
বেশ ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল…, নাহ্ শঙ্খ এঁড়ে বাছুর কেনেনি, তবু তাকে তাঁত বোনা ছাড়তে হয়েছিল। ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল।
শঙ্খের পেশা তাঁত বোনা ছিল না। বাবা সেরিব্রাল অ্যাটাকে অকেজো হয়ে যাওয়ার পর, সংসারের সচল চাকা গতি হারাতে থাকে। সংসার যাপন অচল হতে শুরু করে। চাকরি না পেয়ে, বেছে নিয়েছিল সাইন বোর্ড আঁকা। ভাগ্যিস আঁকার হাতটা ভালো ছিল। পথ চলার পথে, জি. প্রসন্ন-র অনুপম সাইন বোর্ড আঁকা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। মনে হয়েছিল জি. প্রসন্ন মস্ত বড় এক শিল্পী। শিল্পের কদর আর দর সর্বত্র। লাইনটা মন্দ নয়।
কাঠের ফ্রেমে সাঁটানো টিনের ওপর, সরু, মোটা তুলিতে রং বুলিয়ে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অসংকুলান হয়নি। কাজী কবি গেয়েছেন, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। শঙ্খের দিন সমান যায়নি। হাওয়া অনুমান করতে ভুল হয়েছিল। পুরনোকে ঠেলে সরিয়ে দুয়ারে এল, ফ্লেক্স প্রিন্টিং। রং তুলিতে হাতে আঁকা সাইনবোর্ডের কুটির শিল্প, হাত ছাড়া হয়ে গেল।
মানুষের জীবনের গতিধারা কি বিচিত্র! শঙ্খনীলকে হাওড়ার শিবপুরের ভাড়া বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হল হুগলির শ্রীরামপুরে।
নাচার হয়ে নতুন ঠেকে এসে, নিতান্তই ঠেকায় পড়ে বেছে নিতে হল ছাত্র পড়ানো। এখানেও সেই, ভাগ্যিস। ভাগ্যিস পেটে কিছু বিদ্যে ছিল। ছিল টিউশনি করে নিজের কলেজের পড়া চালিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা।
বেশি চাহিদা না থাকায় দিন চলে যাচ্ছে বেশ। মনে শুধু একটু খচখচানি, শিবপুরের বন্ধুদের ছেড়ে আসা। ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়ে গেছে। সব বন্ধুই সমান ভালো, তবে শঙ্খ আর দীপকের বন্ধুত্ব যাকে বলে হরিহর আত্মা। দীপক মাঝে মাঝে বলে, “আমি হলাম ওথেলো, ঝুনু হল ডেসডিমোনা, তুই আমার বন্ধু ক্যাসিও।”
দীপকের প্রেম পর্বের দৈর্ঘ্য, নয় নয় করে ন’বছর। দীপকের মনে প্রেমের ভাব অতল। ভাব প্রকাশের ভাষায় তার ভাব ছিল বেতালা। ফোনে মন দেওয়া নেওয়ার আমল সেটা নয়। দীপকের পত্র মিতালীর লিখন ভাষের কলমচি ছিল শঙ্খ। দয়িত দয়িতার দেখা সাক্ষাতের সময় দীপক প্রায়ই সামিল করত শঙ্খকে। শঙ্খ ওদের দুজনের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি ছিল না, ছিল কাবাব মে জাফরান। প্রেমালাপে ওমন কথার সুবাস কে আর মিশিয়ে দিতে পারত? ক্যাসিও যেমন ছিল ওথেলো ও ডেসডিমোনার মাঝে।
