10 Oct

চিত্রলেখা-অনিরুদ্ধ ও ঊষার গল্প

লিখেছেন:নাহার তৃণা


নাহার তৃণা / গল্পের সময়

বহুক্ষণ হলো, কুয়াশার মেদ ঝরিয়ে কার্তিক মাসের সকাল মধুমাখা হাসিতে ডগমগ করছে। গতরাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া উপন্যাসের ইতি টানতে সকাল সকাল বারান্দায় রোদের মিষ্টি আদর গায়ে মেখে বইটিতে ডুবে ছিলাম। এমন নয় এ বই আমি প্রথমবার পড়ছি। আগেও দুবার পড়েছি। বছর তিন বাদে আবার পড়তে গিয়ে নতুন আলোয় অনেক না দেখাদের আরো যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সে পাওয়ার আনন্দ রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। যদিও রাত জাগা আমার জন্য নতুন কিছু নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্রছাত্রীদের জন্য রাতজাগা দস্তুর। ফাইন্যাল পরীক্ষা শেষ, আপাতত পড়াশোনার চাপ একেবারেই নেই। নিজের মতো খরচ করার বাড়তি কিছু সময় পাওয়া গেছে।

অবসরে যথেষ্ট ঘুমিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও মাঝে মধ্যে অভ্যেসবশত রাত জাগা হয়ে যাচ্ছে। আর সে যদি হয় তিথিডোর পুনর্পাঠের মতো ঘটনা, তখন টানা পড়ে শেষ না করা পর্যন্ত স্বস্তি নেই। শেষ পাতায় পৌঁছানোর জন্য বরাবরই আমার ভেতর অন্যরকম এক তাড়া থাকে। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে আশপাশ ভুলে ভেজা চোখে আমি পড়ে নিচ্ছি মুখস্থ প্রায় অংশটুকু…


খুচরো পয়সার মতো গড়িয়ে পড়া কথাগুলো বুকের ভেতর সুখের মতো ব্যথা নিয়ে সবে ছড়াতে শুরু করেছে, হঠাৎই বাবার গলা শুনে ভীষণভাবে কেঁপে উঠলাম। চায়ের কাপ হাতে বাবা কখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। চট জলদি চোখ মুছে মুখ তুলে তাকালাম।


“বাসরঘরের দরজায় রাজেনবাবু থামলেন। সামনে দাঁড়ানো বিজু আর ডালিমের ফাঁক দিয়ে একবার স্বাতীকে দেখলেন, ডালিম আর অরুণের ফাঁকে একবার সত্যেনকে।…অরুণ বেরিয়ে বলল—কোন ঘরে, বিজন বলল—হেমাঙ্গদা এখন… এই তো হেমাঙ্গবাবু…চলো ডালিম…শ্বেতা বলল–বাবা তোমার শীত… রাজেনবাবু বললেন–লোটন তো খুব…রিকশর টুংটাং, অন্ধকার..অন্ধকারে পাহাড়ের মতো রেল-লাইনের বাঁধ। টালিগঞ্জের ব্রিজ… প্রদীপ-জ্বলা কুলো দেয়াল ঘেঁষে সরিয়ে রাখলেন বড়োপিসি। শোভা ভাবল শেষ, এরপর…বাবু কাহাপর.. শোভার হাই উঠল, শেষ..শাশ্বতী বলল—পিসিমা…কুন্দদিদিমা সরে এসে…রিকশ মোড় নিল, নিঃসাড় পাড়া, ঝলমল জোনাকি, ঝলমল শাড়ি… মহাশ্বেতা-সরস্বতী উঠল। টুংটাং চুড়ি…রিকশ থামল টুং। আচ্ছা, আচ্ছা…চলি। চলি, রাজেনবাবু আগে নেমে লোটনকে কোলে…শ্বেতা নেমে বাবার কোল থেকে মেয়েকে … মহাশ্বেতা-সরস্বতী বোল … শোভা, শেষ..রাজেনবাবু তিনটি সিঁড়ি উঠলেন… শূন্য। …শ্বেতা দাঁড়াল…রাজেনবাবু দেয়ালে হাত তুলে…টান, দুটো প্রাণ… জীব… হৎপিণ্ড… স্পন্দনের পিণ্ড..চোখ নেই, চোখ খোলা, খোলা জানলা কালো…বাইরে কালো, কালো আকাশে তারা… দূরে… পারে… পরপারে… হয়ে-যাওয়া… না-হওয়া… হতে-থাকা… চিরকালের… আকাশ-ভরা স্তব্ধ তারা তাকিয়ে থাকল। “

