যেইএকটাঅজানাদ্বন্দ্বচলছে, কেমনযেনকতকালেরচেনাছায়াপথ, তারওপরআবারঅমনঅদ্ভুতনাম – আরোকিছুটাএগোনোরইচ্ছেটাদমিয়েরাখাগেলনা!

একটুএগোতেইদেখতেপেলাম – মন্দিরের চাতালে কয়েকজন আড্ডা মারছে, সে আড্ডা রোজকার নাকি রবিবাসরীয়, বোঝার উপায় নেই। এমনিতে শহর ছাড়ালে জীবনের গতি বিলম্বিত কিম্বা বড় জোর মধ্যলয়ে অভ্যস্ত। সেখানেঠেকা বাজে দুলুনির তালে, সেখানে ছন্দে থাকে অযথা গিটকিরির বদলে অলস বিস্তার। যারা বসেছিলেন, তাদের চেনা ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলো বোধহয় আমাকে দেখে। এমন স্থান-কালে অচেনা পাত্র-পাত্রীর দেখা সচরাচর মেলেনা বলেই মনে হল ওনাদের শরীরী ভাষায়। সেটাকে গায়ে না মেখে সামনের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম

‘দাদা, জলের পোকার পুকুরটা আর কতদূর বলতে পারেন?’

‘ঐ তো, সামনেই…ওদিকে কোথায় যাবেন?’

‘জানিনা..’, আনমনেউত্তরদিলাম।

‘কাউকে খুঁজছেন?’

‘আচ্ছা,পুকুরটারনামজলের পোকা কেন?’, রোদ-চশমাটানামিয়েনিলাম, মনেমনেযেনএকটাঅদ্ভুতঅস্বস্তি – কীখুঁজছি, কাকেখুঁজছি, কেনএলামএইরাস্তায়!

‘আরে না না, জলের পোকা কেন নাম হতে যাবে ও পুকুরের! ছেলে ছোকরারা ঐ নাম দিয়েছে..একটা পাগলি রাত দিন ওই পুকুরে চান করে কিনা, তাই ওই পাগলিটাকে ছেলে ছোকরারা জলের পোকা ডাকে…তা ইয়ে, ওই নামে ডাকলে পাগলিটা খেপে একটু গালমন্দ করে আর কি! ছেলে ছোকরার দল, বুঝতেই পারছেন, পাগলিটাকে খেপালেই ওরা খুশি!’, হেসে উঠলেন সকলে।

‘শীতকালেও চান করে?’

‘সারা বছর…’, মেচেতারদাগওলামাঝবয়সীভদ্রলোকজবাবদিলেন।

‘আশ্চর্য, ঠান্ডা লাগে না ওর!’

’আগেকার লোকেরা বলে, ও নাকি ওর মেয়েকে খোঁজে..ওর মেয়েটা তো ওই পুকুরে ডুবেই মরেছিল। বাজারে ওই হারু বুড়ো..সে আরেক পাগল, গেলে দেখতে পাবেন যত রাজ্যের দরকচা মারা সব্জিপাতি নিয়ে বেচতে বসেছে… ওই হারু পাগলারই তো ছেলের বৌ… পাগলের গুষ্ঠি একেবারে!’

বাজারের ওই পাগল বুড়োর ছেলের বৌ – আশ্চর্য!

‘আচ্ছা, ওনার ছেলেই তো বিষ খেয়েছিল, না?’

‘তাই তো শুনেছি..তখন আমরাও সব ছোটছোট..তবে বাপ জ্যাঠার মুখে শুনেছি, মহাজনের ঋণ ছিল, ফসলও ভালো হয়নি নাকি সেবার, তাই শোধ করতে না পেরে বিষ খেয়েছিল..তা আপনাকে তো চিনতে পারলাম না? এদিকে কেউ থাকে টাকে নাকি?’, অচেনামানুষেরপ্রতিওনাদেরএইকৌতুহলঅস্বাভাবিকনয়।

‘এই পথে আসানসোল যাচ্ছিলাম, চা খেতে নেমেছিলাম বাজারের কাছে চায়ের দোকানটায়..আচ্ছা, দাদা…জলের পোকার মেয়েটা কি ছোটবেলাতেই জলে ডুবে যায়?’, কীসেরএতকৌতুহল – নিজেইনিজেরপ্রতিবিস্মিতহই। কথাগুলোযেনআপনাআপনিইবেরিয়েআসছে!

‘ওই বছর তিনেক হবে..আমরাও তখন ওরই কাছাকাছি বয়সী…শুনেছি, ওই হারু পাগলাই সবাইকে বলেছিল, নাতনি নাকি পুকুরে ডুবে মারা গেছে! কিন্তু কেউ নাকি বাচ্চাটার বডি জলে ভেসে উঠতে দেখেনি! কে জানে, কী হয়েছিল! তবে পুরোনো লোকেদের অনেকে বলে – বর মারা যাওয়ার পর ঐ জলের পোকার নাকি মাথায় গন্ডগোল হয়ে যায়, তাই হারু ওর নাতনিকে পাচার করে দিয়েছিল শহরে; ওর কোন আত্মীয়ের বাড়ি! আর সবার কাছে রটিয়ে দিয়েছিল নাতনি জলে ডুবে গেছে, যাতে ওই পাগলি মা’র থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়…অনেকদিন আগের কথা, সত্যি মিথ্যা জানিনা! তা ম্যাডাম বললেন নাতো – কোথা থেকে আসা হচ্ছে?’

অন্যমনস্ক ভাবে ওনাদের ছেড়ে একটু এগিয়ে যেতেই আচমকা চোখে পড়ল – একটা পাগলি সামনের রকটায় বসে কী যেন খাচ্ছে, গায়ের কাপড়চোপড় থেকে তখনও জল টসটস করে ঝরছে।

মূহুর্তে চোখাচোখি হয়ে গেল জলের পোকার সাথে; আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের মত চমকে গেলাম। জলের পোকার ডান কপালে অবিকল একইরকমের জড়ুল, এ জড়ুল আমার চেনা! জ্ঞান হওয়া ইস্তক এই একই রকম জড়ুল আমি আয়নায় দেখেছি!

এ জড়ুল জলের পোকারও চেনা…শ্যাওলা ধরা বুকের পাঁজরে যে উথাল-পাথাল ঝড় বইছে তারই জের নামতে শুরু করেছে বোধহয় ওর ফ্যালফ্যালে চোখের পাশ দিয়ে..

কাঁপা-কাঁপা হাতে জলের পোকা বাড়িয়ে দিল এক মুঠ ন্যাতানো মুড়ি আর আধ খাওয়াতামাটে বুড়ো শশার একটা টুকরো…

‘কী করছ এখানে…কখন থেকে খুঁজছি…দোকানে চা জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়ে গেল!’ চাপা উদ্বিগ্ন গলা দীপেশের। ‘এসব পাগল টাগলের কাছে বেশি যেওনা…কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই!’,

দীপেশ পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর দিকে পিছন ফিরতেই বললো, ‘এ কী, তোমার চোখে জল? কিছু পোকাটোকাপড়লো নাকি?’

[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

Tags: , , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