
আমি জানি না ইদানিং আমি কানে খাটো কিনা৷ কথাটা মা-ই ক’দিন আগে আমাকে শুনিয়েছিল৷ মায়ের কথা শোনার পর আমি বোকার মতো ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে ঝুঁকে পড়ে কান টেনে ধরে নানাভাবে দেখলাম আমার কান কতটা খাটো৷ মনে মনে হেসেও ফেললাম৷ তবে মায়ের কথায় রাগ হল৷ কিন্তু কিছু বললাম না৷ মনে মনে ফুঁসলাম৷ এরপর একদিন আমার মেয়ে দূর্বাও কি এক কথায় যেন বলল, ওঃ বাপি, তুমি দেখছি ইদানিং কানে কম শুনছ৷ দূর্বার কথায় আমি কখনো কোনোদিন রাগ করি না৷ আমার ধারণা আমার মা, আমার বউ আমাকে উলটো পালটা বললেও দূর্বা কখনও বলবে না৷ দূর্বার কথায় আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম৷ তখন মনে হল, মেয়েটা মনে হয় ওর মা-আম্মার কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়েছে৷ কারণ মায়ের ‘কানে খাটো’ বা দুর্বার ‘ইদানিং কানে কম শুনছ’—এসব কথা কিন্তু আমার কানে বেজেছে৷ তাই দূর্বার ওপর একটু অভিমান হল৷
বাড়িতে ক’দিন ধরে আমি আমার এই কান-পর্বের জন্য গম্ভীর হয়ে গেলাম৷ ব্যাপারটা আর কারুর নজরে পড়েছে কি পড়েনি জানি না৷ দূর্বার ঠিক খেয়াল হয়েছে৷ ও বলল, বাপি, তোমার কী হয়েছে? আজকাল কেমন যেন গুম মেরে থাকো৷ আমি কোনো উত্তর দিলাম না৷ দূর্বা আবার বলল, তুমি কি আমার কথা শুনতে পেলে না বাপি? আমি কোনো উত্তর দিইনি৷ এবার দূর্বা আমার কানের কাছে মুখ এনে গলা চড়িয়ে একই কথা বলল৷ এবারও আমার মুখে রা নেই৷ দূর্বা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, মা, আম্মা তোমরা শুনছ? বাপি বদ্ধ কালা হয়ে গেছে৷ দূর্বার চিৎকারে মা ও বউ প্রায় দৌড়ে এল৷ দূর্বা তার মা-কে বলল, মা, তুমি এক্ষুনি ছোটোমামাকে ফোন করো৷ ই. এন. টি’র ভালো ডাক্তার কে আছে! আর একদম দেরি নয়৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন দেখাতে পারি৷ আমার মা দূর্বাকে শান্ত করল, দিদিভাই, এ্যাত উতলা হচ্ছিস কেন! এখন এসব কোনো ব্যাপারই না৷ দরকার হলে কানে মেশিন বসিয়ে দেবে৷ এতক্ষণ পরে আমার বউ, মানে সর্বাণী মুখ খুলল৷ বলল, আমি আর কী বলব? সেদিন ও বাজার ব্যাগ নিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল৷ আমি পেছন থেকে চিৎকার করে বললাম, শুনছ, একটু জিরে আর মুড়ি এনো৷ উনি নিয়ে এলেন চিড়ে আর বড়ি৷ আমার মা যোগ করল, আরে আর বলো কেন, আমি গত হপ্তায় ওকে চুন আনতে বলেছিলাম, ও নুন এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল৷ তোমার মনে আছে বউমা, একদিন ওকে তাল আনতে বলতে ও ডাল এনে দিয়েছিল! সব কথা তোমাদের আমি আর বলিনি৷ হাজার হোক নিজের পেটের ছেলে তো! তবে দিদিভাই, এই যে বউমা—এখন এসব নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না৷ এখন আর কেউ কালা নেই৷
