
রাত একটা। হাওয়া-বাতাস থেকে একটু দূরে, নিভৃত, নির্দিষ্ট, কোনো এক আলোর নিচে- প্রলম্বিত, স্থির, অথচ কম্পমান, অনাথ এবং ভাঙাচোরা একটা ছায়া নৈঃশব্দ্য সরাতে সরাতে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল গঙ্গার পাড় ধরে ধরে। গঙ্গায় তখন জোয়ার এসেছে। তার ঘোলাটে জলের এই ছলাৎ ছলাৎ শব্দগুলির প্রত্যেকেই যে যেরকম পারছে, ওই ছায়াটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে, ছায়াটির বান্ধুময়তা বাড়ছে ক্রমশ। আর, যত বাত্ময়তা বাড়ছে ছায়াটির, ততই নৈঃশব্দ্যেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তবু ভরসা, আজ চাঁদ উঠবে না। ঘোর অমাবশ্য। অন্ধকার বাড়লে নৈঃশব্দ্যেরা শক্তিশালী হয়, একথা কে না জানে! তবু নৈঃশব্দ্যেরা ভয় পায় কেন? আসলে, গঙ্গার ঘাটে, পাড় থেকে একটু ওপরে, এই তো ক-দিন আগে একটা লাইটপোস্ট পোঁতা হয়েছে, যা আগে ছিল না। ফলে, এখানকার পুরোনো নৈঃশব্দ্যেরা, পুরোনো অন্ধকারেররা, তাকে মেনে নিতে পারছে না। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। হাওয়া-বাতাসদের এগুলি গা-সওয়া হয়ে গেছে। তারা আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না!
অথচ, যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসতে পারত, সেই প্রশ্নটির কোনো অবতারণাই ঠিকমতো হল না! যে, ছায়াটি কার? যদিও, এই প্রশ্ন চিহ্নটি তৈরি করার মতো হাওয়া-বাতাস ছেড়ে দিলাম, কোনো মনুষ্যজীবও ওই অন্ধকারে, আশেপাশে, বা ওই আলো-আঁধারিতে, তখন ছিল না। তবে এটা ঠিক, ছায়া কোনো স্বতন্ত্র বা মৌলিক অস্তিত্ব নয়! একটি বস্তু, প্রাণযুক্ত বা নিষ্প্রাণ, চলমান বা স্থির, যাইই হোক না কেন, তাতে আলো পড়লে বাই ডিফল্ট সেই বস্তুর আকৃতির অনুষঙ্গে একটি ছায়া তৈরি হয়।
আর, আলোর উৎসটি বস্তুর সঙ্গে যত দৃষ্টিকোণ ছোটো করবে, তত ছায়ার অহংকার বাড়বে। সে নিজেকে বড় করতে থাকবে। এমন কি কোনো কোনো সময় তার মালিকের চেয়েও সে নিজেকে অনেক অনেক অনেকটাই বড় করে ফেলে। আবার উল্টোটাও ঘটে। আলোর অবস্থান অনুযায়ী নিজেকে সে ছোটো করতে বাধ্য হয়। আসলে আলোর প্রেক্ষিতে বস্তুটির অবস্থান কোথায়, তার ওপরই নির্ভর করে ছায়ার ভবিষ্যৎ, বা আকৃতি!