 

খুচরো পয়সার মতো গড়িয়ে পড়া কথাগুলো বুকের ভেতর সুখের মতো ব্যথা নিয়ে সবে ছড়াতে শুরু করেছে, হঠাৎই বাবার গলা শুনে ভীষণভাবে কেঁপে উঠলাম। চায়ের কাপ হাতে বাবা কখন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। চট জলদি চোখ মুছে মুখ তুলে তাকালাম।

—”জানিস পুষ্প, এই সময়টাতে আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠোনের শিউলি গাছের নিচটা ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত। দূর থেকে দেখে মনে হতো কেউ বুঝি সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে ঝরে পড়া শিউলি ফুলের। শিউলির সেই ম ম সুগন্ধ অতদূর থেকেও নাকে ভেসে আসে!”

সাড়ম্বরে নাক টেনে অতীত সময়ের বুক থেকে গন্ধ নেবার চেষ্টা করলো বাবা। কথাগুলো আমাকে উদ্দেশ করে বললেও বাবার দৃষ্টি দূরে কোথাও নোঙর ফেলেছে। আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরনো সংসারে বাবাটা লাগামছাড়া রোমান্টিক একজন মানুষ। মা এসব নিয়ে নিরন্তর অভিযোগ করলেও বাবার স্বভাবের কোনো হেরফের ঘটেনি। সেরকম কিছু ঘটুক, মনেপ্রাণে চাই না। বাবাকে অনেক ভালোবাসি, রোমান্টিক স্বভাবটার জন্য ওঁকে আরো বেশি বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। শিউলির মনগড়া সুবাসে আমোদিত বাবার দিকে তাকাই। ভাগ্যিস বাবার মনোযোগ অন্য কোথাও। নইলে আমার চোখে জল দেখে কী না কী ভেবে বসতো। কীভাবে বলি, সেই স্কুলের বয়স থেকে নিজেকে আমি স্বাতী আর বাবাকে রাজেনবাবু বলে ভেবে এসেছি। যদিও শ্বাতীর বাবা আমার বাবার মতো আগাপাশতলা রোমান্টিক মানুষ নয়। নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। নিঃসঙ্গতা কি বাবাকে ভোগায়? ভেতরে ভেতরে কমবেশি সকলেই হয়তো নিঃসঙ্গ। কারোটা প্রকট, কারোটা প্রচ্ছন্ন। তবে বাবার মধ্যে তার লেশমাত্র কখনো অনুভব করেছি বলে মনে পড়ে না। আচ্ছা বাবাকে কি আজ একটু বুড়োটে দেখাচ্ছে? না কি শেভহীন বলে কাঁচাপাকা দাড়ি-গোঁফেরা বেয়াড়াপনার সুযোগ নিচ্ছে একহাত। বাবাকে শেভ হীন খুব কমই দেখা যায়। কোনো কারণে বাবার কী আজ মন খারাপ! পূর্ণচোখে বাবাকে খুঁটিয়ে দেখতে থাকি। মন খারাপের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না। ওঁর ঠোঁটের দুই প্রান্ত বরং অন্য কিছু অনুবাদ করছে। বাবার মুখ জুড়ে মিহি হাসির রেখা চিক চিক করছে।

শূন্য চায়ের কাপটা ঠকাশ শব্দে ছোট্ট টেবিলের ওপর রেখে দুইহাত জড়ো করে মুখটা দ্রুত মুছে নিয়ে হঠাৎই গলা খুলে বাবা গাইতে শুরু করে,

“শিউলি তলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।

শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা”

তারপর গান থামিয়ে উত্তেজিত গলায় বাবা বলে ওঠে,

—পুষ্প, চল একবার গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসি। তুই তো এখন ফ্রি…