যদি আমি কানে কম শুনতাম, তাহলে মা-বউ-মেয়ে—এদের কথাগুলো হুবহু শুনছি কী করে? বাড়িতে আমি কালা সেজে বোবাও হতে শুরু করলাম৷ একদিকে যেমন দুঃখ হচ্ছিল, আবার তেমনি মজাও পাচ্ছিলাম৷ আমার মধ্যে একটা জিদ চেপে গেল৷ মনকে সান্ত্বনা দিলাম, দুটো কান আছে, দুটো চোখ আছে, কিন্তু মুখ মাত্র একটা৷ শুনবো আর দেখব বেশি, মুখে বলব কম৷ তাতে কালা ভাবে ভাবুক৷ ‘আমি কানে ভালো শুনি না’ ব্যাপারটা বাড়িতে ইতিমধ্যে স্বতঃসিদ্ধ৷ এবার অফিস৷ একদিন আমার অফিসার ডেকে বলল, আপনি ক’দিন ধরে কেমন যেন অন্যমনস্ক আছেন৷ আমি চুপ৷ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে অফিসার বলল, আচ্ছা বিনয়বাবু, আপনি কি ইদানিং কানে কম শোনেন? দুম করে মাথাটা ঘুরে গেল৷ কিন্তু কিছু বললাম না৷ বরং ভাজা মাছ উলটে খেতে না-জানার ভান করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম৷ অফিসার রেগে বলল, আপনি ডাক্তার দেখান৷ একটা চিরকুটে লিখে দিল, ‘রিটার্ন’ এর ফাইলটা সাবমিট করতে৷
অফিস ছুটির পর আমার কলিগ দীপক আর আমি পাশাপাশি হেঁটে শিয়ালদা স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম৷ দু’জনেই নানা কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলাম৷ হঠাৎ এক সময় দীপক বলে উঠল, অ্যাই বিনয়, তুই আচ্ছা নাটক শুরু করেছিস মাইরি! ভালোই হল৷ কানে শুনি না বলে লোকে সহানুভূতির চোখে দেখবে৷ দায়িত্ব হালকা হয়ে যাবে৷ আমি কোনো কথা না বলে দীপকের দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিলাম৷ দীপকের কী একটা কাজ আছে বলে কিছুটা হেঁটে ও বাস ধরতে চলে গেল৷ আমি একা হাঁটতে থাকি৷ মেট্রো চ্যানেলে মিটিং হচ্ছে৷ রাস্তা জ্যাম৷ আমি দেখলাম এক নেতা বত্তৃণতা দিচ্ছে আর পাবলিক যে যার মতো নিজেদের মধ্যে কথা বলে যাচ্ছে৷ নেতার কথা কানেই ঢোকাচ্ছে না৷ অথচ এরা ভিড় বাড়াতে এসেছে৷ মিটিং-এর কিছু কথা আমার কানে ভেসে এল৷ ওই নেতা বলছে, সরকার এখন কালা, কানে শোনে না, এ্যাত মানুষের প্রতিবাদ ওদের কানে ঢুকছে না৷ আমরাও জানি কী করে কানে কথা ঢোকাতে হয়৷ অজান্তে আমার হাসি পেল৷ ভাবলাম, বলে কী! কানে কথা ঢোকাবে?
ট্রেনে উঠলাম৷ বেশিরভাগ লোকের হাতে মোবাইল, কানে হেডফোন৷ কেউ কারুর কথা শুনছে না৷ কোনো মন্তব্যও করছে না৷ যাদের কানে হেডফোন গোঁজা তারা অন্ধ৷ যারা ফোনে গেম, হোয়াট অ্যাপ বা ফেসবুক করছে তারা চোখে দেখলেও কানে কিছু শুনছে না৷ পরের স্টেশনে নামবে বলে একজন সামনের যুবককে বলল, ভাই একটু সরে দাঁড়াবেন? আমি পরের স্টেশনে নামব৷ ছেলেটির কানে হেডফোন গোঁজা৷ সে কোনো উত্তর দিল না৷ লোকটি আবার তাকে সরে দাঁড়াতে বলল৷ এবারেও ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না৷ বাধ্য হয়ে লোকটি ছেলেটির কাঁধে আলতো ঠ্যালা দিয়ে তাকে সরে দাঁড়াতে বলতেই খ্যাঁক করে উঠল, মুখে বলতে পারেন না৷ গায়ে হাত দিচ্ছেন! লোকটি কোনো কথা না বলে ওকে পাশ কাটিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল৷ যেতে যেতে বলে গেল, কানে সবসময় গুঁজে রাখলে দেখবি একদিন কালা হয়ে যাবি৷ ছেলেটি নিরুত্তর৷ ছেলেটির উদাসীন ভাব