যেমন এই মুহূর্তে। ছায়াটি এখন দুলতে দুলতে, সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে, এক সময় গঙ্গার জলে বিলীয়মান হবে, এবং খানিক বাদে ভুস্ শব্দে জেগেও উঠবে। আর, জটিল আলোছায়া ভেদ করে মালিকের শরীরের জল গায়ে মাখামাখি করে, জলতরঙ্গে, আশপাশের যত অন্ধকার, যত নৈঃশব্দ্য, ভাঙতে ভাঙতে, পুনরায় দুলতে দুলতে, ওপরে উঠে আসবে।
ওপরে, অর্থাৎ সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে উঠতে সিঁড়ির একেবারে প্রথম ধাপে এবং একটা লাইটপোস্টের আলোর ঠিক নীচে। ফলে, সেই ছায়া সাময়িক, প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে মালিকের ঠিক পায়ের তলায় একেবারে ছোটো হয়ে গুটিয়ে শুয়ে থাকবে।
আর এই ছায়ার মালিক- নিমাই সাধু, যে কিনা তার ওই জীবন্ত ছায়াটিকে সঙ্গে নিয়ে একটু আগে গঙ্গার জলে ডুব দিয়েছিল। স্নান করতে নয়, সে এক বিশেষ কারণে! কারণটা হল এই, যে, গঙ্গার তলায় তারই এক সময় পুঁতে রাখা পোড়ামাটির তৈরি অজস্র শ্মশান-কলসির মধ্যে অন্যতম একটা সে এইমাত্র তুলে আনল। এরপর সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে সেই কলসির সরার ঢাকনাটা খুলবে। তারপর সেই কলসির ভেতরে থাকা গ্যাঁজানো অন্ধকার, টলটলে, অতি গাঢ় সবুজ, বিষ-তরলটির দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে জিভ বার করে ঠোঁটের চারপাশ সজল বুলিয়ে নেবে। তারপর আর একটা ফাঁকা কলসির মুখে তিনভাঁজ নামাবলি রেখে সেই তরলটি আগের কলসি থেকে ঢালবে।
আর, নামাবলি ভেদ করে নতুন কলসিতে কুলকুল শব্দে নামতে থাকবে সেই মহার্ঘ তরল! আর, নামাবলির ওপরে পড়ে থাকবে বিজাতীয়, অশনাক্ত, কঠিন এবং প্রবল ঝাঁঝ ও দুর্গন্ধযুক্ত কিছু অপরিকল্পিত বর্জ্য।
ছায়াটি এ সময় একেবারে অনাথ হয়ে যায়! এ সময় সে খুব ভয় পায়।
নিমাই-এর দুটি পা স্পর্শ করে প্রায় দেখা যায় কি যায় না, কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকে! নিমাই ততক্ষণে বসে পড়েছে! ভাঁজ করা দুই হাঁটুর মাঝখানে সেই
কাঙ্ক্ষিত কলসি। এবার সে চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তার মনোযোগগুলিকে ডেকে এনে ওই কলসির ভেতরে স্থাপন করবে। ছায়াটির আরও ভয় করবে। ঠিক মাথার ওপরের আলোটা যেহেতু সূর্য নয়, তাই একই অবস্থানে থেকে যাবে সারাটা রাত! আর, ছায়াটিও, প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে, মালিকের ঠিক পায়ের তলায়, যতটা পারে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে, ভয়ে ম্রিয়মান হয়ে, একেবারে ছোট্ট হয়ে, শুয়ে থাকবে সারারাত।
ঢং ঢং করে এবার বেজে উঠবে দূরবর্তী কোনো এক গির্জার ঘন্টা। অর্থাৎ রাত দুটো বাজল! এবার নিমাই ওই বিষ-তরলটি পান করবে। তারপর হুঁশ আর বেহুঁশের মাঝখানে স্মৃতির মাদুর পেতে, তার এই পঁয়তাল্লিশ বছরের অপরিশীলিত অথচ মৃদু কম্পমান শরীরটা নিয়ে, বেঘোর-নৈঃশব্দের ওপর শুয়ে থাকবে। আর, এই শরীরের ইতিহাসের গায়ে হাত বুলোবে।