হুট করে মা এসে উপস্থিত হওয়ায় বাবা কথা পুরোটা শেষ করতে পারলো না। কী ফরমান জারি হবে তারই অপেক্ষায় আমরা পিতা-পুত্রী মায়ের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হলাম। মনোযোগহীনতা মা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আমরা যে সে কারণে ভীত হয়েই তাঁকে সেটি দিতে অভ্যস্ত, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আমাদের পরিবারে অর্থ-বিত্তের অভাব হয়তো আছে, কিন্তু আপত্য স্নেহ ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। বাবার কাছে বহুবার মায়ের ছেলেবেলার গল্প শুনেছি। সেই ছেলেবেলাটা ছিল স্নেহ-ভালোবাসাহীন নিদারুণ রুক্ষ্ণ এক অধ্যায়। বাবার সঙ্গে খুব অল্প বয়সে বিয়ের পর সেই অধ্যায়ে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে। বিয়ের পর সত্যি সত্যি মায়ের ভাগ্য খুলে গিয়েছিল। বিগত জীবনের স্নেহ-ভালোবাসার অপূর্ণতা বাবা একাই পূর্ণ করে দিয়েছে। মাকে ভয় পাওয়ার যে হাবভাব বাবা করে থাকে, সেটা তাঁর নিছকই দেখুনদারি। সেটা মাও যেমন জানে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও জেনে-বুঝে গেছি।

–-রাতে বলে রেখেছিলাম, আজ বাজার না গেলেই নয়। এখন না গেলে কখনই বা বাজার যাবে, আর কখন রান্না চড়াবো?

বিশেষ পরিস্থিতিতে গলা না চড়িয়েও মা আশ্চর্য একরকমের কাঠিন্য এনে কথা বলতে জানে। যাঁর উদ্দেশে কথাগুলো বলা হলো, সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ঘাড় কাত করে বলল,

—হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই নিয়েই পুষ্পর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মুলা, বেগুন, আলু, আর চিংড়ি দিয়ে তরকারিটা তোর মা যা রান্না করে না! তা আজ কী কী আনলে ভালো হয়?

—সস্তায় যা পাবে। চাল,তেল, চিনি কিন্তু আনতেই হবে।

বাবার মুখে ঘন ছায়া থিতু হতে হতেও যেন মিলিয়ে গেল। মুহূর্তে হেসে উঠে বলল,

—জো হুকুম আলমপনা!

—বয়স কি তোমার বাড়ছে না কি কমছে!

রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার কাছে মা জানতে চাইল,

—তোর রুটি তেলে ভেজে দেই? দুধ চা দিয়ে খেতে তো ভালোবাসিস। গরম গরম ভেজে দিচ্ছি, খাবি আয়…

বাবা মায়ের পিছু পিছু চলে যেতেই আমি বইটা রেখে উঠে দাঁড়াই। তিথিডোর সমাপ্তির সুর ফের বুকের ভেতর গড়াতে শুরু করে। স্পষ্ট যেন দেখতে পাই টুংটাং শব্দের কোলাজে অনেকগুলো জীবনের চিবুক একসঙ্গে নড়ে ওঠে।

***

দুপুরে আজ আর ভাত রান্না হয়নি বাড়িতে। মা কিছু আঁচ করেছিল কিনা জানি না, দুপুরের জন্য লাল আটার রুটি আর চায়ের যোগাড়যন্ত্র করে অপেক্ষায় ছিল বাবার। মায়ের লুকানো উদ্বেগ বুঝি আমাকেও ছুঁয়ে দেয়। আমার ভেতরেও বাবার এত দেরি হওয়া নিয়ে চিন্তার উঁকিঝুঁকি শুরু হয়। গেল কোথায় বাবাটা! এদিকে বাজার যাওয়ার আগে গোপন ষড়যন্ত্র ফাঁসের ভঙ্গিতে বলে গেছে,

-পুষ্প রেডি থাকিস। আজ সন্ধ্যায় ছাদে প্লেইয়াডস, ওরিয়ন, ক্যাপেলা দর্শন হবে। সাথে থাকবে মুড়িমাখা-গরমাগরম চা আর আমাদের গান।