দেখে মাঝবয়সী এক যাত্রী তার বাপ-মা তুলে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিল৷ ছেলেটি তখন তার দিকে চেয়ে হাসছিল, আর মাথা ঝাঁকিয়ে তাল ঠুকছিল৷ ট্রেন থেকে নেমে আমি হাঁটছি, ছেলেটির মুখটা বারবার ভেসে উঠছে৷ ভাবছি, ছেলেটি যদি ওই অশ্রাব্য শব্দগুলো শুনতে পেত৷ তাহলে কী কাণ্ডটাই না ঘটতে পারত৷ এই যে ছেলেটির কান থাকা সত্ত্বেও শুনল না, তাতে ওর ভালোই হল৷ আমি মনে মনে ঠিক করে নিলাম, আমিও পারতপক্ষে কিছু শুনব না৷ দেখি, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়৷ কানটা খাটো হতে হতে না হয় কানকাটাই হয়ে যাবো৷ দেখাই যাক৷
বাড়িতে আমি ঘোষিত কালা৷ সর্বাণী যে কারণেই হোক অনেক কথা বলতে পারত না৷ এখন আমার ‘কানে খাটো’র জন্য দেদার ক্যাসেট চালিয়ে দেয়৷ এর মধ্যে বেশির ভাগই তার ক্ষোভ৷ আমাকে বিয়ে করে জীবনে সে কিছু পেল না৷ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য রান্না ঘরে বাসন ধুতে ধুতে সর্বাণী উচ্চারণ করে বসল৷ সর্বাণী বলল, শালা শেষপর্যন্ত একটা কালার সাথে আমাকে জীবন কাটাতে হবে! অথচ শোভনদাকে বাবা কিছুতেই মেনে নিল না৷ শোভনদার পায়ের যোগ্য নয় আমার এই কালা৷ সর্বাণীর এই কথা শুনে আমার রাগ হল অন্য জায়গায়৷ শোভন বলে কার সাথে কী বা কতটা মাখো মাখো সম্পর্ক ছিল তাতে বিন্দুমাত্র আমার দুঃখ হয়নি৷ দুঃখ হয়েছে এখন দূর্বার বয়স তেইশ৷ সামনের বছর এম এস সি কমপ্লিট করবে৷ ছাবিবশ বছর বিয়ের পরও সর্বাণীর মধ্যে এই ক্ষোভ থেকে গেছে! আমি কানে কম না শুনলে কি আর এসব তথ্য জানতে পারতাম! মনটা এতটাই বিগড়ে গেল যে আর অফিস যেতেই ইচ্ছে করল না৷ সটান বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরালাম৷
দূর্বা বাড়িতে ছিল না৷ মা ছিল ঠাকুরঘরে৷ ভাগ্যিস দূর্বা বা মা সর্বাণীর এইসব কথা শোনেনি৷ পুজো সেরে মা আমার মাথায় ফুল ঠেকিয়ে হাতে বাতাসা দেয়, তারপর আমি স্নানে যাই৷ মা আমাকে ঘরে না পেয়ে ডাকল৷ আমি বারান্দা থেকে উঠে এলাম৷ মা বলল, সেকি! তুই শুনতে পেয়েছিস! আমি বললাম, মা আমি কানে খাটো না৷ আমি সব শুনি৷ অন্যমনস্ক থাকলে কানে কথা ঢুকলেও মগজে ঢোকে না মা৷ তোমাদের কোনো কোনো কথা অন্যমনস্কতার জন্য আমি শুনতে পাইনি৷ মায়ের চোখের কোণ থেকে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল৷ মা বার বার আমার মাথায় ফুল ঠেকাল, বুকে ফুল ঠেকাল৷ রেকাবিটা কপালে ঠেকাল৷ আমার চোখ পড়ল চৌকাঠে৷ ওখানে সর্বাণী আঁচলে জলহাত মুছতে মুছতে বলল, আমি রান্নাঘরে একটু আগে যে কথাগুলো বলছিলাম…৷ আমি বললাম, হ্যাঁ শুনেছি৷ তবে যতটা কানে তার চেয়েও মন দিয়ে শুনেছি৷ তখনি কলিংবেল বাজল৷ এতদিনের কানে কালা আমিই এগিয়ে গেলাম দরজা খুলতে৷ দূর্বা টিউশানি পড়ে ফিরেছে হয়তো৷
[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

Tags: কালা, গল্প, গল্পের সময়, প্রগতি মাইতি
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।