প্রথমে ক্লোজ-আপ-এ স্ত্রীর মুখটা ভেসে উঠবে। তারপরে জুম ব্যাক করবে ভাবনার দৃষ্টিটা। আস্তে আস্তে স্ত্রীর গোটা শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে। নিমাই ভাববে, কল্পনায় দেখতে থাকবে- আজ থেকে পনেরো বছর আগে সেই প্রবল ঝড়-বৃষ্টির রাতে স্ত্রীর সঙ্গে শেষ সহবাসের কথা। তারপর সে ঘুমিয়ে পড়লে, এই জন্মবৈরাগী শরীরটা নিয়ে কিভাবে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছিল, সেই সব অপ্রত্যয়িত দৃশ্যসর্বস্ব কথাসকল তাকে চেতনে-অবচেতনে আক্রান্ত করতে থাকবে। করতেই থাকবে…
তারপর ভাববে, এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে কীভাবে এই শ্মশানে এসে পড়ল, তার কথা। চরসগাঁজাভাংআফিম তো আছেই। এরা শাশ্বত। এর বাইরে, এই এখন, যে তরলটি সে পান করল, তা কীভাবে তার মস্তিষ্কপ্রসূত থেকে আবিষ্কারে পরিণত হল! সেই নিভাঁজ স্মৃতিটি সে মগজ থেকে বার করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে ঝালিয়ে নিতে থাকবে- ওই একটা ছোটো শ্মশান-কলসির ভেতরে সে কী কী রেখেছিল বা রাখে! তার তালিকা কীভাবে আস্তে আস্তে বাড়াতে থাকে সে……
পচা ফলমূল, বট-অশ্বত্থ-মহানিম গাছের পাতা, পচা ভাত, গোবর, বাজার থেকে কুড়িয়ে আনা বিভিন্ন শাকপাতা, পাঁঠার নাড়িভুঁড়ি, মাছের আঁশ, এক পাঁইট বাংলা মদ, প্রয়োজনে আরও এক পাঁইট, খানিকটা নিজের পেচ্ছাপ, ইত্যাদি দিয়ে কলসির দুই-তৃতীয়াংশ ভর্তি করে!
তারপর ওই কলসির মুখ ভালো করে গঙ্গামাটি দিয়ে সরা এঁটে, গঙ্গার একধারে পুঁতে দিয়ে আসে। এবং ছ-মাস পরে সেই কলসিটা তুলে, ভেতরের ওই তরল নামাবলিতে ছেঁকে পান করে! এই এখন যে রকম সে পান করল!
একই নেশা অনেক দিন হয়ে গেল, এর বাইরে আরও অন্য কোনও রকমের নেশা তৈরি করা যায় কিনা এবার সে ভাববে! এটাই দস্তুর! নেশা যত তাকে চেপে ধরবে, ততই তার এই ভাবনাটা জমে উঠবে- একঘেয়ে নেশা আর ভাল্লাগছে না, আর কী নতুন নেশা তৈরি করা যায়, ইত্যাদি……।
এইভাবে একটার পর একটা ভাবনার শরীরে ট্যুল্ পা রাখতে রাখতেসে ক্রমশ ঢুকে যাবে কুয়াশায়িত ঘুমের বেঘোর অবয়বের ভেতরে। আর বেহুঁশ পড়ে থাকবে আঠেরোটি ঘন্টা। এই, এই রকমই রুটিনের ভেতরে তার এযাবৎ শরীর।
তবে, এরও কি ব্যত্যয় হয় না? হয়। যেদিন প্রবল ঝড়বৃষ্টিবিদ্যুৎ শুরু হয়, সেদিন তার নেশা ছুটে যায়। তড়াক্ লাফে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে। আর থরথর কাঁপতে থাকে। শেষ দেখা সঙ্গমরত স্ত্রীর উলঙ্গ শরীরটা তার চোখের ওপর চকিত বিদ্যুচ্চমকের সঙ্গে সঙ্গে ছলাৎচ্ছল ভাসতে থাকে। আর তৎক্ষণাৎ যৌনতামাখা একটা তীব্র আঁশটে গন্ধ লম্বা সাপের মতো তার সারা শরীর প্যাঁচাতে থাকে।
অসহায় ছটফ্ট করতে থাকে নিমাই। সারা গায়ে যৌনগন্ধ মেখে কী যেন খোঁজে।
হাতড়ায়। হাতড়াতেই থাকে…….
কী হাতড়ায়? নিমাই? সে নিজেও জানে না…….