বাবার সঙ্গে ছাদে কাটানো অনেক মধুর স্মৃতি রয়েছে! ছোটোবেলায় খুব উৎসাহ নিয়ে বাবা আকাশের বুক জুড়ে থাকা তারা নক্ষত্রদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়েছে। আগে কিছুতেই প্লেইয়াডস নামটা মুখে আসতে চাইতো না। ‘কৃত্তিকা’ সেই তুলনায় অনেকটাই সহজ মনে হতো। ওরিয়নের চেয়ে বরাবরই ‘কালপুরুষ’ নামের প্রতি আমার পক্ষপাত। ওকে বড় আপন মনে হয়। প্রথম প্রথম কালপুরুষ চিনতে শেখার পর ওর কোমরবন্ধের তিনটি তারা

Mintaka, Alnilam, Alnitakকে আমার কেন জানি মনে হয়েছিল, ওরা আমাদেরই প্রতীক হয়ে আকাশে ঝুলে রয়েছে। ওদের বাংলা নামগুলোও অদ্ভূত সুন্দর! চিত্রলেখা, অনিরুদ্ধ এবং ঊষা। মা-বাবা আর আমি!

পড়াশোনার চাপে বহুদিন ছাদে গিয়ে তারাদের খোঁজ-খবর নেওয়া হয়নি। ওদের নামধাম কতটা মনে আছে, সেটা যাচাই করার তাগিদ এবং তারচেয়েও বেশি বাবার গান শোনার লোভে তৎক্ষণাৎ সম্মতি জানিয়েছি। কিন্তু দুপুরের পর থেকে হুট করে আকাশের মুখ বেজার হতে হতে এখন ঘনকালো বর্ণ হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মায়ের মুখ ভার হয়েছে। এর মধ্যে কতবার যে মা জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিয়েছে। বাইরের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে। মুখে না বললেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মায়ের উদ্বেগ চাল-তেলের চাইতে বাবার জন্যই বেশি। অথচ আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বানোয়াট রাগ ঝরিয়েছে এই একটু আগেও।

-তোর বাবার কাণ্ডজ্ঞান দেখ! সেই কখন বাজারে গেছে। নির্ঘাৎ পুরনো কোনো ইয়ারদস্তোর দেখা পেয়ে আড্ডায় বসে গেছে। এই লোকটা সারাজীবন আমার হাড়-মাংস জ্বালিয়ে খেলো। আমি বলে বর্তে গেল। সুখ কী জিনিস চোখেও দেখলাম না, তারপরও দেখ কেমন আগলে আছি এই ঘর-সংসার। সাবধান করে দিচ্ছি পুষ্প, জীবনসঙ্গী হিসেবে কক্ষনো বাবার মতো এমন কাউকে বেছে নিবি না যেন।

মা একনাগারে বকে গেলেও আমি ঠোঁট দুটোকে মুহূর্তের জন্যও আলগা হতে দেইনি। বাবা আর মা হলো টম অ্যান্ড জেরি’র মতো। সামনা সামনি যত লড়াই-ঝগড়া। অথচ একে অন্যকে চোখে হারায়। ওঁদের ভালোবাসা বড়ই অন্তরাল প্রিয়। বাবার না ফেরা নিয়ে উদ্বেগ ঢাকতে বুঝি নানান ছুতোয় তাঁর প্রতি ছদ্ম বিরাগ দেখানো। এমন নাটক দেখে দেখেই আমি বড় হয়েছি। মায়ের এই ছদ্ম রাগের আড়ালে যে মমতা-অস্থিরতা লুকিয়ে থাকে, সেটা কখনোই আমার চোখ এড়ায় না।


এঁদের বোঝাপড়া অসাধারণ। পাছে মেয়ের সামনে স্বামীকে বিব্রত হতে হয়, মা সেটা চায় না। খুব সন্তর্পণে বুকের ভেতর কিছু একটা গড়ানোর অনুভূতি হয় বুঝি। আর কতকাল আমাকে তুলোয় মুড়িয়ে রাখবে এঁরা! কীভাবে ওঁরা আমি কিছুই বুঝি না!


