08 Oct

ববিযান

লিখেছেন:হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়/ গল্পের সময়

রমেশের চায়ের দোকানের তিনটে দেওয়ালের একটা ফার্ম হাউসের সীমানা পাঁচিল। বাকি দুটো রমেশের পয়সায়। খুব একটা শক্তপোক্ত নয়। বাড়ি ভাঙা পুরোনো ইঁট কম পয়সায় জোগাড় করেছিল বটে তবে সেগুলো সব কাদা দিয়ে গাঁথা। যদিও ওপর থেকে সেটা বোঝা যায় না। অনেক কষ্টে দুবস্তা সিমেন্টের পয়সাও জোগাড় করেছিল রমেশ। বালি নিয়েছিল রাস্তার ধারের তিনটে ডাঁই থেকে। রাস্তা তৈরির জন্য যেগুলো রাখা ছিল একবছরেরও বেশি। রমেশ জানত ওগুলো সব নিয়ে নিলেও কেউ কিছু বলবে না। কিছু কিছু নিয়েও নিয়েছিল অনেকে। কিন্তু রমেশ দিনেরবেলা সকলের চোখের সামনে নিতে পারেনি। তাই বেশ কয়েকদিন রাতে দোকান বন্ধ করার সময় ছোট একটা বালতি করে বেশ কিছু বালি দোকানের এক কোণে জড়ো করেছিল। তিনটে ডাঁই থেকেই কিছু কিছু নিয়েছিল। যদিও দু’একজন দোকানের ভেতর বালি দেখে রমেশকে চোখ মেরেছিল। কিন্তু সে একটাও কথা বলেনি, শুধু শুনে গেছে। আর মুখে এমন একটা ভাব করেছে যে, তোমাদের মুখ তোমরা বলতেই পারো; তোমরা বললেই তো আর আমি চোর হয়ে যাচ্ছি না।

মতলেব মিস্ত্রিকে রোজ চা খাইয়ে আর হাতে টাকা কুড়ি গুঁজে দিয়ে সপ্তাখানেকর মধ্যে দুটো দেওয়াল মাজিয়ে নিয়েছিল রমেশ। যদিও দোকানটা অনেকগুলো ঝড় আর বর্ষা পেরিয়ে আসতে পেরেছিল শুধুমাত্র ওই ফার্ম হাউসের পাঁচিলটার জন্যেই।

দোকান থেকে রমেশের বাড়ি হেঁটে ঠিক পাঁচ মিনিট। রমেশ হেঁটেই দোকানে আসা যাওয়া করে। ফার্মের ঘড়িতে এখন ঢং ঢং করে রাত ন’টা বাজল। চারপাশ সব চুপচাপ হয়ে গেছে। আটটা থেকেই মোড়ের মাথায় লোকজন কমতে শুরু করে। সাড়ে আটটায় রমেশের দোকান একেবারে ফাঁকা। এরপরেই সে গেলাস কেটলি দুধের ডেকচি মাজতে বসে। দোকান বন্ধ করতে করতে প্রায় সাড়ে ন’টা বেজে যায়।

একটা সাইকেল দাঁড় করানো  রমেশের চায়ের দোকানের গায়ে ফার্ম হাউসের সীমানা পাঁচিলে হেলান দিয়ে। আজ নিয়ে পাঁচদিন হলো। কার সাইকেল কেউ জানে না। রমেশকে জিজ্ঞাসা করলে সে এর কোনো উত্তর দেয় না। মুখটা এমন করে থাকে তার দোকানের কাছে যখন আছে তখন তার ছাড়া আর কার হবে। রমেশ এমনই। ওপর থেকে তাকে বোঝা দায়। এই রমেশই একদিন তার দোকানের পনেরটা গেলাসের নীচে নীলরঙের ফোঁটা দিয়ে আরও দুটো চায়ের দোকানের গেলাসের থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছিল। একদিন রাতে দোকান বন্ধের আগে গেলাস মাজতে বসে চোখ চোদ্দর জোড় সংখ্যায় আটকে যায়। একটা পাঁচ টাকার গেলাসের জন্যে রমেশ পরদিন সকালে দোকান খুলেই ভগবতী স্টোর্সের সঙ্গে একঘন্টা ঝগড়া করেছিল। কারণ বাইরে চা যাওয়া বলতে একমাত্র ভগবতী স্টোর্সেই যায়। আর দোকানে রমেশের চোখ এড়িয়ে গেলাস ভাঙা অসম্ভব। তাই ভগবতী স্টোর্সের মালিক গোলোকের শত অস্বীকার সত্ত্বেও পাঁচ টাকা আদায় করে তবে চুপ করেছিল রমেশ।

