14 Apr

পৌষের অপেক্ষায়

লিখেছেন:সিদ্ধার্থ সান্যাল


Siddhartha Sanyal GALPER SAMAY STORY

এক

ধুলোভরা গ্রামের রাস্তায় চারজনের ছোট দলটা হনহন করে চলছে ।

সকলের হাতে একটা করে থলে, তাতে প্লাস্টিকের দু-একটা জলের বোতল।

রাস্তার তেষ্টা মেটাতে তো বটেই, ওদের কাজেও জলের প্রয়োজনটা বেশি, গলা ভেজাবার জন্য।

ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে তাদের পৌছতে হবে তাদের গ্রাম আজারি থেকে চার মাইল দূরের কোজরা গ্রামে।

কোজরার পুরনো জমিদার ঠাকুরসাহেবের হাভেলির বায়না।

কাকভোরে এক মুনিষ সাইকেলের টিংটিং ঘণ্টা বাজিয়ে ঘরের দাওয়ায় এসে দামিনীকে বলে গেছে, হুকম সকাল আটটার মধ্যে দামিনীকে পুরো দল নিয়ে হাভেলিতে দুরস্ত পৌঁছে যেতে বলেছেন ।

আত্মীয়স্বজনেরা সব এসে যাওয়ার আগেই সেখানে পৌঁছে কাজ শুরু করে দিতে হবে।

গত চার বছরে দামিনীর এই নিয়ে তিনবার ঠাকুর ত্রিলোচন সিংয়ের হাভেলিতে ডাক পড়লো ।

দামিনীর দলের কাজ ঠাকুরসাহেবের বেশ পছন্দ, হাত খুলে টাকা দেন তিনি।

আজকের দিনে তাদের কাছে এই রকম খদ্দের খুব কমই আছে ।

আবার বড়োলোক আত্মীয় পরিজনদের কাছ থেকে দল পায়বাড়তি অনেক বখশিস।

খদ্দেরের যত কাছের বেরাদরি, ততো বেশি দামিনীদের দেখনদারি মাতম, আর ততো বেশি বকশিস !

এবার গেছে ঠাকুর ত্রিলোচন সিংয়ের বাবার ভাবী, বয়স হয়েছিলো নাকি চার কুড়ি দশেরবেশি।

অনেক দিনের পরে একটা বায়না, বড়ো ঘরের বায়না।

অনেক দিন পরে ভালো টাকার মুখ দেখা যাবে।

দামিনী পেছনের সবাইকে হেঁকে তাড়াতাড়ি চলতে লাগলো ।

 

মাঝে মাঝে ভোরবেলার জোর হাওয়ায় ধুলো আর বালির রাশ উড়ছে ।

শুকনো পাতা ঘুরতে ঘুরতে উঠে আসছে তাদের চলার পথে ।

কিন্তু কালো রঙের ফিনফিনে ওড়নায় তাদের সকলের মুখ ঢাকা।

চোখের মধ্যে ধুলোবালি ঢোকার ব্যাপার নেই ।

তাই দামিনী, গুঞ্জন, মাহিকা আর মতিয়ারচলার গতিও থামছে না ।

শুধু ওড়না কেন, সর্বাঙ্গে তাদের পোশাকের রঙ কালো ।

চার মাইল দূরের গ্রামে তারা যে কাজে যাচ্ছে সে কাজে কালো রঙের পোশাকই কেবল চলবে ।

ওরা রুদালি, ওদের পোশাক হবে শোকের, আর এই রাজ্যে শোকের রঙ কালো ।

আজারি গ্রামে ওরা তিন চার ঘর ভীল আর গারাসিয়া জনজাতি,যাদের বিধবারা কয়েক পুরুষ ধরে পিন্ডওয়ারা তহসিলের আশেপাশের গ্রামগুলোতে রুদালির কাজ করে আসছে ।

বড়ো ঘরের বৌ-ঝিরা তো আর চিৎকার করে কেঁদে শোক জানাতে পারে না, তাদের সযত্নলালিত আব্রুতে বাধে, গলার স্বর যে পৌঁছে যাবে পরপুরুষের কানে ।

সুখ বা দুঃখের সময়ও তাদের গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়ার হক কেবল স্বামী বা ঘরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিজনদের, এটাই উঁচুজাতের সমাজের রীতি, শতাব্দীপ্রাচীন রেওয়াজ ।

