10 Oct

কিসসাওয়ালি ও একটি গোপন কিসসা

লিখেছেন:তন্বী মুখোপাধ্যায়


কিসসাওয়ালি ও একটি গোপন কিসসা / তন্বী মুখোপাধ্যায়

গত পাঁচ বছর যেদিন ডাক পড়েছে সেদিন সে গল্প শুনিয়েছে, তার আসল শ্রোতা চলতে না পারা ছেলেটি।কোনও কোনও দিন ওর ভাইবোন কি দুষ্টু বন্ধু-সখা এসে লক্ষ্মী হয়ে বসে, তখন কিসসাউলি যত তার মনে শোনা-জানা গল্প ছিল, লতায় পাতায় বুনতে থাকে। আজ কিন্তু শুধু এই ছেলেটির তলবেই তার গল্প বলতে আসা। আজ প্রথমেই শ্রোতাটি বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘নীতিকথা আমি শুনব না, ধর্মের, পুরাণের কথাও অনেক শুনেছি। আজ শুনব কোনও একটা বদলে যাওয়ার কথা। একই থাকতে থাকতে আমিও আর পারছি না, আমিও যদি বদলে যেতে পারতাম। গুটিপোকা যেমন প্রজাপতি হয়ে যায়।”

কিসসাউলি একটু বিপদে পড়ে গেলেন, তবু হাসিমুখেই বললেন, ‘রোজ রোজ এক গল্প থাকবেই না বাছা, তারা যে আগেই ঠিক করে আমার খাতা থেকে সরে গেছে দূরে। আজ বরং খাতা থাক।‘

শ্রোতার বয়স বারো-তেরো তাই তাকে নেহাত ছোট ভাবা ঠিক হবে না। ততক্ষণে শ্রোতা বলে উঠেছে, ‘কিংবা তোমার কি এমন কারুর সঙ্গে এমন কোনওদিন দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল যে দিন সেই অদ্ভুত লোকটার জন্যই তোমার কাজকর্ম ধ্যানধারণা আমূল বদলে গিয়েছিল? তাহ’লে তার গল্প শুনব।’


আবার কিসসাউলি শ্রোতার মুখের পানে চেয়ে কোথায় যেন ডুব দেয়। খুব আস্তে আস্তে বলে,‘কী যে বাঁশুরির সমান তুমার গলাটি। একদিন শুনিয়েছিলে গান। রাবি ঠাকুরের গান। দুনিয়াটা হয়ে গেল মিছা, বেবাক সুর আর গলাখানা ছিল সাচ্চা।’


-‘তাই ভাবছি গো, তোমার আমার দুজনের মনের মতো গল্প এমনকরে কার গল্পে মাখামাখি হয়ে আছে, তাকেই খুঁজছি। দেখি তোমার কেমন লাগে!’

গল্প শুরু করি। আমায় আবার ফিরতে হবে অনেকটা। আজ বাদলার ধারা সহজে থামবে না। ঝাপটা আসছে মাঝে মাঝে, ঝাপসা-ঝাপসা- খানিকটা দূর অবধি,তারপর আর কিছু দেখা যায় না।

লোকে বলত, ‘চমৎকার ছেলেটি, হবে না বাবা-মা কেমনধারা ভাল মানুষ।’

শ্রোতা কোমর পর্যন্ত চাদরটা টেনে নিয়ে বালিশের স্তূপে ঠেস দিয়ে বসল।

কিসসাওয়ালি বলতে থাকল- যদিও ছেলেটার বারবার মনে হয়েছে সে যেন বড্ড বেশি মাঝারি, তার পরিবার সেও খুবই মাঝারি। তার নাম অনন্য হওয়ার কারণ সে খুঁজেছে, মনে হয় সে অনন্য হবে ভেবে তার ঘাড়ে এরকম একটা নাম চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদতে সে এরকম কোনও প্রতিভার আশীর্বাদপূত নয়।