বাবা প্রায় সাড়ে তিনটায় অসময়ের বৃষ্টি মাথায় করে বাড়ি ফিরলো। বাইরেটা তখন সন্ধ্যে নামার মতো অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। খানিক আগে হুড়মুড়িয়ে নামা বৃষ্টির ছাঁট থেকে ঘরের বিছানা-বালিশ শুকনো রাখাতে ছোটাছুটি করে মা ঘরের সব জানালা লাগিয়ে এসেছে। আমি বন্ধ করা সত্ত্বেও আমাকে সরিয়ে জানালাগুলো কষে বন্ধ হয়েছে কিনা পরীক্ষা করেছে। আজ বাদে কাল যে ডাক্তার হবে, তার ওপর এমন আস্থাহীনতায় অভিমানের বদলে আমার বেদম হাসি পেয়েছে। দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে নিরস্ত করতেই মায়ের এতসব। অথচ মুখে বলেছে, বৃষ্টি নামবে বুঝতে পেরেও আগেভাগে সে কাজ করতে না পারার জন্য দায়ী ওই একজনই। সকাল থেকে শত অপরাধে সাব্যস্ত অপরাধীটি দৃশ্যপটে যখন দৃশ্যমান হলো, মা তখন দিব্যি নিজের বৃত্তে ফিরে গেল। সেই মাপা কণ্ঠের সীমানা টানা স্বরে অপরাধী বাবার উদ্দেশ্যে বলল,

-বাজার রেখে আগে গোসল সেরে নাও। অসময়ের বৃষ্টিজলে শর্দিকাশিতে ধরবে না হলে।

চুলোতে গরম জলের হাঁড়ি চাপানোই ছিল। বাজারের ব্যাগ রান্না ঘরে নামিয়ে রেখে বাধ্য ছেলের মতো বাবা গিয়ে বাথরুমে ঢোকে। গরম জলে গোসল সেরে পরিপাটি বাবা খেতে বসলো। এতক্ষণ আমরা কেন না খেয়ে বসে আছি, তাই নিয়ে খানিক আফসোস করলো। খুব সম্ভবত দেরির কারণটা মাকে বলবার জন্য বাবা উসখুস করছিল। মা তাতে বাধা দিয়ে চাপাস্বরে বলল,

-চুপচাপ খেয়ে ওঠো।

এঁদের বোঝাপড়া অসাধারণ। পাছে মেয়ের সামনে স্বামীকে বিব্রত হতে হয়, মা সেটা চায় না। খুব সন্তর্পণে বুকের ভেতর কিছু একটা গড়ানোর অনুভূতি হয় বুঝি। আর কতকাল আমাকে তুলোয় মুড়িয়ে রাখবে এঁরা! কীভাবে ওঁরা আমি কিছুই বুঝি না! আমার মন খারাপ টের পেয়ে বাবা হালকা চালে বলে ওঠে,

-কি রে পুষ্প, কেমন পিকনিকের আমেজ হচ্ছে না? রোজ রোজ ভাতের চেয়ে অন্যরকম কিছু মন্দ নয়, বল! কারেন্ট না থাকলে দিব্যি ক্যান্ডেল লাইট লাঞ্চ সেরে ফেলা যেত… হা হা হা..

***

সন্ধ্যা নামার আগেই বৃষ্টি থেমে গেল। বাবা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,

-কতদিন আমরা ছাদে আড্ডা দেই না বেলু!

মায়ের কর্মব্যস্ত হাতটা থমকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মায়ের ডাকনাম বেলি। বাবা আদর করে মাঝেমধ্যে বেলু নামে ডাকে। অসময়ে বাবার আদুরে ডাকে মা কেমন দিশেহারা হয়ে পড়লো। বাবার কথার কোনো জবাব দিলো না মা। ওঁর হাত থেকে খুনতিটা খসে পড়লো। তড়িঘড়ি আরেক দফা লবণ দিয়ে বসলো তরকারিতে। দূরে বসে সবটা দেখলেও আমি কোনো উচ্চবাচ্য করলাম না। কিছু কিছু মুহূর্ত নীরবতা দাবি করে। বাবার ওই এক চিলতে আফসোস মায়ের মনের কোথাও হয়তো সূক্ষ্ম অপরাধবোধ বা বিষাদ তৈরি করেছে, যা মা প্রকাশ করতে পারেনি। ফলে লবণের পরিমাপে ভুল হয়ে যায়।

বহুদিন ধরে মনের ভেতর গচ্ছিত রাখা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আরো একবার নিজেকে সতর্ক করি। এঁদের জন্য আমার অনেক কিছু করা বাকি।