তাই নিজের মা, বাবা বা স্বামী চলে গেলে মৃত মানুষটার মেয়ে বা বৌ ঘরের ভেতরে, গলা পর্যন্ত ঘোমটার আড়ালে কি ভাবে শোক প্রকাশ করে তা দামিনীরা কোনদিন জানতে পারেনি ।

 

দামিনীদের পক্ষে সেসব জানবার চেষ্টা করাও বৃথা ।

কারণ ঘর কেন, ঘরের বাইরের শান-বাঁধানো দাওয়াতেও তো নিচু ভীলজাতির রুদালিদের ওঠার নিয়ম নেই !

সে নিয়ম ভাঙলে সমাজ থেকে কঠোর শাস্তির আগাম বিধান দেওয়া আছে।

পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে বলতে গেলে এইরকম দাঁড়ায়…

‘আমাদের খুব কাছের মানুষটা মরেছে। আমরা খুব দুখী। কিন্তু আমাদের হয়ে তোদের শোক পালন করার কথা। এটাই রীতি। সেজন্য তোদের ডাকা হয়, আজও হয়েছে। উঠোনে তোদের বসার জন্য সদ্য-কেনা একটা নতুন শতরঞ্চি পাতা আছে। সেখানে বসে তোরা বুক চাপড়ে, চিৎকার করে, মাটিতে চাপড় মেরে, নানাভাবে, সেই মৃত অচেনা মানুষটার জন্য আকাশ বাতাস চিরে কাঁদ, কেঁদে যা, যতক্ষণ না সেই শবদেহ রামনামের সত্যতার একটানা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বাইরে চলে যায়। তখন তোদের কাজ শেষ। তারপর তোরা শুকনো চোখে টাকা, বখশিস, সব নিয়ে চলে যাস। হ্যাঁ, যাওয়ার সময় শতরঞ্চিটা তুলে নিয়ে যেতে ভুলিস না। তোরা ওটাতে বসেছিস, এখন তো আর ওটা আমাদের কোন কাজে আসবে না!’

 

দুই

 

গত দুতিন বছর ধরেই দামিনী তাদভির দুশ্চিন্তা উত্তরোত্তর বাড়ছে ।

দিনকে দিন রুদালির কাজ কমে যাচ্ছে।

বড়ো বড়ো হাভেলি, উঁচু জাতের ঘরে, যদি বা মাসে দু-তিনটে ডাক আসে, সাধারণ ঘরে তো এই রীতি প্রায় উঠে যাওয়ার অবস্থা।

চারজনের দল চালানোই খুব মুশকিল হয়ে পড়ছে ।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সামাজিক রীতিনীতিরই বদল হয়, এটাই সত্যি ।

সিরোহি পিন্ডওয়ারার সাধারণ ঘরের মেয়েরাও এখন আব্রু ভেঙে উঁচি দরজার স্কুল কলেজে যাচ্ছে।

তাদের ঘরে আসছে লিখিপড়ি বৌ, গুরুজনদের সামনে তাদের ঘুংঘট কপাল ছোঁয় কি না ছোঁয় !

এসবের পরে বাড়ির প্রিয়জনের মৃত্যুতে তাদের জোরগলায় কান্নাকাটি করার বাধা কোথায়!

দামিনী রুদালি এইসব ভাবে আর বিশ বছর আগেকার দিনগুলোর কথা ভেবে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে।

দামিনীর বিধবা শাশুড়ি বারলি, তার ছেলে কালিয়ার বৌ তাদভি দামিনীর থেকেও নামজাদা রুদালি ছিল।

পুরো পিণ্ডওয়ারা তহসিলের গ্রামগুলোর ঘরে হাভেলিতে তখনকার সময়েবারলি রুদালির নামডাক প্রচুর। বর্ধিষ্ণু পরিবারে কেউ মারা গেলে বারলিকে, তার দলকে ডাকার কথাই সকলের আগে মনে পড়তো ।

 

স্বামী মারা যাবার পর প্রায় ঘর-খরচা চালাবার তাগিদেই বিধবা বারলি রুদালি হয়ে যায় ।