সে বেঁটে, গায়ের রঙ ময়লা,মন খুলে কোনদিন হাসে নি,ডাকাবুকো নয়, ভীতু বলে কোনও ঝামেলায় থাকে না। লেখাপড়ায় কোনওদিন বেশ ভালো কিছু করেছে তা তার মনে পড়ে না।

তার মা বলেন, একচান্সে সব পরীক্ষা সে পাশ করেছে। বাবা বলেন, ভারি বাধ্য, কক্ষণও মুখে মুখে তক্ক করে না।মাস্টারমশাইরা বলেন,কী পাংচুয়াল, ১০০পারসেন্ট অ্যাটেন্ডেন্স।প্রতিবেশিরা বলেন, ভারি ভদ্র সভ্য ছেলে।

হঠাৎ, কিসসাউলি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন বুঝি।  বলতে থাকেন- “ সে কী রূপ ! কী গায়ের চিকন রং! কিষাণভগবানের মতো কোমল মিষ্টি আঁখি, সে আঁখ কথা বলে—’

শ্রোতা চমকে ওঠে, ‘কী বলছ গো?’ বলে ওঠে বেশ জোরে সচকিতভাবে।

কিসসাউলি বলে, কই বাবু? তারপরে আবার বলতে থাকে,‘এসব কিছু কিছু সুখ্যাতি তার কানে আসে। তবু সে বুঁদ হয়ে থাকে তার বন্ধুদের গুণপণায়। তার তুতোভাইদের সে দেখে অবাক চোখে । তার বন্ধুরা একজনের কথা বলে, তার মতো ভাল নাকি কেউ বাসতে পারবে না। আশ্চর্য ফিলিং, বন্ধুর বন্ধু । মেয়েটি যেমন হয় আর কি বিরাট বড়লোকের একমাত্র মেয়ে, নেহাত ছা-পোষা পরিবারের ছেলে তাকে ভালবাসল।পাশের বাড়ি থেকে উসখুস, মেয়েটিরও ছিল। তারপর বিয়ে হয়ে মেয়েটি চলে গেছে বিলেতে, এখনও ছেলেটি তারই ছবি আঁকে, মূর্তি যে ধ্যান করে বলাই বাহুল্য। এমন ভালবাসবার ক্ষমতা সবাইকার থাকে না।এ শুধু প্রেম নয়, এযেন স্বর্গের কোনও বস্তু।

‘নেহাত খেটে খাওয়া স্বামী-পরিত্যক্ত মায়ের ছেলে তার এক বন্ধুর দাদার বন্ধু, কোনদিন ফার্স্ট ছাড়া সেকেণ্ড হয় নি – ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ল, তারপর ইউ পি এস সি ক্র্যাক করল, টপার, একেবারে আই এ এস হয়ে বসল।

অনন্যর খুড়তুতো বোন অরণ্যা তো করলে বাজিমাত! বাংলা সিরিয়ালে সে এখন নামকরা নায়িকা,কখনও সে বসে থাকতে পায় না।দেশের এক নম্বর নায়কের সঙ্গে একটা বিগ বাজেটের মুভিতে নাকি তাকে অল্পদিনের মধ্যে দেখা যাবে।’

আবার কিসসাউলি শ্রোতার মুখের পানে চেয়ে কোথায় যেন ডুব দেয়। খুব আস্তে আস্তে বলে,‘কী যে বাঁশুরির সমান তুমার গলাটি। একদিন শুনিয়েছিলে গান। রাবি ঠাকুরের গান। দুনিয়াটা হয়ে গেল মিছা, বেবাক সুর আর গলাখানা ছিল সাচ্চা।’

কী বলছ গো বিড়বিড় করে, শুনতে পেয়েও শ্রোতা জিগ্যেস করে। আবোল তাবোল কথাগুলো তার ভাল লাগে। তবু সে বলতে ছাড়ে না, ‘আসল গল্পটা হয়তো তুমি ভুলেই যাচ্ছ।‘