এ জেলা ও জেলায় অবস্থান হলেও এখনো বন্ধুত্বে খামতি দেখা দেয়নি। দুজনের অবস্থা যদিও, এই পাড়ে আমি আর ওই পাড়ে তুমির মতো। শঙ্খ বলে, আমাদের মাঝে কুট কুশলী, ঈর্ষা কাতর কোনো ইয়াগোর আবির্ভাব ঘটেনি। বন্ধুত্বে তাই কালির ছিটে পড়েনি।”
জেলান্তরে এসে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার পাঁচ বছর পর, সঞ্চিত কড়ি উজাড় করে, শঙ্খ এক কামরার একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলল। প্রধান উদ্যোগী ছিল তার বেটার হাফ্, রুম্পা। আশ্রয়ে থাকার বড় ঘরের চেয়ে নীড় ছোটই বেটার নেস্ট।
ধান ভানতে শিবের গীত একটু বেশি হয়ে যাওয়ার কারণটা এবার ভাঙা যাক। জেলাত্যাগী হয়ে শ্রীরামপুরে আসার পর থেকে দীপকের বেটার হাফ্, ঝুনুর ফোনে তাগাদার পর তাগাদা, “শঙ্খদা, আপনার ফ্ল্যাট কবে দেখতে যাব? এক রোববার সকালে গিয়ে সাঁঝে ফিরব কিন্তু। বেশি কিছু নয়, চা বিস্কুট আর ডাল ভাত খাওয়ালেই চলবে।”
“কী খাওয়াব, সেটা কি কোনো ফ্যাক্টর?” শঙ্খ হেসে ফোনের ওপাড়ে কথা ছুঁড়ে দেয়।
“তাহলে, ফ্যাক্টরটা কী?”
“ছুটি ম্যনেজ করা।”
“সেকি! রোববারেও মাস্টারের ছুটি নেই?”
“রবিবারে ছাত্রদেরও ছুটি নেই যে।”
“রবিবার ছাত্রদের ছুটি নেই, মাস্টাররা তো রবিবার না পড়ালেই পারে!”
“সে গুড়েও বালি। ছাত্রদের অভিভাবক ঠিক করে দিচ্ছে, সপ্তাহে তিন দিনের মধ্যে একদিন রবিবার পড়াতে হবে। উইক ডেজে পড়ার জন্য একটা তৃতীয় দিন পাওয়া যাচ্ছে না।”
ঝুনু্ যেন, যেনতেন প্রকারে শঙ্খদার ফ্ল্যাট দেখতে মরিয়া। একটু দম নিয়ে বলে, “মনে করুন, রবিবার সকালে ছাত্র পড়িয়ে নিলেন। আমরা একটু বেলায় গেলাম। অথবা আমরা আপনার ফ্ল্যাট ঘুরে আসার পর, আপনি রাতে পড়াতে গেলেন।”
শঙ্খের গলা কিঞ্চিৎ ভারি, “নো ভ্যাকেন্সি, রবিবারে চার ছাত্রের জন্য চারটে স্লট। সাত সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত দু’জন। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দু’জন।”
“দেখাই যাক, বেড়ালের ভাগ্যে কবে শিকে ছেড়ে,” ফোনে ভেসে আসে ঝুনুর আশাবাদ।
সপুত্র দীপক, ঝুনু অবশেষে শঙ্খের ফ্ল্যাটে পায়ের ধুলো দিতে পারল। শঙ্খ দরজা খুলে স্বাগত জানাল। দরজায় পাতা পাপোষে পা দিয়েই ঝুনু সহাস্যে মন্তব্য ভাসায়, “শঙ্খদা, আট বছর পর তাহলে সময় হল? আপনার ফ্ল্যাট নতুন অবস্থায় দেখা আমার কপালে ছিল না। হাফ্ পুরনো ফ্ল্যাট দেখেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাই।”
দীপক হাসল, “তাহলে গোটা একটা রবিবার স্পেয়ার করতে পারলি?”