স্বামীর ভাই-বেরাদর নিজের ভাগের জমি বিক্রিবাটা করে বহু বছর আগেই পরিবার নিয়ে শহর পিণ্ডওয়ারাতে পাকা ঘরে স্থায়ী আস্তানা করে নিয়েছিলো।

তাদের পরিবারের পুরুষেরা কিছু না কিছু চাকরি করে।

তাদের সেই বাঁধা মাইনের শক্তিতে ছেলেমেয়েরা পড়তে যাচ্ছে শহরের স্কুলে।

এদিকে বাপ-ঠাকুরদার জমির ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যাবার পরবারলির স্বামীর সম্পত্তি বলতে তিন কামরার খড়ের চালের একটা বসত বাড়ি, গোটা চারেক ছাগল আর ঘরের পেছনে কাঠা তিনেকজমি।

চারটে ছাগলের দুধ বেচে, জমিতে ফলানো পেঁয়াজ টমেটো বাজারে বিক্রি করে আর ইটভাটায় বাপ ছেলের দিনমজুরির কটা টাকায় সাড়ে চারটে পেট ঠিক ভাবে চলার কথা নয় ।

ছেলে কালিয়ার বিয়ে দিয়ে বৌ দামিনীকে ঘরে নিয়ে এসেছিলো বারলির শোহর।

বছর ঘুরতেই দামিনীর কোলে এসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে।

সেই মেয়ে বিধি-র জন্মের দিন বারলি আর প্রতিবেশী ভীল মেয়ে-বউদের সওহর গানের আওয়াজে আজারি গ্রামের ভীলবস্তির মহল্লা সচকিত হয়ে উঠেছিলো ।

কিন্তু অমজা দেবীমাতার ইচ্ছায়ই বোধহয় সে সুখের দিন বারলির জীবনে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

নাতনির মুখ দেখার কয়েক মাস সুখে কেটে যাবার পর একরাতের মধ্যে বারলির স্বামীর একটানা দাস্তবমি চলার পর, ভালো করেতার কোন চিকিৎসা হবার আগেই দুদিনের মধ্যে বারলি বিধবা হয়ে গেলো।

গলা চিরে চিৎকার করে বুক চাপড়ে বারলির কান্নার সেই শুরু ।

টাকা-পয়সার সঙ্গে সম্পর্কহীন সে কান্না ছিলো তার প্রিয় মানুষটার জন্য।

কোন অনজান মৃত মানুষের জন্য নয়।

 

এরপর ছ-ছটা মাস কেটে গিয়েছিল অভাব অনটনের মধ্যে ।

ছোট্ট বিধির জন্য কৌটোর দুধ, নতুন মায়ের জন্য একটু ঘি, একা কালিয়ার দিন মজুরির সামান্য রোজগার,বাড়ির কর্ত্রী বারলি তখন চোখে আঁধার দেখছিলো।

রুদালির রিত-রিওয়াজ জানা ছিল তার ।

গারাসিয়া সমাজের মেয়ে সে,পাঁচ মাইল দূরে তার নিজের গ্রাম ধানারি।

সেখানে কয়েকঘর রুদালি বিধবা বাস করতো ।

মন খারাপ করছে এই অজুহাত দিয়ে একদিন সে ধানারি চলে গেলো ।

কালিয়া মা-র সঙ্গে যেতে চেয়েছিলো।

কিন্তু বারলি তাকে আশ্বস্ত করলো, সে নিজে নিজে ঠিক বাপের গ্রামে চলে যেতে পারবে।

নিজের গাঁয়ের রুদালিদের থেকে ব্যবসার খুঁটিনাটি জেনে পরের দিন ফিরলো বারলি।

মা-র মনোগত ইচ্ছা জানবার পর কালিয়ার ঘোরতর আপত্তি কানে তোলেনি বারলি।

ছেলের কথা শুনলে সংসার চলবেনা ঠিকঠাক।

চড়ানো উঁচু পর্দার জোরালো গলা ছিল তার, একজন দক্ষ রুদালির ঠিক যেমনটা চাই !