সাইকেলটা ফার্ম হাউসের সীমানা পাঁচিলে কে যে হেলান দিয়ে রেখে গেছে কেউ জানে না। এমনকি রমেশও না। তাছাড়া সাইকেলটা এমনভাবে হেলানো দেখে মনে হবে কেউ যেন কিছুক্ষণের জন্য রেখে দিয়ে গেছে। পরে সেই লোকটি যেকোনো সময়ে চাবি খুলে নিয়ে চলে যেতে পারে। রমেশও ঠিক মনে করতে পারে না সকালে দোকান খোলার সময়ে সে সাইকেলটাকে দেখেছিল কিনা। তবে মাঝে মাঝে চা করতে করতে দু একবার দেখেছিল বলে মনে হয় তার। তারপর আর খেয়াল ছিল না খদ্দেরের চাপে। রাতে দোকান বন্ধের সময় বাসন মাজতে মাজতে রমেশের হঠাৎ চোখ যায় সাইকেলটার দিকে। তখনও হেলানো। কিছুক্ষণ আগে ফার্মে ন’টার ঘন্টা বেজে গেছে। এখন আর এইসময় কে সাইকেল নিতে আসবে। বাসন ফেলে উঠে এসেছিল রমেশ সাইকেলটার কাছে। খুব একটা পুরোনো নয়। তবে সাইকেলটা যার হাতে ছিল সে যেমন খুশি কাজে লাগিয়েছে। রমেশ লক্ষ্য করল সাইকেলটা চাবি দেওয়া। রমেশ সাইকেলটা সোজা করে। আবার দেওয়ালে হেলিয়ে দেয়। কি মনে হতে রমেশ তালাটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করতেই খুলে গেল। কেমন যেন করে উঠেছিল ভেতরটা। একটা সাইকেল সেই সকাল থেকে দাঁড় করানো। চাবি খোলা অথচ ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে চাবি দেওয়া। রমেশ কিছুটা ভয়ও পেয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল এর মধ্যে কোনো রহস্য থাকলেও থাকতে পারে। চাবিটা আবার আস্তে আস্তে আগের মতো লাগিয়ে খুব তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এসেছিল।


রাতে দোকান বন্ধের সময় বাসন মাজতে মাজতে রমেশের হঠাৎ চোখ যায় সাইকেলটার দিকে। তখনও হেলানো। কিছুক্ষণ আগে ফার্মে ন’টার ঘন্টা বেজে গেছে। এখন আর এইসময় কে সাইকেল নিতে আসবে। বাসন ফেলে উঠে এসেছিল রমেশ সাইকেলটার কাছে। খুব একটা পুরোনো নয়।


একবারের জন্যও রমেশের মনে হয়নি সাইকেলটা দোকানে ঢুকিয়ে রাখি। রাখেনি অবশ্য একটাই কারণে। এর আগে একবার চায়ের দোকান থেকে সামান্য দূরে স্কুলের মাঠে বিকেলবেলা একটা রেডিও পাওয়া যায়। এলাকার সবাই রেডিওটা কুড়িয়ে নিয়ে চায়ের দোকানে আসে। রেডিও নিয়ে অনেক গল্প হয়। সন্ধে হয়ে আসে। সকলে আলোচনা করে ঠিক করে রেডিওটা দোকানেই থাকুক, প্রতিদিন গান শোনা যাবে। তাই যাবার সময় সবাই রেডিওটা দোকানেই রেখে গিয়েছিল।

কিন্তু পরদিন সকালে ছবি পুরোপুরি বদলে যায়। থানা থেকে পুলিশ আসে। ওই রেডিওটা নাকি কিছু বন্দুকবাজদের। ওর ভেতরে নাকি বোমা রাখা ছিল। পুলিশ ওই দলটার কি একটা নাম বলেছিল রমেশের মনে নেই। আর সে মনে রাখতেও চায় না। পুলিশ রমেশকে থানায় ধরে নিয়ে যায়। দু’বেলা এক সন্ধ্যে দোকান বন্ধ থাকে। রেডিওটা নিয়ে আসার সময় যতজন লোক ছিল তার একজনও ছিল না পরের দিন সকালে। তবে রেডিওর ভেতর সত্যি সত্যিই বোমা ছিল কিনা রমেশ জানে না। শুধু সমর দারোগার জন্যে রমেশ বেঁচে যায়। লোকটা রমেশের দোকানে একসময় প্রায়ই চা খেত। এখন অন্য থানায় বদলি হয়ে গেছে। তা না হলে শহরের জেলে একবার চালান হয়ে গেলে কী যে হতো ভাবলে আজও রমেশের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

