
– আমি তো রায়গঞ্জ যাচ্ছি, তুমি কোথায় দীপঙ্করদা?
– আমি তো গতপরশু থেকেই শিলিগুড়ি। তোর কাজ মিটলে চলে আসিস।
– হ্যাঁ, খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই তো? আবার পৌনে দুশো কিলোমিটার উজিয়ে যাব আড্ডা দিতে।
– তাহলে আসিস না। কী একটা বিশেষ কাজে নাকি নিউজ এডিটর দেবব্রত বসু তোকে পাঠিয়েছেন – শুনছিলাম।
– সেটা তো বলতেই পারতাম যদি আমাকে একটু সাহায্য করতে। কিন্তু সেটাই যখন করবে না, তখন আর জানাব কিভাবে?
– বলিস না। সমস্ত গোপন কথা ছড়িয়ে ফেলতে নেই। সামনের সপ্তাহে একটা গেট-টুগেদার হবে, তখনই না হয় শুনব। অবশ্য তার আগেই যদি না কাগজের পাতায় প্রকাশিত হয়ে যায়।
– তোমার ছোটবেলাটা কিছুদিন এই দিকেই কেটেছে না?
– সে তো কালিয়াগঞ্জ। তোরা সাউথের লোকজন পুরো উত্তরবঙ্গের সবাইকে পাশাপাশি বাড়ির বাসিন্দা বলে মনে করিস।
– তাও, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, হিলি – এই এলাকাগুলোতে তোমার যাতায়াত আছে – তাই না? তোমাকে সঙ্গে পেলে সুবিধা হতো। চলো, ঠিক আছে। গুডনাইট।
অতসী ফোনটা নামিয়ে রাখল।
সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। কিন্তু নিজেকে এই কাজে যুক্ত করলাম অনেক ঘাটের জল খেয়ে। ফলে, অনির্বাণ, অতসী বা রাঘবের মতো তিরিশের আশেপাশের যুবক-যুবতীকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করি বটে, যদিও বয়সে এরা আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট। তাই এরা সবাই আমাকে দাদা ডাকে। তবে, এদের বন্ধুত্ব আমি খুব উপভোগ করি। এখনকার ছেলেমেয়েরা পরিশ্রমী তো বটেই অনেক বেশি ফোকাসড।
আমাদের নিউজ টিমের একটা অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। কিন্তু সব কিছু তো ঠিক অফিসিয়াল ভাবে বলা যায় না – তাই হবে এর পাশাপাশি আমরা নিজেরাও একটা আন-অফিসিয়াল গ্রুপ খুলেছি। সেখানে সবাই মেম্বার, সবাই অ্যাডমিন। ছয়-সাতজন মিলে শুরু করে আমরা এখন তেত্রিশ জন। অন্য পত্রিকার বন্ধুদেরকে আমরা বলতাম, আমাদের মধ্যে যা ইয়ার্কি হয় না, হেব্বি! আসলে – এইসব-ই কচি বয়সের দুস্টুমি। আমিই শুধু শিং ভেঙে বাছুরের দলে।
একবছরের এপাশে-ওপাশে যাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম তাদের মধ্যে সিঞ্চন আগরতলায় থাকে, মঞ্জিষ্ঠা বেঙ্গালুরু। চক্রপাণি তো খোদ রাজধানী দিল্লি। ওরা যখন কলকাতায় আসে, আমাদের এক-একটা রাতে হুল্লোড় হয়। কখনো সখনো আমি নাচানাচি করলেও বেশিরভাগ সময় শুধু এদেরকে দেখি। এদের খোলামেলা মনোভাব বিনিময়, খুশির উদযাপন আমাকে খুব উৎসাহ জোগায়।
সব কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে একটা সপ্তাহ কোথা দিয়ে কেটে গেল। টিকিট কাটার ঝকমারি আমাকে পোহাতে হয় না, এটাই একটা বাঁচোয়া। রাতের দার্জিলিং মেল প্ল্যাটফর্মে দিয়ে দিয়েছে – এইরকম সময়ে যথারীতি আমি স্টেশনে ঢুকছি। ঠিক এই সময় অতসীর ফোন – দীপঙ্করদা, তোমাকে আমার খুব দরকার।
আমি বললাম – কেন, বল।
– তুমি এখন কি শুনতে পারবে?