শক্তপোক্ত চেহারার বারলির নিজের জাতের মধ্যে চারজনের দল জোটাতে তার বেশিদিন লাগেনি।

তার নিজের আজারি গ্রামে থাকে অনেক ঘর ভীল আর গারাসিয়া উপজাতির মানুষ, আর কিছু নিম্নবিত্ত উচ্চজাতির পরিবার।

রুদালির দল গড়ার পরবারলি নজর দিলো সেইসব পড়শি গ্রামের ওপর, যেখানে উচ্চবর্ণ আর উচ্চবিত্তের সহাবস্থান।

একবছরের মধ্যে হইহই করে রুদালি বারলির দলের নাম ছড়িয়ে পড়লো পিণ্ডওয়ারা তহসিলের চারিদিকে।

কাঁচা টাকায় প্রথম বছরের শেষেঘরে বাড়লো আধা ডজন ছাগল আর কালিয়ারজন্য এলো নতুন সাইকেল।

সে আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগেকার কথা।

 

তিন

 

আজারি গ্রামের ভীল তাদভি পরিবারে অনেক কিছু ঘটে গেছে এই বিশ বছরে ।

প্রথমে চলে গেছে ঘরের একমাত্র পুরুষ কালিয়া, অপঘাতে মৃত্যু হয়েছিলো তার।

ইটভাটার মালিক কালিয়াকে বলেছিলো পড়ে থাকা বেশি পুড়ে যাওয়া পুরনো ইটের পাঁজা পরিষ্কার করতে।

সে ইটের পাঁজায় লুকিয়ে ছিল কালনাগ, যার এক ছোবলই একটা প্রমাণ মানুষের প্রাণ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসার আগেই কালিয়া এলিয়ে পড়লো, দুঘণ্টা মধ্যেই তার প্রাণ বেরিয়ে গেলো ।

ডাক্তার ছোবলের রকম, দাঁতের দাগ আর বিষের দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার রকম- সকম  দেখে বললেন, অতিবিষাক্ত রেগিস্থান ভাইপারের কামড়।

সেদিন বারলি আর দামিনী, কালিয়ার মা আর বৌ, একসঙ্গে কেঁদেছিলো, আর কাউকে দরকার হয়নি।

নাতনি বিধি সেসময়ে পিন্ডওয়ারার সরকারি মেয়েদের স্কুলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।

 

তিন মেয়েমানুষের সংসারে তখন পুরুষমানুষের জোর নেই ।

কালিয়ার মৃত্যুর পর একটা বাঁধা রোজগারও কমে গেছে ।

ইটভাঁটার মালিক দয়াপরবশ হয়ে বারলির হাতে তুলে দিয়েছিল হাজার পাঁচেক টাকা।

মাসতিনেকের মধ্যেই সে টাকার স্বাদ আর কালিয়ার স্মৃতি কঠোর বাস্তবের আঁচড়ে ফিকে হয়ে গিয়েছিলো।

বারলিআর তার রুদালির দল এখন আর বায়না নেওয়ায় বড়ো ঘর গরীব ঘরের বাছাবাছি করে না।

নাতনির বিয়ে বসাবার চিন্তা তার রাতদিনের…দিনে দিনে নাতনিটা তাদের ঘরের, তাদের জাতের হিসেবে বড়ো সুন্দর হয়ে উঠছে…কুনজর পড়তে কতক্ষণ !

পিন্ডওয়ারার উঁচু স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক পড়া বন্ধ হয়ে গেছে বিধির ।

পড়ার জন্য টাকাপয়সার সংস্থান হয়তো সংসারখরচার সাশ্রয় করে হয়ে যেতে পারতো ।

কিন্তু ঠাকুমা আর মা-র ভয় জাগলো রাস্তার বিপদের।

মেয়ে ডাগর হয়ে উঠলে নীচুজাতের প্রান্তিক মানুষের যেমন ভয় থাকে উঁচু জাতের বেপরোয়া ছেলেদের।

বারলি আর দামিনীর বিশেষ করে ভয় কোজরা গ্রামের ঠাকুর ত্রিলোচন সিংয়ের ছেলে ত্রিভুবনকে।

সে এখন লায়েক হয়ে চারপাশের উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলোর দিকে নজর দিতে শুরু করেছে।

বছর চারেক আগে নিজের ঠাকুমার মৃত্যুর পরে বারলিকে খবর দিতে সে এসেছিলো মোটরবাইকে চেপে ।

বিধি তখন ছিলো ঘরের কুয়োতলায়, সবে চান সেরে আদুর গায়ে ভেজা কাপড়টা জড়িয়ে মাথা পেছনে ঝুঁকিয়ে গামছা দিয়ে মাথার লম্বা চুল ঝাড়ছিলো।

বাইকের আওয়াজ পেয়ে বিধি তাড়াতাড়ি দাওয়ায় উঠে ঘরের ভেতর যেতে যেতেই ত্রিভুবন বোধহয়  বিধিকে একনজর পেছন থেকে দেখতে পেয়েছিলো।

বারলি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই প্রশ্ন করেছিলো, তোর ঘরে মেয়েটা কে রে, এখনি ভেতরে গেলো ?