শুধু একজনই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রমেশের সঙ্গে ছিল, সে হলো ববি। রেললাইনের ওপারে থাকে। রমেশের সঙ্গে অনেক বছরের বন্ধুত্ব। যদিও ববি তার থেকে অনেকটাই ছোটো। সবাই ওকে বোবা বলেই জানে। রমেশও তাই জানতো কিন্তু একদিন রাতে কেটলি মাজতে মাজতে ওকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল রমেশ, তোর ববি নাম কে দিয়েছিল রে? জিজ্ঞেস করেই হেসে ফেলেছিল, ও তুই তো বলতে পারবি না! রমেশকে অবাক করে ববি কথা বলে উঠেছিলো——বাবা। কিন্তু শুধু একটা শব্দ নয়। বলেছিল আরও অনেক কথা —— বাপের গুরু ছিল রিসি কাপুর। বাপ বলত যে বচর টাউনের সিনেমায় ববি ছবি আসে সে বচর আমি হই। তাই বাপ আমার নাম ববি দেয়—এই প্রথম রমেশ জানতে পারে ববি কথা বলতে পারে। যদিও এর পরে আর একটা কথারও সে উত্তর দেয়নি। এই ঘটনার পর থেকে মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ কথা বলে ওঠে ববি। নিজের ইচ্ছে হলে, তাও রাতের বেলা যখন রমেশ বাসন মাজতে বসে।

সারাদিনে ববি দু’বার রমেশের দোকানে আসে। দুপুরে আর রাতে। চার বালতি করে আট বালতি জল তুলে দেয়। এছাড়া রমেশ যা বলে তাই করে দেয়। মুখ থেকে একবার খসালেই হলো। রমেশ বুঝতে পারে ববি ওকে খুব ভালোবাসে। দুপুরে রমেশের বাড়ি থেকে ববির জন্যেও ভাত আসে আর রাতে দোকান থেকে রমেশ ওকে একটা পাঁউরুটি দেয়। রেডিওর ঝামেলায় যতঘন্টা রমেশকে থানায় থাকতে হয়েছিল সেসময় থানার দুয়ার থেকে ওকে কেউ সরাতে পারেনি। সবসময়ের জন্যে গলায় ঝুলতে থাকা গামছাটা থানার দুয়ারে পেতে একটা রাত প্রায় না ঘুমিয়েই কাটিয়েছিল ববি। থানা থেকে ছাড়া পেলে ওরা দুজনে একসঙ্গে এসে দোকান খুলেছিল।

পাঁচদিন হয়ে গেল সাইকেলটার কেউ খোঁজ করেনি। রমেশও সাইকেলের ব্যাপারে দোকানে বেশি আলোচনা করে না। কিন্তু রমেশ দেখে ববি দোকানের জল তুলেই সাইকেলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দিন দুই তিন দেখার পরই রমেশ সাইকেলের চাবিটা খুলে দেয়। এমনিতে খোলাই ছিল কিন্তু সবাই তো জানতো সাইকেলটা চাবি দেওয়া আছে। তাছাড়া তালা দেওয়া সাইকেলের সামনে ববির দাঁড়িয়ে থাকাটা ভালো দেখায় না।

সাইকেল নিয়ে একটা ব্যাপারে রমেশ ভীষণ খুশি। ববিটা দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। একমাত্র রমেশের সঙ্গেই সে কথা বলতো কিন্তু সেই কথা বলাটাও মাসে হয়ত একদিন, একটা কি দুটো। কিন্তু সাইকেলটা আসার পর থেকে ববি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। রমেশের সঙ্গে মাঝে মাঝেই কথা বলে। আগে জল তুলেই কোথায় পালিয়ে যেত। আবার দুপুরে খাবার সময় আসতো। এখন সে সাইকেলটা নিয়েই সবসময় ব্যস্ত থাকে। কখনও শুকনো কাপড় দিয়ে মোছে, আবার কখনও জল দিয়ে ধোয়। কোনো কোনোদিন আবার সাইকেলটাকে নিয়ে দোকানের সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে। রমেশ জানে না ববি সাইকেল চালাতে পারে কিনা। কোনোদিন জিজ্ঞেসও করেনি।

