10 Oct

বিলকিসের মা

লিখেছেন:রূপা সেনগুপ্ত


বিলকিসের মা / রূপা সেনগুপ্ত

তরুবালা বারান্দায় বসে ভাত মাখছেন। হ্যাঁ তাতো প্রায় এক গামলা হবেই। তাঁর সামনে পাঁচটি বিড়াল বসে আছে উবু হয়ে। বিলকিস খালি তাঁর কোলে। সাদা ধবধবে নীল চোখের বিলকিস তরুবালার একটু বেশি প্রিয়। রথের মেলায় কুড়িয়ে পাওয়া একে । তাঁদের বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে মাহেশের রথের মেলায় গেছিলেন তিনি। তখন  ওই গজা জিলিপির দোকানের পাশটায় দেখেন একটা ছোট্ট বিড়াল ছানা। বিড়ালরা বোধহয় তাঁর গায়ে কোন গন্ধ পায়। তরুবালার পায়ের কাছে এসে ডাক দেয়। স্পষ্ট যেন শুনতে পেলেন, মা। কোলে তুলে নিলেন।

রথযাত্রা উপলক্ষে মাহেশের স্নানপিড়ি ময়দানে এক মাস ধরে বিশাল মেলা বসে। মেলায় কত দোকান!হাতের কাজের জিনিস, খেলনা, খাবার  নাগরদোলা । ওইদিকে আবার গান বাজনার আসর বসে গেছে। লেখা আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসব  দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে। তরুবালা হাঁটছেন। ভিড় ঠেলে সামনের দিকে হাঁটছেন। সামনেই কাঁচের চুড়ির দোকান। দোকানের নাম বিলকিসের রকমারি। তরুবালা কোলের দিকে ফিরে বিড়ালছানাটাকে বললেন, তোর নাম দিলাম বিলকিস । বিড়াল কোলে নিয়ে হাতে চুরি পরলেন এক ডজন । নীল লাল সবুজ তিন রকম চারটি করে। হারুবাবুর বেডিং স্টোর থেকে নিলেন একটা ফুল ছাপা বিছানার চাদর। তারপর বাড়ির দিকে চললেন।

তাঁদের পাড়ায় ঢোকার মুখে রাস্তায় হাঁটু জল জমে। তিনি তাই ঘুর পথে তপনের দোকানের পাস দিয়ে চললেন। তপন জিজ্ঞেস করল কী গো কাকিমা কোলে নতুন কে? তোমার চম্পাকলির মেয়ে বুঝি! তরুবালা একটু রেগেই বলেন, না চম্পকলির নাতনি। মোটামুটি পাড়াবেড়ানি চম্পাকলিকে সবাই চেনে। ভালোবাসে। সে নাকি কারো বাড়ি গিয়ে কোন খাবারে মুখ দেয় না । তবে কিছু দিলে নাকি খায়।

আজ তরুবালার বয়স পয়ষট্টি। তিনি তো এমন ছিলেন না। তাঁকে একসময় লোকে চিনত রতনের মা বলে। এখন ছয়টি বিড়াল দুটি গরু নিয়ে তিনি বিলকিসের মা। সে একদিন ছিল তাঁদের। তখন তাঁরা মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে থাকতেন। বাড়ির পশ্চিমে ছিল এক বিরাট দিঘি। সেখানে বর্ষা এলেই শাপলা ফুল ফুটত। সাদা লাল দুই রকমের শাপলা ফুল জলে ভেসে বেড়াত। বর্ষাকালে চাষি আর দিন-খেটে খাওয়া মানুষের কাজ কম থাকে। এই দুটো মাস ওই সব চাষি যুবক ও অন্যান্য অনেকেই বেকার থাকে।  তাঁদের কেউ কেউ শাপলা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। তাঁদের ওই দিঘিতে ছোট মাঝারি চিংড়ি মাছও পাওয়া যেত প্রচুর। রতনের বাবা এক ধরনের তিনকোনা বাঁশের কাঠামোর সাথে যুক্ত হাতল দেওয়া ছোট জাল যা দিয়ে ঠেলে সামনে নিয়ে চিংড়ি, পুঁটি ও অন্যান্য ছোট মাছ ধরতেন। এই জালকে গা-ঘরে ঠ্যালা জাল বলে। তরুবালা জুত করে রাঁধতেন চিংড়ি শাপলার ঘণ্ট, পুঁটি মাছের চচ্চড়ি। রতন খেতে বসে বড্ড বায়না করত। ও দুধ ভাত খেতে ভালবাসত। সে ওদের সেই বাদামী গাইয়ের দুধ আর গুড় দিয়ে মাখা ভাত চেটে চেটে খেত। মাঝে মাঝেই বাড়িতে তাঁর ননদ পুঁটি ছেলেপুলে নিয়ে বেড়াতে আসত।