বারলি একবার ভেতরের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো,ও আমার নাতনি।

-ওকে তোদের রুদালির দলে সামিল করে নিয়ে আসবি, আনিস না কেন ?

ঘরের দরজার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ত্রিভুবন দাঁত বার করে বললো,ওকে দলে নিয়ে এলে তো তোদের বখশিস ঝরে ঝরে পড়বে রে  !

বারলি সভয়ে বলেছিলো, ছোঠ ঠাকুরসাহেব, বিধবা না হলে তো রুদালি হয় না, ওর তো বিয়েই হয়নি ।

-ওহ,বিয়েই হয় নি ! বাঃ ! তাহলে তো খুব ভালো !

মুখটা মচকে দাঁত বার করে হেসে ত্রিভুবন আর একবার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, তোরা তাড়াতাড়ি চলে আয়, ঘন্টাখানেকের মধ্যে। নইলে বাপু অস্থির করবে, সবাইকে জ্বালিয়ে মারবে।

বিরাট আওয়াজ করে বাইকে স্টার্ট দিয়ে ত্রিভুবন চলে গিয়েছিলো।

সেই দিন থেকে বিধির মা-ঠাকুমার ভয়ের সুরু ।

ভীল মহল্লার মধ্যে দিনের বেলায় ভয়ের কিছু নেই ।

লড়াকু জাত এরা, ঘরে ঘরে সড়কি বল্লমের জোগাড় রয়েছে ।

ভীল বুড়োদের হাতের জোর শহরের-ভাত-খাওয়া জোয়ান মরদের শরীরে পাওয়া যাবে না ।

তাই দিনের আলোয় পলটন নিয়ে এলেও ভীল ঘরের বৌ-ঝিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চিন্তাপাগলেও করবে না।

তবু গভীর রাতের বেলায় যদি দূর থেকে কোন বাইকের আওয়াজ কানে আসে, বারলির ঘুমের চটকা ভেঙ্গে যায়, হালকা ধাক্কা দিয়ে দামিনীকে সজাগ করে, দুজনে পাশে রাখা ধারাল হাঁসুয়া দুটোর হাতল শক্ত করে চেপে ধরে থাকে।

 

সেই বিধিরও একটা ভালো বিয়ে হয়ে গেছে আজ তিন বছর হতে চললো।

সে এক অদ্ভুত ব্যাপার, কাকতালীয় সে ঘটনাটা শুরু থেকে শেষ ঘটে গিয়েছিলো সাতদিনের ভেতর ।

ত্রিভুবনের ভয়ে অধীর হয়ে বারলি একদিন নাতনি বিধিকে সঙ্গে নিয়ে চলে গিয়েছিলো পিণ্ডওয়ারাতে, তার জেঠানির ঘরে।

বেশ কয়েক বছর দেখাসাক্ষাৎ হয়নি দুই জায়ের।

উদ্ভিন্নযৌবনা সুন্দরী বিধিকে দেখে বারলির ভাসুর-বউ তো একেবারে মোহিত হয়ে গেলো।

এতোদিনের উপেক্ষার পরে অমজা দেবীমাতা বোধহয় তাদভি পরিবারের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন।

জেঠানির বাপের ঘর পিন্ডওয়ারা থেকে প্রায় ষাট মাইল দূরের ঝালোর সদর শহরে।

সেখান থেকে তার দাদার বিবাহযোগ্য ছেলে পুনীত সেইসময় দুদিনের জন্য রয়েছে তার বুয়াজির বাড়িতে।

তার নিজের গ্রানাইট পাথরের ছোট কোম্পানির জন্য সরকারি কাজ ধরার সুবাদে পিন্ডওয়ারাতে এসেছে সে।

বিধিকে একনজর দেখেই তার যুবক মনে উত্তেজনার তোলপাড়, ভীলের ঘরে এমন সুন্দর মেয়ে, সে-ও আবার মাধ্যমিক পাশ করেছে !