অনেকগুলো নির্ভার বিকেল, তারাভরা আকাশের নিচে অগুনতি সন্ধ্যে কিংবা রাত, সম্পূর্ণভাবে নিজেদের জন্য বেঁচে থাকার আহ্লাদভরা সময়, যতদিন এঁদের হাতে তুলে না দিতে পারছি, ততদিন আমি যেন নিজের একান্ত ইচ্ছেদের দূরে রাখতে সক্ষম হই।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর চোখ ভেঙে ঘুম নামে আমার। বাবার যদিও ইচ্ছে ছিল গল্পগুজবের। মা একরকম ঠেলেই বিছানায় পাঠায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘুম আমায় টেনে নেয় অতলে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না, মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ, বেজাই তেষ্টা পেয়েছে। অন্যদিন জলের বোতল ভরে মাথার কাছের টেবিলে রাখি। রাতে রাখতে ভুলে গেছি। উঠে রান্না ঘরে গিয়ে দু গ্লাস জলে তৃষ্ণা মেটাই। নিজের ঘরে ফেরার মুখে মা-বাবার ঘরের দরজা খোলা দেখে থমকে দাঁড়াই। কৌতুহলে উঁকি দিয়ে দেখি বিছানা খালি। মা-বাবা কেউ ঘরে নেই। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে, কী মনে হতে পা টিপে টিপে ছাদের সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়াই।

রাতের আকাশ দেখে কে বলবে সন্ধ্যায় হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নেমেছিল!  রাত বাড়তেই মেঘের ভার ধীরে ধীরে সরে গেছে দূরে। ভেজা বাতাসে শীতের আগমনী ঠান্ডা স্পর্শ। আকাশের কালো পর্দা ভেদ করে একে একে ফুটে উঠেছে কালপুরুষের তিন তারা চিত্রলেখা, অনিরুদ্ধ আর ঊষা। বৃষ্টির পরে আকাশে তারাগুলো যেন অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। উঁকি দিয়ে দেখলাম, চিলেকোঠার দেয়াল ঘেঁষে দুজন পাশাপাশি বসে আছে।

মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল, হাতে যে টাকা পয়সা নেই, সে কথা গত রাতেই তো আমাকে বলতে পারতে। যা হোক একটা কিছু করে আজকের দিনটা ঠিকই চালিয়ে নিতাম। টাকা ধার করতে তোমাকে অতদূরে ছুটতে হতো না। কতটা দুশ্চিন্তা হয়েছিল তুমি বোঝো? তোমার নিজেরও তো কম ভোগান্তি গেল না! নিজের ভালোটা আর কবে বুঝবে তুমি!

দিন আর রাতের ফারাক যতটা, অন্য সময়ের আর এই মুহূর্তে মায়ের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়া শব্দ-বাক্যের কোমলতাতেও বুঝি ততটাই ফারাক। মমতার মম গলে গলে পড়ছে শব্দ চুইয়ে। আমি দম আটকে দুজন মানুষের মান-অভিমান পর্ব দেখছি আর ভাবছি, এই বুঝি বাবা কোনো কবিতার লাইন আওড়াবে। মায়ের কথাগুলো বাবাকে যে একটুও দমাতে পারবে না সেটি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু বাবা ধার করা কবিতা কিংবা গানে মাকে সন্তুষ্ট করতে চাইল না বুঝি। আকাশ ভরা তারাদের উজ্জ্বল আলোর নিচে স্পষ্ট দেখতে পেলাম বাবা মায়ের হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিতে নিতে মায়ের আরো কাছাকাছি সরে এলো। সন্তান হিসেবে বাবা-মায়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত থেকে নিজে সরিয়ে নেবার তাগিদ এড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখলাম—বাবা পরম মমতায় মায়ের ঠোঁটে জ্যোৎস্না এঁকে দিলো।

মাথার ওপর চিত্রলেখা-অনিরুদ্ধ জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে রয়েছে। আর আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ঊষা!

ঋণস্বীকার: সরলরৈখিক/জয়াশিস ঘোষ 

[বানানবিধি লেখকের নিজস্ব]

নাহার তৃণা / গল্পের সময়

 

 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।