– হ্যাঁ, এই ট্রেন ধরতে এসে গেছি তো। প্ল্যাটফর্মের সিঁড়িতে।
– থাক, তুমি উঠে পড়লে একটা ফোন কোরো। আমি রাখছি।
এক হাতে জলের বোতল, অন্য হাতে ফোন, কাঁধে ব্যাগ – এই অবস্থায় ধাক্কা লেগে গেল এক বয়স্ক ভদ্রমহিলার সঙ্গে। ওঁর হাত থেকে একটা খাবারের প্যাকেট পড়ে গেল নিচে। আমি তাড়াতাড়ি করে সেটা ওঁর হাতে তুলে দিতে গেলাম। উনি খানিকটা অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন – ওটা ফেলে দাও। মাটিতে পড়া জিনিস খাওয়া যায় না।
আমি বললাম – আপনার সঙ্গে কে আছেন?
– আমার ছেলে।
– উনি কোথায়?
– এগিয়ে গেছে। তুমি বরং আমার হাতটা ধরে আমাকে সিঁড়ি থেকে নামিয়ে নাও।
আমি খাবার প্যাকেটটা ফেলিনি। কিছুটা এগিয়ে ওঁর ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। বললাম – আমার সঙ্গে ধাক্কা লেগে ওঁর খাবার প্যাকেট মাটিতে পড়ে গেছে। প্যাকেটে কী ছিল বলুন, আমি কিনে নিয়ে আসি।
উনি ঘড়ি দেখে বললেন – সেটা আর সম্ভব নয়। আমি দেখছি, ট্রেনে যদি কিছু পাওয়া যায়।
আমি নাছোড়বান্দা হয়ে পরপর অনুরোধ করতে লাগলাম। বৃদ্ধা বললেন – তোমার জায়গা কি এই কামরাতেই? আমি মাথা নাড়লাম। উনি বললেন – তুমি তোমার জায়গায় যাও। আমরা কিছু একটা ব্যবস্থা করে নেব। তোমাকে তো আমরা কিছু বলিনি।
ম্লান মুখে আমি নেমে আমার কামরার দিকে পা বাড়ালাম। সেখানেও এক ঝামেলা। একটা বড়ো দল অনেক লাগেজ নিয়ে বসে আছেন আমার জায়গায়। টিকিট দেখাতেই একজন যাত্রী বললেন – আপনি কাইন্ডলি আঠাশ নম্বর সিটটায় বসবেন, আমাদের তাহলে খুব সুবিধা হয়। আঠাশ নম্বরে গিয়ে দেখি আর একজন বসে। এই যাওয়া-আসার মাঝেই ট্রেন ছেড়ে দিল। শেষ পর্যন্ত নিজের সিটে বসলাম যখন, তখন বোধহয় একটা-দুটো স্টেশন পেরিয়ে গেছে। অতসীকে ফোন করলাম। কল হলো না। দেখলাম টাওয়ার খুব কম।এতোগুলো ঘটনা একসাথে ঘটে যাওয়ায় খুব বিরক্ত লাগছিল।
ওদিকে আমাদের সেই আনঅফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রচুর পোস্ট জমা হয়ে রয়েছে। আগামীকাল বাইপাসের ধারে একটা ছোটখাটো রিসর্টে সন্ধ্যায় সবাই একজোট হচ্ছে। সবাইকে নিজের নিজের গিটার বা ঢোলক নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। সবাইকে কিছু না কিছু করতেই হবে।
আমি আলাদা করে অতসীকে মেসেজ করলাম – ফোনে পাচ্ছি না। আগামীকাল সন্ধ্যায় তো দেখা হচ্ছে। একেবারে মুখোমুখি কথা হবে।মনে মনে ভাবছিলাম, সেরকম কিছু দরকার হলে ও মেসেজ করেও জানাতে পারতো। পরে হয়তো দেখা যাবে, সেরকম কিছু কথাই নয়। বরং নিজের রিপোর্ট লেখার সময়টাই বের করে নিতে হবে দুপুরের মধ্যে।
আমার আস্তানায় পৌঁছে সেখানে দেখলাম সব লাট হয়ে পড়ে আছে। একার সংসারে বেশ কয়েকটা দিন বাইরে কাটিয়ে ঘরে ঢুকলে, সবচেয়ে যেটা অসহনীয় বলে মনে হয়, সেটা হচ্ছে ধুলো। খাটের ওপর, টেবিলের ওপর, বাসনকোসনের ওপর – সর্বত্র। খুব কষ্ট হয়, এইসব পরিষ্কার করতে। তাও সব কিছু সেরে অতসীকে একবার ফোন করেছিলাম। ওর ফোন সুইচড অফ দেখলাম। স্নান সেরে বেরিয়েই একবার একটা দরকারে অফিসে ফোন করলাম। তখনই খবরটা পেলাম – অতসী অফিসে এসে এখন দেবব্রতদার ঘরে। সেই ঘরে আপাতত কাউকে ঢুকতে বারণ করা হয়েছে। মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল। তবে কি অতসীর অনুসন্ধানে বিশেষ কিছু বেরিয়ে এসেছে। আর সেই বিষয়েই ও আমার পরামর্শ চাইছিল?