খেই ধরিয়ে দিতে গিয়ে তার মনে হয়, গল্প বলে কিছু এখনও তৈরি হয় নি। নাড়ুর পাকের পরে গোল্লা পাকানো হবে।তার দেরি আছে। সে কেমন উদাস হয়ে পড়ে। শুনেই বা কী হবে একঘেয়ে সব জীবন।

‘তারপর অনন্য নামের ছেলেটি আরও বড়ো হয়ে গেছে। চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে, এখনও পায় নি। তার সঙ্গী-সাথী ক্লাসমেটদের মধ্যে মেয়েরা চাকরি করছে অনেকে, বিয়েও হয়ে গেছে কারও বা।কেঊ কেঊ ব্যবসা করছে, কেউ এল আই সি-র এজেন্ট হয়েছে।পুলিশে গেছে অমরীশ, আই টি-তে গেছে কৌস্তভ, প্রলয়, আর মৈনাক একমাত্র রেলের লোভনীয় চাকরি ম্যানেজ করেছে, চিন্টু আগেই ডিফেন্সে চলে গেছে। আর তার অনন্য নাম সার করে অন্যের প্রজেক্ট করে দিতে হচ্ছে। কখনও থার্মোকল কেটে কিংবা আরও রকমে-সকমে দুটো- চারটে পয়সার জন্য খোকা-খুকুদের স্কুলের ওয়ার্ক এডুকেশনের কাজ করে দিয়ে চলছে।যদিও কারুর বেনামে কাজ করতে মন তার রীতিমতো আপত্তি করে।খুব বেশি হলে গড়ে দিনে তার রোজগার শ-দেড়েক।এখনও বাবা হাত-খরচা দেন। গত মাসে না বলতেই একটা গ্যালাক্সির ট্যাব প্রেজেন্ট করেছেন।এখনও তিনি গর্ব করেন, অন্য নেশা-ভাঙ তো প্রশ্নের বাইরে-তাঁর ছেলে একটি সিগারেট অবধি খেলো না।মজা করে বলেন, বাবুর কি ইয়ে গোঁফ-দাড়ি হয়েছে?’


নবা ওকে ধরেছিল্। পুলিস নবাকে তখনও ধরেনি। ওকে শাসিয়েছিল খুন করবে বলে। ওর ক্লাসমেট নবা।একটা বড় ছোরা নিয়ে পরদিন সকালবেলা একলা ও চলে গিয়েছিল নবার বাড়ি।নবা লুঙ্গির কষি বাঁধছিল। নবার ফোনটা তখনও টেবিলে ছিল। তুলে নিয়ে সোজা এস পির কোয়ার্টারে।


ছেলেটা কেমন যেন! তার কষ্ট হয়, অথচ রাগ হয় না, ভয় হয় কিন্তু কখনও জেদ করে না, খুবই ক্ষুব্ধ হয়,তবে মানুষকে একধারে সন্দেহ করতে পারে না।আস্তে আস্তে ঘরকুনো হয়ে পড়ছে, মৃদু হাসিটাও মুছে গেছে ঠোঁট থেকে।

কটাক্ষে শ্রোতাকে দেখলেন বক্তা।একটা কালো ছায়া বাইরের মেঘের মতো ওর গোটা বসার ভঙ্গিতে।অবসাদ থমথম করছে সারা ঘরে, জাজিমে,পালঙ্কে, হারমোনিয়ামে।

বললেন, ‘কত্ত কিতাব পড়ে বাবু, সোনা মনা।’

আওয়াজ নেই কোথাও, গল্পে ফিরে আসেন তিনি। “ও খুব ভালো শ্রোতা, এর অবসরে অনেকে আসে মনের দুঃখের গল্প করে। বাবা-মাও ওকে উপলক্ষ করেই বঞ্চনার গল্প করেন, ও যে খুব ভালো শ্রোতা। সকলের মনের ভার বলতে পারলে কমে কিছুটা।’’