সকলের আড়ালে বুয়াজিকে সে একান্ত অনুরোধ করে বসলো, এই মেয়েকেই সে বিয়ে করবে, বুয়াজিকে তার প্রিয় ভাইপোর জন্যএই সম্বন্ধ পাক্কা করে দিতেই হবে ।

স্বামী নেই, ননদের কথা আর সুপারিশ পুনীতের মা-র কাছে সব, বিশেষ করে যখন একমাত্র ছেলের পছন্দ ।

পুনীত ঝালোর সদর শহরের ব্যবসায়ী, ব্যবসা খুব বড়ো না হলে কি হবে,জিনসের প্যান্ট, টিশার্ট আর মোটরবাইকের জেল্লায় তার চালচলন সেরকম।

তেল চকচকে মাথার চুল সুবিন্যস্ত,ঝকঝকে বাইক, প্যান্টের পেছন-পকেটে মোবাইল ফোন উঁকি মারছে !

বিধিরচোখেও ঘোর লেগে গেলো, সে শহরে থাকবে, পাকা শ্বশুর বাড়ি হবে তার, দোতলার ছাতেনাকি একটেরে একটাই ঘর, পুনীতের !

প্রশ্নে নিরুত্তর বিধির মাথা নোয়ানো  দেখে পোতির মন বুঝতে বারলির ভুল হলো না।

পুনীতের ফোনে সেদিনই পুনীতের মা-র সঙ্গে বারলির কথায়  দুজনের বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়ে গেলো।

সাতদিনের মাথায় বিয়ে, পিতৃহারা মেয়ের বিয়েতে কোন পণের দাবী নেই ছেলেপক্ষের ।

বাড়ি ফিরে দামিনীকে সুখবরটা দেবার পরে ইউত্তেজিত বারলি সোজা তার নিজের শোবার ঘরে ঢুকে  দরজায় আগল দিলো।

তারপর দামিনী আর বিধির অবাক চোখের সামনে তক্তাপোশের তলায় ঢুকে প্রথমে একটা বড়োটিনের তোরঙ্গ টেনে বাইরে বার করে আনলো।

তারপর একটা খুন্তি দিয়ে তোরঙ্গের নিচের মেঝের আলগা মাটি খুঁড়ে বার করে আনলো একটা মাঝারি সাইজের পেতলের ঘটি, তাতে চেপে চেপেরাখা নোটের তাড়া,বারলির  সুসময়ের বাড়তি রোজগার।

দামিনী আর বিধি তাকিয়ে আছে প্রৌঢ়া বারলির দিকে, তাদের চোখের পলক পড়ছে না ।

বারলি হেসে বললো, যেদিন তোর মেয়ে হলো বৌ, বিধি মা এলো আমাদের ঘরে, সেদিন থেকে প্রত্যেক মাসে একটু একটু করে আজকের এই দিনটার জন্যে জমিয়ে রেখেছি রে ! বিধি বেটি, তোর সসুরালে তো পাকা ঘর, ওদের ব্যবসা আছে, টাকাও আছে। ওরা তো কিছু পণও চায়নি। ওরা শুধু তাড়াতাড়ি তোকে বৌ করে ঘরে তুলতে চায়। তাইতো আমি সাতদিনের মধ্যে বিহার দিন ঠিক করে এলাম ।

তারপর ঘটি থেকে নোটের বান্ডিল গুলো সাবধানে বার করতে করতে বললো, গত মাসে একবার গুণে দেখেছিলাম, দুলাখ টাকার ওপরে দুকুড়ি হাজার আছে।

বিধি অস্ফুটে বললো, দু লাখ চল্লিশ হাজার ।

-হ্যাঁ ! তাইতো ! কাল তোকে সঙ্গে নিয়ে সকাল সকাল পিণ্ডওয়ারা গিয়ে তোর গলার হার, জামাইরাজার একটা আংটি আর তোদের দুজনের জামাকাপড় কিনে আনবো। বৌ, এখন কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না । বরাত আসার দুদিন আগে মহল্লার লোকেদের মাংসভাতের নেমন্তন্ন করে আসবো আমি। পণ্ডিতকেও বলে আসবো।ওই বেয়াদব ত্রিভুবন ছোঁড়াটাকে আমার বড়ো ভয় রে বৌ ।