সেবার খুব বৃষ্টি হয়েছিল। খাল বিল হাওর নদী সব জল টুবুটুবু । রাস্তা ঘাটে জল কাদায় থৈ থৈ। ননদ পুঁটি  এলো ছেলে মেয়ে নিয়ে। সেদিন রতনের বাবা ইলিশমাছ এনেছিলেন। তরুবলা যত্ন করে রেঁধে বেড়ে সকলকে খাওয়ালেন। খাওয়া শেষে দুপুর তিনটে নাগাদ রতন আর পুঁটির ছেলে বিল্টু গেল ধানক্ষেতের পারের সরু নালিতে ঘুণী দিয়ে মাছ ধরতে। অনেক বার বারণ করেছিলেন তিনি। ছেলেরা শুনলে তো! বিকেল শেষ হয় হয় এমন সময় রতন ফিরল। কিন্তু বিল্টু ফিরল না। রতনের কথা মতো পায়খানা পাওয়ায় বিল্টু নাকি আগেই বাড়িতে চলে এসেছে। রতন হালদারপাড়ার দিপু আর প্রদীপের সঙ্গে মাছ ধরছিল।

বিল্টুকে সারা  সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত অবধি খুঁজে পাওয়া গেল না। শেষে ভুবনকাকা চিনিকাকা ওই রাতেই পশ্চিমের বিলের জলে নামলেন। বিল্টুর দেহ পাওয়া গেল। ছেলেটার হাতে একগোছা শাপলাফুল ধরা ছিল। সেই ঘটনায় পুঁটির ক্ষতি  কষ্ট যা কিছু হবার তো হলোই , কিন্তু রতন যেন কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। খালি বলতে লাগল, ইস যদি ওকে আমি একা ছেড়ে না দিতাম!

রতনের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগল। চেহারা শুকিয়ে দড়ি পাকিয়ে গেল। গোটা পরিবারেই কেমন একটা অসুখ অমঙ্গলের ছায়া ঘনিয়ে পড়ল। চিনিকাকা তাকে ডেকে বললেন, মা তুমি রতনকে কদিনের জন্য ওর মামার বাসায় রেখে এসো। তরুবালাও যেন  অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি ঠিক করলেন লক্ষ্মীপূজার সময় ছেলেকে মামারবাড়িতে রেখে আসবেন।

দেশভাগের পরে তাঁর বাবা ভাইরা নদিয়ার দোগাছিতে এসে ওঠেন। ফরিদপুরে তাঁর বাপের ভিটায় খুব বড় করে লক্ষ্মীপূজা হতো। তাঁর বাবা নেপাল সাহার ছিল খুব বড় কাপড়ের দোকান। কত কর্মচারী কাজ করত সেই দোকানে! তরুবালাকে বিয়ের সময় ওজন করে পঁয়ত্রিশ ভরি সোনার গয়না দিয়েছিলেন তাঁর বাবা। তারপর দেশে শুরু হলো সে কী বিভ্রাট! তরুর তখন চোদ্দ বছর বয়স। সদ্য বিবাহিতা।  তরুবালারা সকলেই দেশ ছাড়লেন। ওদের পাড়া প্রতিবেশী জ্ঞাতি আত্মীয় সবাই একে একে চলে এলো । সবাই মিলে উঠল অঞ্জনানদীর তীরে এই পাড়াতে ।

দেশ ছাড়ার সময় ওই মানুষগুলো তাঁদের  সঙ্গে করে নিজেদের ঘটি-বাটি আর সংস্কৃতির পাশাপাশি নিয়ে এসেছিলেন তাদের গৃহলক্ষ্মীকেও। এইবঙ্গে এসে নতুনভাবে নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিচয়  টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবেই তাঁরা এই পুজো ও মেলার সূচনা করেন বলে তরুবালা শুনেছেন। যা আজ নদীয়ার অন্যতম প্রধান উৎসব।

নদীয়ার দোগাছি অঞ্চলের বিখ্যাত আড়ঙ মেলাতে তাই পূর্ববঙ্গের এই উদ্বাস্তু সংস্কৃতির ছায়া  রয়েছে। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের কবিতায় আছে এই  অঞ্জনানদীর নাম। সে প্রথম প্রথম অবাক চোখে দেখত নদীটিকে।

যাইহোক এমনিতে তো আর রতনকে মামারবাড়ি পাঠানো যেত না, সে কিছুতেই ঘর ছেড়ে বের হতে চায় না। খালি একই কথা। মা আমি যদি বিল্টুর সঙ্গে চলে আসতাম। খুব মন খারাপ হয় তরুর। সে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, বাবা নিয়তির লিখন খণ্ডায় কার সাধ্যি!