এই ক’দিনে সবাই ধরে নিয়েছে সাইকেলটা রমেশের আর সে এটা ববিকে কিনে দিয়েছে। রমেশের সঙ্গে ববির সম্পর্কটা সবাই জানে তাই এটা ভেবে নিতে কারও কোনো সমস্যা হয়নি। কে যেন সাইকেলটার একটা নামও দিয়ে দিয়েছে —— ববিযান। নামটা রমেশের ভারি পছন্দ হয়েছে। তবে রাতে সাইকেলটা এখনও দোকান ঘরের ভেতরে ঢোকাতে সাহস হয় না রমেশের। তবে যেহেতু রমেশ খুব ভোরবেলা সকলে ঘুম থেকে ওঠার আগে এসে দোকান খোলে এবং দোকানে এসেই লোকেরা সাইকেলটাকে দেওয়ালে ঠেস দেওয়া অবস্থায় দেখে তাই সবাই ধরে নেয় রমেশ খুব ভোর ভোর উঠে সাইকেলটা দোকান থেকে বাইরে বের করে দিয়েছে।


ববি সাইকেলটা নিয়ে স্কুলের মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। ওই তো মামুদপুরের সেতু। চারদিকে আলো জ্বলছে। ববি সেতুর ওপর সাইকেল নিয়ে উঠল। বগলের নীচে দিয়ে গামছার দুটো প্রান্ত উড়ছে, ঠিক যেন ডানার মতো মনে হচ্ছে। সেতুটা পশ্চিম দিকে নেমে গেছে।


আজ সকাল থেকেই ববি একটু এলোমেলো। গতকাল রাতে বাড়ি যায়নি। রমেশের দোকানেই শুয়েছিল। চারের জায়গায় দু বালতি জল তুলেছে। রমেশ শরীর খারাপ কিনা জানতে চেয়েছে কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি। শুধু সাইকেল নিয়ে সে ব্যস্ত। একবারের জন্যেও সাইকেলের কাছ থেকে আজ সে নড়েনি। দেওয়ালে হেলান দেওয়া অবস্থাতেই সে বেশ কয়েকবার সিটে চেপে বসেছে। দুপুরে অল্প একটু ভাত খেয়েছে। কিন্তু তবুও রমেশ খুশি। ববি তার জীবনে একটা অন্তত ভালোবাসার জিনিস পেয়েছে।

দোকানের বাল্বের আলোটা ফার্ম হাউসের পাঁচিলে গিয়ে পড়েছে যেখানে সাইকেলটা হেলান দিয়ে রাখা আছে। হাঁড়ি মাজতে মাজতে রমেশ দেখল ববি সাইকেলের সিটে চেপে বসে আছে। আজ সে পাঁউরুটি নেয়নি। শুধু এক কাপ চা খেয়েছে।

মাজা বাসনগুলো ঘরের মধ্যে গুছিয়ে রাখছে রমেশ। এমন সময় বাইরে সাইকেলের আওয়াজ হতেই ছুটে বেরিয়ে এলো। কিছু বুঝতে পারল না। পাঁচিলের দিকে তাকিয়ে দেখল সাইকেল ববি কেউ নেই। রাস্তায় নেমে এসে রমেশ দেখল, ববি সাইকেলটা নিয়ে স্কুলের মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। ওই তো মামুদপুরের সেতু। চারদিকে আলো জ্বলছে। ববি সেতুর ওপর সাইকেল নিয়ে উঠল। বগলের নীচে দিয়ে গামছার দুটো প্রান্ত উড়ছে, ঠিক যেন ডানার মতো মনে হচ্ছে। সেতুটা পশ্চিম দিকে নেমে গেছে। এখন শুধুমাত্র ববির মাথাটা দেখা যাচ্ছে। একটু পরে তাও আর দেখা গেল না। রমেশের মনে হলো ববি সাইকেল নিয়ে যেন আলোর দেশে ডানা মেলে দিয়েছে।

[ বানানবিধি গল্পকারের নিজস্ব ]

ববিযান / হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়/ গল্পের সময়

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।