 

চার

 

এসব তিন বছর আগের কথা।

বারলির সবরকম আশঙ্কার নিরসন করে বিধির বিয়ে কিন্তু ঠিকঠাক নিরুপদ্রবে হয়ে গিয়েছিলো।

ঝালোর থেকে বরকে নিয়ে দু গাড়িভর্তি বারাতিরা এসে পড়ার পরও মা-মেয়ের একটা দুশ্চিন্তা ছিলোই ।

বিয়ের আসর থেকে পছন্দের মেয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ঠাকুরদের কাছে জলভাত।

অনেক বুদ্ধি করে বারলি নিজে গিয়ে আজারি গাঁওয়ের পুলিশচৌকির হাবিলদার আর তার চারসাথী কনস্টেবলকে পোতির বিয়ে উপলক্ষে পেটপুরে মাংসভাত খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে এসেছিলো ।

নিমন্ত্রিত পুলিশদলের উপস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বিধির বিহাতে কোন অঘটন ঘটেনি।

বিয়ের জোগাড়যন্ত্রে বারলির বিশ বছরের পুরনো ঘট খালি হয়ে গিয়েছিলো বটে, তবে বিদাইয়ের সময় দুই রুদালির অঝোরে কান্নার নির্ভেজাল অশ্রুবিন্দু দিয়ে সে ঘট হয়তো ভরে উঠতে পারতো !

 

পরাণপ্রিয় নাতনির বিয়ের বছরেই দুদিনের ধুমজ্বরে বারলি তার হাতে-গড়া সংসারটা ছেড়ে চলে গেলো ।

প্রচণ্ড জ্বরে ঝিম ধরে থাকতে থাকতে তিনদিনের মাথায় ঘাড় শক্ত হয়ে গেলো তার ।

মাঝে মাঝে চোখ খুলে যখন দামিনীকেও চিনতে পারছে না, তখন ভয় পেয়ে দামিনী হলুদ বাক্স ঝোলানো ফোনের দোকান থেকে বিধিকে ফোন করলো ।

গভীর রাতে পুনীতের বাইকের পেছনে চেপে একশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বিধি যখন আজারি এসে পৌঁছলো তখন বারলি সব ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে ।

বিধি তো আর রুদালি নয় তাই তার পরাণপ্রিয় ঠাকুমার জন্য সারারাত ধরে তার নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ তাদভি বাড়ির চার দেওয়ালের বাইরে পৌঁছলো না ।

 

একেবারে একা হয়ে পড়েছে দামিনী ।

সকাল সকাল বারোটা ছাগলের দুধ দুইয়ে দুটো বালতি ভর্তি করে সে ।

ঘণ্টা দেড়েক সময় কেটে যায় এই কাজে।

দোয়া দুধ নিয়ে যাবার জন্য তার শাশুড়ি বারলির আমল থেকেই একটা বাঁধা গোয়ালা আছে।

সে এসে দুধ মেপে নিয়ে চলে যায়, দামিনীর জন্য কিছুটা রেখে।

কেরোসিন স্টোভে সেই দুধ জ্বাল দিয়ে দামিনী বেরিয়ে পড়ে ছাগলের পাল নিয়ে ।

চরবার সময় যাতে এদিক ওদিক চলে না যায়, সেজন্য পুনীত লম্বা লম্বা দড়ির টুকরো দিয়ে ছাগলগুলোকে একে অপরের সঙ্গে ভালো করে বেঁধে রেখে দিয়ে গেছে ।

দামিনীর খুব সুবিধে হয়েছে এতে, দলছুট ছাগলের পেছনে আর দৌড়তে হয়না তাকে।

রাজস্থানের কড়া রোদ বেরিয়ে পড়লে ছাগলের পাল তাড়িয়ে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে দামিনী ।

টুকটাক ঘরের কাজ আর নিজের জন্যে রান্না শেষ হতে না হতেই কোনদিন এসে পড়ে গুঞ্জন বা মতিয়া।

কথাবার্তা সেই একই, গতমাসে কোজরা গাঁয়ের ঠাকুর ত্রিলোচন সিংয়ের হাভেলির কাজের পর প্রায় বিশ দিন হয়ে গেছে আর একটাও বায়না আসেনি ।

কাজ এতো কমে গেছে, এরপর কি তাহলে কালো পোশাকগুলো চিরকালের মতো তোরঙ্গে তুলে রেখে ইটভাঁটার দিনমজুরিতে লেগে পড়তে হবে !