দুর্গাপূজার রেশ কেটেছে। এসেছে লক্ষ্মীপুজো। তরুবালা ছেলেকে তাঁর দুদিন আগে মামারবাড়িতে নিয়ে যান। সেই অঞ্জনার তীরে দোগাছিতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ঘিরে  উৎসব শুরু হয়েছে । হচ্ছে আড়ঙ মেলা। খুব খুশি অঞ্জনার তীরের দোগাছিবাসী। এলাকাটি উদ্বাস্তু পাড়া বলে পরিচিত। এখানে ঘরে ঘরে  লক্ষ্মীপুজো।  দোগাছিতে লক্ষ্মীপুজো মানে গ্রামে গ্রামে আত্মীয়-স্বজন, কুটুমের আসা যাওয়া। তরুবালার মন অনেকদিন বাদে খুশিতে ভরে ওঠে। রতনের মুখেও হাসি। এই সময় ঘরে ঘরে হাতে তৈরি তিলের নাড়ু, চিনির নাড়ু, গুড়ের ও নারকেলে নাড়ু, মুড়ির মোয়া করা হয়। পুজোর দিন বাড়ি বাড়ি আলপনা দেওয়া হয়। বাঙালির বড় উৎসব দুর্গাপুজা হলেও এখানে আসলে বোঝা যায় লক্ষ্মী পুজোর সঙ্গে কত আবেগ ভক্তি  মিশে রয়েছে।  প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষ্যে নদী তীরের সাময়িক বাজার ও মেলা বসে। আড়ঙ মেলা বলে সবাই।   রতন একাই মেলায় চলে যায়। মেলায় নাগরদোলায় চড়ে খুব মজা পায় সে। বাড়ি এসে কত গল্প করে!

সারারাত পেরিয়ে সকাল হতে মেলা শেষ হয়ে যায়। লক্ষাধিক টাকার ব্যবসা হয়। শুরু হয় পাশেই বয়ে যাওয়া অঞ্জনানদীতে প্রতিমা বিসর্জন।

এই প্রতিমা বিসর্জন দেখতে গিয়ে রতন আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওর বিল্টুর কথা মনে পড়ে যায়।

তরুবালার  বড় ভাইয়ের ছেলেটি একটা ইস্কুলে বিজ্ঞান পড়ায়। ভারী ভালো ছাত্র সে, ভালো শিক্ষকও। সে বলে, পিসিমা এ হলো মনের অসুখ। ওকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে মনের রোগের চিকিৎসা করেন এমন একজন ডাক্তার দেখাও। তরুবলা সেদিন একটা মস্ত ভুল করেছিলেন। তিনি ওই কথা কানে তোলেন নি। ভাবলেন শেষে কী না পাগলের ডাক্তার দেখাতে হবে! তিনি বাড়ি ফিরে ওঝা গুনিন করতে লাগলেন। জ্যোতিষীর কাছে গেলেন। আংটি তাবিজ কবজে রতনের হাত ভরে গেল। কিছুই হলো না। জল দেখলে, শাপলা ফুল দেখলে রতন চিৎকার করে ওঠে। কখনও কখনও অজ্ঞান হয়ে যায়।

তাঁরা স্বামী স্ত্রী মিলে এই বাসাটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবেন বলে ঠিক করলেন। ভাবলেন যদি এতে কোন উপকার হয়। সেই মতো রতনের বাবার মামারবাড়ির কাছে গঙ্গানদীর পাড়ে এসে বাসা ভাড়া নিলেন। তবুও ছেলের তেমন কিছু পরিবর্তন তাঁরা দেখলেন না।

তারপর শেষমেশ যখন ডাক্তারের কাছে গেলেন তখন ছেলে আর ছেলের মধ্যে নেই। যেন অন্য কেউ। আজ বছর দশেক হলো রতন বছরে অন্তত দু’বার মানসিক চিকিৎসালয়ে ভর্তি থাকে। যখন সুস্থ থাকে তখন বাবার সঙ্গে দোকানে যায়। ব্যবসা করে। ইতিমধ্যে আদু শশী চাঁপা নামের বিড়াল একটি একটি করে তাঁর আশ্রয়ে এসেছে। সবশেষে এই আহ্লাদী বিলকিস এলো। আর কী করে না জানি এই পাড়ায় বিলকিসের মা নাম হয়ে গেল তাঁর। তিনি এদের মাঝে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন নাকি  কষ্ট লুকিয়ে রাখেন, তাতো তিনি নিজেও জানেন না। দুধভাত মাখা গামলা নিয়ে তিনি সানবাঁধানো কলতলায় ভাগ ভাগ করে দলা পাকানো ভাত রেখে ডাক দেন , ওরে তোরা আয়। সবকটি ছুটে এসে খাওয়া শুরু করে। শুধু বিলকিস কোলের কাছে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে সাড়া দেয় ম্যাও । যেন বলে আমাকে একটু খাইয়ে দাও! তিনি একটু একটু করে ভাত খাইয়ে দেন বিলকিসকে।

[ বানানবিধি লেখকের নিজস্ব ]

বিলকিসের মা /  রূপা সেনগুপ্ত

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 - 2026 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ ।