14 Apr

পয়লা বৈশাখে লে খ্যাপা

লিখেছেন:সুদর্শন মুখোটী


Sudarshan Mukhoti GALPERSAMAY STORY

পয়লা বৈশাখের রাত, সময় নটা। দীপ্তেশ আর সুতপা ফিরছে, দুজনের চার হাতে  চারটে শপার্স ব্যাগ ঝুলিয়ে। ব্যাগের পেট ফুলে আছে ভেতরের সুইটসের প্যাকেটে। ব্যাগ উঁচিয়ে উঁকি দিচ্ছে পাকানো বাংলা ক্যালেন্ডারের সাদা পিঠ।

দম্পতির মাথায় উঁকি দিচ্ছে প্রশ্ন, পয়সা খরচ করে ক্যালেন্ডার আবার কেন? সুইটসের বহর একটু বাড়ালেই তো হয়! ক্যালেন্ডারের এখন কী গতি হবে? হাল আমলের ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুযায়ী, পয়সা খরচ করে ফ্ল্যাটের অন্দর সজ্জিত দেওয়ালের পাশে ক্যালেন্ডার টাঙানো নেহাত দৃশ্যদূষণ। বাপ ঠাকুরদার আমল হলে, বাড়ির দেওয়ালে পোঁতা পেরেক থেকে সসম্মানে ঝুলে পড়ত। ঠাকুমা হয়তো, ঢাউস কালী ঠাকুরের ছবিটা  বাঁধাবার ইচ্ছে প্রকাশ করত। ঠাকুর্দা অনতি বিলম্বে ‘শম্ভু বাইন্ডার্স’ থেকে বাঁধিয়ে নিয়ে আসত। অত বড় বাড়িতে চারটে কালী ঠাকুরের বাঁধানো ছবির সঙ্গে আরেকটা অন্য ভঙ্গিমার কালী ঠাকুরের বাঁধানো ছবি থাকলে ক্ষতি কী!

সনাতনের মুদিখানা, বাসব বস্ত্রালয় ধরনের দোকানগুলোর হালখাতা কবেই হারিয়ে গেছে। সেই বরফ গোলা সরবত, সিঙ্গাড়া শোভিত গার্ডার মোড়া স্থানীয় দোকানের মিষ্টির বাক্স আর নতুন বাংলা বছরের সস্তা কাগজে ছাপা ক্যালেন্ডার, আজ হারিয়ে গেছে ঝা চকচকে শপিং মল আর ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের গর্ভে।

দীপ্তেশ আর সুতপার মেয়ে রঞ্জিনী,  চন্দ্রকলার মতো দিনে দিনে বেড়ে উঠছে। একদিন বিয়ে দিতে হবে, আর সেই একদিন তো এসে পড়বেই। সোনার দাম ওপরে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁতে চাইছে। রঞ্জিনীর মা বাবা চারটে সোনার দোকানে, ‘এগারো মাস টাকা জমা দিয়ে বারো মাস জমার সুবিধা উপলব্ধ’ এই ধরনের স্কিমের গ্রাহক হয়েছে।

গয়নার দোকানে এখনো সাড়ম্বরে হালখাতা হয়। প্রায় বিয়েবাড়ির আদলে সাজানো হয় গয়নার দোকানের শোরুম মুখ। সোনার দোকানগুলো এখনো হালখাতার ডিজিটাল ছাপা নিমন্ত্রণ পত্র পাঠায়। ইংরেজি এগারো মাসের একটার মাঝে পয়লা বৈশাখ পড়বেই। আপ্যায়নে প্রথম পরিবেশনা, স্ট্র মুখে বসানো কোল্ড ড্রিংকসের বোতল। তারপর টাকা জমা দেওয়ার নথিভুক্তি, হালখাতায় নয়, কম্পিউটারে ডেটাভুক্তি। সিঁদুর মাখানো টাকার ছাপ দেওয়া, সিঁদুর দিয়ে শ্রী আঁকা খাতা অবশ্য সেদিনের জন্য মন্দির থেকে পুজো করিয়ে আনা হয়।

বাড়ির ফেরার সময় হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়, দোকানের নাম লেখা ব্যাগে সিল করা ব্র্যান্ডেড কাজু বরফি বা লাড্ডুর প্যাক আর পাকানো ঝকঝকে দামি কাগজে ছাপা ক্যালেন্ডার। দোকানেই ক্যালেন্ডার মেলে, তার পাশে মিষ্টির প্যাকেট বসিয়ে মুঠোফোনে ছবি তুলে নেয় সবাই। হালখাতয় গর্বের প্রাপ্তি, ফেসবুকে পোস্ট করতে হবে তো!

নামি কোম্পানির এক্সপায়ারি ডেট দেওয়া, বরফি বা লাড্ডু রয়ে সয়ে খাওয়া যাবে। বাড়িতে ফ্রিজ তো আছেই। ক্যালেন্ডার দান করতে চাইলেও এখন আর কেউ নেয় না। বাচ্চাদের গার্জিয়ানরা আর ক্যালেন্ডার দিয়ে পাঠ্য ব‌ইয়ে মলাট দেয় না।

একটা  ক্যালেন্ডার ছবিহীন  বড় বড় হরফে তারিখ লেখা, জাস্ট ফেলে দেওয়া যাবে। একটায় কাশ্মীরের ছবি, একটায় আইফেল টাওয়ারের ছবি। ফেলে দিলে কোনো পাপ হবে না। কিন্তু কালী ঠাকুরের ছবির ক্যালেন্ডারটা?

পায়ে পায়ে ফিরছে ওরা। বাড়ি ফিরে ভেবে দেখা যাবে কী করা যায়! হঠাৎ দেখে উল্টো দিক থেকে এগিয়ে আসছে সেই সোনাজেঠু, যার মুখে কথা শুরু হয়, লে খ্যাপা দিয়ে। কাছে এসেই সোনাজেঠু লে খ্যাপা বলে তুলে নিল, সবচেয়ে উঁচিয়ে থাকা ক্যালেন্ডারটা। রঞ্জিনীর মা বাবা ভাবছে, লে খ্যাপা বলে, যদি আবার দামি সুইটস্ তুলে নেয়!

সোনাজেঠু ক্যালেন্ডার খুলে বলে, “বাংলা বছরের দারুণ দেয়াল পঞ্জি! আরে, বাঙালির ঘরে একটা বাংলা দেয়াল পঞ্জি না হলে তাকে বাঙালি বলে মানায়?”

সুতপার বুক থেকে যেন একটা বোঝা নেমে গেল, মুখ উচ্চারণ করল, “কালী ঠাকুরের ছবিটা তাহলে পছন্দ হয়েছে?”

“নাহ্, এক যুগ ধরে আমার পড়ার ঘরের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ। ছবির তলায় গত বছরের পঞ্জি ফেলে দিয়ে, এই বছরের পঞ্জি পিন‌আপ করে বসিয়ে নেব। পঞ্জি নতুন, রবিঠাকুর চিরন্তন।”

সুতপার স্বস্তি, সুইটসের দিকে তাকিয়েও দেখেনি, সোনাজেঠু।

[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

GALPER SAMAY 2026 BOISAKH (12)

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