এই না জানার মাঝখানে আজ, আবার তীব্র ঝড়বৃষ্টিবিদ্যুৎ আসে আগাম সংকেত না দিয়ে। আর, পুনরায় নিমাই তড়াক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ে। পুনরায় যৌনতাক্রান্ত হয়। কী যেন হাতড়াতে থাকে। হাতড়াতে হাতড়াতে উদ্দেশ্যহীন সে চলে আসে কাঠ-চুল্লীর কাছাকাছি।
তীব্র বৃষ্টি! তার সঙ্গে নেশা মিশে ভিতর-বাইরে সব ঝাপসা। তাই, অভ্যস্থ চোখ যেন অনভ্যস্থ! চুল্লীর পাশে দেখতে পায় একটা খাট। তাতে শায়িত এক নারী। চক্কে ওঠে নিমাই। এতক্ষণ কী যেন হাতড়াচ্ছিল? সেটাও থকে যায়। দু-চোখে সার্চ লাইট জ্বেলে সন্তর্পণ চারপাশে আলো ফেলে সে। নাঃ, কেউ নেই আশপাশে। যারা এই লাশ বহন করে এনেছে, তুমুল বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য, তারা বোধহয় অদূরে শ্মশান-কালীর মন্দিরে ঠাঁই নিয়েছে। আর, বৃষ্টি থামারও কোনও লক্ষণ নেই।
সাধু নিমাই স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে আছে। বিড়বিড় করে কী যেন ভাবছে। আর সেই যৌনতামাখা আঁশটে গন্ধটা ক্রমশ তীব্র, তীব্রতর হয়ে নিমাইয়ের শরীর থেকে বিকিরিত হচ্ছে। এক-পা দু-পা করে নিমাই সেই নারীর দিকে এগোতে থাকে।
আর তখনই, প্রতি বারের মতো এবারও তার বিবেক প্রথমে কুণ্ডলী-পাকানো একটি ধবদবে সাদা সাপ-এ পরিণত হয়! তারপর তার ওই অমার্জিত শরীর থেকে সরসর সরসর করে বেরিয়ে আসে! অনেকটা দূরে চলে যায়। কয়েক মুহূর্ত থকে ওই দূর থেকেই নিমাইকে আগাপাস্তলা জরিপ করে!
তারপর আচা তীব্র ছুটে আসে। তাকে দংশায়। বার-বার, বারংবার…
আর নিমাই, অনাহৃত এক তীব্র অথচ স্থির কম্পন অনুভব করে! প্রথমেমনের ভেতরে, তারপর শরীরে! আর, তৎক্ষণাৎই শরীরের ভেতরে অসম্ভব দ্রুত ছোটাছুটি শুরু হয়, অথচ বাইরে সে স্থাণুবৎ। মুখ থেকে দুর্বোধ্য, অমনোযোগী, মৃদু এবং এক ধরনের ধাতব বিড়বিড় শব্দ একটানা বেরিয়ে আসতে থাকে! হ্যাঁ আর না এর মাঝখনে তার শরীর দুলতে থাকে মহাকালের মতো। আর সাধু নিমাই হেরে যায়। সে আবার এগোয়। চকিতে খাটিয়াটির ওপরে এসে বসে দ্রুত। সেই প্রাণহীন নারীর পায়ের গোড়ালির কাছ থেকে ভিজে জমাট কাপড়টি প্রাণপণে গুটিয়ে ওপরে তুলতে থাকে। আর হঠাৎই কী যেন ভেবে মাথা ঘোরায়। দৃষ্টি ফেলে ওই লাশ, ওই নারীর, সিঁদুর ল্যাপ্টানো মুখের দিকে। তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। সমগ্র দৃষ্টিকে একত্রিত করে পুনরায় সেই নারীর মুখের কাছে নিয়ে যায় তার মুখ। তীব্র দৃষ্টিতে এফোঁড় ওফোঁড় করে। তারপর স্থির হয়ে যায়।
আর তখনই তীব্র আলো-ঝলকানি একটা বাজ পড়ে।
তখনও নিমাই স্থির! স্থাণুবৎ! কিছুতেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না-
ওই প্রাণহীন নারী তার স্ত্রী!

Tags: গল্প, গল্পের সময়, গল্পের সময় উৎসব সংখ্যা ২০২৬, শনাক্তকরণ, শ্যামল জানা
email:galpersamay@gmail.com

মতামত
আপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।