শেষ বিকেলের আলো হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমি পৌঁছে গেলাম ওয়াটার ভিউ রিসর্টে। জলের ধারেই ছোট একটা মঞ্চে উপস্থিত আমাদের কয়েকজন তখন সিন্থেসাইজার আর গিটারের কানেকশন আর টুংটাং আওয়াজ করে সুর মিলিয়ে নিতে ব্যস্ত। নিশিন এলো দারুণ একটা জমকালো পোশাক পরে। সবাই ঘুরে ঘুরে ওকেই নানান রকম কথা ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগল। পোষাকের ওপরের দিকটা সোল্ডারলেস – সেটা নিয়েই বৈভবের উৎসাহ আমি পেছনে বসে নজর করছিলাম। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই এসে গেল ওয়েলকাম ড্রিংকস। ততক্ষণে অনেকেই এসে গেছে।
অতসী যখন এলো, তখন প্রথম গানটা শেষ হয়ে দ্বিতীয় গান শুরু হবে। আমি ওকে হাত নেড়ে ডাকলাম। বললাম – কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাস, এখন বল। চাইলে আমরা এগিয়ে লেকের ঐ পাশে যেতে পারি। ওকে কেমন যেন বেশ ক্লান্ত লাগছিল। মনে হলো অফিস থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে। আমরা দুজনে দুটো ড্রিঙ্কস নিয়ে রেলিং-এর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম – এইবার বল।
অতসী যেন ঠিক কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছিল না। অনেক সময় নিয়ে ভেবে তারপর বলল – অফিস থেকে একটা কাজে গিয়েছিলাম, তুমি জানো। সেখানে আর একটা ব্যাপার ঘটছিল। হঠাৎ করেই সেটা আমার নজরে চলে আসে। আমি আমার নিজের কাজ ছেড়ে ঐ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ি। বেশ কিছু তথ্য জোগাড় করেছি। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে সরাসরি কিছু বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় নিয়ে কয়েকজন মিলে একটা তদন্ত করে দেখতে হবে।
আমি বললাম – তুই কি নিজে সেই তদন্ত কমিটির মধ্যে থাকতে চাস?
– অবভিয়াসলি দীপঙ্করদা।
– এখন দেবব্রতদা কী চাইছেন, তোকে রাখবেন?
– পরিস্কার করে কিছু বললেন না। আমার কাছে তথ্য গুলো সব নিলেন। বললেন, আগে নিজের সোর্স দিয়ে একবার ঘটনাটা জেনে নেবেন। তারপর আমাকে কী করতে হবে, সেটা বলবেন।
– তুই এই কথাটা বিশ্বাস করে সব ডকুমেন্ট দিয়ে দিলি?
– আমি কী করতে পারতাম দীপঙ্করদা? আমাকে তো প্রথমে ঘটনাটা যে ঘটেছে, সেটার প্রমাণ দিতে হতো।
– ছবি তুলে রেখেছিস, সব কিছুর?
– রয়েছে কিছু, কিন্তু ছবিতে কী প্রমাণ হয় বলো?
– আমি তো প্রথমে ছবিটাই দেখাতাম। আসল ডকুমেন্ট কেউ দেয়?