কিসসাওয়ালি আবার বলতে থাকে, “এই তুমরা কি দয়া করেই না আমাকে কাম দিয়েছ। আমি জানি না বুঝি ভেবেছ, যেই সোমসারে পইসার কমী মেহসুস হয়েছে, তমার পিতাজি রাজাবাবু ডাক পাঠান-কিসসাবালি এসো একটুকুন, যাবার বেলা তমরার মাতাজি আমরার আঞ্চল ভরিয়ে দেন।বুজদিল তো নেই বাবু।”

এবার আকাশের কালিমা কেটে যায় বুঝি একনিমেষে। অল্পমাত্র মেঘ ভেসে যায়।

‘যাহোক গল্পটা তো বলো’ শ্রোতার নরম গলা শোনা যায়।

“জি হ্যাঁ তাই।জীবিকা তো একটা চাই। একবার ভাবে ছোটখাটো ব্যবসা করলে হয়,তারপর দেখে কোনও দোকানের তো অভাব নেই।তাহলে কেন কেউ তার জিনিস কিনবে?

নবার মতো রাজনীতি করলে হয় না? নবা ক’দিনে কাউন্সিলার হয়ে গেলো। এবার নাকি এম.এল.এ.ও ওকেই করবে।

সে-হেন নবার সঙ্গেই একদিন ওরই পিসতুতো বোন বিজলি ঘর ছাড়ল। আজ দশদিন নবা ফিরেছে, বিজলি ফেরেনি। ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটা, মা-হারা- মামার বাড়িতেই পড়ে থাকে সর্বক্ষণ।

অনন্য মুহূর্তমাত্র থামেনি। যেখানে যত ওর চ্যানেল ফোনের পর ফোন করেছে। নবার বাড়ির সামনে দিয়ে গিয়ে পুলিসে এফ আই আর করেছে। নবার মতো হবে ভেবেছিল বলে লজ্জায় মরমে মরে যাচ্ছিল সে।

নবা ওকে ধরেছিল্। পুলিস নবাকে তখনও ধরেনি। ওকে শাসিয়েছিল খুন করবে বলে। ওর ক্লাসমেট নবা।একটা বড় ছোরা নিয়ে পরদিন সকালবেলা একলা ও চলে গিয়েছিল নবার বাড়ি।নবা লুঙ্গির কষি বাঁধছিল। নবার ফোনটা তখনও টেবিলে ছিল। তুলে নিয়ে সোজা এস পির কোয়ার্টারে।

তারপর? টানটান হয়ে শ্রোতা বসতে চেষ্টা করে। আলোর ফুলকি তখন আগুন। নবাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অনন্যকে ঘিরে ফেলল প্রেস আর কৌতূহলী জনতা। বিজলিকে ওর আর এক কুকর্মের সঙ্গীর হাতে তুলে দিয়েছিল। এখনও কেউ জানে না ওই লোকটি এখন কোথায়। হয়তো বিজলি আর কখনও আসবে না তার মামার বাড়িতে।

কিসসাওয়ালির চোখে জল।

‘এর একসুতোও গল্প নয়। বিসবাস কোরো বাবু। মনে করো বাবু, তুমি একদিন রাজাবাবুর বন্দুক হাতে নিয়ে চালানো শিখবে বলেছিলে, কেন মনে পড়ে? ছবি দেখেছিলে ঝিলের জলে সাঁতার দেওয়া রাজহাঁস একের পর এক শিকার করেছিলো কোট-টাই-পরা অমানুষ আদমিটা, সেটাকে নিকেশ করবে ব’লে।…’

এই পর্যন্ত বলে অনন্যর অনিন্দ্যসুন্দর মুখখানা মেঘভাঙা আলোয় দেখছিল কিসসাবালি অপলকে।

[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

কিসসাওয়ালি ও একটি গোপন কিসসা/ তন্বী মুখোপাধ্যায় / গল্পের সময়

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।