“গোটা নয়, তিনটে স্লট হঠাৎ ছুটি পেয়ে গেলাম। তোরা চলে যাওয়ার পর রাত সাড়ে সাতটার টিউশনিটা করতে যেতে হবে, শঙ্খের উচ্চারণ প্রফেশনাল।
“শঙ্খদা, তাহলে আমাদের বিকেল বিকেল ভাগিয়ে দিতে চাইছেন। আরে বাবা, ডিনার করে বাড়ি ফেরার বায়না ধরব না। সন্ধে হওয়ার আগেই বিদায় নেব।”
শঙ্খের মুখ একটু চুপসে যায়। মন বুঝিয়ে বলতে চায়, ঠিক ওই মিনিংয়ে সে কথাটা বলতে চায়নি। ঠিক তার পরের ভাবনা, সব কথা সিরিয়াসলি নিতে নেই। অযথা জল ঘোলা হয়ে যেতে পারে, তাই মুখে কিছু বলে না।
সন্ধের দোরগোড়া পর্যন্ত সময়টা কীভাবে যে কেটে গেল বোঝাই গেল না। ঘরোয়া রান্না বান্না, ঘরোয়া কথাবার্তা, ঘিরে থাকল আনন্দঘন সময়। শঙ্খ মনে মনে ভাবে, কোয়ালিটি সময় এত তাড়াতাড়ি চলে যায় কেন?
বিদায় বেলায় সদর দোরের পাপোষে পা রেখে ঝুনু বলে, “শঙ্খদা, এবার আপনার পালা। এক রোববার সপরিবারে আমাদের বাড়িতে আসবেন। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কিন্তু।”
শঙ্খের তাৎক্ষণিক উত্তর, “প্রবলেম তো সেই ছুটি পাওয়া। নতুন অভিধানে এখন লেখা নেই, রবিবার ছাত্রদের তথা শিক্ষকদের ছুটি দিবস।”
“আজকের মতো যদি কোনো রোববার চারটের মধ্যে তিনটে স্লট ছুটি পেয়ে যান, যাবেন। সকালে পড়ানো সেরে যাবেন। নইলে আমার গরিবখানা থেকে ঘুরে এসে রাতে পড়াবেন। দেড় দু’ঘন্টার জার্নির তো মামলা।”
“আমন্ত্রণ সাদরে গৃহীত হইল,” শঙ্খ মুখে স্মাইলি এক্সপ্রেশন দিয়ে বলে।
প্রায় এক বছর পর এক রবিবার শঙ্খ আংশিক সময়ের ছুটির গন্ধ পেল। শিবপুর থেকে ফিরে এসে রাত সাড়ে সাতটার টিউশনিটা করলেই চলবে। সুখবরটা একটু আগে জানানো উচিত। শুক্রবার রাতে দীপককে ফোন করল শঙ্খ। ফোন ধরল ঝুনু। ক্ষীণ কন্ঠে বলে, “বলুন শঙ্খদা, আপনার বন্ধু একটু বেরিয়েছে। তাই আমি…”
“একটা খুশির খবর আছে। পরশু রবিবার, সকাল থেকে তিনটে স্লট পড়ানোর থেকে ছুটি পেয়েছি। আমি যাচ্ছি। সকালে গিয়ে বিকেল ফিরব, কিন্তু। চা বিস্কুট, শাক ভাতের ব্যবস্থা করলেই চলবে।”
“এখন থাক, শঙ্খদা। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে।”
“একদম, আগে সুস্থ হয়ে ওঠা দরকার। অচিরেই সুস্থতা কামনা করি।”
“সুস্থ হয়ে ফিরে আসি, আবার একটা রোববার ছুটি ম্যনেজ করে অবশ্যই আসবেন,” ক্ষীণতর কন্ঠে, ক্ষীণ আবেদন ভেসে আসে।
পরবর্তী ছুটির ব্যবস্থা করার আগেই বন্ধুপত্নী, এই দুনিয়াদারি থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেল। হঠাৎ ছুটি। হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরা আর হয়নি।
[বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

Tags: গল্প, গল্পের সময়, ছুটি, সুদর্শন মুখোটী
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।