– আমি একা কিছুই করতে পারতাম না। সেই জন্যই তো বারবার তোমাকে ফোন করে বিরক্ত করছিলাম।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে, এটা বিরক্ত করার ব্যাপার নয়, এটা আর্জেন্ট বিষয়। কিন্তু বলতে গিয়েও কিছু বললাম না। অতসী বলল – উনি আজকে রাতের মধ্যেই হয়তো আমাকে জানিয়ে দেবেন।
আমি কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, চল দেখি, কী কী ভাজাভুজির ব্যবস্থা করা হয়েছে এবার। সবার সঙ্গে যেমন মিশে থাকিস, কথা বলিস – সেভাবেই বলবি। বাইরে থেকে তোকে দেখেই কেউ যেন কিছু আঁচ করতে না পারে।
ও বলল – আমি সেই সকাল থেকে একটানা নিজেকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছি। ভীষন ক্লান্ত লাগছে। আমি আজকে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারব না। কিছুটা থেকেই হয়তো বেরিয়ে যাব।
আমি আবার কথা ঘোরানোর জন্য বললাম – মঞ্জিষ্ঠা বেঙ্গালুরু থেকে এসেছে, তোর খোঁজ করছিল। দ্যাখ, তোর জন্য হয়তো একটা গিফট অপেক্ষা করে আছে।
ও ম্লান হাসল। আমি মনে মনে ভাবছিলাম – আজকে ও একটুখানি সাজগোজ করে এলেও পারতো। হৈচৈ করার জন্য ওকে মোটেই উপযুক্ত মনে হচ্ছে না। আমার মনে পড়ল – গতবারের গেট টুগেদারে ওরা কয়েকটা মেয়ে মিলে কী নাচটাই না নেচেছিল। আমার ফোনের মেমোরিতে বোধহয় এখনো তার দু-একটা ক্লিপিং পাওয়া যাবে। সেবার আমরা গেছিলাম গড়চুমুক। শীতের সকালের স্নিগ্ধতায় বড়ো মনোরম ছিল সেই উদযাপন।
মঞ্চে তখন মঞ্জিষ্ঠা আর অনির্বাণ উঠে পড়েছে। ওরা এবার গান ধরবে। ওরা অতসীর নাম ধরে ডাকছে। অতসী এগিয়ে গিয়েও আবার ফোনটা হাতে ধরে ফিরে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল – মেসেজ এসে গেছে। এই কেসটা নাকি ভিত্তিহীন। আমাকে কালকে অন্য একটা কাজে বাঁকুড়া জেলায় যেতে বলেছেন।
আনসার এসে আমার কাঁধে হাত রাখল । বলল – কী দাদা, এনিথিং সিরিয়াস? আমি মাথা নাড়লাম। আনসার সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট। ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল – তাহলে তোমার জন্য একটা হার্ড ড্রিংস নিয়ে আসি? আমি মুচকি হেসে মাথা নাড়লাম। আমার আজ আর কোনও বন্ধু নেই, এরা ছাড়া। কাগজের লাইনে কাজ করতে এসে আর এক অনন্তপথের সঙ্গী লাভ হয়েছে আমার – নৈঃশব্দ। আমরা সত্যি-মিথ্যে নিয়ে বিলাস করি। কতোটা সত্যির পেছনে যে কতোটা মিথ্যা মেশানো থাকে, আমরা তার আঁচ পাই না। বাইরে তাকিয়ে দেখি কুয়াশা ঘেরা লেকের জলে হালকা একটা তরঙ্গ খেলে বেড়াচ্ছে। টলোমলো মনে আমি আমার অন্য বন্ধুদের খুঁজি। এই খুঁজে বেড়াতে গিয়েই হঠাৎ দেখতে পাই এইমাত্র অতসী এই মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
আনসার হাত তুলে ওকে ডাকতে চাইছিল। আমি ওকে আটকালাম। আমি বললাম – ডাকবেন না, কেননা ও সাড়া দেবে না।
আমিও ডাকতে পারছি না, কেননা আমি গতকাল থেকে ওকে ঐ নামে ডাকার অধিকার হারিয়েছি।
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: অরিন্দম গোস্বামী, গল্প, গল্পের সময়, সাদা-কালো চেক
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।