গুঞ্জন, মতিয়া বা মাহিকার ভাগ্য কিন্তু দামিনীর মতো মসৃণ নয় ।

দামিনীর নিজের দিনযাপনের চিত্র তার নিজের হাতেই আঁকতে হচ্ছে ।

নিজের জন্য সব সিদ্ধান্তের মালিক সে নিজে ।

কিন্তু দলের আর তিনজন বিধবা রুদালির ঘরে ছেলে আছে, ছেলের বৌ, নাতি নাতনি আছে ।

কারণে অকারণে বৌদের মুখঝামটা নাতি নাতনির আদরের থেকে ভারি পড়ে যায় তিনজনের কাছে ।

তাই দিনের বেলায় কিছু কাজ আর সংসারে কিছু অর্থের জোগান দিয়ে নিজেদের সম্মান রক্ষা করাটাজরুরি বলে তিনজনেই মনে করে।

কিন্তু নিরক্ষর, কোনরকম কাজের দক্ষতাহীন বৌ-মেয়ের জন্য গ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলের ইটভাটায় দিনমজুরি ছাড়া অর্থকরী কাজ আর কোথায় !

এ রাজ্যে একশ দিনের কাজের সরকারি প্রতিশ্রুতিতে যদি মানুষ পঞ্চাশ দিন কাজ পায়, তাহলে সে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে!

 

কয়েক মাস পরে এমন এক দিনে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এলো বিধি।

মেয়েকে কাছে পেয়ে আত্মহারা দামিনী অনেক কথার মাঝে দুঃখের কথাও বলে ফেললো…রুদালির পোশাক বরাবরের মতো তুলে রেখে এবার ঘরের পেছনের তিন কাঠা জমিতে নানারকম ফসল ফলানোয় জোর দিতে হবে…ছাগলের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে…

বিধি বললো, মা, এখনই হতাশ হয়ো না, বোধহয় তোমার, তোমার কেন সব রুদালির এবার সুদিন আসছে। তোমার জামাই খবর এনেছে, সারা দেশে এক মহামারি রোগ শুরু হয়েছে। ঝালোরে এখনো তেমন কিছু শুরু হয়নি, তবে আমাদের রাজস্থানে অন্য বড়ো শহরগুলোতে হরদম লোক মরছে, হাসপাতালগুলো ভর্তি হয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি। এ রোগ, করোনা না কি যেন নাম, এ দারুণ ছোঁয়াচে রোগ, একটা লোকের থেকে আরেকজনকে ধরে নিচ্ছে চোখের পলক না ফেলতেই। সরকার তাই লোকজনকে রেডিও টিভিতে অনেক রকম নিয়ম মানতে বলছে। আমি দেখেছি টিভিতে।

দামিনী শুনে কিছুটা খুশী হয়েই তারপর দমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু তুই যে বলছিস, এ রোগ ভীষণ ছোঁয়াচে ! মড়ার বাড়িতে আমরা গিয়ে রুদালি করলে আমাদেরও তো ওই রোগটা ধরতে পারে !

বিধি হেসে উঠলো, ভয় পেও না মা। আমি শুনেছি এটা বড়ো ঘরের মানুষদের, টাকাপয়সা-ওলা লোকেদের রোগ ! আমরা বস্তিতে বড়ো হয়েছি মা, ছোট জাতের গরীব মানুষ আমরা ! আজ আমার পয়সা-ওলা ঘরে বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে,আমাদের রক্তটা তো গরিবের, ছোট জাতের, শক্ত ধাতের রক্ত মা। বড়ো মানুষদের এই মহামারি রোগ আমাদের মতো ছোটজাতের দিকে ফিরেও তাকাবে না মা, তুমি দেখে নিও !

[ বানানবিধি ও মতামত লেখকের নিজস্ব]

GALPER SAMAY 2026 BOISAKH (6)

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